kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দলছুট আড্ডা

একদিন শাহবাগে

১৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



একদিন শাহবাগে

দলছুট আড্ডায় এসেছিল (বাঁ থেকে) রুবায়েত ইসলাম নাবিল, উম্মে তাসমিয়া সানজু, নাফিসা তাসনিম নোসিন, ফাহিম মুনতাসির (পেছনে) ও সৈয়দা নাদিয়া হক। সঞ্চালক হিসেবে ছিলেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত। তারিখটা ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর। ছবি তুলেছিলেন মোহাম্মদ আসাদ

বসে বসে আড্ডা হবে? নাকি কোথাও গিয়ে খানাপিনা? কেউ বলছে খিচুড়ি, কেউ বার্গার। তর্ক চলতেই থাকল। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত এলো। খাওয়াও নয়, বসাও নয়। আজ হোক দিনভর ঘোরাঘুরি

ফাহিম : জাতীয় জাদুঘর দিয়েই শুরু হোক।

সায় দিলাম সবাই। টিকিট কেটে ঢুকতে যাব জাদুঘরে, তার আগে থামাল সানজু।

সানজু : এই দাঁড়া, প্রচুর রোদ। একটা পানির বোতল কিনে নিই।

রোদের প্রখরতা এত বেশি ছিল যে মনে হচ্ছিল রাস্তায় একটা ডিম ফাটিয়ে দেখি, অমলেট হয় কি না।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জাদুঘর। ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, শিল্পকলা ও প্রাকৃতিক ইতিহাস নিয়ে নিদর্শনের শেষ নেই। ১৯১৩ সালে ঢাকা জাদুঘর নামে এর যাত্রা শুরু। স্বাধীনতার পর ১৯৮৩ সালে নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর’। রাজধানীর শাহবাগে ৮ দশমিক ৬৩ একর জমির ওপর চারতলা ভবনটি। আছে ৪৪টি প্রদর্শনীকক্ষ, তিনটি অডিটরিয়াম, একটি গ্রন্থাগার ও দুটি অস্থায়ী প্রদর্শনীকক্ষ।

নাবিল : আজ যদি হুট করে এ সিদ্ধান্ত না নিতাম, তবে এমন চমত্কার জায়গাটা দেখা হতো না। আমি কিন্তু আজই প্রথম এসেছি জাদুঘরে। নাদিয়া, তুই কয়বার?

নাদিয়া : আমি স্কুল থেকে দুইবার এসেছিলাম। মা-বাবার সঙ্গে একবার।

ফাহিম : কথা না বাড়িয়ে চল ঘুরে দেখি। সময় কম। ঘুরতে হবে ১০টা জায়গা। পুরো চারতলা ঘুরতেও কম সময় লাগবে না।

ঢোকার মুখেই দুটি কামান। চোখের আরাম দিল নভেরার ভাস্কর্য। নিচতলায় রয়েছে শুভেচ্ছা স্মারক বিপণি, সঙ্গে ব্যাগ রাখার স্থান ও কয়েকটি খাবারের দোকান। সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠতেই চোখে পড়ল গ্যালারি নির্দেশক। প্রতিটি তলায়ই আছে। জাদুঘরে ঘুরতে গেলে আগে এটা দেখে নিয়ো তোমরা। তা না হলে পছন্দের গ্যালারি খুঁজেই পাবে না হয়তো।

প্রথম তলায় পাবে বাংলাদেশের খুদে সংস্করণ। দ্বিতীয় তলায় সভ্যতা ও ইতিহাসের ক্রমবিবর্তন। বিভিন্ন সময়কার অস্ত্র, বাদ্যযন্ত্র, চীনামাটির হস্তশিল্প, কুটির শিল্প, পাণ্ডুলিপি, শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো। তৃতীয় তলায় রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্যক্তির প্রতিকৃতি, চিত্রকর্ম ও বিশ্বসভ্যতার নানা নিদর্শন।

চুপচাপ সবাই দেখলাম। বিশেষ কথাবার্তা হলো না কারো মধ্যে। সময় হলো বের হওয়ার।

নোসিন : এতক্ষণ আরাম। এবার গরমের ব্যারাম!

নাদিয়া : আমি তো তাকাতেই পারছি না রোদে।

নাবিল : কী মজা! আমার কাছে ছাতা আছে! এখন আমি আরামে চলব!

ফাহিম : তোমার আরাম বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। কারণ এখন আমরা পাঠক সমাবেশে যাব। আমার দুটি বইও কেনা লাগবে।

সানজু : চলো সবাই ওখানে। বসে বসে দু-একটি বইও পড়া যাবে।

জাদুঘর থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। পাঠক সমাবেশে ঢোকার মুখেই দারুণ এক শিল্পকর্ম। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার আগে কেয়ারটেকারের কাছে রাখা খাতায় স্বাক্ষর করে নিতে হয়। ব্যাগসহ অন্যান্য সামগ্রী জমা দিতে হয় নিচের লকারে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় চোখে পড়বে মনোরম সব চিত্রকর্ম।

নোসিন : ফাহিম, তুই তো ঘন ঘন স্ট্যাটাস দিস, সারা দিন বাতিঘরে বসে আছি। তো কী পড়লি আগের সপ্তাহে?

ফাহিম : আরে দূর! তোরা খালি খোঁচা দিস। আমি সারা দিন বসে থাকি না। একটি চ্যালেঞ্জ নিয়েছি মাত্র। প্রতিদিন একটি করে নতুন বই পড়ব।

সানজু : তোর না অ্যাডমিশন শুরু কদিন পর?

ফাহিম : এই দেখ! সঙ্গে বই নিয়ে ঘুরি। বাসে বসেও পড়ি।

নাদিয়া : আচ্ছা, তোরা শেষ কোন বইটা পড়েছিস শুনি তো?

নাবিল : আমার একটু কম পড়া হয়। শেষ পড়েছি হুমায়ূন আহমেদের দেয়াল।

সানজু : আমি বই পড়ি না খুব একটা। এটা আমার খারাপ গুণ। কিন্তু অভ্যাসটা হয়ে যাবে দ্রুত।

নোসিন : আমি একটি ইংরেজি বই পড়েছিলাম। নাম মনে আসছে না।

নাদিয়া : আমি জাফর ইকবাল স্যারের কিশোর উপন্যাস সাইক্লোন পড়েছি।

নাবিল : আচ্ছা, বের হই এবার। অন্য জায়গাগুলো ঘোরা লাগবে।

সানজু : এখন চারুকলায় যাব। আমার আঁকাআঁকির অনেক ইচ্ছা ছিল। আগে পারতামও। এখন ভুলেই গেছি।

নোসিন : ফাহিম, তুই কি চারুকলায় পরীক্ষা দিবি?

নাদিয়া : হা হা! কী বলছিস! ফাহিম তো বায়োলজির ছবিই আঁকতে পারে না।

ফাহিম : আজ আঁকতে পারি না বলে এত কথা!

পৌঁছলাম চারুকলা ইনস্টিটিউটের গেটে। ঢোকার সময় গেটে বেমক্কা ধাক্কা খেল সানজু। উহ করে শব্দ করে উঠল। মোবাইল টিপতে টিপতে হাঁটলে তো ব্যথা পাবেই! নখ যে উপড়ে যায়নি সেটাই রক্ষা।

ভেতরে ঢোকার পর যথারীতি সবার আগের আকর্ষণ গোলটেবিল বৈঠকের ভাস্কর্য। ঠিক যেন আমাদের মতো ওরাও দলছুট আড্ডায় মেতেছে। ফাহিমের চোখে পড়ল এক শিক্ষার্থী। তিনি একজনের স্কেচ করছিলেন। নাবিলা চলে গেল আরেক আপুর কাছে। তাঁর সামনে মডেল হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটি শিশু। বটতলায় সবাই একটু জিরিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এবার গন্তব্য টিএসসি।

ফাহিম : চারুকলা বেশ চুপচাপ।

নাবিল : এখানে কথা কম, কাজ বেশি। তবে পহেলা বৈশাখের আগের রাতে আসিস। মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতির সময় খুব আনন্দ-হৈচৈ হয়।

সানজু : এখন ক্লাস নেই মনে হয়। তাই ফাঁকা দেখা যাচ্ছে। কিছুদিন আগে এসেছিলাম। ভালোই ভিড় ছিল।

নাদিয়া : দাঁড়াও সবাই। আমি চুড়ি কিনব। কী সুন্দর চুড়ি! ফাহিম, আমাকে গিফট দিবি দোস্ত?

ফাহিম : আমার কাছে ভাড়ার টাকা আছে। আমি আরো ভাবছি, টিএসসিতে গেলে তোরা আমায় খাওয়াবি।

নাদিয়া : তুই যে কিপ্টা জানতাম। আমি নিজেই কিনব।

নাদিয়া চুড়ি কেনার পরই হাজির ফুল বিক্রেতা। শুরু হলো ঘ্যানর ঘ্যানর। ‘আপা একটা ফুল নেন।’ অনেক বোঝানোর পর ফুল বিক্রেতার কাছ থেকে মুক্তি মিলল। এদিকে সবার লেগেছে খিদে। টিএসসিতে কম টাকায় মধ্যাহ্নভোজের অনেক ব্যবস্থা আছে। এটা-ওটা খেয়ে নিলাম। তারপর ঢুকলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আসাদ ভাই আসবেন ছবি তোলার জন্য ৩টায়। এখন ২টা বেজে ৪০।

ঘুরতে ঘুরতে থামলাম মুক্তমঞ্চে। গিয়েই দেখা হলো দুই আন্টির সঙ্গে। নাবিল ও নোসিনের সঙ্গে এসেছে তাদের মা। তখনই এলো এক বাদামওয়ালা, ‘বাদাম দিব ম্যাডাম?’ আন্টিরা বললেন, ‘দিন। ওরা আড্ডা দিচ্ছে দিক। আমরাও বাদাম খেতে খেতে আড্ডা দিই।’

এবার শুরু আসল আড্ডা। আগের মতো শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো। ফোন থেকে থাকতে হবে দূরে। অবশ্য আমার বেলায় শর্ত খানিকটা শিথিল। কারণ আমি আবার আমাদের আড্ডার কথাবার্তা ফোনে রেকর্ড করছিলাম কিনা।

ফাহিম : নোসিন, তোর তায়কোয়ান্দো প্রশিক্ষণ কেমন চলছে?

নোসিন : চলছে ভালো। সামনে পরীক্ষা। আপাতত পাঠ্য বইয়ের সঙ্গে কুংফু-কারাটে চলছে।

নাদিয়া : তায়কোয়ান্দোটা কী? আমিও শিখব নাকি!

নোসিন : এটাকে আন্তর্জাতিক একটা স্পোর্টস বলতে পারিস। ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান মার্শাল আর্ট। এটা কিন্তু শুধু আত্মরক্ষার কৌশল নয়। এটা ব্যায়ামও। এটার প্র্যাকটিস করলে বুঝবি দেহের ভেতর কত শক্তি। সেগুলোকে আবার কিভাবে রূপান্তর করা যায়। যা-ই হোক, এটা জটিল একটা বিষয়। শুরু না করলে বুঝবি না।

ফাহিম : আমি জানি, এটা ভয়ানক নাকি। আহত হওয়ার অনেক আশঙ্কা। তুই হয়েছিস?

নোসিন : মোটেও ভয়ানক নয়। এটা বেশ বিজ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল খেলা। শরীরের সংবেদনশীল স্থানগুলো রক্ষার জন্য বিভিন্ন রকম সরঞ্জাম তো আছেই। হেড গার্ড, চেস্ট হার্ড, হ্যান্ড হার্ড, হ্যান্ড গ্লাভস, শিন গার্ড—সবই পরে নিতে হয়। খেলা হিসেবে নিলে কোনো ঝুঁকি নেই।

নাবিল : তুই কোনো মেডেল পেয়েছিস?

নোসিন : তায়কোয়ান্দোতে ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে ব্রোঞ্জ পেয়েছিলাম। তবে এ খেলায় বাংলাদেশের অর্জন কম নয়। ২০০৬ সালে কলম্বোয় দশম সাউথ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের মোঃ মিজানুর রহমান স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। ২০১০ সালে ১১তম সাউথ এশিয়ান গেমসে শাম্মী আক্তারও স্বর্ণপদক পান। একই বছর ঢাকায় ১১তম সাউথ এশিয়ান গেমসে ফারজানা শারমীন রুমি জেতেন স্বর্ণপদক। ২০১১ সালে ভারতের চেন্নাইয়ে পঞ্চম কমনওয়েলথ তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় শ্রাবণী বিশ্বাসও জেতেন। ওই প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদকটাও আমাদের ঘরে আসে। ওটা পেয়েছিলেন শাহনাজ খাতুন। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০১২ সালে সপ্তম কোরিয়া ওপেন ইন্টারন্যাশনালে মোঃ মুসলেম মিয়া স্বর্ণ ও মোঃ ইমতিয়াজ ইবনে আলী রৌপ্য পদক জিতেছিলেন।

ফাহিম : আচ্ছা, আমায় একটু তায়কোয়ান্দো স্টাইল দেখা তো।

নোসিন দাঁড়িয়ে গেল চট করে। ফাহিমকে বলল, উঠে দাঁড়া। এরপর দুম করে নোসিন তার পা উঠিয়ে দিল ফাহিমের মুখ বরাবর। ফাহিমও চেষ্টা করল উঠাতে। দিল এক চিত্কার। ‘ও আল্লাহ! আমার পায়ের রগ মনে হয় শেষ!’

সানজু : এটা শিখব কোথায়? তুই কোথায় শিখছিস?

নোসিন : অনেক একাডেমি আছে। আমার বাসার পাশে এক স্যারের কাছে শিখেছি। তোরা চাইলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে তায়কোয়ান্দো ফেডারেশনে খোঁজখবর নিতে পারিস। এ ছাড়া দেশের ভেতর তায়কোয়ান্দো ফেডারেশন অনুমোদিত প্রশিক্ষকও আছেন। খরচ খুব বেশি না। দু-তিন হাজার টাকায় ভর্তি হতে পারবি। আর লাগবে পোশাক। মাসিক একটা ছোটখাটো ফি আছে।

নাবিল : সামনে দুর্গাপূজার বন্ধ। কারো কোনো প্ল্যান?

নাদিয়া : তোরা কোথাও গেলে আমিও রাজি। কার কী পরিকল্পনা শুনি? 

সানজু : কলেজের ফেস্ট নিয়ে যেই যন্ত্রণায় আছি তাতে তো মনে হচ্ছে, ঘরে বসে মাথাটা শীতল করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

নাবিল : কোনো প্ল্যান করিনি। তবে বিতর্কের দুটি প্রগ্রাম আছে। ওটা নিয়ে ঝালাই করে নিচ্ছি নিজেকে।

ফাহিম : যেহেতু সামনে ভর্তি পরীক্ষা। তাই পড়াময় ছুটি কাটানো ছাড়া উপায় নেই।

নোসিন : তুই কিছু করবি, নাদিয়া?

নাদিয়া : আমি চিন্তা করছি, ঘুরতে বের হবো বড় বোনের সঙ্গে। সেটা এক দিনের জন্য। ঘুরে ঘুরে পূজা দেখব।

আচ্ছা, পৃথিবীর ফুসফুস ওরফে আমাজনে যে আগুন লাগল, এটা নিয়ে তোমরা কী ভাবছ?

নাদিয়া : আমরা ১০ বন্ধু মিলে উদ্যোগ নিয়েছি, আমাদের স্কুলের যে জায়গাগুলোতে গাছ লাগানো সম্ভব, সেখানে মাসে ১০টি করে গাছ লাগাব।

নোসিন : আমাদের স্কুলের প্রতিটি ক্লাসরুমেও গাছ। মাঠেও গাছে ভরপুর। ছাদে আম্মু বাগান করেছেন। আমার কাজ হলো সেগুলোর দেখভাল করা।

ফাহিম : প্রতিদিন একজন মানুষকে গাছ লাগাতে বলব। মাসে নিজেও একটা লাগাব।

সানজু : বন্ধুদের জন্মদিনে গিফট হিসেবে গাছের চারা দিব ঠিক করেছি। ফেলে তো দিতে পারবে না। ওটা লাগাতেই হবে। হা হা হা।

নাবিল : গাছ লাগানো নিয়ে লেখালেখি চালানোর ইচ্ছা আছে। বিশেষ করে ফেসবুকে।

এর মধ্যে হাজির আমাদের প্রিয় আলোকচিত্রী আসাদ ভাই। এসেই জেমস বন্ডের মতো মুখ করে বললেন, ‘আমি যার ছবি তুলি সে বিখ্যাত হয়ে যায়। তোমরা বিখ্যাত হতে তৈরি?’ হো হো করে প্রাণ খুলে হেসে উঠলাম সবাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা