kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

বিজ্ঞান

গাছের ইন্টারনেট

৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গাছের ইন্টারনেট

গহিন জঙ্গল মানে সুনসান গাছপালায় ভরপুর সবুজে ছাওয়া আলাদা এক জগৎ যেন। কিন্তু যদি বলি, ওই জগতেও অনবরত তথ্য আদান হয়, মাটির তলায় যাদের আছে এক আলাদা ইন্টারনেট। বৃক্ষরাশির এক অদ্ভুত নেটওয়ার্কের কথা জানাচ্ছেন কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব

 

লুকায়িত সাইবার ক্যাফে বললে ভুল হবে না। প্রত্যেকে একে অন্যের সঙ্গে খোশগল্পে মশগুল। শুধু গল্পই নয়, একের বিপদে অন্যে সাড়াও দেয়। খাবারদাবারও ভাগ-বাটোয়ারা করে খায়। এমনই এক পারস্পরিক উপকারের নেটওয়ার্ক বজায় রেখে চলেছে গাছেরা।

 

উডওয়াইড ওয়েব

একটা গাছকে আপাতদৃষ্টিতে একাকী চুপচাপ ভদ্রলোকের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলো তলে তলে মানে শেকড়ে শেকড়ে চলে হাজারটা কাজ। শুনে অবাক হবে যে আমরা যেমন মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করি, গাছেদেরও আছে নিজস্ব যোগাযোগব্যবস্থা। এ কাজটা মাটির নিচে খুব দক্ষতার সঙ্গেই সম্পন্ন করে ওরা। আমরা যেমন ইন্টারনেট ব্যবহার করি, গাছেরা ব্যবহার করে ছত্রাকের নেটওয়ার্ক। ছত্রাকের সুতার মতো দেহকে বলে হাইফা। এই হাইফাগুলো দেখতে সরু নলের মতো। অনেক হাইফা মিলে যখন জালের মতো অংশ গঠন করে, তখন তাকে মাইসেলিয়াম বলা হয়। আর বুদ্ধিমান গাছেরা এই মাইমেসিয়া নেটওয়ার্কটাকে ভূ-অভ্যন্তেরর ইন্টারনেট হিসেবে কাজে লাগায়। এই মাইসেলিয়া নেটওয়ার্ক মাটির ভেতর উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গড়ে তোলে এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক। রিভলিভ ডটকম থেকে জানা যায়, ১৮৮৫ সালে জার্মান জীববিজ্ঞানী আলবার্ট বার্নার্ড ফ্র্যাংক ছত্রাকের সঙ্গে উদ্ভিদের এ দোস্তিকে মাইকোরাইজাল অ্যাসোসিয়েশন নাম দেন। শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ মাইকোস এবং রাইজা থেকে এসেছে। মাইকোস অর্থ ছত্রাক আর রাইজা অর্থ মূল বা শিকড়। এই মাইকোরাইজাল অ্যাসোসিয়েশনে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে উদ্ভিদ ছত্রাকের খাবার জোগায় আর তার বিনিময়ে ছত্রাক উদ্ভিদকে পানি শোষণ করতে সহায়তা করে এবং ফসফরাস, নাইট্রোজেনসহ নানা পুষ্টির উপাদান সরবরাহ করে।

বিবিসি থেকে জানা যায়, ১৯৬০ সালে এই মাইকোরাইজা অ্যাসোসিয়েশনের ওপর উদ্ভিদের নির্ভরশীলতার ব্যাপারটা প্রমাণিত হয়। ২০০৮ সালে টেড টকে যুক্তরাষ্ট্রের ছত্রাক বিশেষজ্ঞ পল স্ট্যামেটস উদ্ভিদের এই যোগাযোগব্যবস্থাকে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ইন্টারনেট বলে আখ্যায়িত করেন।

১৯৭০-এর দিকে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে ছত্রাক নিয়ে পরীক্ষারত অবস্থায় পল স্ট্যামেটস ছত্রাকের মাইসেলিয়াম নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্সের ইন্টারনেটের একেবারে প্রথম সংস্করণ, তথা আরপানেটের মধ্যে মিল খুঁজে পান। আর এ জন্যই ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েব বা ডাব্লিউ ডাব্লিউ ডাব্লিউয়ের আদলে এর নাম হয়ে যায় উডওয়াইড ওয়েব।

 

ভাগ করে খাই

বাসায় ভালো খাবার আনলে যেমন সব ভাই-বোন ভাগ করে খায়। সেভাবেই উদ্ভিদরা নিজেদের মধ্যে খাবার ভাগাভাগি করে। ১৯৯৭ সালের দিকে ভ্যাঙ্কুভারের ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সুজান সিমার্ড দেখান যে ডগলাস ফার নামের এক ধরনের পাইনগাছ এবং পেপার বার্চগাছ একে অপরের সঙ্গে মাইসেলিয়ার সাহায্যে কার্বন ভাগাভাগি করছে। উদ্ভিদরা নিজেদের মধ্যে এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান ফসফরাস ও নাইট্রোজেন আদান-প্রদান করে। সিমার্ড আরো মনে করেন, মা গাছ তার নবজাতকদের এই ছত্রাকের জালের মাধ্যমে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। ব্যাপারটা ১৯৯৭ সালের এক গবেষণায় স্পষ্ট হয়। সেখানে দেখা যায়, ছায়ার মধ্যে থাকা ছোট গাছগুলোর খাদ্যসংকট হয় বলে বড় বড় গাছ সেখানে কার্বন পাঠিয়ে সাহায্য করে। অর্থাৎ গাছ শুধু মানুষেরই না। নিজেদের মধ্যেও ভালো সম্পর্ক রাখে। নিউইয়র্কার ডটকম থেকে জানা যায়, মুমূর্ষু গাছ অন্য প্রতিবেশীদের কল্যাণের জন্য নাকি নিজের সব খাবার বিলিয়ে দেয়। কারণ সে জানে সে বাঁচবে না, তাই খাবার নষ্ট করে না।

 

বিপত্সংকেত

উদ্ভিদ যখন ক্ষতিকর ছত্রাক দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন তারা তাদের প্রতিবেশী উদ্ভিদকে মাইসেলিয়ার মাধ্যমে রাসায়নিক সতর্কবার্তা পাঠায়। ২০১০ সালে সাউথ গুয়ানঝুয়ে অবস্থিত চায়না অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির রেন সেন যেং-এ বিষয়টি টমেটোগাছের মাধ্যমে প্রমাণ করেন। তাঁর দল অনেক পাত্রে এক জোড়া করে টমেটোগাছ লাগান। সেসব পাত্রের কোনো কোনোটায় মাইকোরাইজা গঠন করতে দেওয়া হয়। অর্থাৎ তাদের মধ্যে উডওয়াইড ওয়েব সুবিধা দেওয়া হয়। আর অন্যগুলোতে মাইসেলিয়া সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এরপর প্রতি পাত্রের যেকোনো একটি গাছের পাতায় অল্টার্নারিয়া সোলানি নামের একটি ক্ষতিকর ছত্রাক স্প্রে করেন। এরপর তা এয়ারটাইট ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, যাতে বাতাসের মাধ্যমে কোনো রাসায়নিকসংকেত দ্বিতীয় গাছে না পৌঁছায়। ৬৫ ঘণ্টা পর রেন সেন যেং প্রতি পাত্রের দ্বিতীয় গাছটিকে রোগাক্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি অবাক হয়ে দেখেন, যেসব জোড়ায় মাইসেলিয়াম নেটওয়ার্ক ছিল, সেসবের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গাছটা কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মানে দ্বিতীয় গাছটাকে প্রথমে আক্রান্ত গাছটা সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দিয়েছে। ফলে সে সাবধান হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বিষয়ে ২০১০ সালে প্লাস ওয়ান জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ হয়। এ লিংকে এ বিষয়ে আরো জানতে পারবে। https://journals.plos.org/plosone/article?id=10.1371/journal.pone.0013324।   শুধু টমেটো নয়, ২০১৩ সালে আবেরদিন ইউনিভার্সিটির ডেভিড জনসন এবং তাঁর দল ব্রড বিন নামের একটি উদ্ভিদে একই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখেন। এ ক্ষেত্রে এই উদ্ভিদ এফিড নামের পোকার বিরুদ্ধে একে অপরকে সতর্ক করে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে।

 

হ্যাকার গাছ!

আমরা তো এতক্ষণ উদ্ভিদদের নিজস্ব ইন্টারনেটের ভালো ব্যবহারগুলো দেখলাম। জেনে অবাক হবেন যে তাদের মধ্যে কিছু হ্যাকারগোষ্ঠীও আছে। উদ্ভিদজগতের এই দুষ্ট সদস্যরা অন্য গোবেচারা উদ্ভিদদের খাবারে অন্যায়ভাবে ভাগ বসায়। এমনকি নীরবে বিষাক্ত পদার্থ ছেড়ে দিয়ে তাদের বৃদ্ধি ব্যাহত করতেও দ্বিধা করে না। সিনসিনাটি ম্যাগাজিনের ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অব প্ল্যান্টস’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, এরা নাকি মৃত্যুর হুমকিও দেয়। এ হ্যাকারগোষ্ঠীর একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এদের ক্লোরোফিল নেই, ফলে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের খাদ্য বানাতে পারে না। এ ধরনের একটা গাছ হলো ফ্যান্টম অর্কিড। তারা নিকটবর্তী গাছ থেকে মাইসেলিয়ার সাহায্যে কার্বন চুরি করে নিয়ে নিজেদের কাজে লাগায়। আবার আরেক ধরনের হ্যাকার আছে, যাদের ক্লোরোফিল থাকা সত্ত্বেও চুরির অভ্যাস ত্যাগ করতে না পেরে আশপাশের গাছ থেকে ক্লোরোফিল নিয়ে আসে। কিন্তু চুরিতেই শেষ না। এমনও কিছু গাছ আছে, যাদের কর্মকাণ্ড দেখলে রীতিমতো ভরকে যেতে হয়। তারা খাদ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিবেশী উদ্ভিদদের সঙ্গে রীতিমতো রাসায়নিক যুদ্ধ করে। যুদ্ধের অংশ হিসেবে তারা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মাইসেলিয়ার সাহায্যে ছড়িয়ে দেয়। ফলে প্রতিবেশী উদ্ভিদের বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে যায়। এভাবে রাসায়নিকের মাধ্যমে অন্য উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত করাকে অ্যালিলোপ্যাথি বলে। এই অ্যালিলোপ্যাথি আকাসিয়াস, শুগারবেরি, আমেরিকান সাইকামোর্স এবং কিছু প্রজাতির ইউক্যালিপটাসের মধ্যে দেখা যায়। ওহাইওর সিনসিনাটিতে অবস্থিত জ্যাভিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাথরিন মরিস গোল্ডেন ম্যারিগোল্ড নিয়ে একটি পরীক্ষা করেন। তিনি পাত্রের মধ্যে মাইকোরাইজাল ছত্রাকসহ গোল্ডেন ম্যারিগোল্ড গাছ জন্মান। সেই পাত্রগুলোতে আবার অনেক ছিদ্রযুক্ত সিলিন্ডার রাখেন, যার মধ্য দিয়ে শিকড় না বের হতে পারলেও মাইসেলিয়া ঢুকতে পারে। তিনি অর্ধেকসংখ্যক পাত্রের সিলিন্ডারগুলোয় ছত্রাক নেটওয়ার্ক যাতে না গড়ে উঠতে পারে, তা নিশ্চিত করেন। এরপর তারা ম্যারিগোল্ডের দ্বারা যে দুটি বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়, তার পরিমাণ মেপে দেখেন এবং অবাক হয়ে লক্ষ করেন, যেসব পাত্রে মাইকোরাইজাল ছত্রাকের নেটওয়ার্ক ছিল, সেখানে সেই বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ ১৭৯ এবং ২৭৮ শতাংশ বেশি ছিল। এখান থেকে তাঁরা সিদ্ধান্তে আসেন যে মাইসেলিয়া আসলেই বিষাক্ত পদার্থ পরিবহন করে। ক্যাথরিন মরিস বলেন, ‘পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়, ছত্রাকের নেটওয়ার্ক বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ পরিবহন করতে পারে এবং এই ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রতিবেশী উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত করে।’

গাছ কিভাবে উডওয়াইড ওয়েব ব্যবহার করে, তা বিবিসির এই ভিডিওটিতে চমত্কারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে-https://www.bbc.com/news/av/science-environment-37353570/how-trees-use-the-wood-wide-web  ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা