kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

ফোকাস

পাহাড়ে অ্যাডভেঞ্চার

এখন পাহাড়ে ওঠার উপযুক্ত সময়। মন চাইলেই বন্ধুদের নিয়ে উঠে যেতে পারো পাহাড়ে। তবে তার আগে জেনে নিতে হবে সতর্কতা। পাহাড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা আর এ বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন আরাফাত বিন হাসান

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাহাড়ে অ্যাডভেঞ্চার

চট্টগ্রাম শহরের এদিক-ওদিক ছোটখাটো পাহাড় অনেক। তাথির (বাঁয়ে), নিশাত ও রাকিবের মতো তোমরাও ঘুরে আসতে পারো দল বেঁধে

তিনজনই সমান তালে এগোচ্ছে। রাকিবের পাহাড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা আছে, তাই সবার আগে ও। দলের ছোট সদস্য তাথির। আরেকজন নিশাত। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীর ছোটখাটো পাহাড়গুলোতে যাচ্ছে ওরা অ্যাডভেঞ্চারের সন্ধানে।

‘এবার একটু জিরিয়ে নেওয়া যায় না?’ প্রশ্ন নিশাতের।

‘হ্যাঁ, একটু জিরিয়ে নেওয়া গেলে ভালোই হতো’—সায় দিল তাথির।

‘সামনের ওদিকটায় কিছুটা পরিষ্কার, জঙ্গলও প্রায় নেই। চলো সামনে জিরোই।’  প্রস্তাব দিল রাকিব।

‘আচ্ছা ঠিক আছে, চলো।’ সায় দিল নিশাত ও তাথির।

ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে পানি পান শেষে খালি বোতলটি পাশে ছুড়ে মারল নিশাত।

‘সেকি! এখানে সিটি করপোরেশনের লোকজন এটা নিতে আসবে নাকি?’ বোতলটি কুড়িয়ে নিতে নিতে বলল রাকিব। নিশাতের বুঝতে বাকি নেই যে এখানে ময়লা ফেলাটা তার মোটেও ঠিক হয়নি, তাই ভ্রু কুঁচকে বোঝাতে চাইল—এটা তার ভুল হয়ে গেছে।

হঠাত্ লাফিয়ে উঠল তাথির, ‘আইডিয়া!’

‘পাহাড়ে বাড়ি বানাবি নাকি?’ রাকিবের প্রশ্ন।

‘আরে দূর, তুমি মিয়া সব সময় ফাজলামো করো। আচ্ছা, এখানে বারবিকিউ করলে কেমন হয়?’ তাথিরের ভাবখানা এমন যেন দুনিয়ার সবচেয়ে চমত্কার আইডিয়াটা বের করে ফেলছে।

‘দারুণ তো! চলো আয়োজন করা যাক।’ নিশাত বলল।

‘কিন্তু এখানকার বুনো প্রাণীদের কথাও তো ভাবতে হবে, এখানে বারবিকিউ করলে তাদের ক্ষতি হতে পারে।’ রাকিবের সতর্কবাণী।

‘ও তাই তো!’ সমস্বরে বলল তাথির আর নিশাত।

জিরোনো শেষ। আর ১০ মিনিটের মতো এগোলেই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে যাবে ওরা। তিনজনই এগোতে শুরু করল আবার। হঠাত্ থেমে গেল রাকিব। চেহারায় বিরক্তি ভাব। হাত চুলকাতে চুলকাতে রাকিব বলল, ‘দেখো, এই গাছের পাতা আমার হাতে লাগামাত্রই বাজেভাবে চুলকাচ্ছে!’

‘এ আবার কেমন গাছ?’ এগিয়ে এলো নিশাত।

‘আরে আরে, ওই দেখো শিমের মাইক্রো ভার্সনের মতো দুটি ফলও দেখা যাচ্ছে!’ বলল তাথির।

‘আচ্ছা, গাছের নামটা কী হতে পারে?’ নিশাতের প্রশ্ন। হঠাত্ মুঠোফোন বের করে গাছটার ফলের একটি ছবি তুলল রাকিব। তারপর মন দিল ফোনে। একটু পর রাকিব বলল, ‘শোনো, গাছটার নাম আলকুশি বা বিলাই আঁচড়া। অনেকে একে বিচুটি নামেও চেনে। মানুষের গায়ে লাগলে চুলকালেও এর কয়েকটি ঔষধি গুণও রয়েছে।’

নিশাত আর তাথিরের বুঝতে বাকি নেই, রাকিব গাছটির ছবি গুগলে সার্চ করেই এসব জেনেছে।

চূড়ায় পৌঁছল ওরা। বোঝাই যাচ্ছে, ওদের আগেও এখানে অনেকে এসেছে। খালি পানির বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ মানুষের ফেলে দেওয়া বিভিন্ন পরিত্যক্ত জিনিস দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া যায়।

‘আচ্ছা, এখানকার অপাচ্য ময়লাগুলো আমরা পরিষ্কার করে নিয়ে গেলে ভালো হয় না?’ নিশাতের প্রস্তাব।

‘অসাধারণ আইডিয়া।’ বলল রাকিব।

‘আচ্ছা, এখানে বুনো ফুল খুব একটা দেখা যাচ্ছে না কেন?’ জানতে চাইল তাথির।

‘এখন তো শীতকাল। শীতকালে বুনো ফুল খুব একটা ফোটে না। বেশির ভাগ বুনো ফুল ফোটে বর্ষাকালে।’ বলল রাকিব।

‘তাহলে বর্ষাকালে একবার এসে ঘুরে গেলে কেমন হয়?’ জানতে চাইল নিশাত। 

‘দেখো, বর্ষাকালে পাহাড়ে জোঁকের উপদ্রব বেড়ে যায়, তা ছাড়া পাহাড়ি মাটিও খুব পিচ্ছিল হয়ে যায়। আবার তখন ছুটিও খুব একটা পাওয়া যায় না, তাই বার্ষিক পরীক্ষার পরে শীতকালীন ছুটিতে আসাটাই সবচেয়ে ভালো।’ রাকিবের উত্তর।

 

পাহাড়ে যা করতে পারো

এমন কিছু উদ্ভিদ আছে, যা শুধু পাহাড়ি অঞ্চলেই জন্মে। যেমন—গর্জন, সেগুন, গামার ইত্যাদি। এসব উদ্ভিদের নাম আমরা শুধু পাঠ্য বই দেখে মুখস্থ করি; কিন্তু স্বচক্ষে খুব একটা দেখি না। তাই এমন কোনো উদ্ভিদের দেখা পেলে তা ভালো করে দেখে তার নাম জানার চেষ্টা করা যেতে পারে। নাম জানতে না পারলে নমুনা সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে শিক্ষক বা অন্য কারো সাহায্য নিয়ে নাম জানা যেতে পারে।

 

পাহাড়ি ঝরনার খোঁজ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ পাহাড়েই পাহাড়ি ঝরনার দেখা মেলে। পাহাড়ি ঝিরি ধরে এগোলেই এসব ঝরনার দেখা পাবে।

 

অপরিচিত কোনো পাখি বা অন্য কোনো প্রাণী দেখলে সেটা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে পারো। সম্ভব হলে ছবিও সংগ্রহ করবে। তত্ক্ষণাত্ ওই প্রাণী বা পাখিটি সম্পর্কে জানতে না পারলেও ছবির মাধ্যমে পরে জানা যেতে পারে।

 

অন্য দর্শনার্থীদের যত্রতত্র ময়লা ফেলা নিয়ে সচেতন করতে পারো।

 

যা করা যাবে না

অনেকে পাহাড়ি এলাকায় ক্যাম্প করে বারবিকিউর আয়োজন করে। যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আগুনের ধোঁয়া দেখে পাহাড়ি প্রাণীরা ভয় পেতে পারে। তা ছাড়া পাহাড়ি জঙ্গলে আগুন ছড়িয়েও যেতে পারে।

 

ক্যাম্প করার ক্ষেত্রে এমন জায়গা বেছে নিতে হবে, যেখানে বন্য প্রাণীর আনাগোনা কম। ক্যাম্প করলে রাতে জোরে শব্দ বা গান-বাজনা করা যাবে না। রাতে বেশি আলো জ্বালানোটাও বন্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।

 

অপচনশীল কিছু কোনোভাবেই পাহাড়ে ফেলা যাবে না। কারণ এটা পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিক্ষর। আর পচনশীল কিছু যদি ফেলতেই হয়, তবে তা মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে।

 

হাইকিং বা ট্রেকিংয়ের সময় উদ্ভিদ বা প্রাণীর যথাসম্ভব ক্ষতি না করার চেষ্টা করবে। অহেতুক লতাপাতা কাটা বা মাড়ানো উচিত নয়।

 

পাহাড়ে মলমূত্র ত্যাগের সুব্যবস্থা নেই। খোলা আকাশের নিচেই শৌচকার্য সম্পন্ন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে স্থানটি কোনো পানির উেসর আশপাশে যেন না হয়। তা ছাড়া মল ও টয়লেট টিস্যু গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে।

 

কোনোভাবেই পাহাড়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অসদাচরণ বা বিদ্রূপ করা যাবে না। তাদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

 

সতর্ক থাকো

পাহাড়ি এলাকায় যেহেতু নানা ধরনের জীবজন্তু আছে, তাই পাহাড়ে প্রতিটি পদক্ষেপই দেখেশুনে নিতে হবে। হাইকিং বা ট্রেকিংয়ের সময় চোখ-কান খোলা রেখে এগোতে হবে। পাহাড়ি জঙ্গলে নানা ধরনের বোলতা থাকে। তাই বোলতার বাসা দেখে চলতে হবে। ভুলেও বোলতা বা মৌমাছির বাসায় ঢিল ছুড়বে না। ওরা আক্রান্ত হলে দল বেঁধে হামলা করবে। বোলতার কামড়ের বিষক্রিয়া কিন্তু মারাত্মক!

কাঁকড়াবিছা নামের ছোট্ট অথচ প্রাণঘাতী প্রাণীটা পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা যায়। এ থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে চলবে।

 

পাহাড়ি জঙ্গলে সাপের যথেষ্ট ভয় রয়েছে। তবে পাহাড়ি সাপ মানুষকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। কিন্তু এরা যদি মনে করে তাদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন ওরাও কিন্তু বসে থাকবে না!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা