kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ফোকাস

ইংকটোবর

আঁকিয়েদের চ্যালেঞ্জ

২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ইংকটোবর

মহীয়সী বেগম রোকেয়ার অনবদ্য ছবিটি এঁকেছেন নুসরাত জাহান

অক্টোবর এলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যায় আঁকিয়েদের নতুন চ্যালেঞ্জে। ইংকটোবরের আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন জুবায়ের ইবনে কামাল

যাদের ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রামে কোনো আঁকিয়ে বন্ধু আছে, তারা হয়তো এরই মধ্যে দেখতে পেয়েছ অক্টোবর মাস আসায় যেন আঁকাআঁকি রাজ্যে নতুন এক বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। আমার বন্ধুতালিকায় থাকা অসংখ্য আর্টিস্ট প্রতিদিন দারুণ সব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন—ফেসবুক, টুইটার কিংবা ইনস্টাগ্রামে আপলোড করে তার ক্যাপশনে লিখছে ‘ইংকটোবর চ্যালেঞ্জ’। ইংকটোবরটা কী? আর বাঘা বাঘা কার্টুনিস্ট ও আর্টিস্টই বা কেন এটায় অংশ নিচ্ছেন তা বোঝা দায়। তাই চলো জেনে নেওয়া যাক এই চ্যালেঞ্জের আদ্যোপান্ত।

নাম দেখেই বোঝা যায়, এটির সঙ্গে অক্টোবর সম্পর্কিত। ইংরেজি শব্দ ইংক (কালি) ও মাস অক্টোবরের সমন্বয়ে ‘ইংকটোবর’। মজার ব্যাপার হলো, শুধু নামের মিল থাকার কারণেই অক্টোবরকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। অক্টোবর ছাড়া অন্য কোনো মাসের সঙ্গে ইংক শব্দটি মিলিয়ে সুন্দরভাবে উচ্চারণ করা যায় না। তাই ইংকটোবরের জন্য অক্টোবরই যথার্থ।

ইংকটোবর হলো এক ধরনের আঁকার চ্যালেঞ্জ। অক্টোবরজুড়ে প্রতিদিন বিভিন্ন নতুন নতুন ছবি তৈরি করা হবে। শর্ত হলো, ছবিটা হতে হবে পুরোপুরি কালির তৈরি। কোনো ধরনের পেইন্ট ব্যবহার করা যাবে না। এই চ্যালেঞ্জে আরো বেশ কিছু চমকপ্রদ নিয়ম রয়েছে, ইংকটোবর চ্যালেঞ্জের নিয়মের খুঁটিনাটি জানার আগে চলো জেনে নেওয়া যাক এই চ্যালেঞ্জের শুরুর কথা।

ইংকটোবর উদ্ভাবন করেন জ্যাক পার্কার নামে এক বিলাতি ভদ্রলোক। তিনি কার্টুন আঁকেন ও ইলাস্ট্রেশনের কাজ করেন। ২০০৯ সালের অক্টোবরে তিনি প্রথম এ বিষয়ের ধারণা দেন এবং সবাইকে এই চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে আহ্বান জানান।

ভদ্রলোক সম্পর্কে জানতে গুগলে ঢু মারলাম। জ্যাক পার্কার লিখে সার্চ করতেই চলে এলো একই নামের একজন আইস হকি দলের কোচের বিস্তারিত। কী মুশকিল! তবে আসল মানুষটাকে খুঁজে পেতে খুব একটা দেরিও হলো না।

২০০৯ সালে—মানে আজ থেকে ১০ বছর আগে শুরু! তবে জনপ্রিয় হয়েছে গত কয়েক বছরে। এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে ২০১৪ সালের অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনেই দেড় লাখের ওপর টুইট করা হয় কালিতে আঁকা ছবি দিয়ে। সব টুইটের হ্যাশট্যাগ ছিল ইংকটোবর।

এবার আসি নিয়ম-কানুনে। মূলত কয়েকটি শর্তে এই চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে হয়। প্রথমত,  আঁকার মূল উপাদান হিসেবে কালি ব্যবহার করতে হবে। যদিও এখন অনেকেই সাধারণ মার্কার কিংবা রং-পেনসিল ব্যবহার করছে, তবে সেটা নিতান্তই শর্তভঙ্গ।

দ্বিতীয় নিয়ম, ইংকটোবর চ্যালেঞ্জের জন্য আঁকা ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে হবে, সেটা ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রাম বা টুইটার—যেখানেই হোক। তৃতীয় নিয়ম হলো, এই চ্যালেঞ্জের ধারাবাহিকতা পুরো অক্টোবরে থাকতে হবে। অর্থাত্ ইচ্ছামতো এক-দুদিন কিংবা কয়েক দিন পর পর এক দিন করলে ইংকটোবর চ্যালেঞ্জ পূর্ণ হবে না। তোমাকে প্রতিদিনই নতুন কোনো আর্ট তৈরি করতে হবে কালি দিয়ে আর সেটি ফেসবুক অথবা ইনস্টায় শেয়ার করতে হবে। এ ছাড়া আরেকটি ব্যাপার হলো আঁকার থিম। আগে এই ইংকটোবর চ্যালেঞ্জের উদ্ভাবক প্রতিবছর অক্টোবরের আগেই প্রতিদিন থিমের একটি তালিকা তৈরি করে দিতেন। তার ওপর ভিত্তি করে ইংকটোবর চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া আঁকিয়েরা তাঁদের ইচ্ছামতো আঁকতে পারেন। এই থিমের তালিকাকে ইংরেজিতে বলা হয় প্রম্প লিস্ট। যদিও এখন অবশ্য অনেক আর্টিস্টই এসব নিয়মের ধার ধারেন না।

ইংকটোবরের উদ্ভাবক পার্কারের একটি অফিশিয়াল ওয়েবসাইট আছে, যেখানে এ চ্যালেঞ্জের যাবতীয় খবরাখবর নিমেষেই পেয়ে যাবে। গুগলে গিয়ে অন্য জ্যাক পার্কারের পাল্লায় না পড়ে বরং তুমি ইংরেজি অক্ষরে মিস্টার জ্যাক পার্কার ডটকমে লগইন করে বিস্তারিত সব দেখে নিতে পারবে। সঙ্গে সঙ্গে ইংকটোবর চ্যালেঞ্জের তারকা আঁকিয়েদের কাজগুলো দেখেও মুগ্ধ হয়ে আসতে পারো।

ইউটিউবে পার্কার মশাইকে খুঁজতে গিয়ে আরেক দফা বিপদে পড়েছিলাম। কারণ ইউটিউবে তিনি আগে এককালে নিয়মিত ভিডিও আপলোড করলেও এখন নিষ্ক্রিয়। তাঁর প্লেলিস্টে রয়েছে ইংকটোবর চ্যালেঞ্জ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঁকাআঁকি টিপস ও আঁকা ভালো করার খুঁটিনাটি।

এবার ফিরে আসা যাক তোমার আঁকাআঁকিতে। তোমরা যারা এতক্ষণে ইংকটোবর চ্যালেঞ্জের কথা শুনে এতে অংশ নেবে বলে ঠিক করে ফেলেছ; কিন্তু আঁকায় তেমন দক্ষতা নেই, তাদের জন্য রইল কিছু টিপস। এসব টিপস পাওয়া গেছে বিভিন্ন বিখ্যাত আর্টিস্টের মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড থেকে। সঙ্গে সঙ্গে আঁকাআঁকির বিভিন্ন টুলস সম্পর্কে জ্ঞান নিতে আমি ঘুরেছি রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে। এ ছাড়া গত বছর দলছুটেই প্রকাশ হয়েছিল একটি প্রচ্ছদ ফিচার—‘হয়ে যাক কার্টুন!’ কালের কণ্ঠ’র অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে দলছুট আর্কাইভ থেকে পুরো লেখাটি পড়ে ফেলতে পারো।

যদিও কালি দিয়ে ইংকটোবরের মূল চ্যালেঞ্জ; কিন্তু আঁকাআঁকিতে হাতেখড়ি না থাকলে তোমার জন্য শুরুতে পেনসিলই ভরসা। যেকোনো পেনসিলই ব্যবহার করা যায়। তবে ফোরবি পেনসিল কার্টুনসহ বিভিন্ন ক্যারেক্টার ডিজাইনের জন্য বেশি ভালো। যেকোনো পেনসিলের গায়েই দেখবে সেটি কত-বি। বেশ কিছু ব্র্যান্ডের পেনসিল বাজারে পাওয়া যায়। ইরেজার ও শার্পনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তেমন বিশেষ কিছু বিষয় মনে রাখতে হয় না। সাদা ইরেজারের চেয়ে কালোগুলোই বেশি কাজের।

যেহেতু এখন অক্টোবর মাস চলছে, তাই তোমার আঁকিয়ে বন্ধুদের উপহার দিতে পারো আঁকার সামগ্রী। আমি নিজে আমার বন্ধুকে এসব উপহার দিতে গিয়ে রোদে পুড়ে ঘুরেছি শাহবাগ থেকে নীলক্ষেত। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটেই পাবে সব। প্রথমে ঢুকে জামাকাপড়ের দোকান দেখে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ওপরে উঠলেই পাবে অনেকগুলো দোকান। সেখানে পেনসিল, শার্পনার, ইরেজার থেকে শুরু করে লাল-নীল রঙিন বড়-ছোট-মাঝারি—সব আকারের স্কেচবুক পেয়ে যাবে।

ফোরবি পেনসিলের দাম ২০ থেকে শুরু করে ৫০ টাকা। শার্পনার ও ইরেজারের ১০-২৫ টাকা। স্কেচবুক নির্ভর করে আকৃতির ওপর। তুমি যদি এমন কাউকে স্কেচবুক উপহার দিতে চাও, যে কিনা রাস্তাঘাটে স্কেচবুকিং করে অভ্যস্ত, তবে তাকে পকেট স্কেচবুক দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আঁকাআঁকির জন্য বিশেষ ধরনের আর্ট পেপারও পাওয়া যায়। যেগুলোর দামও খুব বেশি নয়। এগুলো তুমি শাহবাগ ছাড়াও কাঁটাবনসহ নিউ মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে পেতে পারো খুব সহজেই। আর তা ছাড়া প্রফেশনালরা কিন্তু পেনসিল দিয়ে আঁকেন না। তাঁরা কলম দিয়ে আঁকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। গ্রাসহোপার্স কিংবা অন্য দোকানে গেলে আঁকার জন্য ভালো কলমগুলোও দেখতে পাবে।

পেনসিল ও কলম কেনা হলে বসে যেতে হবে চর্চায়। আর্টের তপস্যা এত সহজ নয়। তবে এখন তা অত কঠিনও নয়। আর্ট স্কুলে ভর্তি না হলেও বাসায় বসেই ইন্টারনেটে আঁকাআঁকির অনেক কিছুই শেখা সম্ভব। গত বছর দলছুটের কাছে বিখ্যাত কার্টুনিস্ট মেহেদী হক এক গোপন তথ্যে বলেছিলেন, তাঁরা খুব শিগগির আঁকার ওপর লাইভ ক্লাস করবেন। এখন সেটি আর গোপন নেই, কারণ এরই মধ্যে সেটি শুরু হয়ে গেছে। সেসব ক্লাস নিয়েছেন কার্টুনিস্ট মেহেদী হক কিংবা আহসান হাবীব স্যারের মতো সব আঁকিয়ে।

আগে থেকেই রাস্তাঘাটে স্কেচবুকিং আয়োজন করছিল আকান্তিস নামের একটি কার্টুন সংগঠন। কিন্তু কার্টুন পিপল নামের সংগঠন ঢাকাকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করেছে স্কেচবুকিং। সেখানে যেতে হলে একমাত্র টিকিট হলো একটি খাতা ও পেনসিল। বিনা ফিতেই পেতে পারো নাক, কান, গলা (আঁকার) সব সমস্যার সমাধান। উপস্থিত থাকেন কার্টুনের ওপর নানা ধরনের ‘ডাক্তার’।

যদিও ইংকটোবর চ্যালেঞ্জের অনেক নিয়ম থাকে; কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য আঁকার চর্চা ও আঁকাআঁকিতে আর্টিস্টদের দক্ষতা বাড়ানো। কেননা এবার ইংকটোবর চ্যালেঞ্জের উদ্ভাবক জ্যাক পার্কার অক্টোবরের শুরুতেই তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগে বেশ মজা করেই কিছু কথা বলেছেন। ‘আপনি কালি দিয়ে আঁকছেন কি না কিংবা ইংকটোবর চ্যালেঞ্জের সব নিয়ম মানছেন কি না—এটা নিয়ে কোনো পুলিশ আপনার ওপর তদন্ত করবে না। আপনি বরং ইংকটোবরের আসল উদ্দেশ্য অর্থাত্ আঁকার জগতে আমাদের প্রভাব বাড়াতে কাজ করলেই এই চ্যালেঞ্জের সফলতা আসবে।’

জনপ্রিয় চরিত্র মেরি ও পিপিনকে এঁকেছেন রাতুল খান

সাপের মতো ভয়ানক কাল্পনিক জন্তুটা এঁকেছেন ইফাত আরা স্মরণ

 রানির মাথায় অনেক বোঝা, সেটাই এঁকেছেন কাজী তাবাস্সুম আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা