kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিজ্ঞান

শব্দের সত্যি জাদু!

শব্দ মানেই কথা, গান, পাখির ডাক কিংবা রাস্তায় গাড়ির হর্ন। সবই ২০ থেকে ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের ভেতর। এর বাইরেও বিরাট এক শব্দজগত্ আছে, যা আমাদের কান শুনতেই পায় না। বিভিন্ন প্রকারের শব্দ নিয়ে চলছে দুর্দান্ত সব গবেষণা। সেসব শব্দে কান পেতেছিলেন কাজী ফারহান পূর্ব

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শব্দাস্ত্র

কথাবার্তায় একটু বুদ্ধি করে শব্দ ব্যবহার করলে অনেক ক্ষেত্রে তা অস্ত্রের চেয়েও ভালো কাজ করে। তাই বলে সত্যিকারের শব্দাস্ত্রও কি সম্ভব? হেয়ারিং হেলথ ম্যাটার্স ডট অর্গের তথ্য মতে, অ্যাডলফ হিটলারের প্রধান স্থপতি আলবার্ট স্পিয়ার একটি শব্দাস্ত্র বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর ওই অস্ত্রে মিথেন ও অক্সিজেনের মিশ্রণে আগুন ধরানোর মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে এক হাজারটি বিস্ফোরণের শব্দ তৈরি করা হতো। পরে এই শব্দকে কেন্দ্রীভূত করে প্রতিফলক ডিশের মাধ্যমে বিবর্ধিত করে শত্রুর দিকে তাক করা যেত। অস্ত্রটা কখনো কারো ওপর ব্যবহার করা না হলেও ধারণা করা হয়, এটি ৩০০ ফুটের মধ্যে দাঁড়ানো কোনো ব্যক্তির শরীরকে ভয়ানক মাত্রায় কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম ছিল। একজন মানুষকে মেরে ফেলতে এ কম্পন ৩০ সেকেন্ড ধরে চললেই যথেষ্ট! এখান থেকে উত্সাহিত হয়ে ১৯৫০-৬০ সালের দিকে নানাজন নানাভাবে শব্দাস্ত্র তৈরির কাজ করেছেন। তবে সেগুলোর কোনোটি প্রাণঘাতী ছিল না। সেগুলো বানানোর উদ্দেশ্য ছিল জড়ো হওয়া মানুষকে বিচ্ছিন্ন করা। এসব অস্ত্রের প্রভাব কতটুকু হবে, তা নির্ভর করে শব্দের তীব্রতার ওপর। কোনো বেচারার ওপর শব্দাস্ত্র তাক করা হলে তার বমি হওয়া, মাথা ঘোরানো, কানের পর্দা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ফেটে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। হিস্ট্রি ডট কম ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে চীনে এবং ২০১৮ সালে কিউবায় বসবাসরত আমেরিকানদের ওপর শব্দাস্ত্র ব্যবহূত হওয়ার অভিযোগে বিতর্কের ঢেউ ওঠে। আক্রমণের শিকার হওয়া প্রত্যেকেই রহস্যময় গোলমেলে শব্দ শোনার পর থেকে তীব্র মাথা ব্যথা, ঘুমের সমস্যা এবং মস্তিষ্কের সমস্যায় ভুগেছিলেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের নেভিও নাকি এক ধরনের শব্দাস্ত্র ব্যবহার করে জলদস্যুদের তাড়াতে! বর্তমানে বিভিন্ন দেশে শব্দাস্ত্র তৈরি চলছে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের বিরক্ত অথবা ভীত করে তুলতে।

চিপসের প্যাকেট যখন মাইক্রোফোন

ভিডিও করেছ, কিন্তু অডিও রেকর্ড হয়নি। মহা মুশকিল! চিন্তা নেই। বিজ্ঞানীরা এমন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন, যা ভিডিও দেখেই বুঝে নেবে সেখানে কী কী শব্দ হয়েছিল। কী করে সম্ভব? এর জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন এক চমত্কার পদ্ধতি। তোমরা জানো, শব্দ তৈরি হয় কম্পনের কারণে। ধাতব প্লেটে একটা বাড়ি দিলে সেটা কাঁপবে এবং শব্দ করবে। কম্পন থামিয়ে দিলেই শব্দ যাবে থেমে। এডোবি, মাইক্রোসফট এবং এমআইটির একদল গবেষক মিলে যে পদ্ধতিটা বের করেছেন, তা ওই ক্ষুদ্র কম্পন বিশ্লেষণ করে শব্দ পুনরুদ্ধার করতে পারে। এ যেন ডিজিটাল জাদু! এক মিটারের এক কোটি ভাগের এক ভাগ দৈর্ঘ্যের কোনো তলে যে কম্পন হয় তা খুব নগণ্য। সেটাও শনাক্ত করা যাচ্ছে উচ্চ ফ্রেমরেটসম্পন্ন ক্যামেরায়। এরই মধ্যে ‘ম্যারি হ্যাড এ লিটল ল্যাম্ব’ গানটার একটা ভিডিও করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে ওই গানের ফলে চিপসের প্যাকেট ও গাছের পাতা কাঁপাকাঁপি করেছিল। সেই কম্পন থেকে আস্ত গানটাই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এ পদ্ধতিতে চিপসের প্যাকেটটাই কাজ করেছে মাইক্রোফোন হিসেবে। এ প্রযুক্তির জন্য প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ষাট থেকে ছয় হাজার ফ্রেম পর্যন্ত ভিডিও করতে পারে এমন শক্তিশালী ক্যামেরা লাগবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রযুক্তিটি কাজে লাগবে গোয়েন্দাগিরিতে। বিভিন্ন বস্তু কিভাবে বিজ্ঞানীরা মাইক্রোফোন হিসেবে ব্যবহার করছেন, তা জানতে ভিডিওটি দেখে নাও—https://www.youtube.com/ watch?time^continue=2&v=FKXOucXB4a8

স্বাদবদল

পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দ খাবারে তিক্ত স্বাদ নিয়ে আসে আর উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ নিয়ে আসে মিষ্টি স্বাদ। ব্যাপারটা বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরি এবং রেস্টুরেন্ট দুই জায়গায়ই পরীক্ষা করে দেখেছেন। তুমি যা-ই খাও না কেন, শব্দ সেটার স্বাদের ওপর বেশ ভালো প্রভাব ফেলে। এটা কিন্তু আমাদের জিহ্বার স্বাদগ্রাহক (রিসেপ্টর) প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে না। বরং প্রভাব ফেলে সরাসরি মস্তিষ্কে। শব্দের কম্পাঙ্কের তারতম্য আমাদের মস্তিষ্ককে নির্দেশ দেয়, সেটা খাওয়ার মধ্যে মিষ্টতা খুঁজবে নাকি তিক্ততা খুঁজবে। আর সেই অনুযায়ীই আমরা খাবারের স্বাদ পাই। ২০১১ সালে প্রকাশিত ‘ইফেক্ট অব ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ অন ফুড পারসেপশন’ নামের একটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখা যায়, গোলমেলে শব্দ আমাদের খাবারের স্বাদ বুঝতে বেশ ঝামেলায় ফেলে দেয়। আশপাশে অত্যন্ত তীব্র শব্দ হলে মানুষ সহজে লবণ কিংবা মিষ্টির স্বাদ বুঝতে পারে না। দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত আইসক্রিম কম্পানি বেন অ্যান্ড জেরি তাদের আইসক্রিম বাক্সে একটি করে কিউআর কোড রাখে, যাতে গ্রাহকরা তাদের ফোনের সাহায্যে যথাযথ গান বাজিয়ে মজা করে আইসক্রিমটা খেতে পারে!

শব্দ নেভাবে আগুন

অক্সিজেন আগুন জ্বলার জন্য দায়ী। কোনোভাবে অক্সিজেনকে ঠেকিয়ে রাখতে পারলেই নিভে যাবে আগুন। এ জন্য বালু ছিটানো কিংবা তরল কার্বন ডাই-অক্সাইড বেশ প্রচলিত। এ তালিকায় উঠে এলো শব্দের নাম। ভার্জিনিয়ার জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র সেথ রবার্টসন এবং ভিয়েত ট্রান তৈরি করলেন সনেক্স ফায়ার এক্সটিংগুইশার। ৩০ থেকে ৬০ হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ দিয়ে তাঁরা আগুন লাগার স্থানে অক্সিজেনের সরবরাহ থামিয়ে দিতে সক্ষম হন। এখন তাঁরা গবেষণা করছেন, কী করে শব্দ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানিতে সৃষ্ট আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করা যায়। তাঁদের এ আবিষ্কার যে শুধু আগুন নেভাবে তা-ই নয়, এতে কমে যাবে রাসায়নিকের ব্যবহারও। ভিয়েত ট্রান আশা করেন, ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি ড্রোনের সঙ্গে সংযুক্ত করে দাবানলও নিভিয়ে দেওয়া যাবে সহজে। শব্দ দিয়ে কিভাবে সেথ রবার্টসন এবং ভিয়েত ট্রান আগুন নেভাচ্ছেন তা দেখতে পাবে এই লিংকে— https://www.youtube.com/watch?v=6znlZE3MkW4

ডলফিন হ্যাকিং

সত্যিকারের ডলফিন নয়। এ ডলফিন ডিজিটাল। হ্যাকাররা চাইলে ডলফিনের ডাকের সমান কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে তোমার স্মার্টফোনটা আরামসে হ্যাক করে ফেলতে পারবে। তাদের ব্যবহূত শব্দের কম্পাঙ্ক ২০ হাজার হার্জের বেশি। তাই এ শব্দ আমাদের মস্তিষ্কের শনাক্তকরণ ক্ষমতার বাইরে। তবে সেটা স্মার্টফোনের সিরি, কর্টানা, এলেক্সাকে কিন্তু ঠিকই প্রভাবিত করে। তোমার ফোন থেকে কোনো নির্দিষ্ট নাম্বারে কল দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইটে ঢোকা এবং ভাইরাস ডাউনলোড করার মতো সব কাজ করে নিতে পারে! প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট ম্যাশেবল ডটকম থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে গবেষকেরা এর স্পষ্ট প্রমাণ পান। তাঁরা ধারণা করেন, গানের মধ্যেও হ্যাকাররা তাদের কমান্ড চালাকি করে পুরে দিতে পারে! ২০১৮ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়। এই ‘ডলফিন অ্যাটাক’-এর মাধ্যমে হ্যাকাররা তোমার মোবাইলের স্ক্রিনের পরিবর্তন, ভলিউম বাড়ানো-কমানো, এয়ারপ্লেন মোড অন করা—এসব করতে পারে অনায়াসে। তবে আক্রমণের জন্য হ্যাকারকে তোমার সাড়ে পাঁচ মিটারের মধ্যে থাকতে হবে। সুতরাং আশপাশে কেউ না থাকলে নিশ্চিন্তেই থাকতে পারো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা