kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গল্প

নাইট শেপস

মূল :রবার্ট ওয়াইনবার্গ
রূপান্তর : তানভীর মৌসুম

১৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নাইট শেপস

অঙ্কন : জামিল

রেমন্ডের বিছানা জানালার ঠিক পাশে। সেটাই বিপদের মূল কারণ। জানালায় সমস্যা নেই। রুমের সঙ্গে সুন্দর মানিয়ে গেছে সেটা। গ্রীষ্মকালের অর্ধেকটা সময় চলে গেছে। রাতে প্রচুর গরম পড়ে। ফিটনেসের ব্যাপারে রেমন্ডের মা-বাবা দুজনই বেশ সচেতন। তাই বাসায় কোনো এসি নেই। এই গরমে সিলিং ফ্যান একমাত্র ভরসা। রেমন্ডের মা-বাবা তাদের বেডরুমে আরাম করে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ছেলেটা নিজের রুমে শুয়ে থাকলেও বেচারার ঘুম আসছে না। তবে এ নিয়ে বিরক্ত নয় ও। ওর রাতের বেলা জেগে থাকতে ভালো লাগে, ভালো লাগে ভাপসা গরম। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে ও, আকাশের বুকে আবিষ্কার করে নানা ধরনের আকৃতি।

বারো বছর বয়সী কোনো ছেলের জন্য এসব স্বাভাবিক। মাথার নিচে বালিশ, চোখ জানালার বাইরে। দিনের বেলা সূর্যের আলোয় যা কিছু স্বাভাবিক মনে হয়, তার অনেক কিছুই রাতের বেলা দেখলে ভয়াবহ মনে হবে। দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা আছে ওর বয়সী ছেলেদের মধ্যে। একটা স্বাভাবিক জিনিসকে বিভিন্নভাবে যে দেখা যায়, সেটা ওরা জানে। রাতের বেলা কিছু সময়ের জন্য কল্পনার হাতে চলে যায় সব ক্ষমতা, বাস্তবতা সেখানে পাত্তা পায় না। অন্ধকার যেকোনো কিছুকে রহস্যময় করে তোলে, নিষ্প্রাণ সব কিছু যেন জীবিত হয়ে ওঠে তখন।

একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা হয়ে ওঠে এক রাক্ষসের দৈত্যাকার মুখ, চোখ বন্ধ করে যে হালকা ঝিমোতে ব্যস্ত। চিঠির বাক্সটা হয়ে ওঠে মানুষ মারার যন্ত্র। আকাশে থাকা মেঘরাজি ধূসর রঙের বিশাল এক হাতিতে পরিণত হয়। বায়ুস্তরে ভাসতে থাকে অতিকায় সেই চারপেয়ে। কোনো সন্দেহ নেই, রাতের বেলাটা জেগে থাকার জন্য উত্কৃষ্ট একটা সময়।

আজ রাতে আকাশে মেঘ থাকবে কি না এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয় রেমন্ড। সারাটা দিন আকাশ উজ্জ্বল নীল বর্ণ ধারণ করে ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামীকালও অবস্থা এমনই থাকবে। আকাশটা যেন বিশাল এক মখমলের চাদর। সেখানে সাদা রঙের অজস্র বিন্দু জ্বলজ্বল করছে। চাঁদটা গোল আর বিশাল, চারপাশে রুপালি আভা ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। রেমন্ড সমানে খুঁজেই চলছে; কিন্তু কোথাও কোনো মেঘ নেই। চারপাশ খোঁজা বাদ দিয়ে এবার ও সরাসরি মাথার ওপর তাকাল।

সেখানে একটা মেঘ আছে। অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল। একটা নিঃসঙ্গ, ছোট, তুলতুলে মেঘের পুঞ্জ। ঠিক ওদের বাড়িটার ওপর ভাসছে। এ কারণেই মেঘটা আগে ওর চোখে পড়েনি।

ঠোঁট জোড়া চেপে ভাবতে শুরু করল—এই মেঘপুঞ্জের সঙ্গে আকার-আকৃতিতে কিসের মিল থাকতে পারে? বিড়াল, কুকুর নাকি সাদা হাতি? না, এসবের সঙ্গে ভাসতে থাকা মেঘটার কোনো মিল নেই। আবার নতুন করে ভাবতে লাগল। ইঁদুর? একটা কুঁড়েঘর? কিংবা একটা বেজবল ক্যাপ? না, কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

অবশেষে উত্তরটা খুঁজে পেল রেমন্ড। না, এটাই হবে। অন্য কিছু নয়। এ কারণেই আগের কিছুর সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছিল না। মেঘের পুঞ্জটা দেখতে হুবহু একটা মুখমণ্ডলের মতো। মেঘের ওপরের দিকে দুটি খাঁজ কাটা। ওগুলোর দিকে তাকালে চোখ বলেই মনে হয়। যদিও ওটার কোনো নাক নেই। নিচের একটা ফাঁক দিয়ে রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে। ওই জায়গাটাকে ঠোঁট হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে। দেখে মনে হচ্ছে, দাঁত বের করে হাসছে ওটা।

মুখ হিসেবে মেঘের আকৃতিটা নিখুঁত নয়, তবে খুব সহজেই পুঞ্জটাকে কারো মুখ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব। নিজের আবিষ্কারে সন্তুষ্ট রেমন্ড মাথা নাড়ল। এবার অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার পালা। যেসব জিনিসের আকৃতি সহজে অন্য কিছুর সঙ্গে মেলানো যায়, সেসবে নজর দেওয়া দরকার।

রাস্তার অন্য পাশে একটা বাংলো আছে, ওর বন্ধু মার্টিন সেখানে থাকে। বাংলোটা বিশাল এক ট্যাংকে পরিণত হলো। আক্রমণকারীদের রুখে দিতে প্রস্তুত অবস্থায় আছে ওটা। কিনারে থাকা পুরনো, মৃত গাছটা বিশাল এক দানব হয়ে গেল। অতিকায় বিশাল হাতগুলো যেন ধীরে ধীরে লম্বা হচ্ছে। রাস্তা থেকে কোনো পথচারীকে ছিনিয়ে নেবে একটু পর। স্ট্রিট ল্যাম্পটা ভোল পাল্টে একচোখা দৈত্যের বিশাল সেই চোখে পরিণত হলো।

আর ওর বাসার সামনেই একটা ওকগাছ আছে। জানালা থেকে বেশি দূরে নয়। সেটা হয়ে গেল ড্রাগন।

আকার-আকৃতিতে এত মিল খুঁজে পেয়ে অবাক হয়ে গেল রেমন্ড। কিছুক্ষণ আগেও তো এসব ওর চোখে ধরা পড়েনি। আরো বেশি মনোযোগ দিল ওকগাছটার ওপর। এক বিশাল, ভয়ানক ও প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ড্রাগনের কথা ভাবতে শুরু করল।

খুব দ্রুত সেটা আকৃতি পেতে শুরু করল। বাঁকা ডালপালাগুলো সবুজ পাতায় ঘেরা। সেটা এক অতিকায় মুখে রূপ নিল। মুখব্যাদান করে আছে ওটা, খিদে মেটানোর জন্য পাগল হয়ে গেছে। ওটার নিচের অংশ রূপ নিয়েছে দানবাকারের এক দেহে। গাছের শাখা-প্রশাখাগুলো ওর রুমের জানালা ছুঁইছুঁই। তবে ভোল পাল্টে সেগুলো এখন ভয়ংকর নখর। শিকার খুঁজছে নখরগুলো! গাছের ওপর দিকে দুটি ফাঁকা অংশ আছে। ফাঁক দিয়ে রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে। সেগুলো ড্রাগনের চোখ।

হঠাত্ থেমে গেল রেমন্ড। ওর চোখ জোড়া বড় বড় হয়ে গেছে। মাথা ঝাঁকাল ও। ফালতু খেলাটা বন্ধ করতে চাইছে। এমনটা হতে পারে না, কিছুতেই না। অসম্ভব! অথচ সেটাই হচ্ছে! ওর কল্পিত প্রতিটি আকার-আকৃতি নড়াচড়া শুরু করেছে!

অতি কষ্টে ঢোক গিলল বেচারা, কোঁত করে শব্দ হলো। গাছের মধ্যে অন্য কিছু কল্পনা করা এক জিনিস আর সেগুলো যখন বাস্তব হয়ে যায় তখন ব্যাপারটা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

প্রচণ্ড আতঙ্ক ওকে গ্রাস করে নিল। এত কিছু কল্পনা না করে ঘুমিয়ে যাওয়াটাই মনে হয় সব দিক দিয়ে ভালো ছিল।

ড্রাগনের নখরগুলো সশব্দে জানালার কাছে এগিয়ে এলো। বাসার দেয়ালের সঙ্গে নখরের ঘষা খাওয়ার স্পষ্ট শব্দ শোনা যাচ্ছে। অল্পের জন্য ড্রাগনের নখর ওর ঘরের ভেতর এসে ঢুকল না।

দম নিতে ভুলে গেল বেচারা। আগে ব্যাপারটা খেয়াল করেনি! ড্রাগনের মুখের ভেতরটা সাদা সাদা দাঁতে ভর্তি। কিন্তু কল্পিত আকার-আকৃতির সঙ্গে দাঁতের তো কোনো সম্পর্ক নেই! রেমন্ড খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, ড্রাগনের রাতের জলখাবার ও নিজেই হতে চলেছে। কিন্তু বেচারা এক ইঞ্চিও নড়তে পারছে না।

ড্রাগনের চোখ থেকে এক ধরনের অতিপ্রাকৃত আভা বের হচ্ছে। আর সেই আভা রেমন্ডকে বিছানার সঙ্গে যেন আঠা দিয়ে আটকে রেখেছে। ফাঁদে পড়েছে ও। এক ছায়া ড্রাগনের ক্ষুধার শিকার হতে চলেছে! যে ড্রাগন খিদে পেলে রেমন্ডের মতো বাচ্চাদের গিলে খায়।

ড্রাগনের খোলা মুখটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে তো হচ্ছেই। জানালার কাছাকাছি ওটা, এখনই কাচ ভেঙে ফেলবে। ভেতরে ঢুকে রেমন্ডকে ওটার দানবীয় পেটের ভেতর চালান করবে।

রাগে, দুঃখে আর নিজের অক্ষমতায় রেমন্ডের চোখে পানি চলে এলো। রাতের এসব কল্পিত আকার-আকৃতি মজাদার এক খেলার একটা অংশ ছিল। সেগুলোকে জীবন্ত হতে বলেছে কে?

ড্রাগনের নখর জানালার কাচ স্পর্শ করল। ভয়ে ছেলেটার চেহারা বিকৃত হয়ে গেল। বুঝতে পারছে, এখনই সব শেষ হয়ে যাবে।

এমন সময় ব্যারেলের মতো মোটা একটা মেঘের হাত কুয়াশা ভেদ করে নিচে নেমে এলো, ঠিক ড্রাগনের মাথা বরাবর! ওটার চকোলেটের মতো সাদা হাত ড্রাগনটাকে খপ করে নিজের মুঠোর ভেতর নিয়ে নিল। বিশাল জন্তুটা আটকা পড়ল সেই অস্বাভাবিক রকমের বড় হাতের ভেতর। তার পরই ওটা ক্ষুধার্ত ড্রাগনকে হ্যাঁচকা টানে তুলে ফেলল। যেন ড্রাগনটা স্রেফ এক ক্ষুদ্র পতঙ্গ। একটা হুস শব্দ করে বিশাল সেই ড্রাগন রাতের আকাশে অদৃশ্য হয়ে গেল।

রেমন্ডদের বাড়ির ওপর থেকে কচমচ শব্দ পাওয়া গেল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল সেই শব্দ। যেন কেউ বিশাল একটা বিস্কুট চিবোচ্ছে।

হঠাত্ রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে একটা উত্ফুল্ল কণ্ঠস্বর শোনা গেল। রেমন্ডের মাথার ভেতর সেই আওয়াজ ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ। আমি জানতাম, ছায়া ড্রাগন নিষ্পাপ কাউকে না দেখলে অন্ধকার ছেড়ে বেরিয়ে আসবে না। প্রচণ্ড খিদে লেগেছিল ওটার, বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। জানত, আমি ওটাকে অনেক দিন ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। তবে আসল কথা হলো, তুমি আর আমি মিলে ছায়া ড্রাগনকে শেষ করে দিয়েছি।’

মাথার ওপর তাকাল রেমন্ড, মুখমণ্ডলের আকৃতি নেওয়া মেঘটাকে চোখ টিপতে দেখে অবাক হলো না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা