kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

গল্প

পাতালঘর

ডিউক জন

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পাতালঘর

অঙ্কন : জামিল

নতুন বাড়িতে ওঠার পর থেকেই বেইসমেন্টটার প্রেমে পড়ে গেছি আমি আর আমার বন্ধুরা। প্রায় দুপুরেই বব, এলিজা, রিয়া আর আমাকে পাওয়া যায় পাতালঘরে। ডজনখানেক ক্লজিট রয়েছে এখানে। পুরনো জিনিসে ভর্তি। সবই আগের মালিকের। একদিন একটা কার্টন বেরোল ওখান থেকে। সেখান থেকে বেরোল কার্ডবোর্ডের একটা প্যাকেট। পুরনো বোর্ডগেম।

ঝুঁকলাম কার্টনটির ওপর। কালো কী যেন চকচক করছে ভেতরে। একটা মুখোশ। তুললাম ওটা। ঝেড়েঝুড়ে আঁটলাম মুখে। ঘোষণা করলাম, ‘আমি হচ্ছি রবিন হুড!’

‘ইহ্!’ মুখ ভেংচাল বব। ‘আমার কাছে তো লাগছে ব্যাংক ডাকাতের মতো।’

ঠিকমতো অ্যাডজাস্ট হয়নি মুখোশটা। খাপে খাপে বসিয়ে নিতেই ধাক্কা খেলাম একটা।

কোথায় দোস্তরা? ‘নেই’ হয়ে গেছে চোখের সামনে থেকে!

অপরিচিত চারজনকে দেখতে পাচ্ছি এখন আইহোল দিয়ে! দুটি ছেলে, দুটি মেয়ে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না চেহারা।

গোল হয়ে মেঝেতে বসেছে ওরা। খেলছে বোর্ডগেম। পুরনো আমলের পোশাক পরনে। হাসছে আর হাত নাড়ছে। কিন্তু কী নিয়ে কথা বলছে, বোঝা যাচ্ছে না।

‘এই যে! কারা তোমরা?’ অজান্তেই চড়ে গেছে গলা।

ঘুরেও চাইল না একজনও।

শ্বাস আটকে আসতে চাইছে আমার। দ্রুত লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা। এক টানে খুলে ফেললাম মুখোশটা।

‘কী হয়েছে রবিন?’ ঝাঁকাচ্ছে বব আমার কাঁধ ধরে। ‘ঠিক আছিস তো তুই?’

বেশ কবার পিটপিট করতে হলো চোখ। যেখানেই অদৃশ্য হোক, ফিরে এসেছে দোস্তরা।

‘বরফের মতো জমে গেছিস মনে হচ্ছিল!’ বলে উঠল রিয়া। ‘কী বলছিলি ওসব?’

‘পরে দেখ মুখোশটা!’ বললাম ববকে। ‘বুঝতে পারবি সব!’

ভুরু কুঁচকে তাকাল ও জিনিসটার দিকে, তবে মুখে লাগাল ওটা।

‘হেই!’ চেঁচিয়ে উঠল আচমকা। ‘কারা তোমরা? কিভাবে এলে এখানে?’ জবাব না পেয়ে খুলে ফেলল মুখোশটা। লাল হয়ে গেছে চেহারা। এমনভাবে মাথা ঝাঁকাল, ঝেড়ে ফেলে দিতে চাইছে যেন সব কিছু।

হাত রাখলাম বন্ধুর কাঁধে। ‘চারটি ছেলে-মেয়েকে দেখতে পেয়েছিস, তাই না?’

নড করল বব। হাঁ হয়ে রয়েছে মুখটা। ‘মনে হচ্ছিল, অন্য কোনো ডাইমেনশন থেকে এসেছে!’

চোখ পাকাল রিয়া। ‘দুজন মিলে বোকা বানানোর প্ল্যান করেছিস আমাদের, তাই না?’

ববের হাত থেকে মুখোশটা নিয়ে বাড়িয়ে দিলাম ওর দিকে।

দ্বিধা খেলা করছে রিয়ার চোখে। শেষমেশ ও, তারপর এলিজাও পরল মুখোশটা। ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হলো।

‘কেউ কি বুঝতে পারছিস, কী দেখলাম আমরা?’ গলা কাঁপছে এলিজার।

‘এই বেইসমেন্টেই ছিল হয়তো ওরা ১০০ বছর আগে।’ অনুমান আমার।

সে রাতে ডিনারের পর আবার নামলাম বেইসমেন্টে। মুখোশটা পরার সময় বেড়ে গেল হৃত্স্পন্দন।

হ্যাঁ, আবার দেখতে পাচ্ছি ওদের। খেলছে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে।

‘হ্যাল্লো!’ রীতিমতো চিৎকার করলাম এবার।

নাহ্, তাকালই না কেউ এদিকে!

ঠিক তখনই শীতল স্রোত নামল শিরদাঁড়া বেয়ে।

দীর্ঘ এক ছায়া ফার্নেসের পেছনে! কেউ লুকিয়ে আছে ওখানে!

চার মূর্তি কি জানে সেটা? মনে তো হয় না!

তীক্ষ দৃষ্টিতে চাইলাম ফার্নেসের দিকে। বোঝা গেল—লম্বা, পাতলাসাতলা লোকটা। রুপালি জুলফি কানের পাশে। ফুলহাতা, নীল চেক শার্টের ওপর ব্যাগি ওভারঅল চাপিয়েছে। চোখে ভারী লেন্সের চশমা। হাতে—

খাইছে! কী ওটা? বড়সড় একটা ধাতব রেঞ্চ লোকটার হাতে!

কী করতে চায় ওটা দিয়ে? মারবে ওদের?

শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে আমার। সাবধান করতে হবে ছেলে-মেয়েগুলোকে! কী ঘটবে, যদি কাউকে স্পর্শ করি? চেষ্টা তো করতে হবে!

কিন্তু নড়তে শুরু করার আগেই কলজে কাঁপানো ভয়ংকর আওয়াজে কেঁপে উঠল গোটা বেইসমেন্ট! তাল সামলানোর জন্য খামচে ধরলাম পাশের কাউচটা।

কী হলো এটা? ভূমিকম্প?

‘নাআআআ!’ ভয়ার্ত চিৎকার ছাড়ল এক কিশোরী।

‘বাঁচাও!’ গলা মেলাল অন্য মেয়েটা।

বিশ্রী মড়মড় আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে বেইসমেন্টজুড়ে! কাঠের একটা বিম অকস্মাৎ আছড়ে পড়ল চার বন্ধুর ওপর! পরক্ষণে ধসে পড়ল আস্ত ছাদটাই! কাঠ আর প্লাস্টারের হিমবাহ বয়ে গেল যেন!

‘নাআআআ...’ প্রলম্বিত চিৎকার বেরিয়ে এলো বুকের গহিন থেকে। চোখ বুজে ফেলেছি। মুখোশটা খুলে ছুড়ে ফেললাম মেঝেতে। হাঁপাচ্ছি বেদম। চোখ মেলে দেখি, একেবারে স্বাভাবিক রয়েছে সব কিছু! কেউই—এমনকি নেই কোনো ভগ্নস্তূপও!

দুদ্দাড় সিঁড়ি ভেঙে উঠে এলাম ওপরে। বন্ধুদের বলতে হবে ঘটনাটা।

কিন্তু ফোনের রিসিভার ওঠানোর আগেই বেজে উঠল ডোরবেল।

দরজা খুলেই পিছিয়ে গেলাম সভয়ে।

‘স্যরি, দেরি হয়ে গেল!’

‘দেরি?’ বুঝতে পারছি না, কী বলছে দরজায় দাঁড়ানো বুড়োটা।

জুলফি চুলকাল লোকটা। ‘মিস্টার রোজারিও আছেন না বাড়িতে? আমার নাম আব্রাহাম। ফার্নেস ঠিক করতে ডেকেছেন তিনি আমাকে।’

হচ্ছে কী এসব? মনে পড়ল রেঞ্চ হাতে লোকটার লুকিয়ে থাকার দৃশ্যটা। ভেতরে ঢুকতে দেওয়া কি উচিত হবে একে? বললাম, ‘না, বাড়ি নেই মা-বাবা। পরে আসুন আপনি।’

পায়ের কাছে রাখা টুলবক্সটা তুলল আব্রাহাম। ‘সমস্যা নেই। ফার্নেসটা কোথায়, জানা আছে আমার।’

ভেতরে ঢুকে পড়ল মেকানিক। পা বাড়াল বেইসমেন্টের দিকে। দুরুদুরু বুকে অনুসরণ করলাম লোকটাকে।

ফার্নেস খুলে কাজ শুরু করে দিল মিস্ত্রি। দেখতে লাগলাম পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে। বারবার মনে আসছে ছাদ ধসে পড়ার দৃশ্যটা।

‘আ-আগে কি কখনো এসেছেন এখানে?’ করেই ফেললাম প্রশ্নটা।

হাসল মিস্ত্রি। ‘গত পঞ্চাশ বছর ধরেই এ বাড়ির দেখভাল করছি আমি।’

‘এখানে...মানে, এই বেইসমেন্টে কি ভয়ানক কিছু ঘটেছে কখনো?’ বলতে গিয়ে কেঁপে গেল কণ্ঠস্বর।

পুরু লেন্সের ভেতর দিয়ে সরাসরি চাইল আব্রাহাম। ‘কেন জিজ্ঞেস করছ এ কথা?’

শ্রাগ করলাম। ‘এমনিই।’

স্ক্রুড্রাইভারের মাথা দিয়ে জুলফি চুলকাল ফার্নেসের কারিগর। ‘তীব্র শীত পড়েছিল সেদিন।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুরু করল বক্তব্য। ‘ওই ঘটনার পর স্টোকার পরিবার—মানে, এ বাড়ির বাসিন্দারা চলে যায় বাড়ি ছেড়ে। কেউ জানে না—কখন, কিভাবে বেইসমেন্টে নেমেছে ওদের ছোট্ট মেয়েটা। কে যেন খুলে রেখেছিল ফার্নেসের দরজাটা। খেলতে খেলতে জ্বলন্ত কয়লার মধ্যে পড়ে যায় ডরোথি। কঙ্কাল হয়ে গিয়েছিল পুড়ে! কেউই শুনতে পায়নি ওর চিৎকার।’ আক্ষেপে মাথা নাড়ছে মেকানিক।

বুঝলাম। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়? তার চেয়েও বড় কথা—আমার দেখা বুড়োটার সঙ্গে এত মিল কেন আব্রাহামের?

হাতের ঝাপটায় টুলবক্সের ডালা আটকাল বুড়ো। টোকা দিল ফার্নেসের গায়ে। ‘বদলাতে হবে নিচের পাইপটা। বাবাকে বোলো, আগামীকাল আসব আমি আবার।’

পরদিন দুপুরে লিভিংরুমের সোফায় বসে আছি চারজন। সব কথা খুলে বলেছি ওদের।

‘ওখানে আর নামছি না আমরা।’ বলল বব। ‘নতুন আরেকটা জায়গা বের করা দরকার আড্ডা দেওয়ার জন্য।’

‘না, নামব ওখানে।’ মাথা নাড়ি আমি। ‘অনেক ভেবেছি ব্যাপারটা নিয়ে। এখন মনে হয় ব্যাখ্যা করতে পারব।’

‘কিসের ব্যাখ্যা?’

‘কেন দেখছি ওদেরকে। মনে হয়, আমাদের সাহায্য প্রয়োজন ওদের। কোনোভাবে যদি সাবধান করতে পারি, অপঘাতে মরার হাত থেকে বেঁচে যাবে ওরা।’

‘কিন্তু রবিন, ওরা তো আমাদের দেখতে—এমনকি শুনতেও পাচ্ছে না!’ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে এলিজা।

‘একটা উপায় বোধ হয় আছে...।’ সটান উঠে পড়লাম কাউচ ছেড়ে। ‘চল, ট্রাই করে দেখি।’

চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা বেইসমেন্টে। মৃদু একটা খসখস আওয়াজ আসছে কানে...ফার্নেসের পেছন থেকে...

দেখা গেল আব্রাহামকে। হাতে রেঞ্চ। পাইপ টাইট করছে ওটা দিয়ে।

‘তা, কী করব আমরা?’ অধৈর্য হয়ে পড়েছে বব।

জবাব না দিয়ে পরে ফেললাম মুখোশটা। ...হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি ওদের। আগে যে রকম দেখেছিলাম। অপর্যাপ্ত আলোর কারণে পরিষ্কার নয় চেহারা।

এবার আর ডাকতে গেলাম না। বদলে চলে গেলাম কাছে। ধরতে চেষ্টা করলাম এক ছেলের কাঁধ। শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেল হাতটা। এক মেয়ের চুল ধরতে চাইলাম। এবারও একই ঘটনা।

বিরক্ত হয়ে খুলে ফেললাম মুখোশটা। হতাশ চোখে চাইলাম তিন বন্ধুর দিকে।

‘অন্য কোনো উপায় আছে নিশ্চয়ই!’ বললাম জোর দিয়ে। আপনা-আপনি চোখ চলে গেল তালা দেওয়া ক্লজিটটার দিকে। কেন জানি মনে হচ্ছে, উপায়টা পাওয়া যাবে ওখানেই। ভেতরে কী আছে, কে জানে! এখানে আসার পর থেকেই তালা মারা দেখছি ওটা।

হ্যাঁচকা এক টানে ভেঙে খুলে এলো আদ্যিকালের তালা।

ক্লজিটের হাতল ধরে টান দিল রিয়া। ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজে খুলে এলো পাল্লাটা।

চোখ সরু করে তাকিয়ে আছি চারজন।

‘পুরনো কাপড়!’ আশাহত শোনাল এলিজার গলা। ‘বোঝাই একেবারে।’ লেসের কলারের মলিন এক ব্লাউজ তুলে ধরল।

হাঁচি মারল বব। ‘জুতাগুলো দেখ! ফিতার বদলে বোতাম লাগানো।’

তক্ষুনি খেয়াল হলো আমাদের। আরে, এ রকম পোশাকই তো পরে আছে ছেলে-মেয়েগুলো!

‘নিশ্চয়ই ওদের জিনিস এগুলো!’ মন্তব্য করল রিয়া।

এরই মধ্যে লেসওয়ালা ব্লাউজটা টি-শার্টের ওপর পরে ফেলেছে এলিজা। ডলে ডলে সমান করার চেষ্টা করছে কাপড়ের ভাঁজ। ‘পরলে হয়তো যোগাযোগ করা যাবে ওদের সঙ্গে।’ আইডিয়া দিল।

কথাটা মনঃপূত হলো আমার। সাদা কলারের শার্ট আর হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ব্যাগি প্যান্ট বেছে নিলাম পরার জন্য। বব নিয়েছে কালো একটা জ্যাকেট।

‘মুখোশটা পরা যাক এবার।’ পরামর্শ দিল ধূসর ফ্রক পরা রিয়া।

‘না না, দাঁড়া!’ বাধা দিয়ে উঠল এলিজা। ‘ঠিকভাবে করতে হবে সব কিছু।’ বোর্ডগেমটা বের করে বিছাল সে মেঝেতে। ‘আয়, খেলতে শুরু করি ওদের মতো।’

বসলাম বোর্ড ঘিরে। মিনিট কয়েক খেলার পর হাতে তুলে নিলাম মুখোশটা। পরতে যাচ্ছিলাম, থেমে যেতে হলো আব্রাহামের গলার আওয়াজ শুনে।

‘যেমন খুশি তেমন সাজো খেলা হচ্ছে নাকি?’ সহাস্যে বলল মিস্ত্রি। ‘ভালো। তবে ডিস্টার্ব কোরো না যেন আমাকে!’

মুখের সামনে তুলে ধরলাম মুখোশটা। কিন্তু না, পরা হলো না এবারও।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিস্ফোরিত হলো ফার্নেসটা! ছিটকে পড়লাম শকওয়েভের ধাক্কায়! খাবি খাচ্ছি শ্বাস নেওয়ার জন্য! প্রচণ্ড যন্ত্রণা শরীরে!

মড়মড় একটা আওয়াজ শুনে সভয়ে চাইলাম ছাদের দিকে।

ফেটে যাচ্ছে সিলিংয়ের একটা বিম...ভেঙে পড়ছে আমাদের ওপর!

হাহাকার বেরিয়ে এলো বুকের গভীর থেকে।

সত্যটা বুঝতে পারছি এখন!

ভুল করেছি আমরা! ভুল বুঝেছি আগাগোড়া!

আমরাই ওই ছেলে-মেয়েগুলো!

মুখোশটা অতীত দেখায়নি আমাদের, দেখিয়েছে ভবিষ্যৎ!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা