kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

জটিল মানসিক রোগ : সিজোফ্রেনিয়া

ডা. ইসমাইল আজহারি, মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মগবাজার, ঢাকা

১২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জটিল মানসিক রোগ : সিজোফ্রেনিয়া

সিজোফ্রেনিয়া মূলত একটি গুরুতর মানসিক সমস্যা। এই রোগের পাঁচটি সাধারণ উপসর্গ রয়েছে। এর মধ্য থেকে প্রথম তিনটি উপসর্গ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত কি না তা বুঝতে নিচের উপসর্গগুলো লক্ষ করতে হবে। নিচের পাঁচটি উপসর্গের মধ্যে দুই বা দুইয়ের অধিক উপসর্গ থাকতে হবে। বিশেষ করে প্রথম তিনটি উপসর্গের যেকোনো একটা থাকতে হবে, যার ব্যাপ্তিকাল হতে হবে এক মাসের অধিক। প্রথম তিনটি উপসর্গই মূল উপসর্গ।

 

ডিলিউশন

ডিলিউশন হচ্ছে একপ্রকার মিথ্যা বিশ্বাস। বাস্তবতার সঙ্গে যার  কোনো মিল নেই। যেমন কেউ এমন বিশ্বাস করে যে সে নিজে প্রধানমন্ত্রী। কিংবা কোনো নায়িকা বা নায়ক তাকে ফলো করে। একে Persecutory delusion বলে। কিংবা সে বিশ্বাস করে তার চিন্তা অন্যজন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। একে বলে Delusion of Control. যেমন কেউ বিশ্বাস করে রাতে আমার কাছে এমন কেউ আসে, আমি কী করব সব সে ঠিক করে দেয় অর্থাৎ তার চিন্তা-ভাবনায় একটা মিথ্যা বিশ্বাস তৈরি হয়, যা তার নিজের সম্পর্কে অন্যের সম্পর্কে বা সমাজ কিংবা পরিবারের কারো ব্যাপারে ভুল বিশ্বাস তৈরি করে। সে বিশ্বাস করে, সে দেশের একজন বিশেষ কিছু। সবাই তার ভক্ত। সে নিজেকে নেতা বা আইডল হিসেবে বিশ্বাস করে। সে মনে করে কেউ এসে তাকে লন্ডন নিয়ে যাবে, তার জন্য বিমান পাঠাবে কিংবা অন্য দেশের কেউ তার প্রতি পদক্ষেপ ফলো করে।

 

হ্যালুসিনেশন

এ ক্ষেত্রে তার মধ্যে অস্বাভাবিক সেন্স কিংবা উপলব্ধি তৈরি হবে। এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন সে নিজের কানে অনেক কিছু শুনতে পাবে; অথচ বাস্তবে কেউ কথা বলছে না। আবার সে গায়েবি আওয়াজ শুনতে পাবে। সে এসব শব্দে সাড়া দেবে কিংবা অদৃশ্য বস্তু দেখবে, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।

 

ডিস-অরিয়েন্টেড স্পিচ

এর মানে অসংলগ্ন কথাবার্তা। সে তার স্বাভাবিক কথাবার্তা বলার ধরন হারিয়ে ফেলবে। কখন কাকে কী বলতে হবে তা বুঝবে না। কথা একবার একদিকে নিয়ে যাবে। এই ধরুন, সে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে, সে তার বন্ধুদের কিংবা অন্যদের বলবে আগামী মাসে এখানে একটা ১০ তলা বাড়ি বানাব। অমুক নায়িকাকে বিয়ে করব। এমপি ইলেকশন করব ইত্যাদি এবং সব কথায় সে সিরিয়াসনেস দেখাবে।  সিজোফ্রেনিয়া হতে হলে ওপরের এই তিনটি থেকে যেকোনো একটি উপসর্গ থাকতে হবে। পাশাপাশি নিচের এসব উপসর্গ থাকতে পারে।

 

অসংলগ্ন আচরণ

Aggressive behaviour তথা আক্রমণাত্মক আচরণ। নিজের সঙ্গে, অন্যের সঙ্গে বা পরিবেশের সঙ্গে। কেউ হয়তো নিজেকে আঘাত করে, কেউ হয়তো অন্যকে আঘাত করে, কেউ গাছগাছালি কাটতে থাকে, কেউ ঘরের জিনিসপত্র ভাঙতে থাকে, আবার কেউ এমন কিছু করে না; কিন্তু স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করে না। যেমন খাবার খেতে বসেছে। কিছু নিজে খাচ্ছে, কিছু এক জায়গায় রেখে দিচ্ছে আর বলছে এগুলো অমুকের জন্য বা এগুলো জিনের জন্য ইত্যাদি।

 

নেগেটিভ আচরণ

রোগীর মধ্যে নেগেটিভ উপসর্গ তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, সে কোনো আবেগ দেখাতে পারবে না, তার মধ্য থেকে আবেগ-অনুভূতি, আনন্দ প্রকাশ—এ বিষয়গুলো হারিয়ে যাবে। মনে করুন, তার কোনো আত্মীয় মারা গেল। এটা তার মাঝে প্রভাব বিস্তার করবে না। এমনকি তাকে ব্যথিতও করবে না অথবা একটা সুখের কিংবা ভালো খবর শুনলে অন্যরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটা থাকবে না। পাশাপাশি ঘুম কমে যাবে, সব কিছুতে ইন্টারেস্ট কমে যাবে, সেক্সুয়াল পাওয়ার কমে যাবে, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা পছন্দ করবে। অথবা নীরব স্বাভাবিক শান্ত হয়ে বসে থাকবে, কথাবার্তা কমিয়ে দেবে।

 

নিজে উপলব্ধি করলে ভালো

এসব উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর অনেকে বুঝতে পারে যে মানসিক কিছু সমস্যা হচ্ছে, চিকিৎসা নেওয়া দরকার। যদি সে নিজের সমস্যা বুঝতে পারে, তাহলে তাকে নিউরোসিস বলা হয়। তার চিকিৎসার ফলাফল দ্রুত পাওয়া যায়? আবার অনেকেই নিজেদের সমস্যা বুঝতে পারে না। কেউ যদি তাকে বোঝাতে চায় যে তোমার মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে, চিকিৎসা নেওয়া দরকার। সে তখন আরো রাগ করে। একে সাইকোসিস বলে।

অর্থাৎ নিজের মানসিক সমস্যা হচ্ছে দেখেও যে তা বিশ্বাস করে না, কিংবা বুঝতে পারে না, তাহলে ওই অবস্থাকে সাইকোসিস বলা হয়।

যাদের হতে পারে : বয়ঃসন্ধিকালের পর যেকোনো বয়সেই সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদেরও হতে পারে। পরিবারের অন্য কারো না থাকলেও অন্যদের এটা হতে পারে।

 

আপনার করণীয়

♦ সুস্থ মেধাবী সন্তান, বন্ধু-বান্ধবীর এমন সমস্যা বুঝতে পারলে তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা না করে তাকে সময় দিন। তার সঙ্গে মন খুলে কথা বলুন। তাকে সাপোর্ট দিন সে যেন পূর্ণাঙ্গ পাগল না হয়ে যায়। আপনার সাপোর্ট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

♦ আশপাশের আপন কেউ হঠাৎ নীরব হয়ে গেলে, হঠাৎ আচরণ পরিবর্তন হতে শুরু করলে, তার থেকে হাসি-আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে এমন মনে হলে তার পিঠে হাত রেখে বলুন তোমার কী হয়েছে আমাকে খুলে বলো, আপুকে খুলে বলো ইত্যাদি। মা-বাবাদের উচিত একটু এগিয়ে আসা।

♦ সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন, বাবা তুমি আমাদের সব। কোনো ভয় পেয়ো না। আম্মুকে সব খুলে বলো কী হচ্ছে তোমার ভেতরে। মাথায় হাতা বোলান, তাকে সাহস সঞ্চার করুন।

♦ কলিগরা, বন্ধুরা তাকে একটু সাপোর্ট দিন। একটু উৎসাহিত করুন। তার ভালো লাগা না লাগা জানতে চেষ্টা করুন।

♦ যত দ্রুত সম্ভব তাকে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান। ছয় মাসের মধ্যেই সে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে আশা করা যায়, যদি সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। অন্যথায় পূর্ণাঙ্গ মানসিক রোগী হয়ে আত্মহত্যার দিকে চলে যেতে পারে।



সাতদিনের সেরা