kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

মিউজিক

কে-পপ শুনছ?

গ্যাংনাম স্টাইলের কথা ভুলে যাওনি নিশ্চয়ই। কোরীয় সংগীতশিল্পী সাই তাঁর এক গানেই অনেক রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন। কোরীয় পপসংগীতটি যে ধারা তৈরি করেছিল, ওটাই কে-পপ। গ্যাংনাম স্টাইল বলতে বলতেই কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশ কোরীয় এই পপের সঙ্গে পরিচিত হয়। যার খানিকটা স্পর্শ লেগেছে আমাদের মধ্যেও। লিখেছেন মুসাররাত আবির জাহিন

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কে-পপ শুনছ?

হেভেন্স ল ডান্স গ্রুপের সদস্যরা

আগেই বলে রাখি, কে-পপের শুরু কিন্তু গ্যাংনাম স্টাইলেরও আগে। প্রথম থেকেই এতে ছিল পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব। ১৮৮৫ সালের দিকে হেনরি আপেনজিলার নামের এক ব্যক্তি আমেরিকান ও ব্রিটিশ লোকসংগীতগুলো কোরিয়ান ভাষায় রূপান্তর করে স্কুলের শিশুদের শেখাতেন। মূলত সেখান থেকেই শুরু। তবে এ ধারার স্বাতন্ত্র্য হলো—এতে একই সঙ্গে রক, এক্সপেরিমেন্টাল, আর অ্যান্ড বি, ওয়েস্টার্ন পপ ও হিপহপের সমন্বয় রয়েছে। আবার কে-পপে একটুখানি র‌্যাপ না থাকলেও চলছে না।

নব্বইয়ের দশকে আধুনিক কে-পপের সূচনা ঘটে। ১৯৯২ সালে সিও তাইজি অ্যান্ড বয়েজ নামের তিন সদস্যের একটি কে-পপ ব্যান্ড আত্মপ্রকাশ করে। কোরিয়ান সংগীতে বড় পরিবর্তন আনে ওরা। সিও তাইজির দেখানো পথেই ১৯৯৬ সালে প্রথম আইডল বয়ব্যান্ড এইচওটির অভিষেক। এই ব্যান্ডও সবার মন জয় করে। ১৯৯৭ সালে আসে অল গার্লব্যান্ড এসইএস। ২০০০ সাল থেকে কে-পপ ধারার জনপ্রিয়তার কারণে টিভিএক্সকিউ, বিগব্যাং, বোয়া, শাইনি, মামামো, গট সেভেন, মোমোল্যান্ড, রেড ভেলভেট, আইকন, টোয়াইস, গার্লস জেনারেশন, সুপার জুনিয়র, বিটিএস, ব্ল্যাক পিংকসহ আরো অনেক কে-পপ ব্যান্ডের আগমন ঘটে। বর্তমানে চার শর বেশি কে-পপ ব্যান্ড ও সলো আর্টিস্ট রয়েছেন। সুম্মি, তেইমিন, জেনি কিম, পার্ক বমসহ আরো অনেকেই সলো আর্টিস্ট হিসেবে এখন খ্যাতির চূড়ায়।

কোরিয়ার অর্থনীতিতেও কিন্তু কে-পপ আলোচনায়। প্রিয় ব্যান্ডের কনসার্ট দেখতে বিদেশ থেকেও ভক্তরা দক্ষিণ কোরিয়ায় যাচ্ছে এখন। প্রতিবছর নতুন করে এক শরও বেশি কে-পপ গ্রুপ আসছে। এর মধ্যে টিকে থাকতে পারে মাত্র ৫ শতাংশের মতো। তবে জাপান, চীন, থাইল্যান্ড, এমনকি বিলবোর্ড হট ১০০ চার্টেও চলে আসে তাদের নাম!

কোরিয়ান ভাষা না বুঝলেও বাংলাদেশে কে-পপের ফ্যানবেজ বড় হচ্ছে ইদানীং। জনপ্রিয়তার নেপথ্যে কে-পপের ফ্যাশন ও চোখধাঁধানো নাচও কিন্তু কম ভূমিকা রাখছে না!

কে-পপের খুঁটিনাটি

কে-পপ গানের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে। গ্রুপগুলো তাদের গানকে সাজায় যুগের নামে। প্রতিটি গান ও অ্যালবামের পেছনে থাকে একটি করে গল্প। গল্পটাকে আবার ‘এরা’ বলা হয়। যেমন বিটিএসের আছে উইংস এরা, ডার্ক অ্যান্ড ওয়াইল্ড এরা, এক্সো’র আছে উলফ এরা, গ্রোউল এরা, এনসিটির চুইংগাম এরা, চেরি বম্ব এরা ইত্যাদি।

আবার প্রতিটি কে-পপ গ্রুপ তাদের প্রথম থেকে যে গল্প নিয়ে কাজ শুরু করে, শেষ পর্যন্ত সেই গল্পের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে। প্রিয় ব্যান্ডের নতুন গান আসার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরা সেই গল্পের সূত্র মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটা অনেকটা পাজলের টুকরো মেলানোর মতোই।

অনেক কে-পপ গ্রুপের আবার সাব-গ্রুপ আছে। ব্যান্ডের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে একই এজেন্সির অধীনে আরো একটা গ্রুপ খোলাকে সাব-ইউনিট বলে। যেমন—এক্সোর সাব-ইউনিট হলো ‘এক্সো সিবিএক্স’, এনসিটির সাব-ইউনিট ‘এনসিটি ১২৭’, এনসিটি ইউ, এনসিটি ড্রিম।

কে-পপ আইডল হয় তারাই, যারা কোনো এন্টারটেইনমেন্ট এজেন্সির অধীনে কাজ করে এবং নাচ-গান ও বহু ভাষায় পারদর্শী। বলতে গেলে কোরিয়ান ছেলে-মেয়েদের স্বপ্ন এখন কে-পপ আইডল হওয়া। তবে এতে পরিশ্রম করতে হয় ঢের। ১০-১২ বছর বয়সীদের অডিশনের মাধ্যমে বাছাই করে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। এরপর চলে নাচ, গান, র‌্যাপ ও ভাষা শিক্ষা।

কে-পপ গ্রুপের ভক্তদেরও আবার নাম আছে। বিগব্যাং, গার্লস জেনারেশন, এক্সো, বিটিএস, ব্ল্যাক পিংক, গট সেভেন, আইকন ব্যান্ডের ফ্যানদের ডাকা হয় ভিআইপি, সোনে, এক্সোল, আর্মি, ব্লিংক, আই গট সেভেন, আইকনিক নামে।

 

আমাদের কে-পপ

বাংলাদেশেও কে-পপের ভক্তের সংখ্যা কম নয়। আজকাল অনেকে কে-ডান্সও করছে। এমন একজন হলো মোহাম্মদপুর সরকারি বালক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র সালমান ফারুক। কোরীয় পপ ডান্সার সে। কেন এটা শিখল জানতে চাইলে সে বলল, ‘২০১৭ সাল থেকে আমি কে-পপ শোনা শুরু করি। বিটিএসের গান শুনতে শুনতেই তাদের কোরিওগ্রাফিটা মনে ধরে। তারপর মনে হলো, নিজেও এমন কিছু চেষ্টা করে দেখি।’

এখন সালমান যুক্ত আছে হেভেন্স ল ডান্স গ্রুপে। এ গ্রুপে কে-মিট ৪.০সহ গ্রুপ ও সলো হিসেবে আরো বেশ কিছু জায়গায় পারফর্ম করেছে ও। তার গ্রুপ ২০১৮ সালের কে-পপ ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভালে রানার্স-আপ হয়। সেই সঙ্গে কে-ফেস্ট ২০১৮-তে সালমান পায় ফ্যান্টাস্টিক পারফরমারের তকমা। নাচ কোথাও শেখা হয় নাকি জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল, ‘প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নাচ শিখিনি। ইউটিউবে ভিডিও দেখেই চর্চা চলে।’

বাংলাদেশের কে-পপ কমিউনিটিতে বিডি কে ফ্যামিলি পরিচিত নাম। তারা ঢাকা কে-মিট ও বিডি কোরিয়ান ফেস্টিভাল নামের দুটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে।

কে-পপের কিছু মন্দ দিকও আছে। কে-পপ আইডল হতে গেলে দরকার দারুণ পরিশ্রম। কোরীয়দের অনেকে তো কে-পপ হতে গিয়ে রীতিমতো ঘর-সংসারও ছেড়েছে। পরিবর্তন আনতে হয় লাইফস্টাইলে। অনেক সময় পড়াশোনাও থেমে যায় মাঝপথে। অনেকে সার্জারি করে বদলে দেয় চেহারাও। একটানা প্র্যাকটিস, কনসার্ট করার ফলে শিল্পীরা প্রায়ই কাজের মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়! এমনকি এজেন্সিরাও তাদের ওপর চালায় মানসিক অত্যাচার। এর মধ্যে কে-পপ গ্রুপগুলো তাদের নতুন অ্যালবাম আসার পর ওয়ার্ল্ড ট্যুরে যায়। সেখানেও চলে প্র্যাকটিস। দেশে দেশে ভ্রমণ করতে গিয়ে নিতে পারে না পর্যাপ্ত বিশ্রাম।

এত কিছুর পরও কদর কমছে না। অনেক কে-পপ আর্টিস্ট আবার নিজেদের নানা সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত রেখেছেন। ইউনিসেফের সঙ্গে লাভ মাইসেলফ নামের একটি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে বিটিএস। যেখানে শিশু-কিশোরদের প্রতি সহিংসতা রক্ষার্থে তারা কাজ করছে। নিজেদের ফ্যানবেজকে কাজে লাগিয়ে তহবিল সংগ্রহেও কে-পপ শিল্পীরা অনেক এগিয়ে।

কেন শুনি কেন শুনি না

দ্বাদশ শ্রেণির তাসফিয়ার কাছ থেকে জানা গেল, বিটিএসের গান শুনে সে বুঝতে পেরেছে কিভাবে নিজের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে হয়। প্রমি তালুকদার বলল, ‘একজন আইডল একই সঙ্গে নাচ-গান-র‌্যাপে সমান পারদর্শী! সে যে অনেক প্রতিভাধর, এতে সন্দেহ নেই। প্রথম কে-পপ গান শোনার পর মনে হয়েছিল, এমন তারকাকেই তো খুঁজছিলাম!’

দ্বাদশ শ্রেণির আয়শার মতে, ‘কে-পপ গানগুলোর লিরিক একটু আলাদা। বারবার শুনতে ইচ্ছা করে।’ একই কথা শোনা গেল একাদশ শ্রেণির মিলির কাছ থেকেও। সে বলল, ‘কোরীয় গানের লাইনগুলো বেশ অর্থবহ।’

যদিও আফসানার মতে, কে-পপ গানগুলো সব সময়ই একই রকম হয়। বৈচিত্র্য চোখে পড়ে না। সপ্তম শ্রেণির সামির মনে করে, ‘কে-পপ আইডলদের অতিরিক্ত সাজসজ্জা তাদের সত্যিকারের চেহারা ও সৌন্দর্য ঢেকে দিয়েছে।’

এই ফাঁকে বলে রাখি, আমি নিজেও কিন্তু কে-পপ ফ্যান! প্রথম একটি গান ৩০ সেকেন্ড দেখেই ভিডিওটা বন্ধ করে দিই। কিন্তু এরপর একটি গানের লিরিকস-ভিডিও দেখে মনে হলো, বাহ! বেশ তো! বিতর্কিত সাজসজ্জা ও বেশভূষার জন্য কে-পপের সমালোচনা করা হলেও দিনের শেষে এটা সংগীতের একটি ধারা। বিতর্ক তো চলতে থাকবেই, আমরা না হয় বিতর্ক থেকে দূরে সরে কে-পপের মজার জগত্টায়ই ঢু মেরে আসি। বলা তো যায় না, কেউ একজন হয়তো অনুপ্রাণিত হয়ে আবিষ্কার করে ফেলবে বি-পপ!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা