kalerkantho

শনিবার । ২৫ জুন ২০২২ । ১১ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৪ জিলকদ ১৪৪৩

২৯ মে বিশ্ব ডাইজেস্টিভ স্বাস্থ্য দিবস

কিভাবে বুঝবেন আপনার কলোরেক্টাল ক্যান্সার আছে

ডা. মুহাম্মদ সায়েদুল আরেফিন   

২৮ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কিভাবে বুঝবেন আপনার কলোরেক্টাল ক্যান্সার আছে

বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ ফুসফুসের ক্যান্সারের পর দ্বিতীয় প্রধান কারণ কলোরেক্টাল ক্যান্সার। আমাদের দেশে সঠিক ডাটা না থাকলেও বলা যায় ক্যান্সারজনিত প্রথম ১০টি কারণের অন্যতম একটি কারণ কলোরেক্টাল ক্যান্সার। যেহেতু গবেষণায় কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকিগুলো নির্ণীত হয়েছে এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব, তাই এই রোগ সম্পর্কে জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।  

পরিপাকতন্ত্র মানবশরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।

বিজ্ঞাপন

অন্ত্রনালি ছাড়াও লিভার, প্যানক্রিয়াস, পিত্তথলি, পিত্তনালি এই তন্ত্রের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শরীরের এই অংশের বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অর্গানাইজেশন প্রতিবছর ২৯ মে’কে ‘বিশ্ব ডাইজেস্টিভ স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০০৪ সাল থেকে এই দিবসটি সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। প্রতিবছর কোনো একটি বিশেষ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই দিবস পালিত হয়। ২০২২ সালের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘কলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রতিরোধ করুন : সঠিক পথে থাকুন’।

 

কাদের ঝুঁকি বেশি?

৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে যেকোনো নারী-পুরুষ, যাদের নিকট আত্মীয়ের (মা-বাবা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে) কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস আছে, ‘আলসারেটিভ কোলাইটিস’ ও ‘ক্রোন্স ডিজিজ’ নামক ‘ইনফ্লেমেটরি বাওয়েল ডিজিজ’ এবং ‘ফ্যামিলিয়াল এডিনোমেটাস পলিপোসিস’-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি।

 

অন্যান্য ক্যান্সার থেকে পার্থক্য কী?

সময়ের পরিক্রমায় ‘কোলনিক পলিপ’ নামক কোলনের গায়ে এক ধরনের নির্দোষ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ‘কলোরেক্টাল ক্যান্সার’-এ রূপান্তরিত হয়। এই ‘কোলনিক পলিপ’ পর্যায়কে কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ‘প্রি-ম্যালিগন্যান্ট’ অবস্থা বলা হয়। ‘পলিপ’ থেকে ‘ক্যান্সার’-এ রূপান্তর হতে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ থেকে ১০ বছর সময় লেগে থাকে। সব ক্যান্সারের কিন্তু এমন ‘প্রি-ক্যান্সারাস পর্যায়’ পার হতে হয় না     ।

 

‘কোলনিক পলিপ’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

যেহেতু ‘কোলনিক পলিপ’ একটি ‘প্রি-ক্যান্সারাস’ অবস্থা, তাই ‘প্রি-ক্যান্সার’ থেকে ‘ক্যান্সার’-এ রূপান্তর হওয়ার আগেই এই পলিপ ‘কোলনোস্কোপি’র মাধ্যমে কেটে ফেলে দিলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই পলিপ কোলন থেকে নির্মূলের জন্য পেটে কোনো কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না।

 

লক্ষণগুলো

♦ মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, পেটে ব্যথা, পেটে চাকা অনুভূত হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্যতা, শরীর শুকিয়ে যাওয়া, রক্তশূন্যতা ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে কলোরেক্টাল ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীরা আসতে পারে।

♦ প্রায় আমরা মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া মানেই পাইলস মনে করে ভুল করে থাকি। দীর্ঘ সময় অবহেলার ফলে চিকিৎসার আওতার বাইরে চলে যাওয়া অবস্থায় কলোরেক্টাল ক্যান্সার ধরা পড়তে পারে। তাই মলের সঙ্গে রক্ত গেলে দ্রুত নিকটস্থ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

♦ অনেক সময় কলোরেক্টাল ক্যান্সার শুধু রক্তশূন্যতা নিয়ে হাজির হতে পারে। রক্ত কমে গেলে শরীরে রক্ত ভরে দেওয়াই শেষ কথা নয়। মনে রাখতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত রক্তশূন্যতার কারণ আপনি না জানছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার চিকিৎসা অসম্পূর্ণ। শরীরে রক্ত কমে গেলে অথবা রক্ত সঞ্চালনের আগে চিকিৎসককে রক্তশূন্যতার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন।

 

যেসব কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে

♦ রেড মিট বা লাল মাংস (গরু, খাসি)

♦ ধূমপান

♦ শারীরিক স্থূলতা

♦ অতিরিক্ত মদ্যপান।

অন্যদিকে আঁশজাতীয় খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় বলে মনে করা হয়।

স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব

ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশের আগেই কোনো ক্যান্সার খুঁজে বের করার পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘স্ক্রিনিং’ বলা হয়। যেহেতু কলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রি-ক্যান্সার পলিপ থেকে রূপান্তরিত হয়ে তৈরি হয়, তাই স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে পলিপ কেটে দিলে কলোরেক্টাল ক্যান্সারকে সম্পূর্ণ ঠেকানো সম্ভব। একইভাবে যেহেতু স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের কলোরেক্টাল ক্যান্সার চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব, তাই কলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রতিরোধে স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কলোরেক্টাল ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের জন্য অনেকগুলো পরীক্ষার উপায় থাকলেও কোলনোস্কোপিই সর্বোত্তম এবং সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। ৪৫ থেকে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকেই নিয়মিত বিরতিতে কোলনোস্কোপি পরীক্ষার মাধ্যমে কোলন ক্যান্সার স্ক্রিনিং করা উচিত।

 

কোলন ক্যান্সার রোগী নিকট আত্মীয় হলে

পরিবারে কারো নিকট আত্মীয় কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকলে নিকটস্থ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং কোন বয়সে জীবিত আত্মীয়-স্বজনকে কোলনোস্কোপি পরীক্ষা শুরু করতে হবে, তা জেনে নিতে হবে। কারো রক্ত সম্পর্কীয় নিকটতম আত্মীয় (মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন) যে বয়সে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, সেই বয়স থেকে ১০ বছর আগে অথবা ৪০ বছর বয়স থেকে অথবা এই দুইয়ের মাঝে যেটি কম, সেই বয়স থেকে স্ক্রিনিং পরীক্ষা শুরু করতে হবে। যেমন—কারো মা-বাবা যদি ৩৫ বছর বয়সে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে ছেলে-মেয়েদের ২৫ বছর বয়স থেকেই কোলন ক্যান্সার স্ক্রিনিং শুরু করা উচিত। অন্যদিকে কারো মা-বাবা যদি ৫৫ বছর বয়সে কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে ছেলে-মেয়েদের ৪০ বছর বয়স থেকেই স্ক্রিনিং পরীক্ষা শুরু করা উচিত।

 

চিকিৎসা

♦ সার্জারি

♦ কেমোথেরাপি

♦ ইমিউনোথেরাপি

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা



সাতদিনের সেরা