kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

শীতে শিশুর যত্ন

ডা. নূরে ইশরাত নাজমী, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, এমবিবিএস, এফসিপিএস (পেডিয়েট্রিকস), লে. কর্নেল, ডিএসসিএসসি, মিরপুর সেনানিবাস, ঢাকা

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শীতে শিশুর যত্ন

মডেল : অভেয়া অপ্তি

শীতে শিশুদের নিয়ে অনেক মা-বাবারই দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। শীতের শুষ্কতায় বাতাসে ভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। তাই যেকোনো ভাইরাসজনিত রোগবালাইয়ের প্রকোপ এই সময়ে যায় বেড়ে।

 

শিশুর নাক বন্ধ হলে কী করবেন?

ঠাণ্ডা লাগার পর শিশুর প্রথম কষ্ট শুরু হয় নাক বন্ধ দিয়ে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ স্যালাইন নাকের ড্রপ দিয়ে নাক পরিষ্কার রাখতে হবে। বাজারে বিভিন্ন নামে পাওয়া সাধারণ স্যালাইন ন্যাজাল ড্রপ দিন ও রাতের যেকোনো সময় যতবার প্রয়োজন দেওয়া যায়, এমনকি নবজাতকের ক্ষেত্রেও এটি নিরাপদ। তবে এতে নাক বন্ধ ভালো না হলে ‘নাক নিষ্কাশনকারী’ (nasal decongestant) প্রয়োজন হতে পারে, যা শুধু চিকিৎসকের পরামর্শেই ব্যবহার করা উচিত।

 

সর্দি-কাশি : কফ সিরাপ না মধু?

কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত যেকোনো কফ সিরাপ শিশুকে খাওয়ানো যাবে না। সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে ক্রমাগত কফ সিরাপ খাওয়াতে গিয়ে আপনার শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যায়নি তো? তাই জটিল আকার ধারণ করার আগেই চিকিৎসককে দিয়ে শিশুর বুক পরীক্ষা করিয়ে নিন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, এক বছরের নিচে কোনোভাবেই শিশুকে মধু খাওয়ানো যাবে না। এর চেয়ে বেশি বয়সী শিশুদের দেওয়া যেতে পারে। কফকে পাতলা করায় বিশুদ্ধ মধুর মতো প্রাকৃতিক ওষুধের জুড়ি নেই। তবে সারা দিনে কখনোই ১০ মিলি বা দুই চামচের ওপর নয়। সারা দিনে আদা, লবঙ্গ, দারচিনি, তুলসীমিশ্রিত গরম পানিতে অল্প লেবু মিশিয়ে দুই-তিনবার খাওয়ালে আপনার শিশুটির কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে।

 

জ্বর হলেই কি প্যারাসিটামল?

শিশুর জ্বর হলে প্রথম পর্যায়ে কুসুম গরম পানি দিয়ে পুরো শরীর মুছে দিতে হবে। তবে এতে তাপমাত্রা না কমলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক ডোজে প্যারাসিটামল খাওয়াতে হবে। প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ যেমন—ক্লোফেনাক, আইবুপ্রোফেন কিংবা অ্যাসপিরিন কোনোভাবেই নিজে নিজে শিশুকে জ্বর কমানোর জন্য দেওয়া যাবে না। গায়ে হালকা কাপড় পরাতে হবে। ঘরে আলো-বাতাস এবং পর্যাপ্ত রোদের ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য। এ ছাড়া কয়েল, স্প্রে, ধুলা থেকে আপনার শিশুটিকে দূরে রাখুন। মনে রাখতে হবে, কভিড-ডেঙ্গু এখনো আমাদের চোখ রাঙাছে। তাই শিশুর অতিরিক্ত জ্বরের সঙ্গে মাথা ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, লালচে দানা, অতিরিক্ত কাশি কিংবা শ্বাসকষ্ট হলে অনতিবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

 

এ সময়ে কী খাওয়াবেন?

অসুখ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়াস্বরূপ খাদ্যে অরুচির কারণে শিশুর ওজন কমে যাবে বলে অযথাই দুশ্চিন্তা না করে অসুস্থ অবস্থায় শিশুকে বারবার অল্প করে খাওয়াতে হবে। ঠাণ্ডা কাশি লাগলে প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের ওপরের বয়সী শিশুদের (যারা বুকের দুধ ছাড়া অন্য খাবার শুরু করেছে) বারবার কুসুম গরম পানি খাওয়ানো যেতে পারে। দুই বছরের নিচে সব শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া কমলা, আতাফল, আনারস ইত্যাদি ভিটামিনসমৃদ্ধ ফল ও নানা বর্ণের সবজির সমাহার শীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

শীতকালীন এই খাবারগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং এই সময়ের মৌসুমি সবজি ও ফল শিশুদের খাওয়াতে ভুলবেন না। শীতের শুষ্ক আবহাওয়া শরীরের শুষ্কতা, পানিশূন্যতা, চর্মরোগসহ আরো অনেক ধরনের সমস্যাকে আমন্ত্রণ জানায়। তাই আপাতদৃষ্টিতে শরীরে ঘাম বা ক্লান্তি দেখা না গেলেও শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করানোর ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে।

 

শীতে ডায়রিয়ার কারণ কী?

শীতের ভাইরাস শুধু যে শ্বাসনালি সংক্রমণ করে তাই নয়, খাদ্যনালিও তাদের পছন্দের জায়গা। মূলত রোটা ভাইরাস এ জন্য দায়ী। শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসের মাধ্যমে খুব সহজেই এই ভাইরাসকে প্রতিহত করা যায়। আর যখনই পানির মতো পাতলা পায়খানা শুরু হবে, প্রতিবার পায়খানার পর ওরস্যালাইন, বাকি সময় পানি ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে, যাতে পানিশূন্যতা না হয়। অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর তো নয়ই, বরং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধসহ (Antibiotic resistance) অন্যান্য জটিলতা ডেকে আনতে পারে। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের ডায়রিয়া হলে দুই-তিন ঘণ্টা পর পর বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে মনোযোগ দিতে হবে। তবে যেকোনো বয়সেই শিশু যদি অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ কমে যায় কিংবা বন্ধ হয়ে যায়, অস্বাভাবিক বেশি জ্বর কিংবা বমি হতে থাকে, শিশুর বুকের দুধ টানতে কিংবা খাবার খাওয়াতে অনীহা দেখা যায়—তাহলে অতিসত্বর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।



সাতদিনের সেরা