kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

গল্প

অতৃপ্ত বাস

জুনায়েদ হাবীব

৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অতৃপ্ত বাস

অঙ্কন : জামিল

তিন বন্ধু। সুজিত, রাকিব, আদিব। কলেজের প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ। তিনজনের প্ল্যান—ঘুরতে যাবে কোথাও। কিন্তু কোথায় যাবে? আদিব বলল, একটা ভূতুড়ে স্থানে যাওয়া যাক। অন্য রকম একটা অভিজ্ঞতা হোক।

ঠিক হলো, দিনাজপুরের প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে যাবে। বহু কষ্টে অনুমতি জোগাড় করে তিনজন পৌঁছল কমলাপুর রেলস্টেশনে। যেতে যেতেও আলাপ করছিল, কোথায় যাওয়া যায়। শুনেছে, রাজনগর নামে একটা জায়গা আছে। সেটা নাকি ভূতুড়ে! পাশের সিটে বসা আগন্তুকই জানাল কথাটা।

গল্প করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল তিন বন্ধু। সকাল হতেই দেখল, ট্রেন গন্তব্যে।

সুজিতের এক আত্মীয় আছে এখানে। তিনজন গেল সেখানে। ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়েও পড়ল। এভাবে কেটে গেল একটা দিন। ভূতুড়ে জায়গাটায় আর যাওয়া হলো না। তার আগেই এলো ঢাকার ডাক। সুজিত ও রাকিবের প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেক ভালো লাগছিল। তারা যেতে চাইছিল না। কিন্তু আদিবের অনেক তাড়া। আজকের মধ্যেই ঢাকা যেতে হবে। রাতের খাবার খেয়ে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো তিন তরুণ। ৮টার বাস ধরতে হবে। গ্রামের পথঘাট সুনসান। তবে জোনাকি দেখল অনেক। রিকশা বা ভ্যান পাওয়া যায় না। পা-ই ভরসা। আর তাতেই হয়ে গেল দেরি।

অবশেষে সবাই পৌঁছল বাসস্ট্যান্ডে। স্ট্যান্ড দেখে থমকে গেল ওরা। স্ট্যান্ড এত নীরব থাকার কথা না। কোনো টিকিট কাউন্টার চোখে পড়ল না। মিটিমিটি একটা বাতি জ্বলছে শুধু। ঘড়ি দেখে হতাশ সবাই। সাড়ে ৮টা বেজে গেছে।

এদিক-ওদিক কাউকে না পেয়ে অবাকই হয়ে গেল তিন বন্ধু। চরম বিপাকে পড়ল। ভয়ও হচ্ছে। আদিব এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল, যদি কারোর দেখা মেলে।

হঠাত্ উদয় হলো এক বুড়ো। বয়স সত্তরের মতো। লাঠিতে ভর করে এগিয়ে এলো তিন তরুণের দিকে। তাকে দেখে রাকিবরা জানতে চাইল, ৯টার বাস ছাড়বে?

বুড়ো মুচকি হেসে বলল, আর তো কোনো বাস নেই। আগামীকাল সকালে আছে আবার। তিনজন হতাশ চোখে একে অন্যের দিকে তাকাল।

আদিবের মেজাজ ক্রমে গরম হচ্ছে। যে করেই হোক, আজ যাওয়া চাই-ই। সুজিত বোঝাতে চাইল, আজ ফিরে যাই। কিন্তু নাছোড়বান্দা আদিব। সে একদিকে হাঁটা শুরু করল। তাকে বোঝাতে গিয়েও ব্যর্থ হলো রাকিব ও সুজিত। কিন্তু আদিব কানই দিল না। একটু পর আদিব চলে গেল চোখের আড়ালে। তাকে আর খুঁজেই পেল না দুজন। সুজিত ও রাকিব ফিরে গেল সেই আত্মীয়র বাসায়।

এদিকে আদিব অন্ধকার মেঠো পথ ধরে হাঁটতে লাগল অজানা গন্তব্যে। কিছুক্ষণ পরই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। বিশ্রাম নিতে রাস্তার এক পাশে বসে পড়ল। মনে মনে ভয়ও কাজ করছে। একসময় চাদর মুড়ি দেওয়া একজনকে আসতে দেখে স্বস্তি ফিরে পেল। আদিব ডাকল লোকটাকে। কিন্তু সে শুনেও যেন চলে যাচ্ছিল। এরপর তার পথ আগলে দাঁড়াল আদিব।

‘ভাই, কোথায় যাচ্ছেন?’

অবাক কাণ্ড! লোকটি বলল, ‘ঢাকায়।’

আদিব খুশিতে আটখানা। যাক, সঙ্গী পাওয়া গেল। লোকটাকে বলল, সে-ও যাবে। এক সঙ্গেই যাওয়া যাক। কিন্তু আগন্তুক তার কথায় কান দিল না মনে হলো। বরং দ্রুত পায়ে ঘন জঙ্গলের দিকে চলে গেল। আদিব পিছু নিল আগন্তুকের।

জঙ্গলে ঢুকে কিছুটা এগোতেই আবার অবাক আদিব। ঘন বনের ভেতর কতগুলো লোক লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে! ওই লোকটাও আছে লাইনে। এমন ঘন জঙ্গলে ঢাকায় যাওয়ার বাস ছাড়বে! তা-ও আবার এত রাতে লাইন! আদিব নিজেকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে গেল লাইনে।

ওমা! একটু পর একটা বাসও চলে এলো! দাঁড়াল ঠিক লাইনের সামনে। কিন্তু বাসটিতে কেউ উঠছে না কেন! আদিব মনে মনে বিরক্তই হচ্ছে। যাক, সে দেরি না করে সবাইকে টপকে নিজেই উঠে পড়ল বাসে। উঠেই আঁতকে উঠল আদিব। গোটা বাস রক্তে ভেসে আছে। সিটগুলো সব ভাঙাচোরা। এখানে-সেখানে রক্ত। আদিব ভয় পেয়ে যায়। পা দুটি ভীষণ ভারী লাগে। বাসে সে আর এক চালক। আর কেউ নেই। বাস স্টার্ট দিল চালক।

পরদিন। দুপুরে রাজনগর থেকে রাকিব আর সুজিত পৌঁছল ঢাকায়। রাকিবের ফোনে এলো আদিবের মায়ের কল।

‘আদিব কোথায়?’

রাকিব কী বলবে বুঝতে পারছে না। আদিবের মাকে মিথ্যা বলল রাকিব। বলল, আদিব থেকে গেছে দিনাজপুর।

তিন দিন পরও খোঁজ মিলল না আদিবের।

পরদিন গভীর রাত। রাকিবদের বাসার সামনে একটা সরু গলি। হঠাত্ একটা বাস এসে ব্রেক কষল সেখানে। এরপর হর্ন দিতে শুরু করল একটানা।

রাকিব মহা বিরক্ত। এত রাতে হর্নের শব্দে কেউ কিছু বলছেও না। বারান্দায় এসে দাঁড়াল রাকিব। এরপর নিচে নেমে এলো। বাসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আশপাশে কেউ নেই। এমন সরু গলিতে বাস ঢুকল কী করে—ভাবছে রাকিব। এমন সময় বাস থেকে নেমে এলো কালো একটা ছায়া। রাকিবকে শূন্যে ভাসিয়ে তুলে নিল বাসে।

দোকানে চা খেতে খেতে সুজিত একটা পুরনো পত্রিকা হাতে পেয়ে পড়ছিল। একটা খবরে চোখ আটকে গেল তার। তারা যেদিন দিনাজপুর থেকে আসবে, তার আগের দিন রাত ৮টায় যে বাস ছেড়েছিল সেটা অ্যাকসিডেন্ট করেছিল। যাত্রীদের অনেকে ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

‘আরে! এই বাসেই তো ওঠার কথা ছিল আমাদের!’

এমন সময় ভরদুপুরে কানের কাছে বিকট শব্দে হর্ন। একটা বাস। তার পাশেই দাঁড়িয়েছে। বাসের পেছনের একটা সিটের জানালায় পরিচিত দুটি মুখ দেখতে পেল।

‘আরে! আদিব আর রাকিব!’ এবার এক দৌড়ে বাসে চড়ে বসল সুজিতও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা