kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

ক্রিকেট একটি উৎসবের নাম

ক্রিকেট এখন শুধু খেলা নয়। এ এক মহোৎসব। হারি আর জিতি, ক্রিকেট উত্সবে গা ভাসানো চাই ষোলো আনা। লিখেছেন জুবায়ের ইবনে কামাল

১৬ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ক্রিকেট একটি উৎসবের নাম

ফুটবল হোক আর ক্রিকেট; বিশ্বকাপ এলেই আমাদের পুরান ঢাকায় সাজসাজ রব। তবে একটা ব্যাপার ভুরু কুঁচকে দেওয়ার মতো—ফুটবল বিশ্বকাপে পতাকার ছড়াছড়ি হলেও ক্রিকেটের সময় সেটা দেখা যায় না। এর অবশ্য কারণ আছে। কারণ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশও খেলে। এখন কেউ যদি বাংলাদেশ রেখে অন্য দেশের পতাকা টাঙাতে যায় তবে তার ওপর কী ঝড় আসতে পারে সেটার একটা চাক্ষুষ প্রমাণ দেই—

আমার বন্ধু ফয়সাল। সাউথ আফ্রিকার এবিডি ভিলিয়ার্সের বিশাল ভক্ত। বিপিএল খেলতে ভিলিয়ার্স বাংলাদেশে এলে ফয়সাল আমাদের মিষ্টিও খাইয়েছে। গতবার বিশ্বকাপ শুরু হলেও দেখা গেল ফয়সাল বাংলাদেশের পাশাপাশি সাউথ আফ্রিকার পতাকাও লাগিয়ে দিল। এটা দেখে পাড়ার কেউ কেউ তো তার বিরুদ্ধে সমন জারি করে বসল। শাসানো হলো, পতাকা না নামালে তাকে চোখে কাপড় বেঁধে টানা দুই ঘণ্টা কানামাছি খেলতে হবে। ভয়ে বেচারা এবার আর ভুল করেনি। আমার একবার মনে হলো, ক্রিকেট তো ভাতৃত্ববোধ বাড়ায়। পছন্দের আরেক দেশের পতাকা ঝোলালে এমন কী-বা ক্ষতি। কোনো পতাকার অসম্মান না করলেই হয়। একবার ভাবো তো, বাংলাদেশের খেলা দেখে সেটা ভালো লেগে গেল কোনো সাউথ আফ্রিকানের। সে আবার খানিকটা আবেগের বশে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে ঘুরল। তোমার কি ব্যাপারটা ভালো লাগবে না? আমার তো মনে হয় এমনটা ঘটলে সেটা আমাদের জাতীয় দৈনিকের পাতায় উঠে আসবে।

তো যাই বলো, দেশে এখন ক্রিকেট উন্মাদনা। চায়ের দোকান থেকে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত এখন ক্রিকেটই ঘুরেফিরে টক অব দ্য কান্ট্রি।

তবে উন্মাদনায় বাড়াবাড়ি কখনোই ভালো না। গতবারের বিশ্বকাপের একটা ম্যাচে বাংলাদেশ জেতার পর একদল অতি আগ্রহী রাস্তায় নেমে শুরু করলো বাড়াবাড়ি। কেউ কেউ রাস্তায় থাকা দোকানগুলোর শাটারে আঘাত করে বীকট শব্দে চেঁচাতে লাগল। পরে পুলিশের ধাওয়াও খেল তারা। তাই আগেভাগেই বলে রাখি ক্রিকেটের উন্মাদনায় গা ভাসিয়ে আবার উটকো ঝামেলায় পড়তে যেও না।

উন্মাদনায় লাগাম দিলেও ক্রিকেট নিয়ে যদি টু-পাইস কামানোর সুযোগ থাকে, সেটা বাদ দেওয়া ঠিক হবে না। এই যেমন তোমার নিজের ডিজাইন করা খেলোয়াড়দের ক্যারিকেচারযুক্ত পোস্টার থেকে ক্রিকেট স্যুভেনির; এসব বানানোর মোক্ষম সময় তো এখন। আর বাণিজ্যের প্রসঙ্গ এলো যখন তখন রিয়াজ নামে আমার এক কাজিনের ঘটনা ফাঁস না করে থাকতে পারছি না। রিয়াজ প্রায়ই স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যায়। একদিন খেয়াল করলাম সে দুই পকেটে দুটা বল নিয়ে মাঠে যাচ্ছে। ঘটনা কী? ঘটনা ঘটেছিল অতীতের কোনো এক ম্যাচে। ব্যাটসম্যান ছক্কা পেটাবার পর বলটা দর্শক সারিতে গিয়ে পড়েছিল। ফিল্ডার এসে বল ফেরত চাইল। কিন্তু কেউ বলটা খুঁজে পেল না। ওই দর্শকদের মাঝে ছিল রিয়াজ। বিষয়টা নিয়ে সে চিন্তায় পড়ে যায়। বল খুঁজে না পাওয়ায় মাথায় বুদ্ধিটা ভর করে তার। ওই দিনের পর থেকেই পকেটে করে বল নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ছক্কার বল হারিয়ে গেলেই ফিলডারকে প্রস্তাব দেবে, টাকা দিন বল নিন। মাঠে যে অতিরিক্ত বল যথেষ্ট পরিমাণে থাকে, সেটা সম্ভবত তার জানা নেই।

ফিরে আসা যাক উন্মাদনায়। খেলার উত্তেজনায় চিত্কার চেঁচামেচি করে নিজের ভোকাল কার্ডের বারোটা বাজাতেই পারো। কিন্তু পাশের ঘরে বা ফ্ল্যাটে অসুস্থ কেউ থাকলেই বিপদ। তাই অহেতুক আতশবাজি না ফুটিয়ে অন্য কোনোভাবে নেচেগেয়ে আনন্দ করার প্ল্যান করতে পারো। তোমার আনন্দ প্রকাশের মাধ্যমটা যদি অন্য কাউকে বিনোদন দেয় তবেই তো মজার ওপর ডাবল মজা।

প্রতিপক্ষ দলকে সম্মান করতে শেখা উচিত। উন্মাদনা বশত কোনোভাবেই কোনো খেলোয়াড়কে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে যাবে না। বিশেষ করে ফেইসবুকে বা ওই খেলোয়াড়ের পেইজে গিয়ে অহেতুক খোঁচাখুঁচির কী দরকার! ফেইসবুকে কোনো দেশের পতাকা কিংবা জার্সিকে অবমাননা করেও কোনো ট্রোল করতে যাবে না। এতে তোমারই ক্ষতি। কীভাবে? তোমার এমন আক্রমণাত্মক পোস্ট দেখে অনেকেই দেখবে নিভৃতে তোমাকে আনফ্রেন্ড বা আনফলো করে দিয়েছে। আবার বিভিন্ন দলের অফিসিয়াল পেইজ বা কোনো খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত প্রোফাইলে গিয়ে বাজে মন্তব্য করাটা আমাদের মানসিক অপরিপক্কতাকেই ইঙ্গিত করে।

অবশ্য তাই বলে একেবারেই চুপ করে বসে থাকতে বলছি না। যদি মজা করতেই হয় তবে নিজে থেকে দুয়েকটা জোকস বানালে ক্ষতি নেই। যেমন—খেলায় কমসে কম পাঁচটা ক্যাচ মিস করেছে এক উইকেট কিপার। যথারীতি তার কারণেই খেলায় হেরে গেল দল। ম্লান মুখে সবাই বসে আছে, এমন সময় ওই কিপার গেল ক্যাপ্টেনের কাছে ছুটি চাইতে। বলল, এখনই ছুটি দিন। ছ’টার ট্রেনে বাড়ি যাব, টিকেট কেটে রেখেছি। ক্যাপ্টেন বিরস বদনে বলল, ছুটি দিতে আপত্তি নাই। কিন্তু ট্রেনটা ধরতে পারবে তো!

জার্সি কই?

উন্মাদনার লাগাম যেন বেশি টাইট না হয়। কারণ উচ্ছ্বাসের স্রোতে গা না ভাসালে পরে বলার মতো কোনো গল্পও তো পাবে না। গা ভাসানোর আগে গায়ে চাপাও জার্সি। এবার তো রীতিমতো টিভি বিজ্ঞাপন বানিয়ে বিক্রিবাট্টা হচ্ছে জার্সির। ‘জার্সি কই’ বিজ্ঞাপনটা এতক্ষণে নিশ্চয়ই সবার দেখা হয়েছে।

জেনে রাখতে পারো, এবারের বিশ্বকাপের বাংলাদেশের জার্সির স্বত্ত্ব কিনেছে স্পোর্টস অ্যান্ড স্পোর্টস নামের একটি কম্পানি। এবারই প্রথম বিসিবি তাদের জার্সিকে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির চুক্তি করল। বাংলাদেশ দলের জার্সির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৫০ টাকা। মূল জার্সির পাশাপাশি অ্যাওয়ে জার্সিসহ বাংলাদেশ দল যেটা পরে অনুশীলন করে সেটাও পাওয়া যাবে নির্ধারিত আউটলেটে। ফ্যাশন হাউস অঞ্জনস ও জেন্টলপার্কের শতাধিক আউটলেটে বিক্রি হচ্ছে টাইগারদের জার্সি। অনলাইনে বিক্রি করছে ক্রিকশপ বিডি ও জার্সি ফ্রিক বিডি। ডিমানির অ্যাপ ব্যবহার করেও কেনা যাবে জার্সি। আর সারা দেশে জার্সি ছড়িয়ে দিতে আলাদাভাবে কাজ করবে রবিন স্পোর্টস। প্রবাসী দর্শকদের কথাও মাথা রাখা হয়েছে। তাদের জন্য ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে জার্সি বিক্রির পরিকল্পনা আছে স্পোর্টস অ্যান্ড স্পোর্টজের।

 

ক্রিকেটীয় আইডিয়া

ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে এমন আরো সব খবর পাবে ইন্টারনেটে। গুগল কিংবা ইউটিউবে সার্চ করলেও পাবে ঢের তথ্য। তবে এখন যাদের পড়ার চাপটা বেশি তাদের নিশ্চয়ই খেলা দেখা নিয়ে বিস্তর পরামর্শ (মানে বকাঝকা) শুনতে হচ্ছে। কারণ ক্রিকেট তো আর ৯০ মিনিটের ফুটবল না। এখন খেলা দেখার উপায়? কানে কানে একটা বুদ্ধি দিতে পারি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় তো বটেই, চাকরির পরীক্ষাতেও আজকাল সাধারণ জ্ঞান বিভাগে ক্রিকেট নিয়ে এটাওটা প্রশ্ন আসে। আর বিশ্বকাপ ক্রিকেট যেহেতু এখন হচ্ছে, তাই সামনে এমন কোনো পরীক্ষা থাকলে তাতে ক্রিকেট নিয়ে প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা প্রবল। সুতরাং খেলা দেখলে প্রশ্ন কমন পড়তেই পারে!

ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে নতুন কী করা যায় বা কিভাবে আরো মজা করা যায় সেটা নিয়ে দলছুটের পক্ষে খোঁজখবর করেছিলাম। দলছুট বন্ধুরা ভালোই সাড়া দিয়েছে। চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আলী মাহমুদ একটি পুরনো আইডিয়ার কথা আবারো স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। সেটা হলো ওয়ার্ল্ড কাপ পিকনিক। আগে ফিফা ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপেও দেখা গেছে যে বিশেষ দলের খেলা উপলক্ষে পিকনিকের আয়োজন করত বন্ধুরা মিলে। মাঝেমধ্যে তো নিজেরাই ডাল-চাল উনুনে বসিয়ে রান্না করে ফেলতো সুস্বাদু খিচুড়ি। ক্রিকেট বিশ্বকাপেও করা যায়। এবার শুধু বাংলাদেশের ম্যাচই আছে নয়টি। তাই সামনের ম্যাচগুলোতে যদি ছোটখাটো পার্টি হয় তবে এ বিশ্বকাপ যে স্মরণীয় হবে থাকবে তা তো বুঝতেই পারছো।

সদ্য এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতি নিতে থাকা আহমদ আলী রাজুর কথা ভিন্ন। পড়ুয়া রাজু ক্রিকেটেও পড়তে চায়। খেলার মাঝ বিরতিতে কুইজ খেলার আইডিয়াটা দিল সে। এতে নাকি খেলায় মনযোগ বাড়বে। মনে থাকবে টুকটাক অনেক তথ্য। তিন-চারজন বন্ধু মিলে মাঝবিরতিতে বা খেলার শেষে একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করবে, উত্তর দিতে পারলে মিলবে পয়েন্ট। শর্ত হলো, যে প্রশ্ন করবে তাকে সেই প্রশ্নের উত্তর জানা থাকতে হবে। এ খেলায় যার পয়েন্ট কম হবে তার ঘাড়ে পড়বে বাকিদের বিরিয়ানি খাওয়ানোর দায়িত্ব!

একসঙ্গে খেলা দেখতে বসলে আনন্দ উদযাপনের অভিনব একটা আইডিয়া দিল ঢাকার মিসবাহ পাটোয়ারী। খেলার শুরুতে নিয়ম ঘোষণা করা হবে—বাংলাদেশ দলের প্রতিটি চারের সঙ্গে একজন উঠে গিয়ে নাগিন নৃত্য পরিবেশন করবে। পরেরবার চার হলে আরেকজনকে দেখাতে হবে উচ্চাঙ্গ নৃত্য।

গুরুগম্ভীর শোনালেও বেশ মজার একটা আইডিয়া দিল পাবনার নাফিসা নাজনীন। তার মতে, বাংলাদেশ দল জিতে যাওয়ার পর ত্বারস্বরে চিত্কার কিংবা দোকানের শাটারে আঘাত না করে সবাই যদি বাঁশি, ঢোল আর ব্যান্ডপার্টির মতো সেজে বের হয়ে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে গান গাইতো তবে এ জয় আমাদের মধ্যে অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে দিত বহুগুণ। ক্রিকেটের কারণে দেখা গেল অন্যসব দিকেও জিতে যাওয়ার একটা তাগিদ পেতাম আমরা।

তোমার মাথায় বিশ্বকাপ নিয়ে এরকম মজাদার কিংবা বুদ্ধিদীপ্ত নতুন কোন আইডিয়া থাকলে দলছুট-এর গ্রুপে বা ইমেইলে জানাতে পারো। বিশ্বকাপের দিনগুলোতে ক্রিকেট নিয়ে তোমার মজার অভিজ্ঞতাও পাঠাতে পারো।

একটি ক্রিকেটীয় জোকস দিয়ে শেষ করা যাক। স্বর্গ ও নরকের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হলো। স্বর্গের বাসিন্দারা খেলায় জেতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। কারণ ভালো ভালো সব ব্যাটসম্যান-বোলার স্বর্গে আছে। নরকের বাসিন্দাদের এ নিয়ে চিন্তিত দেখা গেল না। তাদের নিশ্চিন্ত ভাবভঙ্গি দেখে স্বর্গ টিমের অধিনায়ক বললেন, কী ব্যাপার, তোমাদের তো ব্যাটসম্যান বোলার কিছু নেই। তা-ও এমন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছো। শয়তানি হাসি হেসে নরক টিমের ক্যাপ্টেন বলল, তোমাদের যতই বোলার-ব্যাটসম্যান থাকুক, বিতর্কিত সব আম্পায়ার তো সব আমাদের দলে!

মন্তব্য