kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বইমেলা

ঘুরতে ঘুরতে বইমেলা

উত্সব মানে এক-দুই দিনের ব্যাপার। ব্যতিক্রম অমর একুশে গ্রন্থমেলা। প্রাণের এ উত্সব চলে মাসজুড়ে। আমেজ থাকে শেষ দিন পর্যন্ত। বইমেলার খুঁটিনাটি জানাতে মেলা প্রাঙ্গণ থেকে ঘুরে এসেছেন জুবায়ের ইবনে কামাল

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঘুরতে ঘুরতে বইমেলা

‘ভাই, তুই তো আজ সেলিব্রিটি’—বিষণ্ন সুরে একটি ল্যাম্পপোস্ট বলল তার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা আরেক ল্যাম্পপোস্টকে। ‘এত দিন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতি, কেউ পাত্তাই দিত না। আজ সবাই তোর নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। বইমেলাটা তোর ভাগ্য ঘুরিয়ে দিল।’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার প্রবেশপথে থাকা দুই ল্যাম্পপোস্টের কাল্পনিক কথোপকথন ভাবছিলাম। মেলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে নিজেকে সাহিত্যিক ভাবার চেষ্টা করছি। নেই কাজ তো খই ভাজ। কিন্তু এত এত মানুষ। খই ভাজার জায়গাই নেই। তার চেয়ে বইমেলায় গা ভাসানো যাক এবার।

গত মেলায় এত ঘুরেছিলাম যে কোন স্টল কোথায়, সেটা রীতিমতো মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মুখস্থবিদ্যা এবার কাজে লাগল না। কারণ সব গুবলেট পাকিয়ে গেছে। তিন গোয়েন্দার সেবা প্রকাশনী যেখানে ছিল, সেখানে এখন সিসিমপুরের স্টল। গতবার জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশনটা যে স্টল থেকে কিনেছিলাম, সেখানে কোনো স্টলই নেই।

স্টলবিন্যাসের সমাধান দিল ল্যাম্পপোস্ট দুটি। না, মানে ওদের ঠিক পাশেই একটি গাছের সঙ্গে বিশাল আকারের স্টলবিন্যাসের ছবি ঝোলানো। নজর দিতেই বেরিয়ে এলো পুরো বইমেলার আদ্যোপান্ত। এর ঠিক বিপরীতেই আছে তথ্যকেন্দ্র। কিন্তু সেখানে বরাবরের মতো তথ্যকেন্দ্র কথাটি লেখা নেই। সেখানে লেখা ‘কী জানতে চান বলুন’। বেশ আইডিয়া!

স্টলবিন্যাস পেয়েই আরেক মুশকিল। ভেতরে খানিকটা ঘুরতেই সেবা প্রকাশনীর স্টল নম্বরটা বেমালুম ভুলে গেছি! ফেসবুকে একবার ঢু মারতে পারলে অবশ্য পেয়ে যেতাম। কিন্তু আমার ফোনে নেই ইন্টারনেট। ইন্টারনেট পাব কোথায়! ঠিক তখনই শুনলাম, পাশে কে যেন বলছে, ‘ভাই ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ডটা কত?’ আমি তো অবাক! এখানেও ওয়াই-ফাইয়ের দাদাগিরি! দেখলাম, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলার প্রায় সবটুকু জায়গায় দেওয়া হচ্ছে ফ্রি ইন্টারনেট সুবিধা। ওয়াই-ফাই লাইনটার নামও অমর একুশে বইমেলা ২০১৯-এর নামে। একবার শুধু ফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা দিয়ে নিবন্ধন করে ফেললেই হলো।

এরপর শুরু হলো বইমেলার আসল মিশন। শুরুতেই বাধ সাধল একটা ছেলে। কিছুতেই আমার পিছ ছাড়বে না। কারণ সে নাকি এক রহস্যময় গোলকধাঁধায় পড়ে গেছে। তাকে উদ্ধার করতে হবে আগে। জানাল, ঘণ্টা দুয়েক ধরে মেলায় এসেছে। কিন্তু ঘুরেফিরে একই জায়গায় এসে পড়ছে। ডানে গেলেও এখানে থামে, বাঁয়ে গেলেও এখানে। বললাম, ‘বের হওয়ার জন্য ডানে-বাঁয়ে না ঘুরে সূর্যের অবস্থান দেখে দিকটা বের করে নিলেই হয়। পশ্চিম বরাবর হাঁটলেই তো বের হওয়ার রাস্তা।

বইমেলায় ঢুকে প্রথম কাজ কী? আমার মতে, সবার আগে ক্যাটালগ সংগ্রহ করা। তারপর মেলা প্রাঙ্গণে রাখা বেঞ্চে আরামসে বসে বসে লিস্ট করে নেওয়া যায়। এবারের মেলায় প্রায় ছয় শ প্রকাশনীর স্টল আছে। দুই মিনিট করে যদি সময় নাও, তবে সব কয়টা ক্যাটালগ সংগ্রহ করতে লাগবে প্রায় বিশ ঘণ্টা। তাই এক দিনে সব ঠিক না করে কয়েক দিন হাতে রাখাই মঙ্গল। বইমেলা প্রতিদিন খোলা থাকে গড়পড়তায় ছয় ঘণ্টা। বুঝতেই পারছ, শুধু ক্যাটালগ নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ না। ছড়াকার খালেদ হোসাইন বলেছেন—

বুক পকেটে এক শ টাকা কিনতে গেলাম বই দুই বগলে বই নিয়ে আজ ফিরবো অবশ্যই। শরীর গেছে ঘামে ভিজে আর ফুলেছে রগ বাসায় নিয়ে এলাম কেবল বইয়ের ক্যাটালগ।

নেব না নেব না করেই হাত ভারী হয়ে গেছে ক্যাটালগে। এবার তবে চোখ বোলানো শুরু করা যাক। স্বাধীনতাস্তম্ভের সামনে যে পা ভিছিয়ে বসার জায়গা, সেটিও এবারের বইমেলায় বর্ধিত করা হয়েছে। সেখানে বসেই বইয়ের লিস্ট করতে বসলাম। প্রথমেই কিশোর উপন্যাসের পালা। আনিসুল হকের ‘দুষ্ট মেয়ের দল’ বের হয়েছে সময় প্রকাশন থেকে। মোস্তফা কামালের ‘অপার্থিব’-এর প্রচ্ছদটাও মনে ধরেছে। প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। মোস্তফা মামুনের লেবাননী জাদুকরটাও (পার্ল) পড়ে দেখতে পারো। রাজীব হাসানের উপন্যাস ‘বোকাবাবা ও কিডন্যাপার’ প্রকাশ করেছে প্রথমা।

কিন্তু মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন ছাড়া তো লিস্ট অপূর্ণ থেকে যায়। অবশ্য মোশতাক আহমেদও বেশ জনপ্রিয় এখন। জাফর ইকবালের নতুন তিনটা বইয়ের মধ্যে ‘নিয়ান’টাই টানলো সবার আগে। পাওয়া যাচ্ছে তাম্রলিপিতে।

ঐতিহ্য প্রকাশনীতে ভারী ভারী বইয়ের ভিড়ে একটা কিশোর উপন্যাসও পাওয়া গেল। দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘এক হালি হরপিদ’। ‘মমির দেশ মিশর’ নামের একটা ভ্রমণ কাহিনিও পেলাম। যারা ছড়া পড়তে ভালোবাসো, তারা নিতে পারো ‘পাতায় পাতায় ছড়া’।

আদর্শ প্রকাশনী থেকে আয়মান সাদিক ও অন্তিক মাহমুদের লেখা ‘ভাল্লাগেনা’ বইটা উল্টেপাল্টে ভালোই লাগল। ছাত্রজীবনের বিভিন্ন ভালো না লাগার রোগ নিয়ে কথা বলা হয়েছে। বাতিঘর থেকে প্রকাশিত জাহিদ হোসেনের ‘দুধ চা খেয়ে তোকে গুলি করে দেব’ বইয়ের নাম দেখেই গলা শুকিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি মেলার মাঝে রাখা দর্শনার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ফিল্টারের সামনে গিয়ে দুই মগ গিলে নিলাম। বোতল ভরতে গিয়ে জানলাম, যত ইচ্ছে খাও, কিন্তু পানি নিয়ে যাওয়া যাবে না।

সব শেষে পেলাম সেবা প্রকাশনী। ১৯৬৪ সাল থেকে শুরু। এখনো এ প্রকাশনীর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা ছাড়াও থ্রিলার, অতিপ্রাকৃত, রহস্য, পিশাচ কাহিনির বই নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে সেবা। তাই এই প্রকাশনীর কোনো বইয়ের নাম আর আলাদা করে বললাম না। গিয়েই দেখে নাও।

আগে বইমেলায় শুধু মোড়ক উন্মোচনের একটি মঞ্চ ছিল। এবার লেখক-কবিদের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক আরো দৃঢ় করতে চালু হয়েছে ‘লেখক বলছি’ মঞ্চ। এখানে লেখকরা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সেশন নেন। মেলার একেবারে শেষের দিকে এর অবস্থান। বরাবরের চেয়েও পরিচ্ছন্ন দেখা গেল বাথরুম। আছে অজু করা ও নামাজের ব্যবস্থাও। রয়েছে ডিবি, আনসার, পুলিশ ও র্যাবের নিরাপত্তা বলয়। দুর্ঘটনা এড়াতে বিশেষ টিমসহ বৈদ্যুতিক গোলযোগে তাত্ক্ষণিক লাইট সার্ভিস আছে। ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশাল গাড়িসহ একটি ইউনিটও সদা প্রস্তুত। এত নিরাপত্তার মাঝে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে নিজেকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে হতে লাগল।

বাসায় ফেরার আগে গেলাম বাংলা একাডেমিতে। সেখানে মুগ্ধ করল বিদ্যানন্দ। এক টাকায় আহারের কথা তো শুনেছ। পথশিশুদের এক টাকায় খাবার দেওয়া হয় সেখানে। সেই আয়োজকরাই এবার বইমেলায় একটি স্টল দিয়েছে। বই বিক্রির সব অর্থই খরচ হবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য। কিন্তু সেই স্টলে কোনো বিক্রেতাই নেই! পাঠক বই কিনে নির্ধারিত মূল্য রেখে আসছে একটি বক্সে। কেউ তাকিয়েও দেখছে না। সততা স্টোরের মতো এমন বইস্টলও আছে দেখে বেশ ভালো লাগল।

বাংলা একাডেমিতে প্রতিবারই থাকে ব্রেইল প্রকাশনীগুলোর স্টল। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য তৈরি বিশেষ বইসহ পাওয়া যায় এখানে। কয়েকজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর হাতের স্পর্শে পড়ছে দেখে মনটা ভরে উঠল। এ প্রকাশনীগুলোর জন্য এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধও তৈরি হলো মনে।

আজ ফিরে যাচ্ছি। তবে বিদায় জানাচ্ছি না। ছুটির দিনে আবার যাব বইমেলায়। কারণ সেদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা খোলা থাকবে। থাকবে শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ আয়োজন ‘শিশু প্রহর’। শিশু চত্বরের বটতলায় হাজির হবে সিসিমপুরের সবাই। সবাই আমাকে যতই বড় বলুক, ওই অনুষ্ঠানটা কিন্তু আমি মিস করব না কিছুতেই।

বাসায় ফিরতেই মনে পড়ল, আহা! ল্যাম্পপোস্ট দুটির সঙ্গে নিজের একটা ছবি তোলা হলো না!

মেলায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত? পাশের সবুজে ছাওয়া মাঠে কোনো একটা গাছে হেলান দিয়ে পড়ে নিতে পারো দু-একটা গল্প

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা