kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

ধারাবাহিক উপন্যাস

রাজবাড়ির অন্ধকারে

মোস্তফা মামুন

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রাজবাড়ির অন্ধকারে

অঙ্কন : জামিল

৩.

ময়মনসিংহ স্টেশন রোডের আমির ইন্টারন্যাশনাল হোটেল থেকে বেরোনোর সময় গাড়িতে উঠতে গিয়ে কাকা একটু দাঁড়িয়ে গিয়ে কী যেন দেখলেন চারদিকে। তারপর বললেন, ‘শান্ত, তোরা গাড়ি নিয়ে আগা। আমি একটু পরে আসছি।’

দেশে কোনো অভিযান হলে সাব্বির মামা জুটে যান সঙ্গে। মামা সব কিছুতে অতিরিক্ত উত্তেজনা দেখিয়ে ঝামেলা পাকান, কাজের চেয়ে অকাজ করে বেশি, তবু কেন কাকার খুব পছন্দ তাঁকে।

মামা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আবার আলাদা যাওয়া কেন? বলেন তো আমরা একটু অপেক্ষা করি।’

আমি ইঙ্গিতটা বুঝলাম। কোনো কারণ ছাড়া কাকা আলাদা হতে চাচ্ছেন না।

আমরা রওনা হলাম। কাকা এলেন মিনিট ১৬ পরে। একটা রিকশায় চড়ে।

কিছু জানতে চাওয়ার আগেই বললেন, ‘যা ভেবেছিলাম তা-ই।’

‘কেউ কী আমাদের ফলো করছে?’

‘হ্যাঁ। আমরা যখন হোটেলে ঢুকি তখনই দেখেছিলাম একটা কালো রঙের মাইক্রোবাস পেছন পেছন এসেছিল। তা এ রকম গাড়ি হোটেলে আসতেই পারে। এখন বাইরে বেরিয়েও মনে হলো যেন সেই গাড়িটা দাঁড়ানো। তাই দেখলাম ওরা আমাদের গাড়িকে অনুসরণ করে কি না?’

‘করল?’

‘গাড়ি যাচ্ছে, আমি যাচ্ছি না—এতে একটু দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল। খেয়াল করলাম গাড়ি স্টার্ট দিয়েও থেমে গেছে। এর মানে হলো, ওদের কেউ অন্য জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফোনে ওর কাছে নির্দেশনা চাইছে।’

‘তারপর? গাড়িটা রওনা হলো, নাকি ওখানেই...’

‘গাড়িটা আগেই রওনা হয়ে গেছে। কিন্তু আবার এখানে এসে দেখলাম না।’

আমরা এসেছি সার্কিট হাউসে। ওখানে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যোগ দেবেন আনোয়ার সাহেব। সঙ্গে আরো দুজন লোক থাকবেন। আনোয়ার সাহেব এঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছেন, কারণ তাঁর ধারণা এঁরা আমাদের আরো নিশ্চিত করে দেবেন যে ঘটনার পেছনে বিক্রম চৌধুরীই দায়ী।

আনোয়ার চৌধুরী এলেন মিনিট দশেক পরে। সঙ্গে যে দুজন মানুষ তাঁদের একজন নবারুণ বাবু। অন্যজনের নাম আল ইমরান। নবারুণ বাবুর পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি আর তাঁর পরনে সাফারি। বোঝা গেল আনোয়ার চৌধুরীর বন্ধুরা পোশাক-আশাকে একটু ব্যতিক্রমী রুচির। এখন ধুতি পরে সাধারণত কেউ বের হয় না। সাফারিও অভিজাত মহলে প্রায় পরিত্যক্ত পোশাক।

জানা গেল, আল ইমরান একজন প্রকৌশলী। ময়মনসিংহের পুরনো যেসব জমিদারি আমলের স্থাপনা আছে, সেগুলো নিয়েই তাঁর কাজ।

সাব্বির মামা বললেন, ‘এ বিষয়টা আমার পছন্দ না।’

‘কোন বিষয়টা?’

‘এই যে পুরনো স্থাপনা। এগুলো ভেঙে ফেলা উচিত।’

‘কেন ভেঙে ফেলা উচিত’—ইমরান সাহেব একটু কৌতূহলী।

‘এই পুরনো লক্কড়ঝক্কড় দালানকোঠা টিকিয়ে রাখার কী দরকার? আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট হবে। বেশি মানুষ থাকতে পারবে। গ্রাম হয়ে যাবে শহর।’

আল ইমরান হাসলেন। ‘বড় শহরগুলোকে জঙ্গল বানানোর পরও আপনারা খুশি হচ্ছেন না।’

‘এসব বড়লোকি ইউরোপ-আমেরিকাকে মানায়। অল্প মানুষ। টাকা-পয়সার অভাব নেই। ওরা ঐতিহ্য-ইতিহাস নিয়ে ভাববে। আমাদের মানুষ খেতে পায় না, কী দরকার এসবে টাকা খরচের।’

আল ইমরান হাসেন। তাঁর চিন্তার সঙ্গে সাব্বির মামার চিন্তার দূরত্ব এত বেশি যে তিনি আর কথা বাড়ানোর দরকার দেখেন না।

আনোয়ার চৌধুরী প্রসঙ্গে আসতে চান। বলেন, ‘তনু সাহেব এই দুজন বিক্রমের খুব ঘনিষ্ঠ। বলতে পারেন আমাদেরও খুব ঘনিষ্ঠ। তাঁদের সঙ্গে কথা বললেই আপনি ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।’

নবারুণ বাবু প্রতিটা কথার আগেই বিগলিত হয়ে পড়েন। সে রকম গলায় বললেন, ‘আসলে এ রকম একটা মেয়ের সঙ্গে এমন কাণ্ড। ভাবাই যায় না।’

কাকা জানতে চাইলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে বিক্রম সাহেবের পরে এ বিষয়ে কথা হয়েছে?’

আল ইমরান বললেন, ‘অনেক বুঝিয়ে বলেছি মেয়েটাকে ফিরিয়ে দিতে।’

‘উনি কী বললেন?’

‘কী আর বলবেন। পুরো অস্বীকার করেন।’

কী ইন্টারেস্টিং সেটা জানলাম হোটেলে ফিরে। কাকা ঘোষণার স্বরে জানালেন, যে গাড়িটা দুপুর থেকে আমাদের ফলো করছিল, সেই গাড়িতে বসেছিলেন আল ইমরান সাহেব। আমি চেহারাটা খেয়াল করতে না পারলেও খয়েরি রঙের সাফারিটা দেখেছিলাম

আনোয়ার সাহেব বলেন, আর নাটকও করেন। বলেন, ‘তিনি নাকি খুঁজছেন?’

কাকা বললেন, ‘আচ্ছা ওনার বাসায় কি যাওয়া যাবে?’

‘অবশ্যই যাওয়া যাবে। একটু অপেক্ষা করতে হবে। অফিসে নাকি বলে গেছে ও দুদিনের জন্য ঢাকা যাচ্ছে। এই দুদিন আমি দেখব। না হলে বাসা ভেঙে ফেলব।’

নবারুণ বাবু বললেন, ‘মেয়ের শোকে বিক্রমের মাথা গেছে।’

আল ইমরান সাহেব একটু গলা খাঁকারি দিলেন। নবারুণ বাবু বিগলিত হন। আর তিনি শুরুতে কেশে নেন। ‘শুনুন তন্ময় সাহেব, নিজেদের মধ্যে বলে আমরা চেয়েছিলাম আপসে ব্যাপারটা মীমাংসা করতে। কিন্তু বোঝানোই গেল না।’

কাকা একটু ভেবে বলেন, ‘এমন কী হতে পারে না যে তৃতীয় কোনো পক্ষ এখানে ঢুকে পড়েছে।’

নবারুণ বাবুর বিগলিত ভাব এবার আর থাকল না। ‘না না, তৃতীয় কোনো পক্ষ এখানে আসবে কেন? আঁখির বিষয়ে ওর ইন্টারেস্টটা নিয়ে আমার শুরুতেই একটু সন্দেহ ছিল। আমি আনোয়ারকে সাবধানও করেছিলাম। ঠিক না আনোয়ার...?’

আনোয়ার সাহেব মাথা নেড়ে জানালেন, ঠিক।

চা চলে এসেছে। সঙ্গে মুক্তাগাছার ঐতিহ্যবাহী মণ্ডা।

সাব্বির মামা এসব ক্ষেত্রে দেরি করেন না। তিনি খেতে শুরু করে বলেন, ‘আমার কাছে তো মনে হচ্ছে প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল কেস। বিক্রম বাবু কোথাও আঁখিকে লুকিয়ে রেখেছেন।’

আল ইমরান বলেন, ‘আশার কথা এটাই যে মেয়েটাকে তিনি এত বেশি ভালোবাসেন, আমাদের বিশ্বাস কোনো খারাপ কিছু হয়নি।’

কাকা একটা মণ্ডা নিয়ে বললেন, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চলের মিষ্টির এত খ্যাতির কারণ কী? আপনাদের মণ্ডা। টাঙ্গাইলের চমচম। আরো বহু কিছু আছে।’

নবারুণ বাবু বলেন, ‘একেবারে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ হয়তো নেই; কিন্তু জমিদার অধ্যুষিত এলাকা তো। তাই আমাদের পিতৃপুরুষরা বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। তখন মিষ্টির খুব কদর ছিল। তাই জমিদারদের কৃপা পেতে অনেকেই মিষ্টি বানানোতে মন দেয়। এভাবেই মিষ্টির খ্যাতি তৈরি হয়ে যায়।’

ইমরান সাহেব যোগ করেন, ‘তবে এখন শুধু নাম আছে। মান নেই। বড় বড় জাতীয় কম্পানি নেমে পড়ায় এগুলো মানে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তাদের ব্যবসা অনেক বড় বলে অনেক ভালো কাঁচামাল ব্যবহার করতে পারে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পারে না। তা ছাড়া কারিগরদের ব্যাপারও আছে। বেশির ভাগেরই ব্যবসা তো পৈতৃক। বাবা-দাদারা নিজেরা বানাতেন। এখন ছেলেরা লোক রেখে কাজ করায়। সেই স্বাদটা আর নেই।’

তাহলেও সাব্বির মামার খুব সমস্যা হলো না। অল্প স্বাদের মিষ্টিই যেভাবে সাঁটাল, তাতে পুরনো স্বাদেরগুলো পেলে আর উঠতই না বোধ হয়।

কাকা ঘড়ি দেখে বলেন, ‘আজ তাহলে উঠি। আমি তো মোটামুটি একটা ধারণা পেলাম।’

বলেই কাকা ওঠার জন্য তাড়াহুড়া শুরু করলেন। আমরা উঠে পড়লাম মিনিট পাঁচেকের মধ্যে।

বাইরে বেরিয়ে কাকা একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে কী যেন দেখে বললেন, ‘ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো। ভেরি ইন্টারেস্টিং।’

‘কী ইন্টারেস্টিং’ সেটা জানলাম হোটেলে ফিরে। কাকা ঘোষণার স্বরে জানালেন, যে গাড়িটা দুপুর থেকে আমাদের ফলো করছিল, সেই গাড়িতে বসেছিলেন আল ইমরান সাহেব। আমি চেহারাটা খেয়াল করতে না পারলেও খয়েরি রঙের সাফারিটা দেখেছিলাম।’

সাব্বির মামা চমকে গিয়ে বললেন, ‘বলেন কী! আমি তো ভাবতেই পারছি না। মানুষটার পোশাকই অবশ্য সন্দেহজনক। এই যুগে সাফারি হচ্ছে পিয়ন-দারোয়ানের পোশাক। সেটা পরে কোনো রুচিশীল মানুষ বাইরে বেরোয় নাকি? আর কী ভদ্র ভাষায় ছোট ছোট বাক্যে কথা! একেবারে বিগলিত ভাব।’

আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘তুমিও তো গলে গিয়েছিলে... যেভাবে প্রণামের জবাবে প্রণাম দিলে...’

‘শোনো, এটাকে বলে ভদ্রতা। কেউ কিছু করলে ওটা ফিরিয়ে দিতে হয়।’

কাকা একটু ভেবে বলেন, ‘একটা জিনিস খেয়াল করেছিস, এই-ই প্রথম আনোয়ার সাহেবের সঙ্গে সুবেদার ছিল না।’

তাইতো।

‘কারণ কী হতে পারে বলে মনে হয়?’

একটু ভেবে বললাম, ‘হতে পারে এটা তার নিজের শহর। এখানে অত ভীতির কিছু নেই। সুবেদার তো একরকমের দেহরক্ষী।’

‘শোনো, এ ধরনের মানুষের বিপদের ঝুঁকি নিজের শহরেই বেশি থাকে। ঢাকায় তো তিনি এমন কেউ না। তাঁর সঙ্গে কারো স্বার্থের সংঘাত নেই।’

কাকা আরো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই ডোরবেলটা বেজে ওঠে। দরজা খুলতেই বেয়ারা একটা কাগজ হাতে দিয়ে বলে, আপনাদের চিঠি।

উত্তেজনায় চিঠিটা কাকার হাতে দেওয়ার আগেই খুলে ফেললাম। কোনো সম্বোধন নেই। সরাসরি লেখা, ‘ব্রহ্মপুত্র পারে চলে আসুন। পূর্ণিমার রাত। দারুণ লাগবে।’

(চলবে)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা