kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ধারাবাহিক উপন্যাস

রাজবাড়ির অন্ধকারে

মোস্তফা মামুন

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



রাজবাড়ির অন্ধকারে

অঙ্কন : জামিল

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ইনি আদৃতার বাবা। এখন জানা গেল চাচা। নাম আনোয়ার বখশ চৌধুরী। পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন। হিন্দু জমিদারদের সঙ্গে লড়াই করে কিভাবে জমিদারি টিকিয়ে রেখেছিলেন সেই গল্প বলতে শুরু করলেন। গল্পে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সালগুলো সব বলছেন বাংলায়। যেমন তাঁর দাদার বাবা বাংলা ১২৭৩ সনে প্রথম জমিদারি করেন। গল্প বোঝার স্বার্থে বাংলা সনের সঙ্গে ইংরেজি সাল মেলানোর চেষ্টা করতে হলো। কঠিন কাজ। বয়স্ক মানুষদের গল্প শোনার মধ্যেও পরিশ্রম আছে। তবে এটা ঠিক, এই মানুষটির বর্ণনার মধ্যে একটি আকর্ষণ আছে। আমার চোখের সামনে কিছুক্ষণের মধ্যে সেই আমলের জমিদারদের রাশভারি চেহারাগুলো ভাসতে শুরু করল।

আর তাতে আদৃতাজনিত চমকটার কথা কিছুক্ষণ ভুলেই গিয়েছিলাম। চমক বলতে দারুণ চমক। আদৃতার কথা শুনেই তিনি আমাদের বাসায় এসেছেন। আদৃতাই নাকি ওকে বলেছে, আমার এক বন্ধুর একটা গোয়েন্দাদল আছে, ওর কাকা বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা। এরপর আরো কিছু কাহিনি বলার পর ভদ্রলোক নিজেও কিছু খোঁজখবর নিয়ে শেষে নাকি আদৃতাকে বললেন, ‘চলো তোমার বন্ধুর বাসায় যাই।’ আর এভাবেই আদৃতা আমাদের বাসায়।

আমি আদৃতাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে বলল, ‘এখনো কিন্তু তোমার গল্পের ৫০ শতাংশই বিশ্বাস করি।’

আমার চমক তখনো কাটেনি। পাল্টা প্রশ্ন করতেও ভুলে গেলাম।

আদৃতা হাসতে হাসতে বলল, ‘কিন্তু ৫০ শতাংশই বিরাট ব্যাপার। সত্যি বললে তোমাদের যেসব কাহিনি আমি শুনেছি, এর যদি ১০ শতাংশও সত্যি হয় তাহলেই হয়।’

ওর হাসিতে ভরসা ফিরে আসে। বলি, ‘১০ শতাংশ নয়, ১০০ শতাংশই সত্যি। তুমি আস্তে আস্তে বুঝবে।’

আনোয়ার বখশ চৌধুরীর সঙ্গে দাদুর খুব জমে গেছে। পুরনো আমলের সন-তারিখ ইত্যাদির উল্লেখে দাদু যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন এরই মধ্যে। তিনিও তাঁর জমানো ইতিহাসজ্ঞান উগরে দিচ্ছেন।

আনোয়ার সাহেবের সঙ্গে আরেকজন ভদ্রলোক আছেন। লম্বাটে চেহারা। মেরুন রঙের পাঞ্জাবি গায়ে। তাঁর দাদু সম্ভবত আনোয়ার চৌধুরী যা বলেন তাতে মাথা নাড়ানো। মাথা নাড়িয়ে সমর্থন জানিয়ে যাওয়া ব্যাপারটাও যে এক রকম শিল্পের পর্যায়ে পড়ে সেটা ওকে না দেখলে জানাই যেত না। শুধু মাথাই নাড়াচ্ছেন না, অন্য ভঙ্গিও আছে। যেমন আনোয়ার সাহেব যখন অতীত জমিদারির গল্প করতে গিয়ে কোনো বিস্ময়কর তথ্য উল্লেখ করছেন, তখন সে হাঁ করে বিস্মিত হচ্ছে। কোনো বেদনার কাহিনি বললে, সে-ও বেদনার্ত। বেচারা কিন্তু বসেনি। দাঁড়িয়ে। দাদু কয়েকবার বসতে বলেছেন। যেন শুনতেই পায়নি। এটাও একটা ব্যাপার। আনোয়ার চৌধুরীর বক্তব্য ছাড়া আর কোনো কিছুই শুনছে বা দেখছে বলে মনে হচ্ছে না। জানা গেল ওর নাম সুবেদার। জমিদার শ্রেণির মানুষের এ রকম কিছু পোষ্য থাকে, যারা বংশপরম্পরায় ওদের প্রতি এ রকম আনুগত্য দেখিয়ে চলে। 

আনোয়ার চৌধুরী ঘড়ি দেখলেন। তারপর আদৃতাকে বললেন, ‘তোমাদের গোয়েন্দা কাকাকে খবর দাও। আমার আরেকটি কাজ আছে। ভূমিমন্ত্রীর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট।’

দাদু একটু ভেবে বললেন, ‘আজ কথা না বললেই কি নয়? ও একটু অসুস্থ।’

‘গোয়েন্দা অসুস্থ!’ আনোয়ার সাহেব একটু হাসলেন, ‘বাহ! গোয়েন্দাদের নিয়ে অনেক গল্প পড়েছি; কিন্তু কোনো গোয়েন্দার অসুস্থতার খবর তো শুনিনি কখনো।’

দাদু বললেন, ‘শরীরের খেয়াল তো রাখে না কখনো। সারাক্ষণ কাজ আর কাজ।’

এর মধ্যে নাশতা চলে এসেছে। আনোয়ার সাহেব একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘নাশতার আয়োজন দেখে তো মনে হচ্ছে আমরা বিয়ের কনে দেখতে এসেছি।’

দাদু বললেন, ‘আমার বউমা সব সময়ই অতিথিদের বিষয়ে খুব আন্তরিক। আর তন্ময়ের অতিথি হলে তো কথাই নেই।’

অভিজাত শ্রেণির লোকজন মেহমানীয় দাদু পালনের সময়ও আভিজাত্য ধরে রাখেন। সামান্য একটি-দুটি খাবার খান। আনোয়ার চৌধুরীর বেলায় এবার আভিজাত্য খসে পড়ল। তিনি এমনভাবে এটা-ওটা খেতে শুরু করলেন যে দেখলে মনে হবে, বোধ হয় খেতেই এখানে আসা।

আমি এই ফাঁকে একটু বেরিয়ে আদৃতাকে নিয়ে ভেতরে গেলাম। আদৃতা হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমাদের বাড়িটা দেখলে অবশ্য গোয়েন্দার বাড়ি মনে হয় না।’

‘গোয়েন্দার বাড়ি কী রকম হয়?’

‘ধরো বাড়িতে নানা রকম রহস্যময় জিনিস থাকবে।’

‘তাহলে তো ভূতের বাড়ি মনে হবে।’

‘তা-ও ঠিক। কিন্তু ওই যে তোমরা দেশ-বিদেশে ঘোরো সেসব জায়গার স্যুভেনির তো থাকতে পারে।’

আমাদের বাসায় সত্যি বললে সে রকম জিনিস খুব একটা নেই। কাকা খুব একটা আগ্রহী নন। বলেন, ‘স্যুভেনির নিলে কী হবে জানিস, তুই এই জিনিসটার মধ্যে এই জায়গাটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করবি। তখন মনে মনে আর স্মৃতিচারণা করবি না। জিনিস বা স্যুভেনিরে নয়, কোনো জায়গার স্মৃতি ধরে রাখার উপায় হচ্ছে নিজের মনে সেটার চর্চা করা।’

আদৃতাকে সেটা গুছিয়ে বললাম। ও একটু অবাক হয়ে বলল, ‘তোমার কাকা দেখছি সব কিছু একটু উল্টোভাবে দেখেন।’

‘আমারও তা-ই মনে হয়। পরে দেখি সেটাই ঠিক।’

‘তাই তোমার কাকাকে দেখার পর মোহভঙ্গ হবে না তো। গল্প শুনতে শুনতে তো মনে হচ্ছে, জাদুুকর ধরনের কেউ।’

আমি কিছু বলতে চাইলাম পারলাম না। কাকা সামনে দাঁড়িয়ে।

আর আদৃতা তাঁর দিকে এমন অবাক চোখে চেয়ে থাকল যেন সিনেমার কোনো নায়ককে দেখছে।

কাকা অল্প হাসিতে বলল, ‘আদৃতা তোমার খাওয়াদাওয়া করতে একদম ভালো লাগে না!’

বলেই কাকা চলে গেল। আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম। আদৃতা অবাক হয়ে বলল, ‘উনি কী করে জানলেন? উনি কী করে জানলেন?’

আমিও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, কেন কাকা এই কথাটা বলল আর বুঝলই বা কিভাবে? তবু একটু গর্ব মিশিয়ে তাকিয়ে থাকলাম, যার অর্থ কাকা সব জানে। আদৃতা আর দাঁড়াল না। বলল, ‘চলো বসার ঘরে যাই। ওনার কথা শুনি।’

আমি আর আমার ঘরটাও দেখাতে পারলাম না। মায়ের সঙ্গে পরিচয় করানোর ইচ্ছা ছিল। পারা গেল না।

বসার ঘরে বেশ একটা গম্ভীর পরিবেশ। আনোয়ার চৌধুরী সাহেব ইতিহাসের গল্প বাদ দিয়েছেন। তাঁকে এই মুহূর্তে খানিকটা বিষণ্ন দেখাচ্ছে।

আনোয়ার সাহেব একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘সরাসরিই বলে ফেলি।’

কাকাও যেন প্রস্তুত। বলল, ‘বলে ফেলুন।’

‘আদৃতার কাছে আপনার গল্প শোনার পর মনে হলো, আপনার সাহায্য নেওয়া যায়।’

‘শুনছি।’

‘আমার একটা মেয়ে ছিল। আদৃতার চেয়ে বছর দুয়েকের ছোট।’

মানুষটি কেঁদে ফেলেন। এতক্ষণে আভিজাত্য চোখের পানিতে ধুয়েমুছে যায়। বেরিয়ে আসেন একজন অসহায় মানুষ। চরম অসহায়ত্ব্ব নিয়ে বলে চলেন, ‘মাসখানেক আগে মেয়েটা হারিয়ে যায়।’

আদৃতাও কেঁদে ফেলে। দাদু আদৃতার পিঠে হাত রাখেন। হঠাত্ করেই একটি চরম শোকার্ত পরিবেশ।

আনোয়ার চৌধুরী রুমাল দিয়ে চোখ মুছে আবার শুরু করেন, ‘মেয়েটিকে হারানোর পর পুরো দেশ খুঁজেছি। না, কোথাও নেই।’

‘থানা-পুলিশ কী বলে?’

‘ওরাও চেষ্টা করেছে। বুঝতেই পারছেন আমি প্রভাবশালী। টাকা-পয়সা আছে। কিন্তু মেয়েটা যেন হাওয়া হয়ে গেল।’

‘কোনো সন্দেহভাজন? যাকে আপনার মনে হয়েছিল...’

‘সেটাই তো ব্যাপার রে ভাই। সন্দেহভাজন মানে আমি নিশ্চিত যে এই মানুষটিই আমার মেয়েকে নিয়ে গেছে।’

‘বলেন কী? তাঁকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি।’

‘করেছিল। ছাড়া পেয়ে গেছে।’

‘আপনি না প্রভাবশালী মানুষ। সে কি আপনার চেয়েও...’

‘না না, সে রকম কেউ না।’

‘তাহলে?’

‘কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মেয়েটি যখন নিখোঁজ হয়, তখন সে এলাকায় ছিল না। ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি ছিল।’

‘আচ্ছা আপনি কিভাবে নিশ্চিত যে সে-ই কাজটি করেছে।’

‘মানুষটি আমার প্রতিবেশী। বলতে পারেন, তাঁর সঙ্গে আমার বেশ খাতির। স্থানীয় নয়। আমাদের অঞ্চলে প্রচুর উন্নয়নকাজ হচ্ছে। তাঁর একটির প্রকৌশলী হিসেবে এসেছিল। বিদেশে পড়াশোনা করা, বিপত্নীক, আমার সঙ্গে রুচিতে খুব মেলে বলে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তারপর একদিন এলো বাসায়।’

‘তার পরই মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেল।’ দাদা প্রশ্নটা করেন।

‘জি না। এসে বরং আমার মেয়েকে দেখে শুরু করল কান্না।’

‘কান্না?’

‘জি।’

‘কান্না কেন?’ সাধারণত অবাক না হলেও এই ঘটনায় কাকাও যথেষ্ট অবাক, বুঝতে পারি।

‘মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, এই মেয়েটি নাকি ওর মেয়ের মতো দেখতে। রাশিয়ায় থাকার সময় একটি দুর্ঘটনায় ওর মেয়ে-স্ত্রী দুজনই মারা যায়।’

‘আচ্ছা।’ কাকা একটু বোঝার চেষ্টা করে।

আনোয়ার চৌধুরী বলেন, ‘খুব স্বাভাবিক, আমরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। এই সূত্রে ওর সঙ্গে সম্পর্কটা আরো গাঢ় হয়। ও মাঝেমধ্যেই আমার মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে বের হতো। উপহার কিনে দিত। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না—এমন সব দামি উপহার দিয়েছে। সত্যি বললে, ওর খুশি দেখে আমরাও খুশি ছিলাম।’

‘তারপর ঘটনা ঘটল কবে?’

‘দুই বছর পর।’

‘মানে মানুষটা এই দুই বছর পর আপনার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। আপনার মেয়েকে নিয়ে ঘুরেছে।’

‘জি।’

‘এমনকি কখনো হয়েছে যে শহরের বাইরে গেছে। একা কোথাও নিয়ে গিয়েছিল।’

‘তা তো হয়েছে। অনেকবার। একবার টাঙ্গাইল নিয়ে গেল। আরেকবার ওর একটা কাজের সাইট ভিজিটে হালুয়াঘাট, ঈশ্বরগঞ্জ গিয়েছিল। ওগুলো ময়মনসিংহেরই থানা। ফিরে এসেছে সময়মতো। মেয়েটা এত মজা পেয়েছে যে দেখে আমাদেরও খুব ভালো লাগত।’

‘তারপর এভাবেই কি একদিন নিয়ে গিয়ে...’

‘না, সেখানেই তো সমস্যা। সে অসুস্থ হয়ে গেল। হালকা স্ট্রোকের মতো হয়েছিল। আমিই নিয়ে আসলাম ঢাকায়। নিউরোসায়েন্সে ভর্তি ছিল এক-দেড় মাস। সেই সময়ই ঘটে ঘটনাটা।’

‘মানুষটি এখন কোথায়?’

‘এখনো ময়মনসিংহেই আছে।’

‘সে পালায়নি। আশ্চর্য তো।’

‘না, পালায়নি। বরং নানা নাটক করে। আমার মতো করেই মেয়েকে খুঁজে বেড়ায়।’

‘আপনার কোনো ভুল হচ্ছে না তো?’

‘না।’

‘কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন? মানুষটি হাসপাতালে ভর্তি, এর আগে সন্দেহজনক কিছু করেনি। আপনার সন্দেহ তো ভুলও হতে পারে।’

‘পারে না। কারণ যেদিন ওকে ঢাকায় রেখে বাড়ির পথে রওনা হয়েছি, সেদিনই এক লোক আমার বাসায় যায়। বলে, বিক্রম, মানে সেই মানুষটি বলেছে, আঁখিকে নিয়ে ঢাকায় যেতে।’

‘সেই মানুষটিও তো মিথ্যা হতে পারে।’

‘পারে না। মানুষটি ওর অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো। সঙ্গে থাকত সব সময়। তারপর ওর ফোনে বিক্রম কথা বলে আমার স্ত্রীর সঙ্গে।’

‘আপনি তখন কোথায়?’

‘আমি তো রাস্তায়। বাড়ি ফিরছি।’

‘আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।’

‘চেষ্টা করেছে। পারেনি। কারণ আমার মোবাইলটা কৌশলে বিক্রম রেখে দিয়েছিল। ফলে আমার স্ত্রী ফোন করে আমাকে পায়নি।’

‘ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট কোথায়?’

‘ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। এর পর থেকে সে-ও নিখোঁজ।’

আনোয়ার চৌধুরী কান্নায় ভেঙে পড়েন। কাকা উঠে দাঁড়ায়।

বুঝতে পারি, আমাদের নতুন অভিযান শুরু হয়ে গেল।

     (চলবে)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা