kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

বিজ্ঞান

ব্লবলোজির নাম শুনেছ?

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ব্লবলোজির নাম শুনেছ?

ওয়াসাবি রিসেপ্টর প্রোটিনের আণবিক গঠন দেখতে এমনই বিদঘুটে

কোষ পর্যবেক্ষণের জন্য কিছু যন্ত্র আছে। কিন্তু সেগুলো কোষের ভেতরকার জটিল সব কাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারছিল না। কিছু অণুবীক্ষণযন্ত্র তো পারমাণবিক পর্যায়ের বস্তু দেখতেই পায় না। তাই বলে খুদে জগতের ছবি কি দেখতে পাব না আমরা? তাই বিজ্ঞানীরা বের করলেন কোষের ভেতরে হানা দিয়ে রঙিন ছবি তোলার পদ্ধতি। যার নাম ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ। এরই আরেক নাম ব্লবলোজি। লিখেছেন কাজী ফারহান পূর্ব

 

শুধু ছবি নয়, ব্লবলোজি প্রযুক্তিতে ভিডিও করাও যায়। কিভাবে এলো এই ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ? এর ব্যবহারটাই বা কী? চলো ঝাঁপ দেওয়া যাক আলোচনায়।

আলোক অণুবীক্ষণযন্ত্রের সীমাবদ্ধতা

কলেজের জীববিজ্ঞান গবেষণাগারে নিশ্চয়ই অণুবীক্ষণযন্ত্র দেখেছ। সেগুলোই আলোক অণুবীক্ষণযন্ত্র। এরা কিন্তু পুরোপুরি কাজের না। সীমাবদ্ধতা আছে। লক্ষ্যবস্তু যখন ৫০ ন্যানোমিটার ব্যাস হয়ে যায়, তখন এটা অণুবীক্ষণযন্ত্রে ধরা পড়বে না।

আলোক অণুবীক্ষণযন্ত্র মানে এখানে আলোর ব্যাপারস্যাপার আছে। আলোর ফোটন কণা বা ‘শক্তি প্যাকেট’গুলো কোনো বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পড়ে, তখন আমরা সেটা দেখি। কিন্তু কিছু বস্তু ফোটনের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়েও ছোট হতে পারে। পরমাণুর ওপর ফোটন পড়ে সেটা প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পরমাণুর স্পষ্ট কোনো বিম্ব তৈরি করতে পারে না।

একটা বুদ্ধিমান পিঁপড়াকে একটা সরু গর্ত পর্যবেক্ষণ করতে দিলে সে গর্তের আকার-আকৃতি সম্পর্কে ভালো ধারণা নিতে পারবে। একই কাজ একটা ভালুককে করতে দিলে সে মোটেও পারবে না। তাই জিকা ভাইরাসের মতো অতি ক্ষুদ্র বস্তু দেখতে গিয়ে ফেল মারে আমাদের পরিচিত আলোক অণুবীক্ষণযন্ত্র। এ জন্য বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বিকল্প খুঁজছিলেন। ছোট জিনিস দেখার জন্য ছোট কিছুই নিক্ষেপ করা চাই! তাই আনর্সট রুস্কা নামের এক জার্মান বিজ্ঞানী ছুড়ে মারলেন ইলেকট্রন! আর এভাবেই ১৯৩৩ সালে ক্ষুদ্র থেকেও ক্ষুদ্রতর বস্তু দেখার যন্ত্র আবিষ্কার করেন তিনি। ফিজিকস ডট ওহাইও স্টেট ডটএডু থেকে জানা যায়, ইলেকট্রনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য এক মিটারের এক হাজার কোটি ভাগের এক ভাগ। প্রায় পরমাণুর সাইজের। তাই ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে আরামসে ক্রিস্টালের ভেতরে পরমাণুর আকার পর্যবেক্ষণ করা যায়। আর বেচারা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ইলেকট্রনের চেয়ে পাঁচ হাজার গুণ বেশি বলে পরমাণু পর্যায়ের ক্ষুদ্র বস্তু দেখতে আমরা আলোক অণুবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করতে পারি না।

সায়েন্সম্যাগ ডট অর্গ ওয়েবসাইট থেকে জানা গেল, ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ লক্ষ্যবস্তুকে এক কোটি গুণ বিবর্ধিত করতে পারে। জেনে রাখো, এই ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কার করে রুস্কা ১৯৮৬ সালে নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন।

ব্লবলোজি ওরফে ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ পদ্ধতিতে তোলা একটি ব্যাকটেরিয়ার ছবি

আরেক বেচারা

এবার জানা যাক আরেকটা প্রযুক্তি সম্পর্কে। এর নাম এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি। এটি আলোক অণুবীক্ষণযন্ত্র থেকে উন্নত। এটি দিয়ে পরমাণু পর্যায়ের বস্তুর ছবি তোলা সম্ভব। এটি আলো বা ইলেকট্রনের বদলে এক্স-রে তথা রঞ্জনরশ্মি ব্যবহার করে। দেহের ভেতরের হাড়ের ছবি তুলতে এ রশ্মির অবদান অনেক। ওই এক্স-রেটা হাড়ের সঙ্গে বাড়ি খেয়ে প্রতিফলিত হয়ে হাড়ের চিত্র তৈরি করে। ঠিক সেভাবেই আমাদের এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি ক্রিস্টালের মধ্যে অবস্থিত পরমাণুর অবস্থান, সজ্জা ইত্যাদির একটি চিত্র উন্মোচিত করে।

প্রোটিন অনেক ধরনের হয়। এর একটি ডাটাব্যাংকও আছে। সেখানে এক লাখ ৪০ হাজার প্রোটিনের গঠনের ছবি আছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই ১৯১২ সালে আবিষ্কৃত ওই যন্ত্র দিয়ে তোলা হয়েছে।

এ যন্ত্রেরও আছে সীমাবদ্ধতা। প্রথমত, যে জিনিসটা তুমি দেখতে চাও, তাকে অবশ্যই সুসজ্জিত ক্রিস্টালে পরিণত করে নিতে হবে। কিন্তু বড় আণবিক ভরের অণুগুলোকে ক্রিস্টাল বানানো কঠিন। বিশেষ করে কোষ ঝিল্লির প্রোটিনকে তাদের আকার এবং দ্রবীভূত হওয়ার দুর্বলতার কারণে ক্রিস্টাল বানানো আরো কঠিন। এরা একেবারে যেন দুষ্ট ছেলের দল! লাইন ধরে সুসজ্জিত হওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাদের নেই। এ ছাড়া আরেকটা বড় সমস্যা হলো, তুমি এটা দিয়ে একটা কোষের কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তের স্থির অবস্থার ছবি পাবে। অর্থাৎ ভিডিও দেখার সুযোগ নেই।

এবার শীতল প্রযুক্তি!

সব প্রযুক্তি যখন বিজ্ঞানীদের খুঁতখুঁতে মনকে হতাশ করে চলেছে, তখন এলো বিশেষ প্রযুক্তি। আর্নসট রুস্কার ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপেরই একটি উন্নত সংস্করণ ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ। শুরুর দিকে এটি কালির ফোঁটার মতো ছবি তৈরি করত। তাই ঠাট্টা করে একে বলা হতো ব্লবলোজি। এখন এর ঠাট্টার জো নেই। এখন এই ব্লবলোজি হয়ে গেছে আল্ট্রা হাই ডেফিনেশন থ্রিডি ভিডিওলজি।

এটি আবিষ্কারের জন্য ২০১৭ সালে জ্যাক্স ডুবোচেট, জোয়াকিম ফ্র্যাংক এবং রিচার্ড হ্যান্ডারসন রসায়নে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার জেতেন। এটিও আলো বা এক্স-রের বদলে ছুড়ে মারে ইলেকট্রন। তবে অন্যান্য আধুনিক মাইক্রোস্কোপের সঙ্গে এর অনেক পার্থক্য আছে। যেমন এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে প্রোটিনগুলোকে ক্রিস্টাল বানানো কঠিন। তা ছাড়া সাধারণ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে ইলেকট্রন ছোড়া হয় বলে সেটি লক্ষ্যবস্তু তথা জৈব অণুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। তাই বিজ্ঞানীরা ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপিতে লক্ষ্যবস্তুকে শীতল করে একেবারে বরফ বানিয়ে ফেলেন।

মাইক্রোস্কোপ মাস্টার ডটকম সাইট থেকে জানা যায়, এ ক্ষেত্রে নমুনা কোষকে তরল ইথেনে দ্রুত ডুবিয়ে আবার তুলে ফেলা হয়। নমুনাটা যাতে স্থিতিশীল থাকে, সে জন্য পানি বা লবণের দ্রবণ ব্যবহৃত হয়। ইথেনে ডোবালেই নমুনাটি বরফ হয়। এতে ইলেকট্রনের আঘাতে ক্ষতির শিকার হয় না ওই জৈব অণু। এরপর এর ওপর প্রচণ্ড গতিতে ইলেকট্রন নিক্ষেপ করা হয়, যার প্রতিফলন ধরা পড়ে বিশেষভাবে তৈরি ক্যামেরায়। এই ক্যামেরা ইলেকট্রন থেকে প্রাপ্ত ছবিকে হাই রেজল্যুশনের ছবিতে পরিণত করে। এভাবে দ্রুত তোলা লক্ষাধিক ছবিকে জোড়া লাগিয়ে একটি থ্রিডি ছবি তৈরি করা হয়।

এমনকি এ পদ্ধতিতে অতিক্ষুদ্র বস্তুর ভিডিও রেকর্ডও করা যায়।

ফ্লু ভাইরাসের ত্রিমাত্রিক ছবি

ব্লবলোজির ব্যবহার

জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে মাইক্রোস্কোপটি। এর সম্পর্কে লন্ডনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের ড. পিটার রোসেন্থাল বিবিসিকে বলেছেন, ‘জীববিজ্ঞানের গবেষণায় এটিই এখনকার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয়। এটাকে রেজল্যুশন বিপ্লবও বলা যায়। প্রতিদিন ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে থ্রিডি ছবি তৈরির সংখ্যা বেড়েই চলেছে।’

এ মাইক্রোস্কোপ থেকে প্রাপ্ত ভিডিও বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন অণুজীবের এমন নিখুঁত দৃশ্য দেখাচ্ছে, যা কেউ আগে দেখেনি। আগে আমরা কোষের ভেতরে কে কী করছে, তা নিখুঁতভাবে দেখতে পেতাম না। এখন এই মাইক্রোস্কোপ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে কে ভালো, কে মন্দ; আর কাকে কড়া নজরদারিতে রাখতে হবে। এর ফলে আরো ভালো ওষুধ তৈরির উপায় বের হচ্ছে। বিভিন্ন ফ্লু ভাইরাস, এইচআইভি, আলঝেইমারস, পারকিনসনস ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায়ও বিশেষভাবে সাহায্য করছে এ প্রযুক্তি।

ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের ফ্লু রিসার্চার লেসলি কাল্ডার বলেন, আগে কোষের ভেতরে কী হচ্ছে তা কেটে দেখতে হতো অথবা শুধু বাইরের অংশ দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। এই মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে সবই দেখা যাচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বায়োকেমিস্ট্রি ও বায়োফিজিকসের অধ্যাপক ইফান চেং ওয়াসাবি রিসেপ্টর নামের এক ধরনের প্রোটিনের কথা জানিয়েছেন। এটি ওয়াসাবি এবং পেঁয়াজের স্বাদ উপলব্ধি করার কাজে সাহায্য করে। আবার এটি দেহের ব্যথা উপলব্ধির সঙ্গেও জড়িত। বিজ্ঞানীরা প্রোটিনটি সম্পর্কে আগে থেকে জানলেও এর গঠন জানতেন না। ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের বদৌলতে পাওয়া গেছে ওয়াসাবি রিসেপ্টরের থ্রিডি ছবি। ফলে উন্নতমানের ব্যথানাশক ওষুধ আবিষ্কারও ত্বরিত এগিয়ে যাচ্ছে।

ব্রাজিলে ছড়িয়ে পড়া জিকা ভাইরাসেরও হাই রেজল্যুশনের ত্রিমাত্রিক ছবি পাওয়া গেছে এ মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে। এতে ভাইরাসটি প্রতিরোধের পথ অনেকটা সুগম হয়েছে।

 

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা