kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

কিশোর যোদ্ধা

‘মওকা বুঝে অ্যাটাক করে দিতাম দৌড়’

বয়স ছিল তোমাদের মতোই। সালটা ছিল একাত্তর। শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। বাঁচাতে হবে মাকে, বাংলাদেশকে। তাই ক্লাসের ব্যাগটা একপাশে রেখে হাতে তুলে নেন অস্ত্র। নেতৃত্ব দেন অনেকগুলো অপারেশনের। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান দিলু তার যুদ্ধদিনের রোমাঞ্চকর গল্প শুনিয়েছেন দলছুটকে

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘মওকা বুঝে অ্যাটাক

করে দিতাম দৌড়’

‘ঢাকা কলেজের ছয় নম্বর গ্যালারির দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখলাম, টিচাররা আসেননি। স্টুডেন্টরা বসে গল্প করছে। একটু মায়া হলো। গ্রেনেডটা মাঝখানে মারলে সাত-আটজন মারা যাবে। সিদ্ধান্ত নিলাম, গ্রেনেড মারব সাইডে। গ্যালারির ভেতর একটা নালার মতো ছিল, সেখানেই ছুড়লাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নীল একটা আলো জ্বলে দড়াম করে ফুটল গ্রেনেড। পুরো কলেজে বোম! বোম! চিত্কার শুরু। আলাদা করে আর পালাতে হলো না। ছাত্রদের ধাক্কাতেই চলে এলাম মেইন গেটে। এর পর থেকে কলেজ বন্ধ।’

শুরুর কথা

‘আমার জন্ম ১৯৫২ সালে, চট্টগ্রামে। ভাবতেই ভালো লাগে, ভাষা আন্দোলনের বছর আমার জন্ম। ১৯৬০ সালে আমরা ঢাকায় আসি। থাকতাম আজিমপুরে। লালবাগ-আজিমপুরের শেষ মাথায় ওয়েস্টার্ন হাই স্কুলে আমার স্কুলজীবন কেটেছে। এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আমলের শেষ ব্যাচের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলাম। ম্যাট্রিক পাস করে মাত্র ভর্তি হয়েছি। এর মধ্যেই যুদ্ধ শুরু। ভেতরে আঠারো বছর বয়সের টগবগে তারুণ্য।

১৯৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলনের যে মিছিলে আসাদ শহীদ হন, সে মিছিলে আমিও ছিলাম। আমি তখন ক্লাস নাইনে। গুলি শুরু হতেই দৌড়ে মেডিক্যাল কলেজের ছাদে উঠি। সেখান থেকে বিকেলে নেমে আজিমপুরে আসি। ওই দিনই মনের ভেতর যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতিটা চলে আসে। এমনিতেও বাউন্ডুলে ছিলাম। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বাবা ডেকে খুব বকাঝকা করলেন। আমার নামে অনেক কমপ্লেইন আসছিল মারামারির। বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, এত ছেলে যুদ্ধে যায়, তুমি যেতে পারো না! বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিয়ে নিই। সাত বন্ধু জোগাড় করে চলে যাই যুুদ্ধে।

ট্রেনিংয়ে অনেক ভোগান্তি হয়েছে। সাত দিন একটানা হেঁটেছি। বর্ডার চিনি না। পানি খেয়ে, রুটি খেয়ে অনেক কষ্টে সাত দিন পর কলকাতায় পৌঁছলাম। ট্রেনিং হয় বিহারচাকরিয়ায়, পাহাড়ি এলাকা। সেখান থেকে মেলাঘর। মেলাঘর থেকে আমরা দুই নম্বর সেক্টরে খালেদ মোশাররফের আন্ডারে ঢাকায় ঢুকি।

১৯৭১ সালের জুন-জুলাইয়ের কথা। সাভারে অস্ত্র রেখে বাড়িতে আসি। দেখি, বাসায় কেউ নেই। বড় ভাইয়ের (নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান) অফিসে গিয়ে নতুন ঠিকানা পাই। আমি বাড়িতে যাওয়ার পর সবাই ছুটে এলো। মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। মাকে বললাম, ‘আম্মা আমি কিন্তু থাকতে আসিনি। ট্রেনিং নিয়ে এসেছি, যুদ্ধ করব।’ সঙ্গে সঙ্গে মা ফিট হয়ে গেলেন। আমার ছয় ভাই দুই বোন। আমার মতো একজন দিলু না থাকলে কী আর এমন হতো। কিন্তু মা পড়েই গেল! কিন্তু আমি দমে গেলাম না। সময়মতো চলে গেলাম বাড়ি ছেড়ে।

তখন থাকতাম কেরানীগঞ্জের আটিবাজারে। সেখান থেকে শহরে এসে অপারেশন করতাম। অনেক অপারেশন করেছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা কলেজ বন্ধ করে দেওয়া। সরাসরি যুদ্ধও করেছি। তবে বেশি করেছি গেরিলা যুদ্ধ। সিভিলিয়ানদের মধ্যে মিশে থাকতাম। মওকা বুঝে অ্যাটাক করে দিতাম দৌড়। হঠাৎ পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে দেওয়া ছিল উদ্দেশ্য। বিষয়গুলো ট্রেনিংয়েই শেখানো হয়েছিল।

এবার ঢাকা কলেজের মিশনের কথা বলা যাক। কলেজের অবস্থা দেখে খারাপই লাগল। কলেজভর্তি ছেলে-মেয়ে। অবাঙালি অনেক ছাত্র-ছাত্রী। আমার প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন। নাসির উদ্দিন বাচ্চু ছিলেন কম্পানি কমান্ডার। তাঁদের কাছে পারমিশন চাইলাম, আমার কলেজে অপারেশন করব। কলেজটা বন্ধ করে দিতে হবে। ওটাই আমার প্রথম অপারেশন।

আমরা তিন মুক্তিযোদ্ধা তিনটা স্টেনগান নদীর ওপার থেকে এপারে আনলাম। এখন যেটা রায়ের বাজার বধ্যভূমি, সেখান দিয়ে মুড়ির প্যাকেটে করে গ্রেনেড নিয়ে আসি। কলেজে গিয়ে দেখি, সিনিয়ররা অনেকেই জানেন আমার যুদ্ধে যাওয়ার কথা। তাঁরা আমাকে দেখে সরে গেলেন। কতগুলো অবাঙালি ছেলে যাচ্ছিল। এক বন্ধুকে বললাম, তুমি দেখো, ছেলেগুলো কোন রুমে ঢোকে, কোনো প্রশ্ন করবা না। ও বুদ্ধিমান। বুঝে গেল ব্যাপারটা। বন্ধুর নাম সাইফুদ্দিন। সে পরে আর্মিতে যায়। ও দেখে এসে বলল, গ্যালারি নম্বর ছয়।

হ্যাংলা-পাতলা হলেও আমার দুর্দান্ত সাহস তখন। পকেটে গ্রেনেড নিয়ে ওদিকে এগোলাম। ট্রেনিংয়ে বলা হয়েছিল, অপারেশনে গেলে আগে পালানোর পথ তৈরি রাখা চাই। আমি টয়লেটে গেলাম। সেখানে দেখি গ্যালারির পাশে যে ওয়াশরুম ছিল, সেগুলোর জানালায় গ্রিল নেই। একটা জানালা খোলা রাখলাম। যদিও ওখান থেকে লাফ দিলে দোতলা সমান নিচে পড়তে হবে। বের হওয়ার পথ ঠিক করে গ্রেনেডটা হাতে নিয়ে শক্ত করে লিভারটা ধরে চাবিটা খুললাম। চাবি খুলে পকেটে রাখলাম। কারণ আমি যে অপারেশনটা করেছি, তার প্রমাণ হিসেবে চাবিটা জমা দিতে হবে। যেই চাবি পকেটে রাখতে যাব, দেখি একটা অবাঙালি ছেলে টয়লেটের দিকেই আসছে। আমাকে দেখে থতমত খেয়ে গেল। আমিও এমন ভাব দেখালাম যে দিলাম তোর গায়ে ছুড়ে! ও পড়িমড়ি করে ছোট টয়লেট ছেড়ে পাশের বড় টয়লেটে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। দেরি না করে গ্যালারির পাশের ড্রেনে গ্রেনেড চার্জ করলাম।

এমন অনেক ঘটনা আছে। তবে বিজয় দিবস এলেই আমার আনন্দ আর কান্নার মিশ্র স্মৃতি চলে আসে। ১৬ তারিখ ভোর থেকে আমরা তিন মুক্তিযোদ্ধা ঘুরে বেড়িয়েছি। ওই সময় ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পেছনের একটা বাড়িতে উঠি। সেখানে গভর্নর মালেকের বাড়ি ছিল। সকালেই খবর পাই আজ সারেন্ডার হবে। আমরা তিনজন গিয়ে ওই বাড়িতে অ্যামবুশ করি। বাড়ির ভেতর থেকে মালেকের লোকজন রাইফেল কাঁধে বের হচ্ছিল। আমরা ওদের সারেন্ডার করালাম। তা দেখে প্রচুর লোক হাজির। এদের মধ্যে অনেকে ছিল, যারা মালেকের কাছে টাকা পায়, কেউ ছিল নির্যাতিত। আমরা লোকগুলোকে গ্যারেজে আটকে অস্ত্রগুলো কবজা করি। মালেক ও তার পরিবারের সবাই আগেই ভেগেছে।

এরপর আমরা সোবহানবাগের একটা পেট্রল পাম্পে ঢুকতেই দেখি, আর্মির একটা লরি। একটা জিপ দেখলাম। তাতে একজন ক্যাপ্টেন ও ছয়জন সেনা। ওদের সারেন্ডার করালাম। অস্ত্র তাক করতেই হাত উঠিয়ে দিল। আমি ক্যাপ্টেনের কোমর থেকে পিস্তল নিয়ে নিই। সেখান থেকে কলাবাগানের দিকে চলে আসি। এখানেও একটা জিপ পেলাম। জিপটা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের হবে। ড্রাইভারকে বললাম, আমাদের নিয়ে চলো। তখনো পুরোপুরি সারেন্ডার করেনি পাকিস্তান বাহিনি। আমাদের সঙ্গে বিজয়ের আনন্দ করতে জিপে অনেক ছেলেপেলেও উঠে পড়ল। আমরা নীলক্ষেত হয়ে ইউনিভার্সিটি দিয়ে যখন শাহবাগের দিকে এগোচ্ছি। আচমকা শাহবাগ আর্মি কন্ট্রোলরুম থেকে বৃষ্টির মতো গুলি। এখন যেটা পুলিশ কন্ট্রোলরুম, ওটাই তখন আর্মি কন্ট্রোলরুম। ওরা চিত্কার করে আমাদের অস্ত্র ফেলে দিতে বলল। এক সেকেন্ডের মধ্যে দেখলাম, জিপ ফাঁকা। কেউ নেই। আমি একা স্টেনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে। স্টেনগানের রেঞ্জ কম। আর ওরা গুলি করছে মেশিনগান দিয়ে। আমি জিপ থেকে নেমে টায়ারের কাছে শুয়ে পড়লাম। ভাবলাম আজকেই বোধ হয় আমার শেষ দিন। আর কিছুক্ষণ থাকলে স্বাধীনতাটা দেখে যেতে পারতাম। এরই মধ্যে দেখি আমার থেকে কয়েক হাত দূরে একটি ছেলে শুয়ে গোঙাচ্ছে। ওর কানের পাশে গুলি লেগেছে। ওর রক্ত আমার দিকে গড়িয়ে আসছে। আমার মানসিক অবস্থা ভয়াবহ! কিছুটা পথ হামাগুড়ি দিলাম। ওরা মনে করেছে আর কেউ নেই। থেমে থেমে একটা করে গুলি করছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। পায়ে থাকা পছন্দের স্যান্ডেলটার মায়া ত্যাগ করে পিজি হাসপাতালের দিকে দিলাম দৌড়। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পিঠে গুলি লাগল। কিন্তু বেঁচে গেলাম। ওখানে গিয়ে দুই বন্ধুকে পেলাম। তিনজন মিলে বেরিয়ে এসে কাভারেজ ফায়ার দেওয়ার চেষ্টা করলাম। ব্ল্যাংক ফায়ার করতে করতে ওই ছেলেকে টেনে আনলাম। ভাবলাম, ওকে বাঁচানো যায় কী করে। ও আমাদের মতো মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। ক্লাস এইট-নাইনে পড়ত। একটা প্রাইভেট কার থামিয়ে বললাম, ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। পরে জানতে পারি, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সে মারা যায়। আমরা দেয়াল টপকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে (মাঝে যার নাম শেরাটন ও রূপসী বাংলা ছিল) গেলাম। সেখানে দেখি, ইন্ডিয়ান আর্মিরা এসেছে। তাদের এক ক্যাপ্টেনকে জানালাম ঘটনা। তিনি বললেন, ওঠো আমার গাড়িতে। ইন্ডিয়ার গাড়ি দেখে ওই পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র নিচু করে হাত উঁচু করল। আমি তো স্টেনগানের ট্রিগারে প্রায় চাপ দিয়েই ফেলেছিলাম। ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেন বলল, ‘নো নো!’ ও আমার স্টেনগান ধরে ফেলল। বলল, ‘তুমি একজন আত্মসমর্পণকারী সেনাকে গুলি করতে পারো না। এটা আইন।’ ওরা একটা সাধারণ ছেলেকে গুলি করে মারল, আমি কিছুই করতে পারলাম না। এই বেদনার বোধ সব সময় আমাকে তাড়া করবে।

তারপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সারেন্ডার স্বাক্ষর হলো। আমরা ওই দিকেই ছিলাম। সারেন্ডারের খবর শুনে প্রথমেই বাড়ির কথা মনে পড়ল। আমার মনে হলো—আমার জন্য মা, ভাই-বোনরা অপেক্ষা করছে। মা সকাল থেকেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার অপেক্ষায়। আমার ছোট বোন ড. জুবায়দা কোত্থেকে ফুল জোগাড় করে মালাও বানিয়ে রেখেছে। বিকেল ৩টা-৪টার দিকে আমি ঘরে ঢুকতেই মা আমার গলায় মালাটা পরিয়ে দিলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা