kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

বান্দরবানের জঙ্গলে

মোস্তফা কামাল

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বান্দরবানের জঙ্গলে

অঙ্কন : মানব

ছয়

রাতে বাড়ি ফেরেনি অপু, রাজন, মুহিত, রুবেল ও রনি। কোথায়, কী অবস্থায় আছে, তা-ও কেউ জানে না। স্কুলে খবর নিয়ে জানতে পারে, পাঁচজনের কেউই স্কুলে যায়নি। যাওয়ার পথে কি কোনো অঘটন ঘটল? নাকি ওরা প্ল্যান করে কোথাও ঘুরতে গেছে। কোথায় গেল! একটা ফোন করে তো জানাতে পারত! কেন জানাল না?

রিজিয়া জামান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, কতবার বললাম ছেলেটাকে একটা মোবাইল কিনে দাও। দিলে না। এত সকালে মোবাইল দেওয়া যাবে না। এখন বোঝো!

রাশেদুজ্জামান তাঁকে শান্ত করার জন্য বললেন, প্লিজ! তুমি অস্থির হোয়ো না। ওরা হয়তো কোথাও ঘুরতে গিয়ে ফিরতে দেরি করছে।

তোমার কি তা-ই মনে হয়?

হ্যাঁ।

আমার তা মনে হয় না। আমার মনে হয়, ওরা কোনো বিপদে পড়েছে।

তোমার ওসব নেগেটিভ চিন্তা বাদ দাও তো!

বাদ তো দিতেই চাই। ওরা নিরাপদে ফিরে আসুক—সেটাই তো চাই। কিন্তু মন যে মানে না!

তার পরও নেগেটিভ চিন্তা কোরো না।

আচ্ছা, করব না।

ঠিক তখনই আয়েশা আখতার এলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ভাবি, কী সর্বনাশ হয়ে গেল! আমার ছেলে তো এখনো ফিরল না! এখন কী হবে!

রাশেদুজ্জামান নরম গলায় বললেন, প্লিজ! এভাবে ভেঙে পড়বেন না। ওদের জন্য দোয়া করুন। ওরা যেখানেই থাকুক, নিশ্চয়ই ভালো আছে।

আয়েশা আখতার আঁচল দিয়ে চোখ মোছেন। তাঁকে রিজিয়া জামান দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে তাঁর পাশে বসান। এর মধ্যে পাঁচ পরিবারের সবাই একত্রিত হয়। কেউ কেউ কান্নাকাটি করে। আবার একজন আরেকজনকে সান্ত্বনা দেন। ডিসি সাহেব বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে খোঁজখবর নেন। তিনি মনে মনে বলেন, পাঁচ-পাঁচটি ছেলের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না! নাকি কেউ কিডন্যাপ করল! কে করবে, কেন করবে? স্কুলে গিয়ে পাঁচটি ছেলে হারিয়ে যাবে—এটা কী করে সম্ভব!

রাশেদুজ্জামান মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, এই পরিস্থিতিতে মাথা গরম করা যাবে না। ঠাণ্ডা রাখতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ওরা সত্যি সত্যিই কিডনাপ হয়ে থাকে, তাহলে তো আর জানানো যাবে না। পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আমাদের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানাতে হবে।

পাঁচ পরিবারের সদস্যরা সারা রাত ডিসি সাহেবের বাংলোতে কাটাল। তাদের কারো চোখে ঘুম নেই। সবার এক চিন্তা, ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে! বেঁচে আছে তো! নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। ভালো আছে।

সকালে রাশেদুজ্জামান অফিসে পা দেওয়া মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা দৌড়ে আসেন তাঁর কাছে। বিস্ময় আর আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে জানতে চান, স্যার, আপনার ছেলে কি বাড়ি ফিরছে? আমরা শুনলাম, গতকাল থেকে নাকি অপুর কোনো খোঁজ নেই। ও কি বাসায় ফিরছে, স্যার?

রাশেদুজ্জামান ধরা গলায় বললেন, না।

কর্মকর্তাদের একজন আইয়ুব আলী বললেন, কোথায় আছে কোনো খবর পাইছেন?

না। তা-ও জানি না।

বলেন কী স্যার! ও কি একা; নাকি আর কেউ আছে?

ওর সঙ্গে আরো চারজন আছে।

তার মানে পাঁচজন! কোথায় গেল, কী হলো! থানা পুলিশকে জানাইছেন, স্যার?

না।

স্যার, বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের কাছে টেলিফোন আসছে। ছেলেটার খবর জানতে চায়।

এই খবর তো আমরা কাউকে বলিনি। কিভাবে ছড়িয়ে গেল?

স্যার, স্কুল থেকে মনে হয় জানাইছে।

ও আচ্ছা। স্কুল কর্তৃপক্ষকে তো মানা করছিলাম।

কেন, স্যার? জরুরি ভিত্তিতে থানা পুলিশ, র‌্যাব এবং প্রয়োজন হলে আর্মিকে জানানো দরকার!

যদি ওরা ইচ্ছা করে কোথাও গিয়ে থাকে!

কথাটা স্যার মন্দ বলেননি। কিন্তু ইচ্ছা করে কোথায় যাবে?

হয়তো কোথাও ঘুরতে গেছে। সেখান থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছে!

তার পরও স্যার, বিষয়টা ভেবে দেখেন। অথবা আরেকটা কাজ করতে পারেন, স্যার। এখানকার গোয়েন্দাদের জানাতে পারেন। তাঁরা গোপনে খোঁজখবর নিক।

আপনার বুদ্ধিটা মন্দ না। কিন্তু ওদের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা যদি পত্রিকায় চলে আসে!

আইয়ুব আলী বললেন, তা তো আসতেই পারে, স্যার। যেইভাবে খবরটা ছড়াইছে! সে ক্ষেত্রে থানা পুলিশকে জানিয়ে রাখা ভালো, স্যার। সেটাই ভালো হবে।

আপনিই তাহলে স্থানীয় থানায় জানিয়ে দেন।

জি, স্যার।

আর পত্রিকা অফিস থেকে ফোন করলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবেন।

জি স্যার, অবশ্যই।

আইয়ুব আলী বললেন, আমরা তাহলে যাই, স্যার?

ঠিক আছে। কোনো খবর পেলে জানাবেন।

জি, স্যার। অবশ্যই জানাব।

কর্মকর্তারা ডিসি সাহেবের অফিস থেকে বের হতে না হতেই তাঁর ল্যান্ড নাম্বারে টেলিফোন এলো। ডিসি সাহেব টেলিফোন ধরে হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে জনৈক রিপোর্টার নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, স্লামুআলাইকুম! ডিসি সাহেব; আমরা খবর পেলাম, আপনার ওখানে কয়েকজন স্কুলছাত্র কিডন্যাপ হয়েছে!

না না, ভাই। কিডন্যাপ হয়নি। আসলে ওরা স্কুল থেকে ঘুরতে রেব হয়েছিল। গত রাতে ওরা বাসায় ফেরেনি।

তাই? আপনি কি চেনেন ওদের?

চিনি মানে, ওদের সঙ্গে আমার ছেলেও আছে।

আচ্ছা আচ্ছা, তা-ই বলেন। কোনো ডেভেলপমেন্ট থাকলে জানাবেন। আমি হারিছ উদ্দিন। ঢাকা প্রকাশ থেকে বলছিলাম।

জি ভাই, জানাব।

ডিসি সাহেব টেলিফোনের রিসিভার সবে রাখলেন। এরই মধ্যে আবার ফোন। হ্যালো, ডিসি সাহেব বলছেন? আমি আজাদী থেকে বলছিলাম। আপনার ছেলেসহ কয়েকজন কর্মকর্তার ছেলে কিডন্যাপ হয়েছে নাকি?

না, ভাই। কিডন্যাপের তো কোনো ঘটনা ঘটেনি।

আমরা তো এ রকম খবরই পেয়েছি। আসলে কী ঘটেছে বলেন তো!

আমার ছেলেসহ পাঁচ স্কুলছাত্র একসঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছিল। গত রাতে ওরা বাসায় ফেরেনি। আসলে কী হয়েছে তা এখনো বলতে পারছি না। আমরা অনুসন্ধান করছি।

আচ্ছা, আমরা নিউজটা কি করতে পারি?

না করলে ভালো হয়, ভাই। নিউজ করলে যদি সমস্যা হয়!

না না। তা হবে না। বরং উপকারই হবে। আমরা সেভাবেই করব।

আচ্ছা, যেটা আপনারা ভালো মনে করেন।

ডিসি সাহেব ফোন রেখে নিজের চেয়ার ছেড়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। তাঁর মন ভীষণ খারাপ হয়েছে। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। আবার ফোনের রিং বাজছে। ফোনও ধরতে ইচ্ছা করছে না। এরই মধ্যে অফিসে লোকজন এসে ভরে গেছে। সবার এক কথা—স্যার, র‌্যাব-পুলিশকে বিষয়টা জানান। তা না হলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে।

এ কথা শুনে ডিসি সাহেবের মন আরো খারাপ হয়ে গেল। তিনি উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তাঁর কাছে সব কিছু এলোমেলো লাগছে।

 

সাত

অপু, রাজনরা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। জীবনের প্রথম পাহাড়ের মাঝখানে গাছের ওপর রাত্রিযাপন। ভাবলেই গা কেমন শিউরে ওঠে। ভয়ানক এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় ওরা। রাতের অন্ধকার ওদেরকে যেন গিলে ফেলছিল। প্রতি মুহূর্তে অজানা আতঙ্ক আর ভয় ওদের তাড়া করে। গাছের নিচে চিতা, বন্য হাতিসহ নানা প্রাণীর দৌড়াদৌড়ির শব্দ কানে বাজে। গাছ থেকে কোনো কারণে পড়ে গেলেই নির্ঘাত মৃত্যু। মৃত্যু-আতঙ্কে রাত কাটল। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ওরা গাছ থেকে নামল।

অপু সবার উদ্দেশে বলল, আমরা আবার গুপ্তধনের সন্ধানে বের হব। আমি জানি, সবাই ক্ষুধার্ত। সারা রাত না-খাওয়া। তার ওপর ঘুম হয়নি। শরীরও বেশ দুর্বল। আমরা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কোথাও থেকে ফল খেয়ে নেব। কী বলিস রাজন?

রাজন আমতা আমতা করে বলল, না মানে তোর কথা ঠিক আছে। আসলে আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে।

মুহিতও চোখ ডলতে ডলতে বলল, আমারও খুব ঘুম পাচ্ছে।

রনি ও রুবেল কিছুক্ষণ পর পর শুধু হাই তুলছে। ওদের হাই তোলা দেখে অপু ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে বলল, এই ধর, মুখ ধুয়ে একটু পানি খেয়ে নে তো!

রুবেল অপুর হাত থেকে বোতল নিয়ে মুখ ধুয়ে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নিল। রনিও তা-ই করল। তারপর রাজনের দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল, রাজন এই ধর, মুখ ধুয়ে পানি খেয়ে নে। ভালো লাগবে। আমারও ভালো লাগছে।

অপুকে উদ্দেশ করে রাজন বলল, তোর বুদ্ধির তারিফ না করে পারছি না। ধন্যবাদ অপু।

অপুও মুচকি হাসল। তারপর বলল, তোদের হয়ে গেলে বোতলটা দিস।

রাজন কয়েক ঢোক পানি খেয়ে মুহিতের হাতে দিল। মুহিতও তা-ই করল এবং অপুর হাতে বোতল দিয়ে ধন্যবাদ জানাল।

অপু মুখে কয়েকবার পানি ছিটিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। পাহাড়ি পথ। কোথাও ঢালু, কোথাও উঁচু-নিচু। আবার কোথাও ভাঙা। খুব কষ্ট করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। কিছুদূর এগোতেই বিপদের মুখোমুখি হয় ওরা। হঠাৎ কয়েকটি শজারু ঝন ঝন শব্দ করে দৌড়ে আসে ওদের সামনে। গায়ের কাঁটাগুলো তীরের মতো খাড়া। দেখতে ভয়ংকর। কোনো কোনোটি ওদের দিকে তেড়ে আসে। আর অমনি ওরা দৌড়াতে শুরু করে। কিছুদূর যাওয়ার পর আর আগালো না।

হাঁপাতে হাঁপাতে এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো। এবার ক্ষুধাটা বেশ বেড়েছে। কিছু না খেলে চলবে না। এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখল কোথাও ফলের গাছ আছে কি না!

হঠাৎ রাজনের কমলাগাছ চোখে পড়ল। সে চিৎকার দিয়ে বলল, এই! পাওয়া গেছে! ওই তো কমলাগাছ। ইস! প্রচুর কমলা পেকে আছে। আয় আয়! কমলা খেয়ে নিই।

 

(চলবে)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা