kalerkantho

বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে

পাহাড়ে আগন্তুক

মো. শোআইব খান   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পাহাড়ে

আগন্তুক

অঙ্কন : প্রসূন হালদার

মাথা ঝিমঝিম করছে শাহাদের। স্টেশনে একটা ছোটখাটো দোকানের সামনে চটপটে এক লোককে দেখতে পেল। ব্যাটা পান চিবুচ্ছে। ‘জামশেদ চৌধুরীর বাড়ি চেনেন’—এমন প্রশ্নে জবাব পাওয়া গেল না। পানের পিক ফেলে মুখ খুলবে খুলবে ভাব লোকটার। হঠাৎ মনে পড়ল শাহাদের, চিঠিতে জামশেদ জানিয়েছিল, জলসা স্টোরের কাছে তার দারোয়ান আজমকে পাঠাবে। লোকটার ছবিটবি কিচ্ছু দেয়নি। শুধু বলেছে, কথায় কথায় দারোয়ান নাকি ইয়েস স্যার বলে।

‘ইয়েস স্যার, চিনি।’ পিক ফেলে মুখ খুলল লোকটা। এক ফাঁকে দোকানের নামটা পড়ে নিশ্চিত হলো শাহাদ।

মালপত্র জিপ গাড়িতে তুলে দিল আজম। বাদলা দিন। লম্বা পথ। বালাগঞ্জে যত দ্রুত রওনা হওয়া যায় ততই ভালো। জিপে ওঠার একপর্যায়ে ফুটপাতে চোখ আটকে গেল শাহাদের। গেরুয়া পোশাকের এক বুড়ো তাবিজ-কবচ নিয়ে বসে আছে রাস্তায়। পাশের কাগজের বোর্ডে লেখা—‘ভূতের সাথে যুদ্ধ ৩০ টাকা, ভূতের সাথে কথাবার্তা ৫০ টাকা।’ ‘খাস্তা ফকির। এখানে বেশ নামডাক স্যার।’ পেছন থেকে জানাল আজম।

‘তার মানে...।’

‘মানে স্যার, যেটা ভাবতাছেন, সেটা না। সিলেট ভূত-পরিদের আস্তানা না হইলেও মানুষজনের পেট ব্যথা আর বালামুসিবতের অভাব নাই। সব কিছুর লাইগা ফকিরের তীরে ছুইটা আসে।’

প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল শাহাদ। জামশেদের বাংলোয় না পৌঁছা পর্যন্ত ঢাকার হালচাল বকে গেল একতরফা।

 

এই অঞ্চলের মানুষজন সারওয়ার হোসেনকে খুব ভালো চেনে। বেশ কয়েকটা চা বাগানের মালিক। অঢেল সম্পদ। প্রিয়মুখ ছিলেন গ্রামে। দুই বছর আগে মারা যাওয়ার পর তার একমাত্র ছেলে জামশেদ এখন সব কিছুর দায়িত্বে। কদিন পরেই তার বিয়ে। গোটা গ্রামে উত্সব উত্সব আমেজ। বন্ধু শাহাদের আগমন সে উদ্দেশ্যেই।

দুপুরের খাবার সাঙ্গ হতেই আড্ডা শুরু। বিকেলের উষ্ণ আলো ঘনিয়ে আসছে। তবু পনেরো বছরের স্মৃতিচারণা থামার নয়। এদিকে জামশেদেরও জ্বর জ্বর লাগছে। সন্ধ্যা নামতেই দুজন ফিরে এলো বর্তমানে।

‘ভূতত্ত্ব নিয়ে পড়ছিস। ভালো। বাংলোর পূর্ব-দক্ষিণে ঢিবি পাহাড়ের অভাব নেই। আজ থাক, কাল শরীর ভালো থাকলে গাঁয়ের কাউকে নিয়ে ঘুরে আয় ওদিকটা। তোর গবেষণার কাজে আসবে।’

‘তুই কাল থাকবি না এখানে?’ জানতে চাইল শাহাদ।

‘নাহ। বিয়ে বলেও রক্ষে নেই। সব সামলাতেই হচ্ছে। কালকের ফাইনাল কাজ সেরে তবেই ফ্রি।’ স্মিত হেসে বলল জামশেদ, ‘তোকে কিন্তু তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে। বিয়ের দিন নাচতে হবে!’

 

পরদিন সকালে জামশেদের দেখা পেল না। বেলা করে উঠেছে শাহাদ। জ্বর কিছুটা কমে এলেও দেহে ক্লান্তির রেশ কাটেনি। বাংলোতে যে কজন কাজের লোক ছিল, তারাও যার যার কাজে বেরিয়ে পড়ল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। শরীর একটু ভালো লাগতেই তৈরি হলো শাহাদ। বাংলোর পূর্ব-দক্ষিণে বেরিয়ে পড়ল।

চারপাশ রোদহীন, ছায়ায় ঘেরা। দূর আকাশে এক চিলতে কালো মেঘ। গাছপালা-জঙ্গলের অভাব নেই। কাঁচা রাস্তা ধীরে ধীরে উঁচুতে উঠছে। সম্ভবত দুর্গম নয় জায়গাটা। ভাবল শাহাদ। অচেনা জায়গায় বেশিদূরে যাওয়ার ইচ্ছা নেই।

ঢাল বেয়ে একটা ছোটখাটো পাহাড়ে উঠল। লালরঙা মাটির আধিক্য সেখানটায়। মাটি ছাড়াও নিচের সবুজে ঘেরা নিরিবিলি পরিবেশ বাড়তি আনন্দ দিল শাহাদকে। দেখতে দেখতে চড়াই-উতরাই পেরোল। হাঁটতে থাকল অবিরাম। যেন সম্মোহিত হয়ে পড়েছে শাহাদ। সেই সম্মোহনের ছটা ভাঙল বিজলির শব্দে। হুড়মুড় করে নেমে এলো বৃষ্টির ধারা। গাছের আড়ালই ভরসা। পথ হারিয়েছে নিশ্চিত। বাংলোটা কত দূর কে জানে।

সামনে কার যেন অস্পষ্ট ছায়া। সাহায্যের আশায় তাকিয়ে থাকল শাহাদ। বৃষ্টির ছাটে এক ধরনের কুয়াশার মতো তৈরি হয়েছে। তাতে দৃষ্টিভ্রমও হতে পারে। তবে একটু পরই দীর্ঘ সাদা চুলের বৃদ্ধকে দেখল পরিষ্কার। হাঁটু পর্যন্ত সাদা আলখাল্লা। পায়ের কাছে একটা কুকুর। শাহাদকে দেখে মিষ্টি হাসল বৃদ্ধ।

‘চাচা, পথ হারিয়ে ফেলেছি। বলতে পারবেন নুড়িয়াখোলা কোন দিকে?’

জবাব দিল না বৃদ্ধ। মুখে ক্ষীণ হাসি। পকেট হাতড়ে একটা মানচিত্র বের করল। মেলে ধরল শাহাদের সামনে। দুটি অংশ টোকা দিয়ে দেখিয়ে দিল। প্রথম জায়গাটা, শাহাদ এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। দ্বিতীয়টা নুড়িয়াখোলাকে নির্দেশ না করলেও বাংলোর পাশের মসজিদটার কথা উল্লেখ আছে। বৃদ্ধকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য ম্যাপ থেকে মুখ তুলল শাহাদ। কিন্তু বৃদ্ধ গায়েব! এই ঝুম বৃষ্টিতে এভাবে কেউ গায়েব হয়!

মানচিত্রটাকে ভরসা করে চলতে শুরু করল শাহাদ। অন্ধের মতো চলতে গিয়ে হোঁচট খেল। হঠাৎ কান খাড়া করে শুনল নুড়িপাথরের পতন। বৃদ্ধের ওপর ভারি রাগ হলো। এইমাত্র নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল ও! কারণ পা বাড়ালেই বিশাল খাদ। পড়লে নিশ্চিত ছাতু হয়ে যেত।

কুয়াশা চিরে আচমকা শুনতে পেল আজমের কণ্ঠ। টর্চলাইটের আলো লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল শাহাদ।

 

সন্ধ্যা সাতটা। জামশেদের মুখ গম্ভীর। ‘তুই যদি সত্যি দেখে থাকিস, তাহলে ওটা ভূত ছাড়া আর কিছু নয়। যত দূর জানি, দাদার জীবদ্দশায় পাহাড়ের ওপর একটা কুকুরকে নিয়ে একাকী বাস করত লোকটা। আর তার দেখানো পথে হাঁটতে গিয়ে পাহাড় থেকে পড়ে মরেছেও অনেকে।’

‘ভুল ম্যাপ দেখিয়ে মানুষকে পাহাড় থেকে ফেলে বুড়োটা কী মজা পাচ্ছে কে জানে। স্থানীয় কোনো বৃদ্ধের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করতে পারলে ভালো হতো।’

‘মনে হচ্ছে, এমন একজনকে চিনি আমি। বাংলোর পাশেই থাকে।’ আজমকে ডাক দিল জামশেদ। ‘আনোয়ার সরদারকে ডেকে আনো।’

কিছুক্ষণ বাদেই বৈঠকখানায় ঢুকল বৃদ্ধ। বসতে বলল জামশেদ। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে উঠতে না পারায় তাকে বিরক্তই মনে হলো। জামশেদের মুখে সব শুনে অবশ্য বিরক্তি চলে গেল। তৈরি হলো আগ্রহের ছাপ।

‘এক হপ্তা। না না, দুই হপ্তা আগে একটা পোলা পাহাড় থেকে পইড়া গেছিল। তবে মরে নাই।’ বললেন আনোয়ার সর্দার। ‘ওই পোলাডাও বুড়া লোকটার কথা কইল। আমি ছাড়া কেউ বিশ্বাস করে নাই। বুড়ারে লোকে খুড়তা বুড়া বইলা ডাকত। আজব কিসিমের মানুষ। পাহাড়ের উঁচায় কুত্তা নিয়া থাকত। ওইখানেই ওর কবর। কিন্তুক মানুষ তো ভালা ছিল। মাইনষের বিপদে-আপদে ছুইটা আসত।’

‘ওই মানচিত্রের ব্যাপারে কিছু জানেন?’ বৃদ্ধ কথাটা বুঝতে পারেনি দেখে শাহাদ কাগজটা খুলে দেখাল। ম্যাপটার এক প্রান্তে ১৯৫০ লেখা। ‘চাচা, ভালো করে খেয়াল করেন, এই মানচিত্রে এখানে পাহাড়ি রাস্তাটার চিহ্ন দেওয়া আছে। অথচ ওখানে কোনো রাস্তাই নেই। খুড়তা বুড়ো কেন শুধু শুধু ভুল পথ দেখাচ্ছে?’

ম্যাপটা দেখে আনোয়ার সরদার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, ‘আমি ভুল দেখি নাই। এমন কাগজ মরা মানুষগুলার কাছেও লোকে পাইছে ! কী হইতাছে, কিছুই তো বুঝতে পারতেছি না। খুড়তা বুড়া ক্যান এমন কাজ করব?’

মানচিত্রটাকে ভরসা করে চলতে শুরু করল শাহাদ। অন্ধের মতো চলতে গিয়ে হোঁচট খেল। হঠাৎ কান খাড়া করে শুনল নুড়িপাথরের পতন। বৃদ্ধের ওপর ভারি রাগ হলো। এইমাত্র নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল ও!

ম্যাপটা আনোয়ার সর্দারের হাতে দিয়ে খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিল শাহাদ। বৃদ্ধ বুঝতে পারল অবশেষে। যখন বলতে শুরু করল, তখন তার কণ্ঠে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। ‘খুড়তা বুড়া মারা যাওয়ার সময়টা স্পষ্ট মনে আছে। ১৯৬৮ সালের একদিন। বালাগঞ্জে ম্যালা তুফান। খুড়তা বুড়ারে আমরা কবর দিয়া ফিরলেও ওর কুকুরটা একটুও নড়ে নাই। এক বছর পর, ওই লালু পাহাড়ে তুমুল ঝড়ে ধস নামল। আর মানচিত্রে যে রাস্তাটা দেখাইলেন, ধসে পইড়া ওই রাস্তাটা নাই হইয়া গেল। তারপর তো...।’

উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গেল শাহাদ। ‘রহস্যের সমাধান পেয়ে গেছি! খুড়তা বুড়ার ভূত সজ্ঞানে এসব করছে না। মানুষজনকে বিপদে-আপদে সাহায্য করতে ভালোবাসতেন তিনি। তাই মৃত্যুর পর পাহাড়ে পথ হারানো মানুষদের ম্যাপ দেখিয়ে পথ চিনিয়ে দিতেন। ১৯৬৮ পর্যন্ত অবিকৃত ছিল ওই অঞ্চলের মানচিত্র। তবে পরের বছর পাহাড়ধসে বদলে যায় অনেক কিছু। খুড়তা মারা যাওয়ায় এসবের কিছুই জানতেন না। তাই নিজের সংগ্রহের পুরনো মানচিত্র দিয়ে অসহায় মানুষকে ঠেলে দিতেন মৃত্যুর মুখে। সত্যিই দুঃখজনক।’

বৈঠকখানার কারো মুখে কথা ফুটল না। জামশেদ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘আর কোনো দুর্ঘটনার আগেই আমাদের কিছু করতে হবে।’

আজমের দিকে তাকাল শাহাদ, ‘একটা কাজ করতে পারবে? খাস্তা ফকিরকে কাল ডেকে আনো। যেভাবেই পারো ওই ফকিরের মাধ্যমে নতুন একটা ম্যাপ খুড়তা বুড়োর হাতে পৌঁছে দাও।’

‘ইয়েস স্যার।’

(এ এন এল মানবির দ্য স্ট্রেঞ্জার ইন দ্য মিস্ট অবলম্বনে)

 

রহস্যজটের উত্তর : সুইসাইড নোটের প্রতিটি বাক্যের প্রথম অক্ষর মেলালেই পাওয়া যাবে ‘আমাকে খুন করবে আবুল’।

মন্তব্য