kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

শিশুর অতিরিক্ত ওজন নয়

অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

১০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



শিশুর অতিরিক্ত ওজন নয়

বর্তমান বিশ্বে শিশুর অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা অতিরিক্ত ওজন। কোনো কোনো দেশে শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যা ও মৃত্যুর চেয়ে মেদবহুলতাজনিত সমস্যায় মৃত্যুহার বেশি। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বেও অতিরিক্ত ওজন শিশু স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

 

কারণ

►   মা-বাবার অতিরিক্ত মেদবহুলতা

►   গর্ভকালীন শিশুর অতিরিক্ত ওজনপ্রাপ্তি

►   বেশি ওজন নিয়ে জন্মানো

►   ধূমপায়ী মা।

 

কিছু ভ্রান্ত ধারণা

শিশুর গর্ভসঞ্চার কাল থেকে দুই বছর বয়স অবধি প্রথম এক হাজার দিন শিশুর এই সমস্যা সৃষ্টির ভিত হিসেবে কাজ করে যা প্রমাণিত সত্য। অনেকে মোটা হওয়াকে ‘স্বাস্থ্যবান শিশু’ বলে একপ্রকার আনন্দ পান। এই ধারণা ভুল। শিশুর অতিরিক্ত ওজন একপ্রকারের অপুষ্টি এবং এর আড়ালে অনেক শিশু রোগ যুক্ত থাকতে পারে।

 

অতিরিক্ত ওজন পরীক্ষা

শিশুর রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ওজন, উচ্চতা ও বিএমআই নির্ণয় করে দেখা উচিত। ফলে তা শিশুর বয়স অনুযায়ী বিকাশ-বৃদ্ধি (গ্রোথ) চার্টে অবস্থান চিহ্নিত করে শিশুর ওজন বেশি কি না বোঝা যায়। শিশুর এই মেদবহুলতা দুই স্তরের।

 

►   শিশুর বিএমআই যদি ৯৫তম সারণি রেখা কিংবা তার ওপর অবস্থান নেয়, তবে শিশু ‘ওবিস’ বা ‘স্থূলকায় শিশু’।

►   বিএমআই যদি ৮৫তম থেকে ৯৫তম রেখায় থাকে, তবে সে ‘অতিরিক্ত ওজনের’ শিশু বলে গণ্য হবে।

 

অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকি

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যে শিশু অস্বাভাবিক ওজনের তার হৃৎপিণ্ড, হরমোন, পৌষ্টিকনালি, স্নায়ুতন্ত্র, অস্থি, ফুসফুস—এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নানা জটিলতায় পড়ে। তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে এবং এসব ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত ওজনের শিশুর’ তুলনায় ‘স্থূলকায় শিশু’ বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

 

প্রতিরোধে করণীয়

শিশু যেন অতিরিক্ত ওজনজনিত মারাত্মক জটিলতায় না পড়ে, সে জন্য কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করা জরুরি। যেমন—

 

►   গর্ভকালে মায়ের স্বাভাবিক বিএমআই বজায় রাখার চেষ্টা করা।

►   মায়ের ধূমপান পরিহার করা।

►   গর্ভবতী মায়ের মাঝারি ধরনের ব্যায়াম করা।

►   গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ও গর্ভস্থ শিশুর ওজন লাভের গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করা।

►   প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু বুকের দুধ পান করানো।

►   ছয় মাস বয়স থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পরিপূরক খাবার, যেমন—খিচুড়ি খাওয়ানো শুরু করা।

►   ১২ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে কোনো ধরনের জুস খেতে না দেওয়া।

►   পরিবারের সবাই মিলে শিশুকে নিয়ে একটা নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা নিরূপণ করে একসঙ্গে প্রতিদিনের খাবার খাওয়া।

►   খাবার রুটিনে কোনো ছেদ না দেওয়া, বিশেষত প্রাতরাশ বা ব্রেকফাস্ট।

►   খাবারের সময় টেলিভিশন না দেখা।

►   খাবার গ্রহণে ছোট থালা বা প্লেট ব্যবহার করা।

►   বেশি চিনি, ফ্যাট বা চিনিযুক্ত পানীয় বর্জন।

►   শিশু বেশি বেশি খেলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে, এরূপ প্রলোভন না দেখানো।

►   শিশুর শোয়ারঘরে টেলিভিশন না রাখা এবং টেলিভিশন ও ভিডিও গেমস দেখার মোট সময় নির্ধারণ করে দেওয়া।

►   চিপস, জুস, চকোলেট, ফাস্ট ফুড, সুগার ড্রিংকস ইত্যাদি অস্বাস্থ্যকর খাবার কেনার টাকা না দেওয়া।

►   স্কুলে নিরাপদ পানি পান ও স্যানিটেশনের সুবন্দোবস্ত রাখা।

►   দৈনিক এক ঘণ্টা করে সপ্তাহে পাঁচ দিন শরীরচর্চার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

►   পাড়ায় বা কমিউনিটিতে শিশুর উপযোগী স্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিরাপদ খেলাধুলার মাঠ, হাঁটা ও সাইকেল চালানোর রাস্তা এবং ব্যায়ামাগার স্থাপন করা।

►   টেলিভিশন ও মিডিয়ায় সেলিব্রিটিদের দিয়ে ফাস্ট ফুড কিংবা কেন্ডি কুকিস ইত্যাদি পুষ্টিহীন খাবারের বিজ্ঞাপন দেখিয়ে শিশু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ওসব খাবারের প্রতি শিশুদের আসক্তি তৈরি না করানো।

►   শিশু যদি স্থূলকায় হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে শিশুপুষ্টি বিশেষজ্ঞ ও শিশু বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার দ্রুত বন্দোবস্ত করা।