kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

বৈশাখী আনন্দে মাতো

বৈশাখ আবার আইল রে

সবার উৎসব পহেলা বৈশাখ। কিন্তু কী হবে এ উত্সবে? দিনভর রোদে ঘোরাঘুরি আর দুপুর না পেরোতেই একগাদা ক্লান্তি? বৈশাখের ষোলো আনা আদায় করতে চাই দুর্দান্ত পরিকল্পনা। সেটা মাথা খাটিয়েই বের করো। আর মাথা খাটানোর সুবিধার্থে কিছু উপায় বলে দিচ্ছেন জুবায়ের ইবনে কামাল

৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বৈশাখ আবার আইল রে

বৈশাখের দিন তানহার মতো হাতে এমন একটা বাহারি পাখা থাকলে বাড়তি সাজের আর কী দরকার!

বৈশাখ নিয়ে বড় সমস্যা—এটা বছরের এমন একটা সময়ে আসে, যে সময় দেশজুড়ে চলে কোনো না কোনো বড় পরীক্ষা (যেমন—এইচএসসি)। এমনই এক অবস্থায় আমার মামাতো ভাই অন্তর চিন্তা করল, পরীক্ষার মাঝেও সে টিএসসিতে ঘুরতে যাবে। তাই এখন থেকেই একটা দিনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য কোন অজুহাতটা তৈরি করা যায়, সেটা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ও। ওর কানে কানে বললাম, বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টিও তো পড়াশোনার বিষয়। আর দল বেঁধে বৈশাখে ঘুরতে যাওয়া মানে এক ধরনের গ্রুপ স্টাডি। ব্যস, তাকে আর পায় কে। 

বর্ষবরণের এ উত্সব এখন আমাদের, মানে বাঙালিদের সেরা উত্সব। কিন্তু এর ইতিহাসটা একটু আলাদা। চলো জেনে নেওয়া যাক, কেমন করে এলো পহেলা বৈশাখ।

 

একনজরে ইতিহাস

ভারতবর্ষে মোগল সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষির ফলনের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে খাজনা পরিশোধ নিয়ে বিপদে পড়ত কৃষকরা। খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্যই পরে  মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন একটি পঞ্জিকা সংস্কার করেই নতুন ক্যালেন্ডার বানান। সম্রাটের আদেশে তত্কালীন বিখ্যাত ইরানি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ সিরাজিকে সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের রূপরেখা বানান। পরে আকবরের নির্দেশে তাঁর সিংহাসনে আরোহণের দিন তথা ১৫৫৬ সাল (হিজরি ৯৬৩) থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। মজার বিষয় হলো, বাংলা সন কিন্তু ০ সাল থেকে শুরু হয়নি। ৯৬৩ হিজরি সন থেকে ৯৬৩ বাংলা সনের শুরু। এরপর হিজরি পঞ্জিকা ১৪ বছর এগিয়ে গেলেও বাংলা পঞ্জিকা তাল মিলিয়ে চলেছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গেই। সেই সূত্রেই এবার ১৪২৬ সন হতে চলেছে বাংলায়। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। আরেকটি বিষয় জেনে রাখো, ইংরেজি সালের মতো বাংলায়ও লিপ-ইয়ার আছে। ফেব্রুয়ারির সঙ্গে মিল রাখতে চার বছর পর পর অতিরিক্ত দিনটি যোগ হয় ফাল্গুন মাসের সঙ্গে।

 

বৈশাখে কী করি

ইতিহাস তো শুনলাম। কিন্তু খাজনা আদায় তো এখন বন্ধ। তো এবারের পহেলা বৈশাখে কী করা যায়! বৈশাখ উপলক্ষে পরিবারের বড়দের কাছ থেকে অল্পবিস্তর খাজনা তুমি আদায় করতেই পারো। তবে সেটা দিয়েও কী করবে। অনেকেই দিনটা কাটায় কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। টিনএজারদের ওপর এ নিয়ে অপবাদ আছে যে তারা শুধু শুধু ঘোরাঘুরি আর নাচানাচি করে দিনটা কাটায়। কত্থক বা তাণ্ডব নৃত্য নাচলেও কথা ছিল; কিন্তু হৈ-হুল্লোড় বলতে ভুভুজেলাতেই তো কান পাতা দায়। তা ছাড়া আমাদের মতো টিনরা নাকি কোনো মজাই করতে শিখিনি। ব্যাপারটা মোটেও যে এমন না, সেটা এবার প্রমাণ করেই ছাড়ো।

যেহেতু বর্ষবরণের দিন রঙিন পাঞ্জাবি কিংবা ফতুয়া পরার একটা রেওয়াজ আছে, সেহেতু বন্ধুরা মিলে চাঁদা তুলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের গায়ে চাপিয়ে দিতে পারো বৈশাখী পাঞ্জাবি। সেটা সম্ভব না হলে অন্তত তাদের হাতে মণ্ডা মিঠাই তুলে দিতে তো বাধা নেই। দেখবে,  বড়রাও অনেকে কাজটা করছে না।

 

আচ্ছা, বৈশাখ উপলক্ষে নতুন ডিজাইনের জন্য বাজারে হন্যে হয়ে ঘোরাটা কি খুব জরুরি? তুমিই করে ফেলতে পারো নকশা। নিজের নকশায় জামা পরার আনন্দ যে কী তা আর বলে দিতে হবে? তোমাদের বন্ধুদের মধ্যে যে ভালো আঁকিয়ে, তাকে তোমার আইডিয়াটা বুঝিয়েসুঝিয়েও আদায় করে নিতে পারো একখানা হ্যান্ডপেইন্ট ফতুয়া বা টি-শার্ট।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট শেখার হাতেখড়ি হিসেবে সকালের পান্তা-ভর্তা-মাছ রেসিপি তৈরি করে সেটা বিক্রি করার স্টলও বসাতে পারো। এতে লাভ হোক না হোক, একটা কিছু আয়োজন করার জড়তা তো কাটবে। সঙ্গে বৈশাখী একটা মজাও পাবে নিশ্চিত। বৈশাখী বাজার, খাবার রান্না, সেটা অন্যদের খাওয়ানো; বৈশাখ মানে যে বাঙালি আতিথেয়তার একটা উত্সব, সেই অনুভূতিটাও টের পাবে খুব করে।

তবে গত বছর আবার আমার মতো করতে গিয়ে খেয়ো না। গতবারের বর্ষবরণ উত্সবের জন্য ইলিশ কিনতে গিয়ে দাম শুনে জ্ঞান হারানোর দশা। পরে বুদ্ধি করে ছোট সাইজের সরপুঁটি মাছ কিনে সেটা কড়া করে ভেজে নিলাম। সেটা খেতে খেতে সবাই বলছিলাম, এই দেখো পান্তা-ইলিশ খাচ্ছি। কিন্তু সবাই মিলে যখন ‘তুই জাটকা কেন কিনলি’ বলে আমার ওপর অ্যাটাক করল...। যা-ই হোক, তখনই প্রতিজ্ঞা করেছি, বৈশাখের সঙ্গে আর বেচারা ইলিশ মাছকে জড়াব না।

বাসার মেঝে, সিলিং, দেয়াল—সব আলপনা করে পুরো ঘরটাকে একটা আর্ট গ্যালারি বানিয়ে ফেলো এই সুযোগে। আলপনা আঁকার রংটা খুব একটা দামি নয়। অবশ্য আগে থেকে সামান্য শিল্পকলা প্র্যাকটিস করে নিয়ো। তা না হলে বৈশাখের আগেই বাসায় কালবোশেখি শুরু হয়ে যেতে পারে।

এবার ঘুরতে যাওয়ার পালা। বৈশাখ মানেই বৈশাখী মেলা। এই মেলার আসল স্বাদ পেতে যেতে হবে গ্রামের বাড়ি কিংবা এমন কোনো বন্ধুর বাড়ি, যেখানে জম্পেশ মেলা হয়। রাজধানীতে মেলার জায়গা কম। টিএসসি আর ধানমণ্ডি লেক ছাড়া যেতে পারো পুরান ঢাকার ধূপখোলা মাঠে।

মেলার স্টলগুলো ঘুরে তো দেখবেই, চড়তে পারো নাগরদোলায়, অংশ নিতে পারো নানা খেলায়। নাগরদোলায় ওঠার আগে যাচাই করে নিয়ো নাগরদোলার কাঠ আর জয়েন্টগুলো মজবুত কি না। কেননা এই নাগরদোলা দুর্ঘটনার কথাও শোনা যায় বৈশাখী মেলায়।

চাইলে তোমরা কয়েকজন মিলেও কিছু খেলা বানিয়ে নিতে পারো মেলা প্রাঙ্গণে। যেমন মেলার মধ্যে একটা মোটাসোটা বাঁশ বিছিয়ে দিয়ে ঘোষণা দিতে পারো, যে এই বাঁশ বেয়ে এই মাথা থেকে ওই মাথায় যেতে পারবে, তার জন্য রয়েছে একটা ক্যান্ডি। দেখো কেমন সাড়া পাও!

যারা বাঁশি শিখতে চাও বা বাজাতে পারো, তারা দু-একটা বাঁশি কিনে ফেলো। তবে প্লাস্টিকের বিকট শব্দদূষণকারী বাঁশি যেন তোমার কোনো বন্ধু না কেনে, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কিন্তু তোমারই। ছোটদের জন্য একটা খাজনা কিন্তু রাখা চাই। ডুগডুগি, টেপা পুতুল, পঙ্খিরাজ ঘোড়া, বাঁদর নাচ, টিনের তৈরি খেলনা স্টিমার—এমন অনেক পুরনো খেলনা পাবে এসব মেলায়, যেগুলো কোনো সুপারশপেও পাবে না। এসব ঐতিহ্যবাহী খেলনা জমানোর শখ থাকলে পহেলা বৈশাখের দিনটাই কিন্তু সেরা। আর এগুলো পেয়ে শুধু ছোটরা নয়, দেখবে তোমার পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়সী বড় ভাইরাও দারুণ নস্টালজিক হয়ে পড়বেন।

বরাবরই রাজধানীর পহেলা বৈশাখের মূল কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এবার নতুনত্ব আনতে চাইলে সকাল সকাল দল বেঁধে চলে যেতে পারো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাবিতে গেলে চারুকলায় ঢু মেরে আসবে সবার আগে। সেখানে এদিন সাজসাজরব। চলবে ছবি আঁকাআঁকি আর এটা-ওটা বানানোর মেলা। হাতে যেহেতু সময় আছে, তাই ১৪ তারিখের আগেই যেতে পারো সেখানে। বর্ষবরণের প্রস্তুতিটা দেখার মজাও আদায় করে নাও।

বর্ষবরণের দিন খুব সকালেই চারুকলার সামনে থেকে শুরু হয় দেশের সবচেয়ে বড় মঙ্গল শোভাযাত্রা। অংশ নিতে পারো তাতেও। নিরাপত্তার খাতিরে এবারও হয়তো মঙ্গল শোভাযাত্রা চলাকালে কেউ মুখোশ পরা অবস্থায় থাকতে পারবে না। তবে হাতে রাখতে পারবে। সেদিন শাহবাগ থেকে শুরু করে টিএসসি, বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকবে প্রচুর মানুষের সমাগম। সঙ্গে পানির বোতল, ছাতাসহ একটা ব্যাকপ্যাক রাখতেই হবে। কারণ আশপাশে অনেক খুঁজেও তুমি বিশুদ্ধ পানি পাবে না। সেদিন হয়তো ফুটপাতে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না। ছোট ভাই-বোন নিয়ে গেলে সাবধান! হাত ছাড়লেই হারিয়ে যেতে পারে ভিড়ের মধ্যে। তবে বেশি ঘাবড়ে না গিয়ে চটজলদি সেটা জানাও দায়িত্বরত পুলিশকে।

ছায়ানট কিংবা রবীন্দ্রসরোবর—সবখানেই থাকে বড় মাপের আয়োজন। সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসরোবরে গিয়ে শুনে আসতে পারো রবীন্দ্রসংগীতসহ আরো অনেক দেশাত্মবোধক গান।

বন্ধুদের নিয়ে দিনটার ষোলো আনা আদায় করতে না পারলে কিন্তু মিস করলে। আর যদি হও আমার মতো এইচএসসি পরীক্ষার্থী, তবে আর কী করা। টিভিতে অনুষ্ঠান দেখো আর মনে মনে প্রার্থনা করো—বৈশাখকে যতই আকুল গলায় সবাই এসো এসো করুক, সে যেন পরীক্ষার মাঝে না আসে।

বায়োস্কোপ দেখছে জাসিয়া ও তানিসা, এরপর দেখবে শ্রাবণী, লাবন্য ও তানহা

বৈশাখী খেলনায় শৈশবে হারিয়েছে ফাইরাজ (বাঁয়ে) ও ফারাবি

মন্তব্য