kalerkantho

দলছুট আড্ডা

আড্ডায় আট

একে তো বন্ধু দিবস, তার ওপর দরজার কাছে ঈদ। কার কী প্ল্যান সেটা জানতে আড্ডা দিয়েছিলাম আমরা আট—মাহবুবা রহমান লাবণ্য, জান্নাতুল ফেরদৌস সিনথিয়া, জাসিকা জেসি, তাসনিম ফেরদৌস, আমানুর রহমান, হাসান আল মামুন সৌরভ, জামিউল ইসলাম জীম। আর সঞ্চালনায় ছিলাম আমি গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আড্ডায় আট

লাবণ্য একটা চকচকে লাল জামা পরে এসেছে। সিনথিয়া দেখেই বলল, কী রে, ঈদের জামা আগেই পরে ফেললি!

লাবণ্য : নাহ, এটা ফ্রেন্ডশিপ ডের জামা।

তখনো বাকিরা আসেনি। ‘সৌরভ বরাবরই লেট করে।’ হাজির হয়েই গম্ভীর গলায় বলল জেসি।

সৌরভ আসতেই খেল ঝাড়ি। দেরি করার শাস্তি হিসেবে তাকে এমন একটা কৌতুক বলতে বলা হলো, যা আগে কেউ শোনেনি। সৌরভ অনেক ভেবে বলল, আজ আসার সময় একটুও জ্যামে পড়িনি। তাতেই ফিকফিক করে উঠল কয়েকজন।

আমানুর : আজকের আড্ডার নিশ্চয়ই কোনো না কোনো টপিক আছে?

তাসনিম : আড্ডার আবার টপিক কিসের!  বন্ধু দিবস আর ঈদের গালগপ্পো করব আমরা।

গলা খাদে নামিয়ে বললাম, সুধীমণ্ডলী, আজকের আড্ডার বিষয়...

তাসনিম : আরে থামো থামো! এটা টক শো না! আমি জানতে চাই, এবারের বন্ধুত্ব দিবস নিয়ে কার কী প্ল্যান?

আমানুর : আমাদের একটা দারুণ প্ল্যান আছে। নারায়ণগঞ্জে থাকি আমি। ওখানে কিছু ভৌতিক জায়গা আছে। বন্ধুরা মিলে বন্ধু দিবসে ওই জায়গায় রাতটা কাটানোর প্ল্যান করছি।

জেসি : আমরা কয়েকজন বান্ধবী মিলে এক রকম জামা বানিয়েছি। রবিবার কলেজ খোলা, তাই বিকেলে সবাই ওই জামা পরে ঘুরতে যাব।

সিনথিয়া : আমিও, ঘোরাঘুরি আর বন্ধুর টাকায় খাবদাব। হিহিহি।

লাবণ্য : আড্ডা, মাস্তি, সেলফি—এসব ছাড়া আর আছে কী!

সৌরভ : কিছু স্কুলবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয় না অনেক দিন। এদিন ওদের খুঁজে বের করব। তারপর পুরান ঢাকায় আড্ডা হবে।

জীম : কলেজে এখনো নতুন বন্ধু হয়নি। পুরানগুলোই ভরসা।

তাসনিম : গরুর হাট তো জমেছে। বন্ধুদের সঙ্গে ওদিকেই যাব।

আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন প্রতিদিন একটা করে বোতল নিয়ে যেতাম স্কুলে। কিন্তু বাসায় আর ফেরত আনতে পারতাম না। তার আগে আমার বন্ধুরা ওটাকে ফুটবল বানিয়ে ফেলত। পুরনো বন্ধুদের নিয়ে তোমাদের কার অভিজ্ঞতা কেমন?

আমানুর : ক্লাসে একদিন দাঁড়িয়ে রিডিং পড়ছিলাম। পেছন থেকে দুষ্ট বন্ধু কাঁচি দিয়ে আমার প্যান্ট দিল কেটে। আমি দেখি, সবাই হাসছে। বুঝতে অনেক সময় লেগেছে। ওরা এত দুর্ধর্ষ ছিল!

জেসি : একদিন ক্লাসে আমার এক বান্ধবী চুলে চুইংগাম লাগিয়ে দিয়েছিল। ওটা তুলতে গিয়ে দেখি মহাবিপদ। বাসায় এসে পরে তেল দিয়ে উঠিয়েছি।

সৌরভ : স্কুলজীবনের শেষদিনে একটা অনুষ্ঠান ছিল। বন্ধুরা সেটা জানতে পারে। তারা ঠিক করে, আমাকে ওই অনুষ্ঠানে যেতে দেবে না। ক্লাস শেষ হওয়ার পর যখন বের হব, তখন আমাকে পুরো ভিজিয়ে দেয় পানি দিয়ে।

জীম : আহা রে বেচারা!

সৌরভ : কষ্ট পেয়েছি প্রথমে। পরে বন্ধুরাই বাঁচিয়েছে। স্কুলের পাশে আরেক বন্ধুর বাসা ছিল। ওর বাসায় গিয়ে জামাকাপড় বদলিয়েছি। পরে অবশ্য অনুষ্ঠানে এমনিতেই যাইনি।

সবাইকে বললাম, এবার বলো বন্ধু দিবসের গিফট নিয়ে কার কী ভাবনা?

আমানুর : আমার একটা বেস্ট ফ্রেন্ড আছে। আমি ওর বাসায় গিয়ে প্রতি ফ্রেন্ডশিপ ডে-তে একটা কিছু চুরি করে নিয়ে আসি। এরপর সেটা র‌্যাপিং করে আবার উপহার দিই। এবারও আশা করি ব্যতিক্রম হবে না!

সবার হাসি থামতেই বলতে শুরু করল সিনথিয়া।

সিনথিয়া : আমার এক বন্ধু ছিল। ফ্রেন্ডশিপ ডে-তে ও নিজেই একগাদা ব্যাজ পরে বসে থাকত। সম্ভবত কাউকে ব্যাজগুলো গিফট দিতে ওর মন চাইত না। হা হা হা!

জেসি : আমার এক বন্ধু আবার এ কাজে এক্সপার্ট। নিজে ব্যাজ কিনত না। যেগুলো উপহার পেত, সেগুলোই আবার বদলাবদলি করে অন্য বন্ধুকে পরিয়ে দিত।

জীম : আমি কখনো গিফটটিফট দিইনি। এ ধারা ভাঙা ঠিক হবে না!

তাসনিম : আমার মনে হয়, একটা দিন অন্যভাবে উদ্যাপন করলে খারাপ হয় না। দেখা যাক কেমন স্মৃতি জমাতে পারি।

সিনথিয়া : আমার বন্ধুরা ফ্রেন্ডশিপ ডের আগে এক প্ল্যান করে। পরে সব ভুলে যায়। ভীষণ খারাপ লাগে। আর আমি বন্ধুদের বই ছাড়া আর কিছু গিফট দিই না।

জেসি : আমি আমার বন্ধুদের সাজুগুজুর আইটেম কিনে দিই। ওরা সাজতে পছন্দ করে।

তাসনিম : আমি স্কুলে থাকতে এক বন্ধুকে একটা স্পেশাল চুইংগাম দিয়েছিলাম। ওটা টান দিলেই শক লাগত।

আড্ডায় অংশ নিতে সিনথিয়া আর লাবণ্যর মায়েরাও এসেছিল। আমরা বসে যখন আড্ডা দিচ্ছিলাম, তারা দুজন দেখি হেঁটে হেঁটে বহুদূর। কত যে গল্প জুড়েছেন। ভালোই হলো! নতুন বন্ধু পেলেন দুজন!

সীমান্ত : সবাই তো এখন ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড, উইশও ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। ছোটবেলাটা এমন ছিল না। ওটা ভীষণ মিস করো?

 

সিনথিয়া : ছোটবেলায় একজন আমার পাশে এসে বলত, ‘আমার বন্ধু হবে?।’ এখন পাঠায় ফেসবুক রিকোয়েস্ট। খুবই হতাশাজনক।

জেসি : ছোটবেলায় বন্ধুর সঙ্গে রাগ, এক আড়ি, দুই আড়ি, তিন আড়ি—কত কিছু ছিল। ফেসবুকে এসব কোথায়!

জীম : টিফিন পিরিয়ডে কলম ফাইট খেলতাম। খাতায় ক্রিকেট খেলতাম। এখন বহু গেমস খেলি; কিন্তু ওই খেলাগুলোর মজা পাই না।

লাবণ্য : স্কুল ছুটি হলেই এক দৌড়ে মাঠে। বরফ পানি, কানামাছি, দৌড়াদৌড়ি; এখনকার পিচ্চিরা এসব খেলার নাম জানে তো?

তাসনিম : বিকেলে ক্রিকেট বল কিনতে পাঁচ টাকা করে চাঁদা উঠাতাম। আহা!

সৌরভ : তাসনিম, তুই না ফ্রেন্ডশিপ ডে-তে গরুর হাটে যাবি? এবার তাহলে তুই গরু?

তাসনিম : হ্যাঁ হ্যাঁ, কোরবানি এলে নিজেকে গরু ভাবতে ভালো লাগে!

কথায় কথায় এবার চলে এলো ঈদের প্রসঙ্গ।

জেসি : ঈদের দিন আমি কোনোভাবেই মাটি করব না। রাতে পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে বের হব। আমি প্রতিবছর বাবার সঙ্গে বসে মাংস কাটি। এবারও মিস হবে না।

সিনথিয়া : আমার ওপর ঈদের দিন মাংস বিলির গুরুদায়িত্ব পড়ে। ওই দিন বিশেষ কোনো প্ল্যান থাকে না। ঈদের পরদিন ঘুরলেই হবে।

লাবণ্য : আমার তো বিশাল কাজ। আমাদের বাসা ছয় তলায়। নিচতলা থেকে ছয় তলায় মাংস উঠাতে হবে আমাকে। আপাতত ঈদের দিনের শেষে বিশ্রাম নেওয়াই প্ল্যান। আর এরপর নানাবাড়ি যাওয়া হতে পারে।

সৌরভ : আমার ঈদ গ্রামের বাড়িতে। আগের দিন বিকেলে সব ভাইয়েরা মিলে হাটে যাব। গরু কিনব। বৃষ্টি না হলে সবাই এগ্রামে-ওগ্রামে টইটই করব।

আমানুর : আমি প্রতিবছর ঈদের দিন বৃদ্ধাশ্রমের মা-বাবাদের সঙ্গে কাটাই। এবারও ঈদের দিন নামাজ পড়ে রওনা হব বৃদ্ধাশ্রমে। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঘোরার পরিকল্পনা আছে।

আড্ডায় যারা এসেছে, তারা আবার অনেক গুণে গুণী। সৌরভ বিতার্কিক, জীম মূকাভিনয় পারে, লাবণ্য নাচ জানে, সিনথিয়া গান গায়, জেসি স্কাউটিং করছে, তাসনিম বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত, আমানুর তো অলরাউন্ডার; বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে শখানেক সার্টিফিকেট পেয়েছে।

সিনথিয়া : লাবণ্য, ওই দিন কলেজের প্রগ্রামে নাচের একটা ভিডিও দেখলাম। কেমন চলছে নাচ?

লাবণ্য : ওটা অনেক আগের ভিডিও। পড়ালেখার জন্য এখন বন্ধ। পরীক্ষা শেষে আবার শুরু করব।

আমানুর : দোস্ত, আমাদের নাচ শেখা!

লাবণ্য : আমি তো ক্লাসিক্যাল নাচি। শিখতে হলে কড়া তালিম নিতে হবে। ধৈর্য আছে?

তাসনিম : জীম তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইম ফেস্টে অংশ নিয়েছিলি?

জীম : ১৮ আগস্ট একটা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষার জন্য বাদ দিয়েছি।

সিনথিয়া : আহা, কষ্ট পাসনে। আমারও পরীক্ষার জন্য গানের ক্লাস বন্ধ।

আমানুর : সৌরভের বিতর্ক?

সৌরভ : সেন্ট জোসেফে লাস্ট একটা বিতর্কে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমানুর, তুই তো সামাজিক সংগঠনে আছিস। ডেঙ্গু নিয়ে কী করছিস তোরা?

আমানুর : আমি একটা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ করি। ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে ফ্রি ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হবে।

জেসি : আমি স্কাউটের একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানেও ডেঙ্গু নিয়ে আলোচনা করেছেন ডাক্তাররা।

সিনথিয়া : শুনলেই তো ভয় লাগে!

জীম : খোলামেলা পরিষ্কার জায়গায় ভয় নাই। ময়লা পানি, গাছের টবের পানি—এসব থাকলে সরিয়ে দিস। এসব হলো ডেঙ্গুর কারখানা।

জীম : পুরো ঢাকা শহরের নানা জায়গায় পানি জমে আছে। আমার মনে হয়, বর্ষার কারণেই ডেঙ্গুর উত্পাতটা বেশি।

নারায়ণগঞ্জে কয়েক দিন আগে রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির কথা জানালাম সবাইকে। যিনি নিজে আস্ত একটা মাঠ পরিষ্কার করে ফেলেছেন। এখন সেখানে সবাই খেলে। আজকের আড্ডায় যারা এসেছে, তারাও কিন্তু পরিচ্ছন্নতা অভিযানে কম যায় না।

সিনথিয়া : আমি নিজে কখনো ময়লা রাস্তায় ফেলি না।

আমানুর : প্রতি মাসে আমি আমার এলাকা চাষাঢ়ায় শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার করি।

তাসনিম : আমরা বন্ধুরা মিলে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট এলাকার ময়লা-আবর্জনা কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলি।

আড্ডার শেষাংশে হাজির মোহাম্মদ আসাদ ভাই। তিনি মজার ছবি তুলতে চান। সবাইকে বললেন চোখে আঙুল গোল করে রাখতে। এর মধ্যে আবার কয়েকজনের চোখে চশমা। অগত্যা চশমা রাখার দায়িত্ব পড়ল আমার ঘাড়ে। ছবি তোলার আগে দিলেন এক বিরাট শর্ত। যেহেতু বন্ধু দিবস, তাই সবার মুখে থাকতে হবে অকৃত্রিম হাসি। অবশ্য এত এত বন্ধু থাকলে তো আর মিথ্যা হাসির জন্য কসরত করতে হবে না। সবাই কারণ ছাড়াই হেসে উঠল হো হো করে।

 

মন্তব্য