kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

হরর ক্লাব

কলকাতার যত ভূত

কলকাতার মহাকরণ, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, মারবেল প্যালেসসহ আরো কয়েকটি প্রাচীন স্থাপনায় রয়েছে ভূতের আনাগোনা! এসব ভূত নিয়ে আছে দেদার গল্প। সিনেমাও হয়েছে। ভূত তাড়াতে এখানে মিলবে ‘মুড়ো ঝাঁটা’ আর তাবিজ-কবচ। কলকাতায় এসব ভূতের আখড়া ঘুরে এসেছিলেন ফখরে আলম

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কলকাতার যত ভূত

অঙ্কন : মাসুম

ভূতের খোঁজে

কয়েক দিনের অনুসন্ধানে কলকাতা এমএলএ হোস্টেলে ভূতের সন্ধান পাওয়া গেছে। গভীর রাতে ভূত ট্যাপের পানি ছেড়ে দেয়। হ্যাফপ্যান্ট পরে বারান্দা দিয়ে হেঁটে যায়। দরজা খুলে আবার বন্ধ করে। এ ছাড়া এমএলএ হোস্টেলে ভূতের আরো গল্প রয়েছে। এসব গল্পের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের শিকার দুজন বিধায়ক আর রহস্যময় মৃত্যুর শিকার একজন কর্মকর্তার নাম উঠে আসে।

কলকাতা শহরের কিড স্ট্রিটে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের এমএলএ হোস্টেল রয়েছে। ছয়তলা দুটি ভবনে স্থানীয় বিধায়কদের (এমএলএ) পাশাপাশি তাঁদের অতিথিরা থাকেন। এখানকার তিনতলার ১০ নম্বর রুমে খুন হন উত্তর দিনাজপুরের বিধায়ক রমজান আলী। ১৯৯৪ সালের ২০ নভেম্বর তাঁকে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। রমজান আলীর স্ত্রী তালাত সুলতানা একই কক্ষে ছিলেন। তিনি পুলিশকে জানান, চারজন অস্ত্রধারী কক্ষে জোর করে ঢুকে আমার হাত-পা বেঁধে এমএলএ সাহেবকে হত্যা করেছে। দীর্ঘদিন পর রহস্য উন্মোচিত হয়। তালাত ও তার সঙ্গী নুরুল ইসলাম ফন্দি করে এমএলএকে হত্যা করেছে। এখন দুজনই কারাগারে। এরপর ২০১১ সালের সিপিএমএর বিধায়ক মুস্তাফা বিন কাশেমকে পাঁচতলা থেকে ফেলে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলার পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু এই হত্যারহস্যের আর কোনো কিনারা হয়নি। ২০১৮ সালে তিনতলার ১৯ নম্বর কক্ষে এখানকার কর্মকর্তা মো. হাফিজের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে তিনটি মৃত্যুকে ঘিরে ভূতের আবির্ভাব ঘটে। এখানকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী বলেন, ‘রাতে একা ঘুমাতে পারি না। গভীর রাতে ট্যাপ খুলে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। আমি গিয়ে দেখি কেউ নেই। হঠাত্ই দরজা লাগিয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় আমি অসুস্থ হয়ে পাড়ি। চিকিত্সককে দেখিয়ে এখন একটু সুস্থ আছি।’ এখানকার একজন অতিথি নাজিফা খাতুন বলেন, ‘গভীর রাতে আমার কক্ষের পাশের বারান্দা দিয়ে হাফপ্যান্ট পরে কে যেন হেঁটে যায়। দরজায় কড়া নাড়ে। আমার ঘুম হয় না।’

 

ঘাড়ের কাছে শ্বাস

ভূত বই পড়ে। ইংরেজি বই পড়তে বেশি ভালোবাসে। কারণ কলকাতার সুপ্রাচীন ও বৃহত্তম ন্যাশনাল লাইব্রেরিতেই ভূতের আনাগোনা। পাঠক যখন একমনে এখানে বই পড়ে, তখন নাকি ভূত এসে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে। পেছনে তাকালে কাউকে দেখা যায় না। দুষ্ট ভূতেরা তাকের বইও এলোমেলো করে রাখে। কর্মচারীরাও ওদের ওপর বিরক্ত। রাতে চেয়ার এক জায়গায় রাখলে সকালে সেই চেয়ার আরেক জায়গায় মেলে। লাইব্রেরি ভবনটি গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের জন্য তৈরি করা হয়। ব্রিটিশ জেনারেল এখানেই থাকতেন। ১৮৩৬ সালে এই ভবনে লাইব্রেরির কার্যক্রম শুরু হয়। বেশ কয়েক বছর আগে ভবনের সংস্কার কাজ করতে গিয়ে ১২ জন শ্রমিক মারা যায়। এ ঘটনার পর ভূতের আনাগোনা যায় বেড়ে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ভূতের ভয়েই নাকি অনেকে পড়া শেষ না করেই কেটে পড়ে।

 

দিনেশ, বাদলরা ঘুরে বেড়ায়

রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ভূতরা খুব সাহসী। এদের মধ্যে বিল্পবী চেতনা রয়েছে। এরা চেয়ার-টেবিল ওলটপালট করে দেয়, সজোরে দরজা বন্ধ করে আতঙ্ক তৈরি করে।

রাইটার্স বিল্ডিংয়ের বাংলা নাম মহাকরণ। এখন এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সচিবালয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ১৭৭৬ সালে কেরানিদের (রাইটার্স) জন্য এটি তৈরি করেছিল। এখানে এক অত্যাচারী জেলার বসতেন। তার নাম ছিল সিমসং। ১৯৩০ সালে সাহসী তিন যুবক—বিনয়, বাদল, দিনেশ অত্যাচারী এই জেলারকে হত্যা করেছিল। এ সময় পুলিশের ক্রসফায়ারে মারা গিয়েছিল বিনয়, আটক এড়াতে আত্মহত্যা করেছিল বাদল আর দিনেশকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। এর পর থেকেই এই তিন যুবকের প্রেতাত্মা এসে ঘোরাফেরা করে। চেয়ার-টেবিল উল্টে রাগ দেখায়।

ক্রসফায়ারে মারা গিয়েছিল বিনয়, আটক এড়াতে আত্মহত্যা করেছিল বাদল আর দিনেশকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। এর পর থেকেই এই তিন যুবকের প্রেতাত্মা এসে ঘোরাফেরা করে চেয়ার-টেবিল উল্টে রাগ দেখায়

রাতে জেগে ওঠে মমি

ভারতের সবচেয়ে বড় জাদুঘর ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম। কলকাতার জওয়াহেরলাল নেহরু রোডে ১৮১৪ সালে এর যাত্রা শুরু। তিনতলা এ মিউজিয়ামের দোতলায় রয়েছে চার হাজার বছর আগের একটি মমি। এই মমি নাকি রাতে ঘুরে বেড়ায়। একজন নর্তকী সারা রাত নাচে।

কয়েক বছর আগে এখানে আলমারিচাপা পড়ে এক শ্রমিক মারা যায়। জাদুঘরের দর্শনার্থীরা চলে গেলে সেই শ্রমিক নাকি সাদা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে অজানা স্থান থেকে বের হয়ে আসে।

কলকাতার আরো কয়েকটি প্রাচীনতম ভবনে ভূতের আনাগোনার খবর পাওয়া যায় প্রায়ই। এমনকি এখানকার অনেকেই রীতিমতো ভূতে বিশ্বাসী। জাতীয় পত্রিকাগুলোর পৃষ্ঠাজুড়ে ভুত-প্রেত ও জাদুটোনার বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। অলৌকিক এসব বিষয় নিয়ে চায়ের আড্ডাও বেশ জমে।

এ ব্যাপারে কথা হয় এখানকার অ্যাপোলো হাসপাতালের সিনিয়র চিকিত্সক অনুপম চক্রপানির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কলকাতার ভূতের কথা শুনেছি। আমার এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য নেই।’ এস নিউজের সম্পাদক পার্থ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘ভূত নিয়ে গল্প হয়েছে। সিনেমা হয়েছে। মজার গল্পও আছে। কিন্তু এসব গল্পের সত্যতা নেই।’ বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মী বিমল সাহা বললেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে ভূতের গল্প বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমরা ভূতের সন্ধানে গিয়ে প্রমাণ পেয়েছি, মানুষই ভূত সেজে নানা ঘটনা ঘটাচ্ছে।’ বিধায়ক শফিউল আলম খান বললেন, ‘ভূত বলে কিছু নেই। আমি এমএলএ হোস্টেলেও কোনো দিন ভূতের আলামত দেখিনি। আসলে মানুষই ভূত।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা