kalerkantho

ফোকাস

বন্ধু, বন্ধুত্ব ও মুড়ি পার্টি

বছর ঘুরে এলো আগস্টের প্রথম রবিবার। মানে বন্ধু দিবস। এদিন বন্ধুদের সঙ্গে কী করা যায়, সে আইডিয়া জানাতে গিয়ে বিস্তর গল্প জুড়ে দিয়েছেন জুবায়ের ইবনে কামাল

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বন্ধু, বন্ধুত্ব ও মুড়ি পার্টি

বন্ধু মানে যে সব সময় একেবারে গলায় গলায় ভাব তা কিন্তু না। আমি তখন ছোট। মানে প্রাইমারির টু-থ্রিতে পড়ি। নিচতলার ফ্ল্যাটে থাকত মুন্না। সারা দিনের খেলার সঙ্গী। আমাকে মাঝেমধ্যেই শায়েস্তা করা যার ডেইলি রুটিন। একবার গায়ে বালু ঢেলে দিয়ে আমার জামা নষ্ট করে দিয়েছিল। আবার একদিন ঘুষিও মেরেছিল। মাকে বিচার দিতেই তিনি বললেন, আমি নাকি সব সময় মুন্নার নামে নালিশ করি। মায়ের কথায় প্রতিশোধের আগুন জেগে উঠল। রাতে স্বপ্ন দেখলাম, মুন্নাকে নির্জন জায়গায় নিয়ে লাগাতার ঘুষি মারছি। সকালে উঠে শুনলাম, আমি ঘুমের ঘোরে মাকে এত ঘুষি মেরেছি যে নাকফুল ভেঙে হারিয়ে গেছে। সেই নাকফুলের মতো হারিয়ে গেছে ঝগড়াঝাঁটির সোনালি দিনটাও। আহা! মুন্না! তোর সঙ্গে কত দিন মারামারি হয় না!

বন্ধু যে কী বস্তু, সেটার একটা উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে। একবার দুই যমজ বোনকে নিয়ে পত্রিকায় একটা ফিচার লিখেছি। তাদের ছবিও তোলা হয়েছে। সব ঠিকঠাক। কিন্তু ছবির ক্যাপশন লিখতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন ওই বিভাগের সম্পাদক। তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, ছবিতে কে কোন জন তা বুঝতে পারছেন না। ১০ মিনিটের মধ্যে জানাতে হবে। ফোন করলাম ওই যমজ বোনদের। নম্বর বন্ধ! সম্ভবত তারা ছিল ক্লাসে। পড়লাম বিপদে। ওদের বাড়ির কারো নম্বরও নেই। আছে ওদের এক বান্ধবীর নম্বর। তাকেই বললাম সমস্যার কথা। ছবি দেখতেই পটাপট বলে দিল কে কোন জন! বন্ধুই পারে বন্ধুকে চিনতে!

কয়েক বছর আগের ঈদের কথা। ঈদ নিয়ে একটা বিশাল ছড়া ফেঁদেছিলাম। এখন এটা পত্রিকায় কিভাবে পাঠাব জানি না। তখন আমার জানে-জিগার দোস্ত এসে বলল, আমাকে সে সাহায্য করবে। ছড়া শুনে বাহবা দিল খুব। ছড়াটার কপি নিয়েও গেল। কথা দিল, ঠিকঠাক পত্রিকায় পাঠিয়ে দেবে। সেই বন্ধু কথা রেখেছিল। ছড়া ছাপাও হয়েছিল। কিন্তু ছড়াকারের জায়গায় আমার নয়, ছিল ওই বন্ধুর নাম। বন্ধুরা তো এমনই!

আমিও কম যাই না! গণিত ক্লাসে স্যার একদিন আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন তেরোর নামতা বলার জন্য। আমি তো আটের নামতাই পারি না ঠিকমতো! তাই ভদ্রলোকের মতো বলে দিলাম, ‘স্যার, তেরোর নামতা পারি না। তবে সজীব খুব ভালো পারে নাকি।’ আমি শাস্তি পাব, আর আমার বন্ধু সজীব পাবে না, এমনটা ভাবা যায়! সজীব নিজেও নামতা পারে না। তাকে দাঁড় করানো হতো এবং স্বাভাবিকভাবে দুজনই শাস্তি পেতাম। তো বুঝতেই পারছ, শৈশবে বন্ধুদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল দা-কুমড়ার মতো। আহা! সেই কুমড়াগুলোকে যদি আগের মতো পেতাম!

এবার পৃথিবীটার সঙ্গেও বন্ধুত্ব করে ফেলো। দূষণ ও গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে ইদানীং তার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না

 

আমার মতো এমন ইঁচড়ে পাকা বন্ধু হোক না হোক, ভালো বন্ধু সবারই দরকার। কিন্তু তোমাদের যাদের বন্ধু খুব বেশি নেই বা নেই বললেই চলে, তারা নতুন বন্ধু বানাবে কী করে? আপাতত ফেসবুকটা লগ আউট করে রাখো। কারণ ওতে নতুন বন্ধু তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বন্ধুত্বের জন্য এমন কিছু ব্যাপারস্যাপার আছে, যার জন্য সরাসরি দেখা ও কথা হওয়াটা আসলেই জরুরি। যে কাজটা করতে পারে একটা ক্লাব কিংবা কোনো চক্র (পাঠচক্র, হাঁটাচক্র, ছবি আঁকাচক্র ইত্যাদি)। এ ধরনের ক্লাবে তুমি এমন কিছু বন্ধু পাবে, যাদের সঙ্গে তোমার আগ্রহের মিল আছে। যদি কোনো মিল না-ও থাকে, তাহলে নতুন কিছু চেষ্টা করতেও তো দোষ নেই। তা সে তায়কোয়ান্দো হোক বা পেইন্টিং। এর মাধ্যমে তুমি তোমার দক্ষতা যাচাই করতে পারবে। তেমনি জানতে পারবে, কে হতে পারে তোমার কাছের একজন বন্ধু।

আর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুরা মিলে নিজেরাই কোনো বন্ধুচক্র অথবা ক্লাব খুলে ফেললে সেটিও হয়ে যেতে পারে চমত্কার কিছু।

ক্লাবে আরো যেসব সুবিধা হয়—নিজেদের উন্নয়নের পাশাপাশি অন্যকেও এটা-ওটা দেখিয়ে দেওয়া যায়। বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে চাইলে বন্যার্তদের জন্য টাকা তুলতে পারো। বা এমন কোনো একটা উদ্যোগের সঙ্গে শামিল হয়ে বানিয়ে নিতে পারো নতুন কোনো বন্ধু। এর সুবিধাটা হলো, নতুন বন্ধু হিসেবে যাকে পাবে, সে হবে বেশ উদারমনা।

হুটহাট এখানে-সেখানে গাছ লাগাতে পারো বন্ধুদের নিয়ে। এতে করে নতুন নতুন পরিবেশপ্রেমীদের সঙ্গে পরিচয় হবে, হবে বন্ধুত্ব। এর বাইরে বই আদান-প্রদান তো আছেই। বই কেনার খরচ তো বাঁচবেই, সঙ্গে পাবে বৈচিত্র্যে ভরা সব বইপত্র।

খোঁজ নিলেই দেখবে তোমার আশপাশেই অসংখ্য সংগঠন রয়েছে বন্ধুদের নিয়ে। যারা নিজেদের পছন্দমতো সমাজের জন্য কিংবা পরিবেশের জন্য কাজ করছে। শুধু স্বেচ্ছাশ্রম কেন; বরং তুমি যদি কোনো কাজে সফলও হতে চাও, সে ক্ষেত্রেও তোমার বন্ধুবহর বেশ কাজে আসবে।

সক্রেটিস বলেছেন, বন্ধুত্ব গড়ে তোলো ধীরে ধীরে, তবে একবার হয়ে গেলে সেটার পরিচর্যা করতে হবে প্রতিনিয়ত। তো বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের সেই পরিচর্যা করবে কী করে? একটা উপায় হতে পারে, মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন আয়োজন করো। হোক সেটা ঘুরতে যাওয়া কিংবা মুড়ি-চানাচুর পার্টি। আজকাল অনেকেই ভাবে, হ্যাংআউট মানে বন্ধুদের সঙ্গে নামিদামি রেস্তোরাঁয় যাওয়া। ডাহা ভুল! বরং খাওয়াদাওয়াটা রেস্তোরাঁর বাইরে হলেই ভালো। চাইলে কিন্তু কয়েকজন মিলে হুট করে কোনো এক বন্ধুর বাসায় হাজির হতে পারো। কারো সঙ্গে থাকবে চাল, কারো সঙ্গে ডাল, আর কারো কাছে ডিম। এসেই বলবে, দোস্ত খিচুড়ি রান্না করতে এলুম! সেদিনের রান্নাটা যেমনই হোক, তোমার স্মৃতির স্ক্র্যাপবুকে কিন্তু ঠিকই জমা থাকবে আজীবনের জন্য। আমি যখন প্রাইমারিতে পড়ি, তখন প্রতি সপ্তাহে একবার মুড়ি পার্টি করতাম। বৃহস্পতিবার বিকেলে একেকজন বাসা থেকে জিনিসপত্র আনত। কেউ আনত পেঁয়াজ, কেউ কাঁচা মরিচ। সবাই মিলে একটা বিশাল পাত্রে মুড়িতে বিভিন্ন জিনিস প্রয়োগ করে একেক দিন একেক স্বাদের মুড়ি মাখানো তৈরি করা হতো। মুড়ির ভাগ পাওয়া নিয়ে এতটাই মারামারি হতো, যেন মনে হয় অমৃতের ভাগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে!

আজ তো বন্ধু দিবস। তোমাদের আইডিয়া কী? মুড়ি পার্টি হবে, নাকি খিচুড়ি? নাকি সারা দিন এদিক-ওদিক হণ্টন পার্টি হবে? যেটাই হোক না কেন, সেটার ছবি তুলে বর্ণনাসহ পাঠিয়ে দিয়ো দলছুটে। বলা তো যায় না, তোমাদের স্মৃতিটা আবার বাঁধাই হয়ে থাকতে পারে ট্যাবলয়েডের পাতায়।

মন্তব্য