kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

অদ্ভুত এক বাদুড়ের গল্প

ইমদাদুল হক মিলন

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



অদ্ভুত এক বাদুড়ের গল্প

অঙ্কন : মানব

কী করছিস রে, পাগলু?

ছোট মামাকে দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠল ফারাজ। ছোট মামা, তুমি কখন এলে?

এইমাত্র এলাম। কিন্তু তুই করছিস কী?

কচ্ছপ দুটোকে ডিনার করাচ্ছি।

এই জিনিস জোগাড় করলি কবে?

মাস তিনেক হলো। তুমি তো অনেক দিন আসো না। আমি কী করছি না করছি, তার কোনো খবরই নেই তোমার।

আমি তো আমার প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত। কৃষি খামার, বুঝলি না? শীতকাল এসে পড়ছে। এখন সবজি ফলানোর সিজন। নানা রকম সবজির চাষ করছি। পুকুরে নতুন করে মাছ ছাড়া হলো। খুবই ব্যস্ত ছিলাম। তবে আনন্দে ছিলাম। এসব কাজে খুবই আনন্দ পাই আমি।

আর আমার আনন্দ হচ্ছে এখন এই কচ্ছপের বাচ্চা দুটি। একটা বিড়ালছানা আর এক জোড়া ময়ূরপঙ্খি কবুতর।

বলিস কী? বাড়িটাকে তো চিড়িয়াখানা বানিয়ে ফেলেছিস?

ফারাজ কথা বলল না। হাসল। গোল বড় একটা কাচের জারে দুটি কচ্ছপছানা সাঁতার কাটছে। স্বচ্ছ পানির তলায় ছোট ছোট রঙিন পাথর। ফারাজের হাতে মটরদানার চেয়ে ছোট কয়েকটা দানা। সে একটা-দুইটা করে জারে ফেলছে। কচ্ছপছানা ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে।

এ রকম কয়টা দানা দিতে হয় রে?

সকালে পাঁচটা, সন্ধ্যায় পাঁচটা। বড় হলে খাবারের পরিমাণ বাড়বে।

এ সময় বিড়ালছানাটা মিউ মিউ করে এলো। সাদা ধবধবে। ভারি সুন্দর দেখতে। মাস দুই-আড়াই হবে বয়স। কচ্ছপের খাবার হাত থেকে ঝেড়ে ফেলল ফারাজ। বিড়ালছানাটা কোলে নিল।

এটাকে কী খাওয়াচ্ছিস?

প্রথম প্রথম সিরিঞ্জে করে দুধ খাওয়াতাম। এখন ফিডারে দুধ দিই। একটু একটু মাংস দিচ্ছি। মাছ দিচ্ছি। চলো মামা, কবুতর দুটি দেখাই।

চল চল। দেখি।

ফারাজের সঙ্গে বারান্দায় এলেন ছোট মামা। এই বারান্দাটা ফারাজের রুমের সঙ্গে। ছোট্ট সুন্দর বারান্দা। সেখানে লম্বা ধরনের লোহার খাঁচায় এক জোড়া কবুতর। দুধের মতো সাদা। সাইজে একটু বড়। লেজ পেখম ধরা ময়ূরের লেজের মতো।

ছোট মামা বললেন, বুঝলাম কেন এই কবুতরের নাম ময়ূরপঙ্খি কবুতর।

সকালবেলা বাকবাকুম করে ডাকে। খুব সুন্দর ডাক। আমার এখন ঘুম ভাঙে কবুতরের ডাকে।

এগুলোর কোনো নাম রেখেছিস?

রেখেছি। কবুতর দুটির নাম হলো ধলা১ ধলা২।

ইন্টারেস্টিং? বিড়ালটার নাম কী?

বাঁকাচোরা। সব সময় বাঁকা হয়ে শোয়। এ জন্য এমন নাম।

এটাও ইন্টারেস্টিং। ‘কাউটা’ দুটির নাম কী?

ফারাজ আবার হাসল। আমি জানি, কচ্ছপকে গ্রাম এলাকার লোকে ‘কাউটা’ বলে।

কাউটার একটা খারাপ অর্থ আছে। কিপটা, কৃপণ। কাউটা টাইপের লোক বলে কৃপণদের। নাম বল, নাম বল।

একটার নাম কান্টু, একটার নাম পন্টু।

আজব নাম। অর্থ কী নামের?

অর্থ জানি না। মনে এসেছে, রেখে দিয়েছি।

ফারাজের মা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, ওরা টের পায়নি। কথা শুনে দুজনই তাঁর দিকে তাকাল। মামা-ভাগ্নের স্বভাব এক রকমই। একজন লেখাপড়া শেষ করে গ্রামে কৃষি খামার করছে, আরেকজন ফ্ল্যাটবাড়িতে চিড়িয়াখানা বানাচ্ছে।

ফারাজের মা তাঁর ছোট ভাইয়ের দিকে তাকালেন। তোর পুকুর কয়টা রে, ফিরোজ?

চৌদ্দটা। আর চাষের জমির পরিমাণ একচল্লিশ বিঘা। এগুলো আমার একার না, আপা।

তা জানি। তোরা চার বন্ধু মিলে আমাদের জমি, পুকুরের চারপাশে আরো জমি নিয়ে খামার করেছিস।

রাইট। কিন্তু এই যে আমি এলাম, তুমি দেখি আমার ভালো-মন্দ কোনো খবরই নিচ্ছ না, আপা?

খবর নিতেই তো এলাম। নাশতা রেডি। আয়।

হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো। চা-নাশতা খেয়ে পাগলুটার সঙ্গে গল্প করি।  একেবারে খাঁটি ঘি এনেছি তোমার জন্য। দুই কেজি। ওই ঘি দিয়ে পোলাও কোরো। দুলাভাই আসবেন কখন?

অফিস থেকে বেরিয়ে জিমে যাবেন। আসতে আসতে রাত ৯টা।

নো প্রবলেম। চলো। আগে নাশতাটা সারি।

ডাইনিংস্পেসের দিকে আসতে আসতে ফারাজের দিকে তাকাল ছোট মামা। বুঝলি পাগলু, তোর জন্য সেই বাদুড়টা ধরে আনতে পারলে খুব ভালো হতো।

আমার দুটি প্রশ্ন আছে।

কর, কর। প্রশ্ন কর।

১. তুমি আমাকে পাগলু বলো কেন? ২. কোন বাদুড় ধরে আনলে ভালো হতো?

ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে চেয়ার টেনে বসলেন ছোট মামা। ১ নম্বর উত্তর হচ্ছে... না না, তার আগে আমারই একটা প্রশ্ন আছে। তোকে আমি পাগলু ডাকি তুই যখন এই এতটুকু। পুঁচকে। এখন ক্লাস ফোরে পড়ছিস। এত দিন পর হঠাৎ কেন এই প্রশ্ন করলি? এত দিন করিসনি কেন?

এত দিন মনে হয়নি। আজ মনে হলো।

গুড গুড। ভেরিগুড। জবাব হচ্ছে, তোর মধ্যে পাগলামি আছে। তুই একটু পাগলা টাইপের। এ জন্য তোকে আমি পাগলু ডাকি। যাদের মধ্যে পাগলামি থাকে, তারা ব্রিলিয়ান্ট হয়। তুইও ব্রিলিয়ান্ট।

ফারাজের মা বললেন, হয়েছে। ভাগ্নের এত প্রশংসা করতে হবে না। খেতে বস।

ছোট মামার পাশে ফারাজও বসল। এবার বাদুড়ের কথাটা বলো।

নাশতা খেয়ে, চায়ের মগ হাতে নিয়ে তোর রুমে গিয়ে বসব। চা পান করতে করতে বলব। তবে একটা কথা এখনই বলে রাখি। বাদুড়টা মনে হয় বাদুড় ছিল না।

তাহলে কী ছিল?

ওটাই রহস্য। আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। কিন্তু কাণ্ডটা ছিল একেবারেই ভৌতিক। আমার নিজের জীবনে ঘটেছে বলে বিশ্বাস করেছি। অন্যে বললে বিশ্বাসই করতাম না।

ভূতরহস্য আর অ্যাডভেঞ্চার ধরনের গল্প শোনার পাগল ফারাজ। বাদুড়ের গল্পটা ভৌতিক—এ কথা শোনার পর থেকেই অস্থির হয়ে গেছে, কখন গল্পটা ছোট মামার মুখে শুনবে। ছোট মামাকে তাড়া দিতে লাগল। আমার রুমে গিয়ে বলতে হবে কেন? এখানে বসেই বলো না!

ছোট মামা হাসলেন। না রে পাগলু, এখানে হবে না। তোর রুমে বসে জমিয়ে গল্পটা বলব। অস্থির হওয়ার কিছু নেই।

ফারাজের রুমে এসে পড়ার চেয়ারটায় বসলেন ছোট মামা। চায়ে চুমুক দিলেন। ফারাজ বসেছে তার বিছানায়। এবার বলো, ছোট মামা।

আমাদের খামারেরই ঘটনা, বুঝলি? এতবার বললাম, খামারটা দেখতে আয়। আপাকে বললাম, দুলাভাইকে বললাম। তোকে তো বললামই। গেলে দেখতি, কী একটা কাণ্ড করেছি। পরিবেশ কী সুন্দর! বিশাল বিশাল একেকটা পুকুর। পুকুরগুলো মাছে ভর্তি। পুকুরের চারপাশে প্রতি সিজনে কোনো না কোনো সবজি চাষ হচ্ছে। আমের বাগান করা হয়েছে। নানা রকমের আম হয়। উত্তর দিককার পুকুরটার ওপাশেই আমাদের খামার শেষ। তারপর বিল। ধানের জমি। ওগুলো আমাদের না। ওখানটায় একটা পুরনো আমগাছ আছে। অনেক বয়স গাছটার। তেমন মোটা না। ডালপালা অনেক। আম ধরে বিস্তর। ভালো জাতের আম না। সাধারণ আম। তবে ভারি মিষ্টি আম। মাঝারি সাইজের। পেকে হলুদ হয়ে যায়।

ছোট মামা চায়ে চুমুক দিলেন। ঘটনা হলো, গাছটার আম কেউ পাড়ে না। গাছটার কাছে একা কেউ যায়ই না। গাছে আম পেকে থাকে, তলায় পড়ে থাকে। কেউ ধরে না। খায়ও না কেউ।

ফারাজ বলল, তুমি যে বললে ওই গাছের আম খুব মিষ্টি! কেউ যদি না-ই খেয়ে থাকে, তাহলে বুঝল কী করে, আম মিষ্টি?

গুড ক্রোয়েশ্চেন। নিশ্চয়ই আগে কেউ না কেউ কোনো দিন খেয়েছে। তাদের কাছ থেকে অন্যে জেনেছে। তবে আমি নিজে খেয়ে দেখেছি। ওই গাছের আম অসাধারণ। গন্ধটা সুন্দর। খেলে তুই মুগ্ধ হয়ে যাবি।

এবার বলো, গাছটার রহস্য কী? ওই গাছের কাছে কেউ যায় না কেন? এত টেস্টি আম, তা-ও কেউ খায় না কেন?

ঘটনার মূলে একটা বাদুড়। এলাকার লোকের ধারণা, বাদুড়টা বাদুড় না।

তাহলে কী?

বুঝিসনি?

বুঝেছি, বুঝেছি। বলো।

তোর ভূতের ভয় কেমন? গল্প শুনে ভয় পাবি না তো? রাতে ঘুমাতে পারবি তো?

ফারাজ হাসল। কী যে বলো মামা? আমি কত হরর মুভি দেখি। ভূতে একটুও ভয় পাই না। ভূতের গল্প পড়তে খুব ভালো লাগে। আমার শেলফে দেখো, কত ভূতের বই। বলো।

ছোট মামা আবার চায়ে চুমুক দিলেন। বাড়ি থেকে খামার বিশ-একুশ কিলোমিটার দূরে। ওই এলাকা সম্পর্কে আমার একটাই ধারণা—এলাকাটা মাছ, সবজি, আম —সবের খামারের জন্য খুবই উপযোগী। অনেকেই খামার করে বড়লোক হয়ে গেছে। বাবা বহু আগে ওই এলাকায় আটাশ বিঘা জমি কিনে রেখেছিলেন। একেবারে পানির দামে কিনেছিলেন। আমরা কেউ কোনো দিন দেখতেও যাইনি। বড় ভাই তো আমেরিকায় গিয়ে সেটেল করলেন। আপা ঢাকায়। আমিও ঢাকায় থেকে লেখাপড়া করি। এমবিএ করার সময় মনে হলো, চাকরিবাকরি করে কী হবে? একটা কৃষি খামার করতে পারলে ভালো হয়। এমনিতেই গ্রাম আমার খুব ভালো লাগে। গাছপালা, খাল, নদী, মাঠ। খোলা জায়গায় আকাশটাও বিশাল দেখায়। ফ্রেশ হাওয়া, পাখির গান। একেক সিজনে একেক রকম প্রকৃতি। কত ফুল ফোটে চারদিকে! শহরে এসব পাওয়া যায় না। কৃষি খামারের আরেকটা সুবিধা হলো, খাবারটা তুই একেবারে ফ্রেশ পাবি। চাল-ডাল, ফলমূল, মাছ-মাংস...

আসল গল্প শোনার জন্য অস্থির হয়ে আছে ফারাজ। বলল, গল্পটা বলো মামা। কৃষি খামারের ভাষণ পরে দিয়ো।

ছোট মামা হাসলেন। গল্প না রে পাগলু। ঘটনা। বাস্তব ঘটনা। আমার জীবনে ঘটেছে।

সে কথা তো একবার বললে। এবার ঘটনাটা বলো।

ওই যে আমগাছটার কথা বললাম, ওই আমগাছটা সম্পর্কে এলাকায় প্রচলিত আছে, ওই গাছের আম কেউ পাড়তে পারে না। একটা বাদুড় থাকে গাছটায়। সব আম সে খায়। গাছতলায় কোনো আমই কখনো আস্ত পাওয়া যায় না। বাদুড় কিছুটা খেয়েছে বা অর্ধেক খেয়েছে—এ রকম আম পড়ে থাকে। হয়তো ও রকম আধখাওয়া আমই কেউ কখনো কুড়িয়ে খেয়ে দেখেছে, আমের স্বাদ ও গন্ধ অসাধারণ। বাদুড়টার কারণে কেউ কখনো গাছে চড়ে আম পাড়ে না। এমনকি গাছটার কাছেই যায় না। গাছটায় আম ধরে অনেক।

চা শেষ করে মগটা রাখলেন ছোট মামা। আমরা চার বন্ধু মিলে খামার করেছি। সুন্দর একটা বাংলো করেছি। কেয়ারটেকার আছে, রান্নার লোক আছে। পাহারাদার আছে। আমি সব সময়ই থাকি। আমার বন্ধুরাও থাকে প্রায়ই। এবার যখন ওই গাছটায় আম ধরল, বললাম, ওই আম পেড়ে খাবই। দেখি কোথায় কোন বাদুড় সাহেব আমাকে বাধা দেন। কেয়ারটেকারের নাম নজরুল। বয়স্ক মানুষ। বলল, এই কাজটা করবেন না স্যার। আপনারা এখানে খামার করেছেন। গাছটা আপনাদের জমির মধ্যেই পড়েছে। ওই গাছে সমস্যা আছে। কী দরকার ওসব নিয়ে ভাববার। গাছ গাছের মতো থাকুক, আপনারা আপনাদের মতো থাকুন। বাদুড়ের ঘটনাটা মিথ্যা না। অনেকেই বাদুড়টা দেখেছে। গ্রামের কোনো কোনো সাহসী যুবক গাছে চড়ে আম পাড়ার চেষ্টা করেছে। পারেনি। হয় গাছেই চড়তে পারেনি। বারবার চেষ্টা করে অর্ধেক চড়ার পরই পড়ে গেছে। কেউ কেউ ওপরে ওঠার পর ডাল ভেঙে পড়ে গেছে। হাত-পা ভেঙেছে কেউ, বাদুড় দেখে অজ্ঞান হয়ে গেছে কেউ।

ফারাজ বলল, বাদুড়টা কি অনেক বড়?

অন্য বাদুড়ের তুলনায় সামান্য বড়। ওটা সমস্যা না। যেকোনো প্রাণীর মধ্যেই দু-চারটা একটু বড় হতে পারে।

তাহলে ওই বাদুড় দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কী আছে?

সেটাই তো ঘটনা। গাছে উঠে বাদুড় দেখে অজ্ঞান হয়ে গাছের দুই ডালের মাঝখানে আটকে ছিল। গ্রামের লোকজন দল বেঁধে গিয়ে উদ্ধার করেছে। তখন গাছে কেউ কোনো বাদুড় দেখেনি। তবে যে অজ্ঞান হয়েছিল, তার নাকি আর জ্ঞান ফেরেনি। ১০ দিন পর মারা গেছে।

বলো কী?

এসব শোনা কথা, বুঝলি না? গ্রাম এলাকায় এ ধরনের বহু গল্প শোনা যায়। আমি বিশ্বাস করিনি। আমার বন্ধুরা কেউ বিশ্বাস করেছে, কেউ করেনি। ওরা ব্যবসায়ী। ও নিয়ে মাথাই ঘামাইনি। কিন্তু আমার মাথায় ওটা রয়ে গেছে। আম পাকলে ওই গাছে আমি চড়বই। আম পেড়ে খেয়ে দেখবই।

বাদুড়টা কী সব সময়ই থাকে ওই গাছে?

না। শুধু নাকি আম পাকার সময়টায় থাকে। কোত্থেকে আসে কেউ জানে না। গাছের আম শেষ হলে কোথায় চলে যায়, তা-ও কেউ জানে না। এই পাগলু, বাদুড় সম্পর্কে তুই কতটা জানিস, বল তো?

বাদুড় দেখতে চামচিকার মতো। বাদুড় পাখি না। স্তন্যপায়ী প্রাণী। অর্থাৎ কুকুর-বিড়ালের মতো বাদুড়ছানারাও মায়ের দুধ পান করে। বাদুড়ের খাবার হচ্ছে ফলমূল। সারা দিন মাথা নিচের দিকে দিয়ে গাছের ডালে ঝুলে থাকে। আমি রমনা পার্কে ওই রকম ঝুলে থাকা বাদুড় দেখেছি। সন্ধ্যার পর বাদুড়রা খাবারের খোঁজে বের হয়। বাদুড় ইংরেজি ইঅঞ ।

বাহ্! বাদুড় সম্পর্কে ভালোই জানিস দেখছি। তবে বাদুড়ের আরেকটা ইংরেজি নাম আছে। ঋখণওঘ েঋঙঢ । ওড়ন শিয়াল। কারণটা হলো, বাদুড়ের মুখ শিয়ালের মুখের মতো।

এটা জানা ছিল না। বলো মামা, তারপর কী হলো?

আমি আমার প্ল্যানমতো আছি। কাউকে কিছু বলছি না। আমের গুটি আসার পর গাছটার ওদিকে একদিন ঘুরেও এলাম। খামার দেখতে বেরিয়ে পুরো খামারটায়ই মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়াই। সঙ্গে বন্ধুরা থাকে, খামারে কাজ করার লোকজন থাকে। কোনো কোনো দিন আমি একাও ঘুরি। ওদিকটায় গেলেই গাছটার দিকে তাকাই। আসলেই বিস্তর আম ধরল গাছটায়। এ বছরই খামার শুরু করলাম আমরা। এ বছরই খেয়াল করলাম। ধীরে ধীরে আম বড় হলো। একটা-দুইটা করে পাকতে লাগল। আমি গাছটার কাছে প্রায়ই যাই। ডালপালার ফাঁকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি বাদুড়টা দেখা যায় কি না। না, কোথাও কোনো বাদুড় দেখি না। তবে গাছতলায় বাদুড়ে খাওয়া আম পাই। একদিন কয়েক ঠোকর খাওয়া একটা আম তুলে অন্য দিক দিয়ে একটু খেয়ে দেখলাম। সত্যি অসাধারণ আম। যেমন মিষ্টি, তেমন গন্ধ। রাতের বেলা বাদুড়রা এসে আম খেয়ে যায়। আমাকেও খেতে হবে। আমি এই গাছে চড়ব, আম পাড়ব। যদি বাদুড়টা দেখতে পাই, তাহলে তো আরো ভালো। কত বড় বাদুড়, কী করে সেটা, দেখি না একটু!

ফারাজ প্রায় দম বন্ধ করে বসে আছে। ছোট মামা তার দিকে তাকালেন। একদিন দুপুরের পর গেলাম গাছটার কাছে। এ সময় খামার একেবারেই নিঝুম হয়ে থাকে। লোকজন খাওয়াদাওয়া সেরে রেস্ট নেয়। আমি চটের একটা ব্যাগ নিয়েছি। ব্যাগটা কাঁধে ঝোলানোর ব্যাগ। সেই ব্যাগ আমি গলায় ঝোলালাম। কারণ কাঁধে বা হাতে নিতে পারছি না। আমি তো গাছে চড়ব। দুই হাতে গাছ বেয়ে উঠব। ব্যাগ কাঁধে রাখা যাবে না। এ জন্য গলায় ঝুলিয়েছি। তত দিনে গাছের আম পেকে একেবারে হলুদ হয়ে আছে। আমের ভারে ডালগুলো নুয়ে পড়েছে। গাছে চড়লাম। একের পর এক আম পেড়ে গলায় ঝোলানো ব্যাগে রাখছি। এ সময় বাদুড়টা আমি দেখতে পেলাম। পাতার আড়ালে একটা ডালে বসে আছে। দিনের বেলা বাদুড় কখনো এভাবে বসে থাকে না। মাথা নিচের দিকে দিয়ে ঝুলে থাকে। এই বাদুড়টা বসে আছে। সাইজে একটু বড়। শিয়ালের মতো মুখ। রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটি লাল। মার্বেলের মতো। চোখে কেমন যেন একটা ঝিলিক। আমার ভয়ভীতি কম। আমি খুবই সাহসী মানুষ। আমার মতো মানুষেরও বাদুড়টা দেখে, ওভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, দিনদুপুরে, ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল। হাত-পা অসার হয়ে এলো। তিরিশ-পঁয়ত্রিশটা আম পেড়ে ব্যাগে রেখেছি। ব্যাগ ভারী হয়ে গেছে। আমি শুধু একটা দিকে খেয়াল রাখছি—গাছ থেকে যেন পড়ে না যাই। বেশ উঁচুতে উঠেছি। পড়লে হাত-পা, কোমর ভাঙবে। যতটা সাবধানে, যতটা তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নামা যায়, নামতে থাকলাম।

একটু থেমে ছোট মামা বললেন, এ সময় অদ্ভুত একটা ঘটনা টের পেলাম। আমি নামছি আর গলায় ঝোলানো আমের ব্যাগ হালকা হচ্ছে...

ফারাজ অবাক। হালকা হচ্ছে মানে?

ব্যাগের ভেতর থেকে আম উধাও হয়ে যাচ্ছে।

বলো কী?

হ্যাঁ, শোনো না। নিচে নেমে দেখি ব্যাগে একটা আমও নেই। তিরিশ-পঁয়ত্রিশটা আম আমি পেড়েছি, ব্যাগে রেখেছি, একটা আমও নেই!

তুমি ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি নামতে গেছ, সেই ফাঁকে আমগুলো গাছতলায় পড়ে যায়নি তো?

আরে না। গাছতলা সবুজ ঘাসে ভর্তি। আম পড়লে ওখানেই পড়বে। ওখানে দু-একটা বাদুড়ে খাওয়া আম পড়ে আছে। ফ্রেশ আম একটাও নেই।

ছোট মামা বড় করে শ্বাস ফেললেন। তারপর আমি সত্যি ভয় পেলাম রে পাগলু। বাদুড়ের ব্যাপারটা বিশ্বাস করলাম। ওটা আসলে বাদুড় না। অন্য কিছু। ওই গাছটার মালিকই সে। তার গাছের আম অন্যকে খেতে দেবে না। কেউ যদি ওই গাছের আম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, তাহলে তার বিপদ হবে। আমার কোনো বিপদ হয়নি। অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভৌতিক অভিজ্ঞতা। ঘটনাটা আমি কাউকে বলিনি। ভেবে রেখেছিলাম, ঢাকায় এলে শুধু তোকে বলব।

ফারাজ বলল, সত্যি অদ্ভুত ঘটনা মামা। তারপর তুমি কি আর ওই গাছটার সামনে গেছ?

বহুবার গেছি। আমের সিজন শেষ। এখন তো আর কোনো ঝামেলা নেই। তবে গাছটার কাছে গেলে বা দূর থেকে ওটার দিকে তাকালে কেমন একটা ভয়ের অনুভূতি হয়। গা শিরশির করে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা