kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

তোমাদের গল্প

অতঃপর মশাটি

নাঈমুর রহমান   

১৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অতঃপর মশাটি

অঙ্কন : মাসুম

অবশেষে মশারির গোপন পথটা আবিষ্কার করতে সক্ষম হলাম। বেশ কিছুদিন ধরে মশাগুলো রাতে ঘুমের সময় পাল্লা দিয়ে আমাকে জ্বালাতন করছিল। মশারি লাগিয়ে প্রতিটি কোনায় সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কানের সামনে এসে মশার দল ঘ্যানর ঘ্যানর করতে শুরু করে, তখন রাগে-ক্ষোভে একগাদা বকাঝকা বেরিয়ে আসে মুখ দিয়ে। বুঝতে পারি, এদের এসব বলে লাভ নেই। তখন আবার একরাশ হতাশা নিয়ে গরমের মধ্যেও কাঁথাটা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু এভাবে কি আর ঘুম আসে? আজ মশারি লাগিয়ে রীতিমতো আতশ কাচ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি প্রতিটি সুতা। শেষে আবিষ্কার হলো সেই অদেখা ফুটো। দেরি না করে জুড়ে দিলাম স্কচটেপ। মনে মনে বললাম, ‘বারে বারে মশা তুমি খেয়ে যাও রক্ত। এবার দেখব কী করে জ্বালাও।’

কাঁথা ছাড়াই বুকভরা প্রশান্তি নিয়ে হারিয়ে গেলাম ঘুমের দেশে। কিন্তু মশা আমার পিছু ছাড়ল কই! মধ্যরাত পেরোতেই গুন গুন গুন। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলাম। কানে এলো মিনমিনে একটা গলার স্বর।

‘তোমরা এত স্বার্থপর হও কিভাবে!’

চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। চুপচাপ বসে রইলাম। গলার স্বরটা বেশ চিকন। তাই ভয় পেলাম কম। মনের ভুল ভেবে আবার শুতে গেলাম...।

‘কী আশ্চর্য! শুনেও জবাব দিচ্ছ না! আচ্ছা অভদ্র তো তুমি!’

গায়ে কাঁটা দিল। ধীরে ধীরে মাথা ঘোরালাম। নেই! কেউ নেই! মিনমিন করে বললাম,

‘ক্...ক্...কে?’

‘এদিকে তাকাও। তোমার নাকের ডগায়।’

চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। একটা মশা! তুচ্ছ বন বন করা মশা! সে আবার আমার সঙ্গে কথা বলার সাহসও দেখায়!

মেজাজ বিগড়ে যাওয়াই তো স্বাভাবিক। তার পরও শান্ত স্বরে বললাম, ‘স্বার্থপরতার কী দেখলে আবার।’

‘এই যে মশারিতে ঢোকার রাস্তাটা বন্ধ করে দিলে। তুমি জানো! রাতের পর থেকে আমরা না-খাওয়া!’

‘আশ্চর্য! আমি আমার রক্ত কেন খেতে দেব? এটা মোটেও স্বার্থপরতা নয়। এটা হলো সেলফ ডিফেন্স—মানে আত্মরক্ষা।’

‘তোমাদের রক্ত খাওয়া আমাদের জন্মগত অধিকার। তোমাদের কোনো অধিকার নেই আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার।’

‘অধিকার! মেজাজটা চড়ে গেল। যাও যাও! খেতে হলে গরু-ছাগলের রক্ত খাও গিয়ে। মানুষের রক্ত পাবে না। তার ওপর শুধু রক্ত খেয়ে চলে গেলে একটা কথা, কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর প্যানর প্যানরও করো তোমরা। শান্তিতে ঘুমানোর জো আছে!’

‘তোমরা যখন আমাদের রক্ত খেতে দাও না, তখন প্রতিবাদ হিসেবে আমরা গান গাই। ওটাকে ঘ্যানর ঘ্যানর বলে অপমান করবে না।’

আমি বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ। একে তো অন্যায়ভাবে রক্ত খায়, তার ওপর আবার বড় বড় কথা। সাহস কত! গলার জোর বাড়িয়ে বললাম, ‘তোমাদের ইচ্ছামতোই সব চলবে নাকি! তোমরা যে একগাদা অসুখের জীবাণু নিয়ে ঘুর ঘুর করো, সেটার কী হবে? পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় এই তোমাদের কারণে। ডেঙ্গু তো আছেই, চিকুনগুনিয়া হলে যে কী কষ্ট, সেটা মশারা কখনোই বুঝবে না।’

‘ওই সব রোগবালাই আমরা ছড়াই না। ওগুলো এডিস মশার কাজ-কারবার। ওরা আমাদের জাতশত্রু। আমাদের সঙ্গে ওদের যুদ্ধ লেগেই থাকে। আর তোমরা যদি ওদের হাত থেকে বাঁচতেই চাও, তাহলে ওদের জন্মের ব্যবস্থা করো কেন?

‘জন্মের ব্যবস্থা করি মানে!’

‘এই যে টবের মধ্যে, টায়ারের মধ্যে পানি জমিয়ে রাখো। ওখান থেকেই তো এরা জন্মায়।’

‘আর তোমাদের জন্ম বুঝি হাসপাতালে হয়! যত্তসব বাজে কথা।’

মশাটি এবার বেশ বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘মানুষদের এই একটাই সমস্যা। একে তো দোষ করো, আবার সেটা স্বীকার না করে যুক্তি দেখাও। ঠিক আছে, এসব বাদ দাও। তোমরা যে আমাদের বিনা কারণে হত্যা করো, সেটার কী হবে শুনি?

‘মোটেও বিনা কারণে হত্যা করি না। তোমরা রক্তচোষা, তাই মারি।’

‘সেদিন আমাদের দলের কিছু মশা এডিস মশাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যাচ্ছিল। কোথা থেকে একটা দুষ্টু খোকা এসে ইলেকট্রিক ব্যাট দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের ওপর। আমরা যেন ক্রিকেটের বল। ব্যাট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যেভাবে সবগুলো মশা মেরে ফেলল। একটা করে মশা মরে আর পটপট করে আওয়াজ হয়। তা দেখে ওই ছেলের সেকি পৈশাচিক আনন্দ! আমাদের মেরে ফেলাটা তোমাদের জন্য খেলা হয়ে গেছে। কখনো তো এমনভাবে পিষে ফেলো যে লাশটাই খুঁজে পাই না।’

‘বিষয়টা মোটেও এমন না। নিশ্চয়ই মশাগুলো যুদ্ধে যাওয়ার সময় ওই ছেলেটিকে কামড়েছিল। তাই সে প্রতিশোধ নিয়েছে।’

‘উফফ! তোমরা সত্যিই প্রতিশোধপরায়ণ! কথা বলে লাভ হবে না। তুমি মানুষদের পক্ষেই বলবে। আমি মশাদের গোটা বাহিনী নিয়ে আসব। তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। ছিনিয়ে নেব অধিকার।’

আমি হাসলাম। বললাম, ‘ভাবছি, তোমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখব। তোমার-আমার সব কথাবার্তা থাকবে ওই গল্পে। গল্পের শেষ লাইনটা কী হবে জানো? শেষ লাইন হবে অতঃপর মশাটি মারা গেল।’

মশাটা ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। আমি হাই তুলতে তুলতে  ঠাস করে লাগালাম একটা চড়। এরপর ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। ডান গালটা জ্বলছে খুব। ভাবলাম, মশাটা তো বসেছিল নাকের ডগায়, গালে চড় মারলাম কেন?

    

 

 

মন্তব্য