kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

তোমাদের গল্প

ঢাকায় পালিয়ে

মাহফুজুর রহমান

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঢাকায় পালিয়ে

অঙ্কন : বিপ্লব

শান্ত দৌড়ে চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়ল। ট্রেন ছুটছে ঢাকার দিকে। বাসার সবার ওপর অনেক রাগ তার। ছোট বোন শান্তাকে সবাই কত ভালোবাসে। ওকে কেউ পাত্তাই দেয় না। শান্তার কাছে কত খেলনা। ও শুধু রিমোট কন্ট্রোল গাড়িটা চেয়েছিল। বাবা এসে এমন ধমক দিলেন, খুব কান্না পেয়েছিল। শান্তাকে কত আদর করে ও। রোজ চকোলেট দেয়। আর সেই শান্তাই কি না ওর সঙ্গে এমন করতে পারল!

—এই ছেলে, তুমি কার সঙ্গে যাচ্ছ? মা-বাবা কোথায়? কোথায় যাচ্ছ?

শান্ত ভয় পেয়ে গেল। টিকিট চেকার এসেছে। ওর কাছে টিকিট নেই। টিকিট মামুনের কাছে। মামুন পাশের বাসায় থাকে। শান্তর সঙ্গে ক্লাস এইটে সদর স্কুলে পড়ে। মামুনের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। দাদির কাছে বড় হয়েছে মামুন। কাল রাতে শান্ত যখন পালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল, মামুন একবাক্যে রাজি। প্রতিদিন দাদির বকবক শুনতে ভালো লাগে না ওর। সন্ধ্যা ছয়টায় বাসায় থাকতে হয়। বন্ধুদের সঙ্গে আমবাগানে যাবে, সে উপায়ও নেই।

—এই ছেলে, উত্তর দিচ্ছ না কেন?

ভাবনায় ছেদ পড়ল শান্তর। মামুন কি তাহলে আসবে না?

শান্ত ট্রেনের বগিতে মামুনকে খুঁজতে লাগল। শেষের বগিতে মামুনের ওঠার কথা। আরে ওই তো মামুন। কলা দিয়ে রুটি খাচ্ছে। ব্যাগ দিয়ে মামুনের ঘাড়ে মৃদু বাড়ি দিল শান্ত।

—কী রে, তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর তুই বসে খাচ্ছিস?

—দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজলে হবে? টিকিট নিয়েছিস সিটের। সিটের সামনে আসবি না!

সিটে বসে শান্ত অন্যমনস্ক হয়ে গেল। বাসা থেকে পালিয়ে আসাটা ঠিক হলো? সবাই কত চিন্তা করছে। নাকি এখনো খোঁজই পায়নি।

—সকালে নিশ্চয়ই কিছু খেয়ে বেরোসনি। নে, কলা আর পাউরুটি খা।

ট্রেন দ্রুত ছুটছে। কী করবে ওরা ঢাকায় গিয়ে সেটা ঠিক করেনি এখনো। সারা রাত না ঘুমানোর ক্লান্তিতে শান্ত ঘুমিয়ে পড়ল।

মামুন ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিল শান্তকে।

—এই শান্ত, ঢাকা চলে এসেছি। নামতে হবে।

ট্রেন ধীরে ধীরে স্টেশনে ঢুকছে। সবাই ব্যাগ হাতে তৈরি নামার জন্য।

চারদিকে কত শব্দ কত কোলাহল। প্রথমবারের মতো ঢাকা এলো শান্ত। মামুনেরও প্রথমবার। ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে নামছে সবাই। ওরা নামার আগেই অন্য যাত্রীরা ট্রেনে ওঠা শুরু করে দিল। বাধ্য হয়ে যেদিকে প্ল্যাটফর্ম নেই, সে দিকেই নামতে হলো। মানুষের ভিড়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল ওরা।

—মামুন, দুপুর হয়ে গেছে, কিছু খাওয়া দরকার।

কোনো জবাব নেই। শান্ত তাকিয়ে দেখে, মামুন নেই। দাঁড়িয়ে পড়ল ও। কিন্তু স্থির থাকতে পারল না। মানুষদের ধাক্কায় এগিয়ে যেতে বাধ্য হলো। মামুন মামুন বলে ডাকল খানিকক্ষণ। ডাক শুনে এগিয়ে এলো বয়স্ক এক লোক।

—কী ব্যাপার! তুমি আমারে ডাকতাছ কেন?

—আংকল, আমার বন্ধুর নামও মামুন। তাকেই ডাকছিলাম।

—ও, তুমি হারাইয়া গেছ? ভালো হইছে। আসো, তোমাকে স্টেশনমাস্টারের কাছে দিয়া আসি।

—স্টেশনমাস্টারের কাছে কেন?

—তা না হলে বন্ধুকে পাইবা কেমনে?

—মামুনও কি ওখানে?

—হ্যাঁ, যারা ঢাকায় আসামাত্রই হারিয়ে যায়, তারা ওখানেই থাকে।

লোকটির হাত ধরে হাঁটতে থাকল শান্ত। একটা রিকশায় উঠল। শান্ত প্রথমে উঠতে চাইল না।

—রিকশায় উঠব কেন? স্টেশনমাস্টার তো স্টেশনে থাকে।

—আজ মাস্টারের ছুটি। উনি বাসায় আছে। তোমার বন্ধু মাসুম ওখানেই।

—ওর নাম মাসুম না। মামুন।

—হ, বুঝছি। আহো, তোমারে মাস্টারের কাছে দিয়া আসি।

রিকশা এগিয়ে একটা এলাকায় থামল। একটা দোতলা বাড়ির ভেতর ঢুকল লোকটি। আচমকা শান্তকে হ্যাঁচকা টানে ভেতরে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল লোকটা।

ঘরে ঢুকতেই দেখে, ওর মতো আরো অনেক বাচ্চা বসে আছে। ওর থেকে ছোটও আছে। যাওয়ার সময় লোকটা ওর ব্যাগও নিয়ে গেছে। কিন্তু ভেতরে মামুন নেই।

—তোরে কি আইজকা ধইরে আনছে?

প্রশ্নটা করেছে যে ছেলেটা, জামা-জুতো নেই তার পরনে।

—ধরে আনছে মানে? এ ছেলেধরা?

একটা বাচ্চা মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল—সক্কালবেলা একটা বিস্কুট আর পানি দিছে। এর পরের তন কিছু দেয় নাই। খুব খিদা লাগছে।

শান্ত উঠেই দরজা ধাক্কাতে শুরু করল। চিত্কার করে ডাকাডাকি করল কিছুক্ষণ। কেউ একজন দরজা খুলতেই ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল শান্ত।

—এই শান্ত, কত ধাক্কাব তোকে? নামতে হবে।

ট্রেন স্টেশনে ঢুকেছে। সবাই ব্যাগ হাতে তৈরি হচ্ছে নামার জন্য। চারদিকে কত শব্দ কত কোলাহল। ঠিক একই অনুভূতি আগেও হয়েছে শান্তর। বাসার কথা খুব মনে পড়ল ওর। মামুন ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত কী বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। স্বপ্ন হলেও তার বারবার সেই ছোট মুখগুলোর কথা মনে পড়ছে। আবার বাড়ির কথাও মনে হচ্ছে। মামুনের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, ফিরতি ট্রেন কয়টায় ছাড়বে রে?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা