kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

বিজ্ঞান

ব্যাটে-বলে বিজ্ঞান

তামিম ইকবালের ওজনদার ছক্কা, সাকিব আল হাসানের স্পিন ঘূর্ণি; প্র্যাকটিস তো বটেই, ক্রিকেটে সফল হতে জানা চাই বিজ্ঞানও! লিখেছেন কাজী ফারহান পূর্ব

১৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ব্যাটে-বলে বিজ্ঞান

সুইং ও রিভার্স সুইং বলের পেছনে কাজ করে যে সূত্র

ব্যাট-বলের ইতিকথা

ব্যাটকে একটা কাঠের টুকরা মনে হলেও বাস্তবে এটা বানাতে মেনে চলতে হয় প্রচুর নিয়ম-কানুন। ষোড়শ শতাব্দীতে যখন ক্রিকেটের জন্ম, তখন ইংরেজরা ঠিক পাড়ার ছেলে-মেয়েদের মতো একটা কাঠের টুকরাকে ব্যাট বানিয়ে খেলায় মেতে উঠত। এখনকার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেই সুযোগ নেই। এখন খেলা হয় ‘সুপার ব্যাট’ দিয়ে। ব্যাটটাকে হতে হবে এমন, যেন সেটা ধরতে, নাড়াতে আরামদায়ক হয়। বলের সঙ্গে বোঝাপড়াটাও যেন ভালো হয়। ক্রিকেটের ৪২টি আইনের মধ্যে পাঁচ নম্বর আইনটা ব্যাটের জন্য বরাদ্দ।

ক্রিকেট ব্যাট বানানো হয় উইলোগাছের কাঠ দিয়ে। বিশেষ করে ইংলিশ উইলো কাঠই বেশি ব্যবহার করা হয়। প্রশ্ন হলো, আম বা জামের কাঠ দিয়ে বানালে কী সমস্যা? উইলো কাঠ ব্যবহারের কারণ—এটা বেশ শক্ত, মজবুত। তবে তার চেয়ে বড় কথা, এতে বল আঘাত করলে কম্পন কম হয়। আবার দ্রুতগতিতে ছুটে আসা বলের আঘাতে এ কাঠে সহজে চিড় ধরে না। পাশাপাশি উইলো কাঠ বেশ হালকা।

ক্রিকেট ব্যাটকে কাঠের হতে হবে, দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ৩৮ ইঞ্চি, প্রস্থ ৪.২৫ ইঞ্চি। মাঝের ও প্রান্তের পুরুত্ব হবে যথাক্রমে ২.৬৪ ইঞ্চি ও ১.৫৬ ইঞ্চি। মংগুজ এমএমআইথ্রি ব্যাট বা গ্রে-নিকোলস কাবুম হলো আধুনিক ব্যাটের উদাহরণ। মংগুজ ক্রিকেট ডটকম থেকে জান যায়, অস্ট্রেলিয়ান হার্ড হিটিং ব্যাটসম্যান ম্যাথু হেইডেন এ ব্যাট ব্যবহার করতেন। অন্য ব্যাটের তুলনায় এটা দিয়ে যে বলটাকে মারা হবে, সেটার গতি তুলনামূলক বিচারে পনেরো শতাংশ বেশি হবে।

অন্যদিকে ক্রিকেট বল বানানো হয় কর্ক এবং চামড়া দিয়ে। এই কর্ক আসে পর্তুগিজ কর্ক গাছের বাকল থেকে। কর্ক ব্যবহার করা হয় বলের আকার ধরে রাখতে এবং বাউন্স যাতে ঠিকঠাক হয় তা নিশ্চিত করতে। বলে যত বেশি কর্ক ব্যবহার করা হবে, বাউন্সও তত হবে। বলে চামড়াও ব্যবহার করা হয়, যাতে সহজে নষ্ট না হয়।

 

মিষ্টিমধুর স্পট

ভালো ব্যাটসম্যান জানেন, ব্যাটের কোন জায়গায় বল লাগলে শটটা সবচেয়ে ভালো হয়। কিছু জায়গা আছে, যেখানে বল লাগলে এত মসৃণ শট হয়, বোঝাই যায় না যে বল ব্যাটে লেগেছে! ব্যাপারটা টেনিস র্যাকেটেও থাকে। খেলার জগতে ব্যাটের এ জায়গার নাম ‘সুইট স্পট’! এর পেছনেও আছে বিজ্ঞান। তুমি একটা কাজ স্থিরভাবে যত সুন্দরভাবে করতে পারো, কাঁপতে কাঁপতে সেটা ঠিকভাবে করতে পারবে না। ব্যাটের বেলায়ও তা প্রযোজ্য। ব্যাটের এমন অনেক জায়গা আছে, যাতে বল লাগলে কম্পনের সৃষ্টি হয়। এ কম্পন ব্যাটে বাড়ি খেয়ে বলের চলে যাওয়ার পরও চলতে থাকে। ব্যাপারটা ব্যাটসম্যানদের জন্য অস্বস্তিকর। সবচেয়ে বেশি কম্পন সৃষ্টি হয়, যখন বল ব্যাটের নিচের দিকে বাড়ি খায়।

এবার আসা যাক ভরকেন্দ্রে। কোনো বস্তুকে তুমি যেভাবেই রাখো না কেন, এর ওপর পৃথিবীর আকর্ষণ বল একটি বিশেষ বিন্দুতে কার্যকর থাকে। ওটাই ভরকেন্দ্র্র। তোমার ক্রিকেট ব্যাটের ভরকেন্দ্র্র চাইলেই বের করতে পারবে। ব্যাটটাকে মাটির সঙ্গে সমান্তরাল রেখে একটা কাঠির ওপর ব্যালান্স করার চেষ্টা করো। যে বিন্দুতে ব্যাটটি স্থির থাকবে, সেটাই ভরকেন্দ্র্র। সাধারণত ক্রিকেট ব্যাটের দৈর্ঘ্য ৮৫ সেন্টিমিটার হয়। তখন বিন্দুটি থাকে ব্যাটের নিচ থেকে ৩৭ সেমি ওপরের দিকে। এখন ধরো, একটা বল ব্যাটের ভরকেন্দ্রে আঘাত করল। ব্যাটটা তখন সোজা পেছনের দিকে সরে আসতে চাইবে। এতে তুমি একটা অস্বস্তিকর কম্পন টের পাবে। আবার ভরকেন্দ্রের খুব নিচ দিয়ে বল আঘাত করলেও হাতলটা সামনের দিকে ঝুঁকতে চাইবে। এতেও প্রচুর কম্পন তৈরি হবে। কিন্তু এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে বল লাগলে ব্যাটের হাতলে কোনো গতির সৃষ্টি হয় না, কম্পনও হয় না। ব্যাটসম্যানদের প্রিয় মিষ্টিমধুর স্পটটি থাকে ভরকেন্দ্রের খানিকটা নিচে। সুইট স্পটটা ব্যাট ও বলের গতিভেদে একটু এদিক-সেদিক হতে পারে। তাই একে সুইট স্পট না বলে সুইট রিজিয়ন বা অঞ্চল বলাই যুক্তিযুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, সুইট স্পট থাকে ব্যাটের নিচ থেকে ১৫-৩০ সেন্টিমিটার ও ব্যাটের মাঝের লাইন বরাবর ১ সেন্টিমিটারের মধ্যে। মাঝের লাইনের ১ সেন্টিমিটারের বাইরে বল আঘাত করলে ব্যাট ডানে-বাঁয়ে ঘুরতে শুরু করে। সুইট স্পট সম্পর্কে আরো জানতে ভিডিওটি দেখে নিতে পারো—https://www.youtube.com/watch?v=cw99tErYCUM

 

ভারী নাকি হালকা ব্যাট

কোন ব্যাট ছক্কার জন্য বেশি উপযোগী? ভারী নাকি হালকা? ফিজিকস ডট ইউএসওয়াইডি ডট এডু ডট এইউ সাইট থেকে জানা যায়, হালকা ব্যাট ভারী ব্যাটের চেয়ে দশ শতাংশ দ্রুত নাড়ানো যায়। আবার যদি একই গতিতে ভারী ও হালকা ব্যাট দিয়ে একই গতিতে আসা বলকে পেটানো হয়, তবে ভারী ব্যাট বেশি জোরে আঘাত করবে, কারণ এর ভরবেগ বেশি। পরীক্ষায় দেখা গেছে, একই গতিতে ব্যাট চালালে হালকা ব্যাটে খানিক কম জোর পাওয়া যায়। সেটা প্রায় এক শতাংশ কম। তার মানে ভারী ব্যাট জোরে মারার জন্য খানিকটা সুবিধাজনক। কিন্তু ব্যাট দ্রুত নাড়িয়ে বল তাড়া করতে চাইলে হালকা ব্যাটের জুড়ি নেই। তাই খেলোয়াড়রা নিজের শারীরিক ক্ষমতা যাচাই করেই ব্যাটের ওজন ঠিক করে নেয়।

 

নিউটনের তিন

প্রথম সূত্র : বোলার যত দ্রুতই দৌড়াক, শেষ মুহূর্তে বলের ওপর হাতের মাংসপেশির জোর প্রয়োগ করতেই হয়। তাতেই বাড়তি গতিশক্তি পায় বলটা। আবার বোলার দৌড়ে আসে, কারণ এতে বলের ওপর বোলারের গতিশক্তিও যোগ হয়। অবশ্য বলটাকে যদি ঢিল ছোড়ার মতো করে ছোড়া যেত, তাহলে এত কষ্ট করে ছুটে আসতে হতো না।

দ্বিতীয় সূত্র : বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক। বল যেদিকে ক্রিয়া করে, বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনও সেদিকে ঘটে। অর্থাত্ বোলারের ছুটে আসা ও হাত ঘোরানোর গতির ওপর নির্ভর করছে বলের গতিও। আবার এ গতির পথেই যদি ব্যাট চালানো হয়, তবে কোনো কষ্ট ছাড়াই চার-ছয় পেয়ে যাবে ব্যাটসম্যান। এ কারণে দেখবে, প্রচণ্ড গতির পেসারের বলে অনেক সময় সামান্য টোকা দিয়েই (বলের গতির দিকে) ছয় পেয়ে যায় ব্যাটসম্যান।

তৃতীয় সূত্র : বলে বাউন্স খাওয়ানোর বিষয়টি এ সূত্র মেনে চলে। এ জন্য বোলারের হাতের গতিপথ হতে হয় পিচের মাঝ বরাবর। আবার ব্যাট বলকে যত জোরে আঘাত করে, বলও বিপরীতমুখী একটা বল ব্যাটে প্রয়োগ করে। তখনই ব্যাটটা কেঁপে ওঠে বা ব্যাটসম্যান সামান্য পিছিয়ে যায়।

 

সুইং ও রিভার্স সুইং

কথায় বলে—ক্রিকেট বলের আচরণ লন্ডনের আবহাওয়ার চেয়েও রহস্যময়। মানে কখন কোন দিকে মোড় নেয় বলা মুশকিল। এর মধ্যে সুইং ও রিভার্স সুইং মোটামুটি বিখ্যাত দুটি মোড়। সুইং জিনিসটা কী? দ্য কনভারসেশন ডটকম থেকে জানা যায়, পিচে আঘাত খেয়ে বাতাসের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গিয়ে হঠাত্ বলের গতিপথ বদলে যাওয়াটাই সুইং। কেন এমনটা হয়? ব্যাখ্যাটা মজার। এ নিয়ে নাসার বিজ্ঞানী ও ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্র মেহতা গবেষণা করেছেন। ২০০০ সালে প্রকাশিত তাঁর এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে সুইং বোলিংয়ের রহস্য। নাসা ডট গভ-এ প্রকাশিত সেই গবেষণায় দেখা যায়, সুইং করাতে হলে বলের দুই পাশে বায়ুপ্রবাহের গতির ভিন্নতা থাকা চাই। যখন বল ছুড়ে মারা হয়, তখন তার চারপাশে বাতাসের একটা পাতলা স্তর তৈরি হয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘বাউন্ডারি লেয়ার’। এই লেয়ারে দুই ধরনের বাতাস থাকে। একটা স্থিতিশীল বাতাস, আরেকটা উত্তাল বাতাস। বলের পৃষ্ঠতল কতটা মসৃণ বা অমসৃণ, সেটার ওপর এটা নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে বলের তিনটা অংশ চিন্তা করতে পারি আমরা। মসৃণ পাশ, মাঝে সেলাই করা অংশ তথা সিমলাইন আর অমসৃণ পাশ। বলের সিমটা যখন একটু বাঁকিয়ে থ্রো করা হয়, তখন মসৃণ পাশে স্থিতিশীল বায়ু প্রবাহিত হয়। অমসৃণ পাশে প্রবাহিত হয় উত্তাল বায়ু। ফলে চাপের একটা পার্থক্য দেখা যায়। অমসৃণ পাশে উত্তাল বায়ু বেশিক্ষণ আটকে থাকার কারণে বলটা সে দিকেই সুইং করে।

এখন আসি রিভার্স সুইং নিয়ে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড ক্রিকেট নামের প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক ক্যাপ্টেন ইমরান খান একটা নতুন সুইং আবিষ্কার করেন। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বলটি সাধারণ সুইংয়ের বিপরীত দিকে যায়। ইমরান খান কিন্তু জানতেন না, রিভার্স সুইং কিভাবে কাজ করে। তাই তিনি তাঁর ছোটবেলার বন্ধু রবীন্দ্র মেহতাকে বিষয়টি বলেন। বেশ কয়েক বছর গবেষণা করে মেহতা ওই রিভার্স সুইংয়ের কারণটা বের করে ফেলেন। তাঁর মতে, রিভার্স সুইং করা হয় পুরনো বলে। এতে বলের দুই পাশেই উত্তাল বায়ু প্রবাহিত হয়। অমসৃণ পাশটা তখন অপেক্ষাকৃত হালকা হয়ে যায়। তখন মসৃণ পাশের ভর বেশি হওয়ায় সেদিকেই বল দিক পরিবর্তন করে। রিভার্স সুইং সম্পর্কে আরো জানতে এ ভিডিও দেখতে পারো—https://www.youtube.com/watch?v=^PM‰Qd527^M&t=1s 

 

স্পিন

স্পিন বোলিং নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী এবং ক্রিকেট-পাগল দুই ভাই গ্যারি এবং ইয়ান রবিনসন ফিজিকা স্ক্রিপ্টা নামের জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। সেখানে তাঁরা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, বলের ওঠা-নামা নিয়ে একটা গাণিতিক মডেল দাঁড় করিয়েছেন। গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে ইয়ান রবিনসন বলেন, তাঁদের কাজ বল ডেলিভারিতে বলের দিক নির্ধারণে বাতাসের প্রভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটার ব্যাখ্যা করা। তাঁরা অবশ্য ক্রিকেটারদের জন্য এ গবেষণা করেননি। করেছেন পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের ব্যাবহারিক সমস্যা নিয়ে উত্সাহী করার জন্য। তবে ওই গবেষণা এতই ফলপ্রসূ হয়েছে যে বোলাররা ওই মডেলটাকেই অনুসরণ করতে শুরু করেন।

মন্তব্য