kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

শিশুদের থ্যালাসেমিয়া রোগ

থ্যালাসেমিয়া হচ্ছে পৃথিবীতে সর্বাপেক্ষা বেশি হারে দেখা যাওয়া জেনেটিক রোগ। বলা হয়, বাংলাদেশে বিশাল এক জনগোষ্ঠী থ্যালাসেমিয়ার বাহক। বিস্তারিত জানাচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী

২৫ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শিশুদের থ্যালাসেমিয়া রোগ

ছবি কৃতজ্ঞতা : বাংলাদেশ থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশন, ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

রোগের ধরন

এটি বংশগত রক্তরোগ। রক্তের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো হিমোগ্লোবিন। জেনেটিক কারণে যখন শরীরে স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না, তখন শিশু এরূপ অসুখে ভোগে। এই রোগে ‘অ্যাডাল্ট হিমোগ্লোবিন’ পরিমাণমতো তৈরি হতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

শিশুর প্রথম বছর শেষে মাত্র ১-২ শতাংশ বাদে সব ‘ফিটাল হিমোগ্লোবিন’ স্বাভাবিক ‘অ্যাডাল্ট হিমোগ্লোবিন’-এ পর্যবসিত হয়ে রক্ত তৈরি করে। থ্যালাসেমিয়া রোগাক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটা হতে পারে না। ফলে দেহের রক্তে ফিটাল হিমোগ্লোবিনের উচ্চমাত্রা বজায় থাকে। আর অ্যাডাল্ট হিমোগ্লোবিন পাওয়া যায় খুব অল্প, কখনো বা শূন্যের কোঠায়।

এ ছাড়া এই থ্যালাসেমিয়ার সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ ‘হিমোগ্লোবিন-ই’ যুক্ত হয়ে আরো মারাত্মক রকমের ‘থ্যালাসেমিয়া-ই’ নামের রোগ আমাদের দেশে শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। এসব হিমোগ্লোবিন বহনকারী লোহিত কণিকাগুলো হয় ত্রুটিপূর্ণ। ফলে সুস্থ মানুষের শরীরে যে লোহিত কণিকাগুলো ১২০ দিন বাঁচে, এদের শরীরে তাদের আয়ু ৩০ দিনের কম থাকে। আবার ওই সব কণিকার বেশির ভাগ অস্থিমজ্জায় তৈরি হয়ে বের হয়ে আসার আগে ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে শিশুর দেহে ক্রমেই রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।

 

কারণ

মা ও বাবার বৈশিষ্ট্যগুলো ‘জিন’ নামের এককের সাহায্যে সন্তানের মধ্যে প্রবাহিত হয়। যেসব মা ও বাবা দুজনের শরীরে এই রোগের জিন আছে, তাঁরা হচ্ছেন বাহক। তাঁদের সন্তানদের ২৫ শতাংশের আশঙ্কা থাকে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার। বাকি ২৫ শতাংশ হবে সুস্থ এবং ৫০ শতাংশ হবে মা-বাবার মতোই বাহক। তবে ঠিক কয় নম্বর সন্তানটি সুস্থ বা অসুস্থ হয়ে জন্ম নেবে তা বলা মুশকিল। পর পর যেমন সুস্থ সন্তান জন্ম নিতে পারে, তেমনি অসুস্থ সন্তান হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।

চাচাতো, খালাতো ভাই-বোনের মতো নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহে এই রোগের বাহকঘটিত থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি বেশি। যাঁরা রোগের বাহক, তাঁরা সাধারণভাবে শরীরে কোনো রকম অসুবিধা বোধ করেন না। কেননা এ ক্ষেত্রে দুটি জিনের একটি অসুস্থ থাকলেও অন্যটি থাকে সুস্থ এবং সুস্থ জিনটি রোগের জিনটিকে দমিয়ে রাখে। কিন্তু মা ও বাবা প্রত্যেকের থেকে প্রাপ্ত দুটি অসুস্থ জিন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুটি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়। সন্তানদের মধ্যে যারা বাহক, তারাও পরবর্তী প্রজন্মকে একই রীতিতে রোগের জিন সরবরাহ করবে।

 

লক্ষণ ও রোগ নির্ণয়

জন্মের সময় শিশুটি সুস্থই থাকে, কিন্তু থ্যালাসেমিয়ার প্রকার ও তীব্রতাভেদে ৪-৬ মাস থেকে ৩-৪ বছর বয়সের মধ্যে বাচ্চাটি রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তার কর্মচাঞ্চল্য কমতে থাকে। এর সঙ্গে পাঁচ-ছয় মাস বয়স থেকে শিশুটির এসপ্লিন বা প্লিহা ক্রমেই বড় হতে থাকে। এ সময় ঠিকমতো চিকিৎসা শুরু করা না হলে চেহারার মধ্যে একটু একটু পরিবর্তন আসে। কপালের সামনে ও মাথার দুই পাশ খানিকটা উঁচু দেখায়। তা ছাড়া তার চেহারায় একটা হলদেটে ভাব দেখা যায়। শরীরের লোহিত কণিকাগুলো অত্যধিক হারে ভেঙে গিয়ে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে জন্ডিস দেখা যায়। শিশু ঠিকমতো বাড়ে না। কিন্তু এটা ছোঁয়াচে রোগ নয়।

ল্যাবটেস্ট

সিবিসি : বাহক হলে হিমোগ্লোবিন মাত্রা ৯/১০ গ্রাম/ডেসি মধ্যম স্তরের থ্যালাসেমিয়াতে তা ৭-৮ গ্রাম/ডেসি, থ্যালাসেমিয়া মেজর-এ এই মাত্রা ৫ গ্রাম/ডেসি লিটারের কম থাকে।

 পিবিএফ—লোহিত কণিকার নানা বৈশিষ্ট্য

 রেটিকুলো সাইট কাউন্ট- অতিরিক্ত

 সিরাম আয়রন ও ফেরিটিন : স্বাভাবিক বা বাড়তি মান

টিআইবিসি : মান কম

হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রো পোরেসিস : হিমোগ্লোবিন এফ, এ-টু ও ই : বাড়তি।

 

চিকিৎসা

এক. শিশুর খাবার চাই পুষ্টিকর, সব প্রকার খাদ্যপ্রাণযুক্ত ও সুষম, যেন শিশু অপুষ্টিতে না ভোগে, যাতে তার বৃদ্ধি যথাযথ হতে পারে। তবে খাবারদাবারের ব্যাপারে কয়েকটা নিষেধাজ্ঞা আছে, যেমন—তাকে টিনজাত দুধ, খাসির মাংস অথবা আয়রনযুক্ত কোনো খাবার বা টনিক দেওয়া চলবে না। বিশেষত রক্তশূন্য ফ্যাকাসে শিশুটির রক্ত বাড়ানোর চেষ্টায় বিভিন্ন ধরনের আয়রন সিরাপ, যা অনেকের কাছে রক্তের সিরাপ বলে বিবেচিত শিশুটিকে খেতে দেন—থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্য তা মারাত্মক রকমের ক্ষতিকর। লোহার পাত্রে রান্না করবেন না। প্রচুর পরিমাণে চা খেতে দেবেন, বিশেষ করে আহারের পর। কেননা চা কিংবা কফি শরীরের লোহা শোষণে বাধা দেয়।

দুই. প্রেসক্রিপশনে ফলিক এসিড রাখা প্রয়োজন। জিংক দিতে পারলে ভালো। শিশুকে হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন দিয়ে দেওয়া চাই।

তিন. কিছুদিন পর পর শিশুটিকে রক্ত দেওয়াই এই অসুখের প্রধান চিকিৎসা। সাধারণভাবে ৮-১০ সপ্তাহ পর পর রক্তের লোহিত কণিকা ট্রান্সফিউশন করে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১০ গ্রামের ওপরে রাখতে হয়। এভাবে রক্ত দিলে শিশুটির বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক থাকে। চেহারার পরিবর্তন হওয়া, প্লিহা ও যকৃৎ অত্যধিক বৃদ্ধি রোধ করা যায়। তবে রক্ত দেওয়ার ব্যাপারে কতগুলো সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। যেমন—প্রফেশনাল রক্তদাতার বদলে স্বেচ্ছাদাতার কাছ থেকে রক্ত নিতে হবে। হেপাটাইটিস-বি এবং এইডস জীবাণুমুক্ত রক্ত যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে দেহে প্রবেশ করাতে হবে। হার্ট ফেইলিওরের আশঙ্কা থাকলে স্নো ট্রান্সফিউশন করা।

বারবার এভাবে রক্ত দিতে দিতে শিশুর শরীরে আয়রনের মাত্রা খুব বেড়ে যায়। প্রতি ব্যাগ রক্তে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম লোহা শরীরে প্রবেশ করে, যা শরীরের কোনো কাজে লাগে না। বরং শরীরের লিভার, অগ্ন্যাশয় ও বিভিন্ন জায়গায় জমে গিয়ে সেসবের ক্ষতিসাধন করে এবং অন্যান্য অসুখের সৃষ্টি করে। রক্তের এই লোহাকে শরীর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য ডেসফিরক্সাইন নামে একটা ওষুধ শিশুকে তিন বছর বয়স থেকে দেওয়া হয়। এটা একটা ইনজেকশন এবং সপ্তাহে পাঁচ-ছয় দিন দিতে হয় প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা ধরে। ব্যাপারটা বেশ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ। তবে বাজারে এর পরিবর্তে খাওয়ার ওষুধ চালু আছে।

চার. বোনম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশন হচ্ছে এ রোগের সম্পূর্ণ নিরাময়কারী নির্দিষ্ট চিকিৎসা, শিশুকে রক্ত দেওয়ার আগে যা করা গেলে শতকরা ৫০ থেকে ৭০ ভাগ ক্ষেত্রেই ভালো ফল পাওয়া যায়।

 

প্রতিরোধ

সফল বোনম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশন ব্যতীত অন্যান্য ব্যবস্থাপনার সাহায্যে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে ২০ থেকে ২৫ বছরের বেশি বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে আগে প্রচুর শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রায় সব দেশই এর মোকাবেলায় দারুণ সফল।

থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান থ্যালাসেমিক বেল্টে এবং এই রোগের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে। বলা হয়, এই জোনে শতকরা প্রায় ৬-৮ ভাগ মানুষ (নারী ও পুরুষ উভয়েই) এই থ্যালাসেমিয়া জিনের বাহক এবং অসচেতন হলে এদের পরবর্তী প্রজন্মের এই অসুখে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে আরো বেশি।

শুধু সামাজিক সচেতনতার সাহায্যে ভাবী মা-বাবার দল যথেষ্টসংখ্যক এগিয়ে এলেই এই রোগে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিবাহে প্রস্তুত নারী ও পুরুষ উভয়েরই উচিত বিবাহের আগে নিজেদের রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া। যদি তাঁদের মধ্যে ওই রোগের জিন থাকে অর্থাৎ তাঁরা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাঁদের মধ্যে কখনোই বিবাহ হওয়া উচিত নয়।

এটাও যদি কেউ করেন, তাঁদের জন্য আরেকটি ব্যাপারের ওপর বর্তমানে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। সেটা হলো ইনট্রাইউটেরাইন ডায়াগনসিস। গর্ভাবস্থার ৮-১০ সপ্তাহের মধ্যে জরায়ুর ভেতরকার ভ্রূণ থেকে এক ফোঁটা রক্ত বের করে তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। এতে যদি ওই রোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে গর্ভপাত করিয়ে ফেলা। সাইপ্রাসে আগে থ্যালাসেমিয়া প্রচুর হতো, কিন্তু ক্যারিয়ার বা বাহকদের মধ্যে বিবাহ হবে না এই ব্যবস্থা চালু করে সেখানে অসুখটি প্রায় নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। তাই এই সাধারণ সচেতনতা বাড়াতে না পারলে আমাদের দেশেও এই রোগের প্রতিকার সম্ভব নয়। এখানে উল্লেখ্য যে ক্যারিয়ার বা কেউ রোগের বাহক কি না তা নির্ণয়ের জন্য খরচ খুব বেশি পড়ে না।

 প্রয়োজন না হলে আরো সন্তান জন্মদান থেকে বিরত থাকা উচিত। যদি সন্তান নিতেই হয়, তবে পরবর্তী সময়ে প্রত্যেক সন্তান গ্রহণের সময় গর্ভাবস্থায় ভ্রূণ পরীক্ষা করিয়ে ‘থ্যালাসেমিয়া শিশু হবে না—নিশ্চিত হওয়া উচিত।



সাতদিনের সেরা