kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

হরর ক্লাব

যে বটের ডাল কেউ ভাঙে না

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যে বটের ডাল কেউ ভাঙে না

৫০০ বছরের পুরনো বট। নিচে কাঁচা রাস্তা। বহুকাল এই পথ মাড়িয়েছে গাঁয়ের লোকেরা। পাশের কয়েক শ গজ দূরে পাকা রাস্তা। গাড়ি চলে সে পথে। কিন্তু বটের তলা দিয়ে যেতে পারে না গাড়ি। গাড়ির ছাদে আটকে যায় ডালপালা। ডালপালা ছেঁটে দিলেই তো হয়! কিন্তু কার এত সাহস! যে-ই ডাল ভাঙবে, তার ভাগ্যে নেমে আসবে শনির দশা! মানিকগঞ্জের ধামরাইয়ের শাইট্টাগ্রাম এলাকার ভূতুড়ে এ পথের গল্প শোনাচ্ছেন আতিফ আতাউর

 

ঠিকাদার তো দূরের কথা, গ্রামের ক্ষমতাবান লোকেরাও এ বটের গায়ে হাত তোলার সাহস দেখাননি কোনো দিন! আর তাই ছবিতে স্পষ্ট—বটগাছের পাশ দিয়েই বানানো হয়েছে নতুন বাইপাস রাস্তা।

পাশের পুকুর আর ফসলি ধানের জমিতেও আগ্রাসন চালিয়েছে এ বটে ডালপালা। তাতেও রা নেই জমি কিংবা পুকুর মালিকদের। যেন ছায়া যত দূর, বটের মুলুকও তত দূর!

এমন এক সম্ভ্রান্ত বটগাছকে ঘিরে আছে হাজারো কল্পকাহিনি। বয়স কত কেউ জানে না। শাইট্টা গ্রামের বটগাছটি দেখতে ছুটে আসে অনেকে, দূর-দূরান্ত থেকে। কবে কিভাবে জন্ম নিল এ মহিরুহ, সে খবর নেই গ্রামের বয়স্কদের কাছেও। শতবর্ষী গোপাল চন্দ্র সাহা জানালেন, মহিন ব্যাপারী নামের এক জমিদার নিজের জমিতে রোপণের সময় একটি বটকে মেয়ে আর পাকুরগাছকে ছেলে সাজিয়ে বিয়ে দেন। একটু দূরত্ব রেখে গাছ দুটি রোপণ করা হলেও একসময় গাছ দুটি আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে যায়। এরপর একত্রে বেড়ে ওঠে ‘ওরা’। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা একসময় মন্দির গড়ে তোলে গাছটির নিচে। শুরু হয় পূজা।

শাইট্টার পাশের গ্রামের বারেক শিকদার জানালেন, এই গাছের ডাল কাটা তো দূরের কথা, কেউ যদি পাতাও কুড়িয়ে নেয় সে-ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ নিয়ে একটা গল্প শোনা গেল তার কাছে। গ্রামের এক নারী গাছের নিচে পড়ে থাকা কয়েক ঝুড়ি শুকনো পাতা কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। প্রথম দিন বটের পাতা পুড়িয়ে ভাত-মাছ রেঁধে খেয়েদেয়ে স্বামী-ছেলেকে নিয়ে ঘুমিয়েছেন। পরদিনই তিনজনের পেট খারাপ। ডাক্তার দেখালেন। অসুখ সারে না। শেষমেশ লোকমুখে শুনে বটের বাকি পাতা ফিরিয়ে দিয়ে গাছের নিচে পূজা দিলেন। পেলেন রোগ থেকে মুক্তি।

একই গল্প শোনালেন গ্রামের নবম শ্রেণির হাবিব রানা। বটগাছের কাছেই তাদের বাড়ি। সে জানাল, একবার একজন একটি ডাল ভেঙেছিল বলে জ্বরে পড়ল। ওষুধ খেয়েও জ্বর সারল না। বাজার থেকে খোরমা কিনে গাছের নিচে পূজা দিয়ে রক্ষা পেল সে। তার চাচাতো ভাই শোনাল আরো ভয়ানক ঘটনা। রাতে বাড়ি ফিরছিলেন পশ্চিমপাড়ার মামুন মিয়া। গাছের নিচে গিয়ে দেখেন একটি বড় ছাগল দাঁড়িয়ে আছে। চিনতে পারলেন ছাগলটাকে। তাদের পাশের বাড়ির বারেক চাচার ছাগল। ভাবলেন, পথ হারিয়ে এসেছে। বাড়ি গিয়ে চাচাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ছাগলের কথা বললেন। বারেক চাচা গোয়ালঘরে ঢুকে দেখেন, তাঁর ছাগল দড়ি দিয়ে বাঁধা। শুনে মূর্ছা গিয়েছিলেন মামুন।

গাছটির এমন অদ্ভুতুড়ে ঘটনার নেপথ্যে আছে আরো ঘটনা। গ্রামের দোকানি সন্তোষ চন্দ্র রায় জানালেন, অনেক বছর আগে গ্রামে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ট্রাকে করে বড় বড় যন্ত্র নিয়ে আসা হয়। গাছের নিচে এসে আটকে যায় ট্রাক। ট্রাকে থাকা লোকজন গ্রামের মানুষের নির্দেশ অমান্য করেই ডালপালা ছেঁটে দেয়। পরের কয়েক দিন আরো কয়েকবার ট্রাকটি গাছের নিচ দিয়ে আসা-যাওয়া করে। বাধ সাধল কাজ শেষে ফেরার দিন। বড় বড় যন্ত্র বোঝাই ট্রাকটির ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। গাছের নিচে যখন পৌঁছল, তখন সূর্য ডুবে গেছে। মেশিনপত্র আটকে যাওয়ার ভয় নেই। কিন্তু গাছের নিচে এসেই বন্ধ হয়ে যায় ট্রাক। ড্রাইভার যতই স্টার্ট দেন, ততবারই বন্ধ হয়ে যায়। যান্ত্রিক গোলযোগ ভেবে মিস্ত্রি আনা হলো। তাতেও স্টার্ট নেয় না। শেষমেশ গ্রামের মানুষের কথা মেনে বাজার থেকে সওদা কিনে গাছের নিচে পূজা দিতেই স্টার্ট নেয় ট্রাক।

এসব গল্পের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে এখনো গ্রামে ঘুরে বেড়ায় সিরাজ। তার গল্প শোনা গেল শ্যামল চন্দ্র রায় নামের গ্রামের এক বাসিন্দার কাছ থেকে। লোকটাকে নাকি কেউ পছন্দ করত না। দেখতে কুচকুচে কালো বলে লোকে ডাকত কালা সিরাজ। তবে সাহসী ছিল লোকটা। বটগাছের কোনো গল্পই বিশ্বাস করতেন না। এ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাজিও ধরেন একবার। রাতের বেলা বটগাছের গোড়ায় গিয়ে সারবেন প্রাকৃতিক কর্ম। সে রাতে কিন্তু তিনি সুস্থসবলভাবেই ফিরে এসে বাজির টাকা বুঝে নেন। পরদিন সকালে দেখা গেল, সিরাজের জিবটা কয়েক ইঞ্চি বেড়ে গেছে! সেই থেকে আজও সে জিব বের করে ঘুরে বেড়ায়। ভালো করে কথাই বলতে পারে না। খেতেও পারে না। গল্প শুনে বিশ্বাস করতে মন চাইল না। তখন সন্তোষের দোকানে থাকা গোটা দশেক নারী-পুরুষ দিলেন সাক্ষ্য। তাঁদের কথায় জানা গেল, গাছের গোড়ায় গিয়ে ক্ষমা চাইলেও কাজ হয়নি। বটগাছের নিচে গিয়ে গড়াগড়ি করে কেঁদেছেনও নাকি। তবু জিব তার ছোট হয়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা