kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

ইমিউন থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বা আইটিপি

ডা. গুলজার হোসেন, রক্তরোগ ও রক্ত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ইমিউন থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বা আইটিপি

আইটিপিকে বলা হতো ‘ইডিওপ্যাথিক থ্রম্বোসাইটোপেনিক পারপুরা’। পরে জানা যায়, এর পেছনে দায়ী শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম। এ জন্য এখন একে বলা হচ্ছে ‘ইমিউন থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া’।

 

দেহে অ্যান্টিবডি খুব দরকারি একটি উপাদান।

বিজ্ঞাপন

ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সামনের যোদ্ধা হলো অ্যান্টিবডি। কিন্তু কখনো কখনো এই অ্যান্টিবডিই হয়ে ওঠে অসুখের কারণ। শরীরের অ্যান্টিবডি শরীরেরই শত্রু হয়ে ওঠে। ঘটায় নানা রকম রোগবালাই। এ রকম রোগকে বলা হয় অটোইমিউন ডিজিজ। আইটিপি এমনই একটি অটোইমিউন জাতীয় রোগ। এই রোগে শরীরে এমন কিছু অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা রক্তের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকার বিরুদ্ধে কাজ করে। প্লাটিলেটকে ধ্বংস করতে থাকে, তখন প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যায়। কমতে কমতে একেবারে বিপত্সীমার নিচে চলে আসে।  

 

রক্তক্ষরণের আশঙ্কা

প্লাটিলেট এক প্রকারের রক্তকোষ, যার কাজ হলো রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করা। এই প্লাটিলেট কমে গিয়ে যখন একেবারে ২০ হাজারের নিচে নেমে যায়, তখন রক্তক্ষরণের আশঙ্কা দেখা দেয়। সাধারণ সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের রক্তে প্লাটিলেট থাকে দেড় লাখ থেকে চার লাখ। আইটিপিতে তা এক লাখের নিচে নেমে আসে। কমতে কমতে ১০ এমনকি ৫ হাজারেও নেমে আসতে পারে।

আইটিপি হলে প্লাটিলেট কমে গিয়ে ত্বক ও মিউকাস ঝিল্লির নিচে রক্তক্ষরণ হয়। তখন ত্বকের নিচে লাল লাল দাগ হয়। একে বলে ‘পারপুরা’। এ ছাড়া দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, কালো পায়খানা বা মলের সঙ্গে রক্ত, মাসিকের সঙ্গে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, নাক থেকে রক্ত পড়া ইত্যাদি হয়ে থাকে। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে দেহের অভ্যন্তরেও রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। যেমন মস্তিষ্কে বা পেটের ভেতর রক্তপাত হতে পারে। তবে এটা বিরল।

 

কারণ

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আইটিপির তেমন কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, বিভিন্ন কারণে প্লাটিলেটের বিরুদ্ধে শরীরে বিশেষ এক ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। যার ফলে প্লাটিলেট কমতে থাকে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে অন্য কোনো রোগ যেমন এসএলই, লিম্ফোমা ইত্যাদি দায়ী। অনেক সময় কিছু ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণও দায়ী হতে পারে।

 

লক্ষণ

মূলত পারপুরা বা ত্বকের নিচে ছোট ছোট রক্তক্ষরণের চিহ্নই হলো আইটিপির মূল উপসর্গ। এ ছাড়া দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্তক্ষরণ, নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ, প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণও উপসর্গ হতে পারে।  

 

পরীক্ষা

রক্তের সিবিসি বা ফিল্ম পরীক্ষাই আইটিপির প্রাথমিক পরীক্ষা। কিছু পরীক্ষা করা হয় সম্ভাব্য কারণগুলো মাথায় রেখে। যেমন ভাইরাস, অটো অ্যান্টিবডির পরীক্ষা ইত্যাদি। আইটিপি ছাড়াও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার আরো কিছু কারণ আছে। যেমন ব্লাড ক্যান্সার, ডেঙ্গু ইত্যাদি। রোগের ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা করে সেসব রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে বোনম্যারো পরীক্ষারও প্রয়োজন হতে পারে।

 

চিকিৎসা

সাধারণত স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দিয়ে আইটিপির চিকিৎসা করা হয়। এর বাইরে আরো কিছু বিশেষ ধরনের চিকিৎসা আছে যেমন ইমিউনোগ্লোবিউলিন, অ্যান্টি ডি, এজাথিউপ্রিন, এলট্রম্বোপেগ, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ইত্যাদি। তবে এই সমস্যা রক্ত পরিসঞ্চালনে কার্যকর নয়, বরং ক্ষতিকর। কোনো খাবার খেয়েও প্লাটিলেট বাড়ানো যায় না।

 

আইটিপি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। শিশুদের পুরোপুরি ভালো হয়ে যাওয়ার হার তুলনামূলক বেশি। যেসব আইটিপি ভালো হয় না তাকে ক্রনিক আইটিপি বলা হয়। এর চিকিৎসা একটু জটিল। যেকোনো আইটিপিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা নিতে হয়। এতে সফলতার হার বেশ ভালো।



সাতদিনের সেরা