kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ফোকাস

ব্রাজিল যাচ্ছে ওরা

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে আয়োজিত অনূর্ধ্ব-১৫ ডেভেলপমেন্ট কাপ ও অনূর্ধ্ব-১৭ বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপে সেরা হয়েছিল ২০ জন। সেখান থেকে বাছাই করা হয়েছে সেরা চারজনকে। এ মাসেই এক বছরের জন্য ব্রাজিলে প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছে নাহিদ, নাজমুল, জগেন ও মিঠু। তাদের ব্রাজিলযাত্রার গল্পটা জানাচ্ছেন গাজী খায়রুল আলম

১৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ব্রাজিল যাচ্ছে ওরা

ফুটবল খেলার জুতা ছিল না

কুড়িগ্রামের ছেলে ওমর ফারুক মিঠু পাড়ায় জনপ্রিয় ছিল ভালো ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে। যখন ব্রাজিলে প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ পায়, তার থেকে বেশি খুশি হয় কাছের মানুষগুলো। ব্রাজিলে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে ফারুক বলে, আমি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকে ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার জন্য নিজে নিজেই চেষ্টা করতাম। পড়াশোনার ক্ষতি হবে বলে মা-বাবা তেমন সাপোর্ট করতেন না। আমার যেদিন পিএসসি পরীক্ষা শেষ হয়, সেদিনই মা-বাবাকে না জানিয়ে ভর্তি হই ভূরুঙ্গামারী ফুটবল একাডেমিতে। মা-বাবার অজান্তে গিয়ে সেখানে প্রশিক্ষণ নিতাম। প্রশিক্ষণ শেষে বাড়ি ফিরলে মা জিজ্ঞেস করলে বলতাম, পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছি। মজার বিষয় হলো, তখন আমার নিজের কোনো ফুটবল খেলার জুতা ছিল না। তাই এক বড় ভাই থেকে পুরনো এক জোড়া জুতা কিনে নিলাম। আমার পায়ের মাপ তখন পাঁচ; কিন্তু আমি কিনেছিলাম আট সাইজের জুতা। জুতার ভেতরে কাপড়ের টুকরা ঢুকিয়ে সেটি দিয়ে কোনো রকম খেলতাম। ভূরুঙ্গামারী প্রশিক্ষণরত অবস্থায় বিকেএসপির জেলাভিত্তিক একটি ট্রায়াল হয়। ট্রায়ালে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে তারা ক্যাম্প করে। কুড়িগ্রাম থেকে একজন বাছাই করে—সেটি আমাকে। তারা তিন মাসের মতো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এটি শুনে বাসায় সবাই খুশি হয়। কিন্তু আমার ভর্তির সুযোগ হয়নি। কেন ভর্তি হতে পারিনি, এটি জানি না। তার পর থেকে আমি রেগুলার ঢাকায় যাওয়া শুরু করি। একটা সময় আরামবাগ ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পাই। আরামবাগের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৫/১৬ দলে ২০১৭ সালে আমি ক্যাপ্টেন্সি করি। ১০ নম্বর জার্সি নিয়ে মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেও ১৬টি গোল করি। তারপর জেলাভিত্তিক খেলায় রংপুরের হয়ে খেলার সুযোগ পাই। রংপুর জেলাদল যখন ডেভেলপমেন্ট কাপ খেলে, আমি ভাইস ক্যাপ্টেন ছিলাম, তখন আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। পরেরবার আমি ক্যাপ্টেন ছিলাম, সেখানেও আমরা চ্যাম্পিয়ন হই।  এভাবে সফল হওয়ার পর যুব গেমস খেললাম। আবাহনীতে অনূর্ধ্ব-১৮ খেলেছি। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। ছোটবেলা থেকে ফুটবল আমার কাছে অনেক ভালো লাগে। ২০১০ বিশ্বকাপে ফুটবলটি আমি ভালোভাবে উপভোগ করতে পেরেছি। ব্রাজিলে গেলে অবশ্যই সুযোগ পেলে প্রিয় খেলোয়াড় নেইমারের সঙ্গে দেখা করব। আর দেশ থেকে যে আশা নিয়ে আমাদের পাঠানো হচ্ছে, সেটি সফল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

নেইমারের কাছ থেকে টিপস নিতে চাই

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ছেলে জগেন লাকরা স্বপ্ন দেখত একজন ভালো ফুটবলার হওয়ার। কিন্তু ফুটবলার হিসেবে ব্রাজিল যাবে—এটি কখনো চিন্তাও করেনি। স্কুলের খেলায় ভালো করত বলে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ই সুযোগ পায় গোদাগাড়ী উপজেলা ফুটবল টিমে। সেখানেই ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন শুরু। জগেন বলল, শহরে গিয়ে ভালো ক্লাবে খেলব, সে সুযোগ ছিল না। একসময় খবর পেলাম, আমাদের রাজশাহী বিভাগের জন্য অনূর্ধ্ব-১৭ টিম গঠন করা হবে। সেই টিম দিয়ে খেলা হবে অনূর্ধ্ব-১৭ বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ। রাজশাহী টিমের বাছাই পর্বে গেলাম। প্রাথমিক বাছাইয়ে আমাকে রাখা হলো। তারপর কিছুদিনের একটি ট্রায়াল শুরু হলো। সেখানে ফরোয়ার্ড হিসেবে আমাকে সিলেক্ট করা হলো। আমার স্বপ্ন তখন একটু একটু করে এগিয়ে যেতে লাগল। ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপে আমাদের রাজশাহী বিভাগ রানার্স আপ হয়। ওই কাপে আমি তিনটি গোল করি। তখন আবার বাফুফে থেকে ব্রাজিলে নেওয়ার জন্য প্লেয়ার বাছাই চলছিল। তারা প্রাথমিক ২০ জনের দলে আমাকে রাখল। কিছুদিনের মধ্যে ট্রায়ালের জন্য ২০ জনকে ডাকা হলো। সেখানেও আমি ভালো করি, ফলে সেরা চারজনের মধ্যে স্ট্রাইকার হিসেবে আমাকেই নির্বাচন করা হয়। আমি জানি, আমার অনেক শেখার বাকি আছে। এখনো ফুটবল নিয়ে আমার অনেক দুর্বল দিক আছে। আশা করি, ব্রাজিলে গিয়ে সেটা কাটিয়ে ফেলব। ব্রাজিল আমার ফেভারিট। সে দেশের সব খেলোয়াড়ই প্রিয়। নেইমার একটু বেশি প্রিয়। সুযোগ পেলে দেখা করে টিপস নিতে চাই।

 

এখন দায়িত্ব অনেক বেড়েছে

লতিফুর রহমান নাহিদ রংপুরের ছেলে। পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টুমি করেই সময় পার হতো। কিন্তু ফুটবলে ছিল দারুণ দক্ষ। ফুটবলের প্রশিক্ষণ নিতে ব্রাজিলে যাবে—কথাটি শুনতেই চোখে পানি চলে আসে নাহিদের। যখন কমিটি থেকে নাম ঘোষণা করে ফোন দেওয়া হয়, নাহিদ বলতে গেলে বাকরুদ্ধ।

যদিও নাহিদের তেমন একটা প্রশিক্ষণ নেওয়া ছিল না। নাহিদ জানাল, আমার ফুটবলজীবন শুরু গ্রামের খেলার মাঠে। সেখানে ভালো খেলতাম বলে আন্ত স্কুল ফুটবল টিমে আমাকে জায়গা দেওয়া হয়। স্কুলভিত্তিক খেলায় ভালো ছিলাম। মিডফিল্ডার হিসেবে গোল করা ও গোল কারানোর দক্ষতা আছে আমার। আমার এই পারফরম্যান্স দেখে অনেকে মুগ্ধ হতো। তারাই আমাকে ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। নিজের ঝোঁক ও প্রিয়জনদের পরামর্শের কারণে ২০১৭ সালে ভর্তি হই রংপুর ফুটবল একাডেমিতে।

সেখানে বেশিদিন খেলতে হয়নি। এক বছরের মাথায় সুযোগ আসে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৬ বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ খেলার। সেখানে ভালো খেলার কারণে বাফুফের ট্রায়ালে ডাক পাই। এরপর সেরা চারে উঠে আসি। ব্রাজিল বলতে গেলে আমার স্বপ্নের দেশ, সেখানে যাওয়া মানে বিশাল কিছু। ভালোভাবে ট্রায়াল দিলাম এবং আমাকে মিডফিল্ডার হিসেবে সিলেক্ট করা হলো।

এখন মনে হচ্ছে, দায়িত্ব অনেক বেড়েছে। আগে মনের আনন্দ নিয়ে ফুটবল খেলতাম। এখন দেশের হয়ে ভালো কিছু করার তাগিদ কাজ করছে। আমাদের যে উদ্দেশ্যে ব্রাজিলে পাঠানো হচ্ছে, সে উদ্দেশ্য সফল করতে আপ্রাণ চেষ্টা করব। ইচ্ছা আছে নেইমার ও কাকার সঙ্গে দেখা করার। দুজনই আমার প্রিয়।

দিন-রাত পরিশ্রম করেছি

ডিফেন্ডার হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছে রংপুরের ছেলে নাজমুল আকন্দ। যদিও স্বপ্নটা শুরুতে এত বড় ছিল না। বাংলাদেশ জাতীয় টিমের হয়ে খেলাটাই তার স্বপ্ন ছিল। খেলেছে কাতারে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ কাপে জাতীয় দলের হয়েও। সেখানে ভালো করেছে নাজমুল। নাজমুল জানাল, আন্ত স্কুল টিমের হয়ে ডিফেন্ডার হিসেবে সব সময়ই আমি ভালো খেলতাম। সেখানে ভালো খেলার কারণে অনেকে ক্লাবে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। মা-বাবাকে বলত, তারা যেন আমাকে রংপুর জেলা ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন। আমার একাডেমিকভাবে ফুটবল লাইফ শুরু ২০১৭ সালে। ওই বছরই রংপুর বিভাগের অনূর্ধ্ব-১৬ টিম গঠন করা হয়। সেখানে আমি ট্রায়ালের মাধ্যমে সুযোগ পাই। জেলাভিত্তিক খেলায় ভালো করি। তারপর যখন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডেভেলপমেন্ট কাপ হয় ২০১৭ সালে, আমি রংপুর বিভাগের হয়ে খেলার সুযোগ পাই। এ কাপে ডিফেন্ডার হিসেবে ভালো করি। যার ফলে অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দল গঠন করার জন্য ট্রায়ালে আমাকে ডাকা হয়। ট্রায়ালের মধ্যে ভালো করে অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলের হয়ে কাতারে এএফসি কাপ খেলতে যাই। দেশে এসে যখন শুনলাম, ব্রাজিলে নেওয়ার জন্য চারজন খেলোয়াড় বাছাই করা হবে, তখন নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করি। শুরু হয় বাড়তি ঘাম ঝরানোর পালা। দিন-রাত পরিশ্রম করেছি। এর মাঝে শুরু হয়ে গেল অনূর্ধ্ব-১৭ বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ। ডিফেন্ডার হিসেবে খেলি চ্যাম্পিয়ন রংপুরের হয়ে। সেখানেও ভালো করলাম। যার ফলে ট্রায়ালে ডাক পাই। ২০ জনকে ২১ দিনের ট্রায়াল দেওয়া হয়। ট্রায়ালে আমাকে বাছাই করা হয়। আশা করি, ব্রাজিলে গিয়ে নিজের দুর্বল দিকগুলো উন্নত করে আসব। সুযোগ পেলে রবার্তো কার্লোসের সঙ্গে দেখা করব। ডিফেন্ডার হিসেবে ভালো খেলার পরামর্শ চাইব। আর ভবিষ্যতে দেশের হয়ে ভালো কিছু করতে চাই। বাংলাদেশের ফুটবল টিমকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে চাই।

মন্তব্য