kalerkantho

মঙ্গলবার । ১ আষাঢ় ১৪২৮। ১৫ জুন ২০২১। ৩ জিলকদ ১৪৪২

‘করোনা ঠেকাতে ভ্যাকসিনের চেয়েও মাস্ক ভালো’

অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম, ভাইরোলজিস্ট, সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘করোনা ঠেকাতে ভ্যাকসিনের চেয়েও মাস্ক ভালো’

বাংলাদেশে ঊর্ধ্বমুখী করোনা সংক্রমণের জন্য ভারতীয় ভেরিয়েন্টকে দায়ী করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আজ ছাপা হলো বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ গত কয়েক মাসে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ কী হতে পারে?

করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে আমাদের সঠিক ধারণা নেই। শীতকালে সারা পৃথিবীতে করোনা সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছিল অথচ আমাদের দেশে কমে ২ শতাংশে নেমে এসেছিল। এর কারণ নির্ণয়ে গবেষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু গবেষণা করা হয়নি। গত বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের হার অনেক বেশি ছিল। এরপর সংক্রমণ কিছুটা কমতে শুরু করেছিল। কিন্তু এই কমা ও বাড়ার সঠিক কারণ আমরা জানি না।

 

বাংলাদেশের বর্তমান কভিড পরিস্থিতির জন্য ভারতের ভেরিয়েন্টই দায়ীএমনটা বলা হচ্ছে। কথাটা কতটুকু সঠিক?

করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভেরিয়েন্ট নিয়ে এখন পর্যন্ত যে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে তার বেশির ভাগই অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশে কিছু ক্ষেত্রে হয়তো এই ভেরিয়েন্ট ঢুকে গেছে। কিন্তু বিপুলভাবে সেটা যে আমাদের দেশে এখনই ঢুকে গেছে সেটা মনে করছি না। তবে এটা ছড়াবে, ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।

 

হঠাৎ করে আমরা ভারতে এত মৃত্যু দেখছি কেন?

এত মৃত্যুর মূল কারণ হচ্ছে, ভারতের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা। আমরা মনে করি, তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা অনেক ভালো। সেটা হয়তো প্রাইভেট সেক্টরে। কিন্তু সরকারি সেক্টরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার করুণ দৃশ্য এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। বেশির ভাগ করোনা রোগী কিন্তু সরকারি হাসপাতালে যাচ্ছে। অথচ সেখানে অক্সিজেন সংকট, হাই ফ্লো নেজাল ক্যানুলা নেই, আইসিইউ সংকট আরো কত কিছু সমস্যা, যা মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ধারণা, ভারতে গেলেই সব চিকিৎসা হয়ে যায়। কিন্তু সেটা ভুল ধারণা। আমি মনে করি, ভারতের চিকিৎসাব্যবস্থা আমাদের দেশের থেকেও খারাপ।

 

নতুন সৃষ্ট অনেক ভেরিয়েন্ট মূল ভাইরাসের চেয়ে দুর্বল ও কম ক্ষতিকর হয়। সে ক্ষেত্রে কোনো আশার বাণী রয়েছে কি না?

এ কথাটা আসলে সত্য নয়। নতুন ভেরিয়েন্ট অনেক শক্তিশালী হতে পারে অথবা অনেক দুর্বলও হতে পারে। অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে আবার কম ক্ষতিকরও হতে পারে। এটা নির্ভর করে মিউটেশন তথা বায়োলজিক্যাল ফ্যাক্টের ওপর।

অনেকে মনে করছেন, করোনার নতুন এই মিউট্যান্টকে পুরোপুরি শনাক্ত করতে পারছে না প্রচলিত আরটি-পিসিআর টেস্ট। তাই নেগেটিভ রিপোর্ট আসছে।

এটা সঠিক তথ্য। এ জন্য আরটি-পিসিআরের প্রোবটা (probe) চেঞ্জ করতে হবে। কিন্তু আমরা সে সময় পাচ্ছি না। ফলে এটা করাও হচ্ছে না।

 

আমাদের কী কী সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত এই মুহূর্তে?

ভারতীয় ভেরিয়েন্ট, সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট, ইউকে ভেরিয়েন্ট যা-ই বলেন, সব ভেরিয়েন্টের বিপরীতে আমাদের প্রধান সতর্কতা হওয়া উচিত সবার মাস্ক ব্যবহার করা। অথচ মাস্ক ব্যবহারকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিচ্ছি না। মাস্ক ফুটো হয়ে ভাইরাস সংক্রমণ ঘটায় এমনটা আমরা কিন্তু দেখছি না।

ধরুন, সংক্রমিত কোনো ব্যক্তির দেহ থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে বাতাসে মিশল। এরপর হয়তো আরেকজনের দেহে প্রবেশ করবে। এখন যার শরীর থেকে ভাইরাসটা বের হচ্ছে সে যদি সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করে এবং যেই ব্যক্তির শরীরে ঢুকবে সে-ও যদি মাস্ক পরে, তাহলে ভাইরাস বের হওয়ার সময় একটা বাধা পাবে (এয়ার ফিল্টার হবে) এবং ঢোকার সময়ও বাধা পাবে। যেখানে ১০০টি বের হওয়ার কথা সেখানে হয়তো ২০টি বের হবে। এখানে দুটি মাস্ক ভাইরাস প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে। আমরা যদি শতভাগ মাস্ক ব্যবহার করি, তাহলে ভাইরাস ঢোকার কোনো সুযোগ কিন্তু পাচ্ছে না। অথচ এই সহজ জিনিসটা আমরা বোঝাতে পারছি না। সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট ভ্যাকসিন রেজিস্টেন্ট। ঠিক একই কথা ইন্ডিয়ান ভাইরাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু মাস্কের বেলায় রেজিস্টেন্ট ভাইরাস নেই। মাস্ক পরার পর অন্যান্য রোগব্যাধি, যেমন—শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি ইত্যাদিও কমে যায়। মাস্ক পরলে অন্য ভাইরাস তো ঢুকছে না, অ্যালার্জেনও ঢুকছে না। মাস্ক ৯৬ শতাংশ ভাইরাস জীবাণু প্রতিরোধ করে। করোনা ঠেকাতে মাস্ক ভ্যাকসিনের থেকেও ভালো। কেননা কভিভ ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ১০ বছর পর কী হবে তা আমরা কিন্তু জানি না। এত অল্প সময়ে পৃথিবীতে কোনো ভ্যাকসিন এর আগে তৈরি হয়নি।

 

চলমান লকডাউন করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে?

লকডাউন মানে হচ্ছে মানুষের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু এটা করতে গিয়ে কাউকে কাউকে আমরা অনুমতি দিচ্ছি বের হওয়ার জন্য, দৈনন্দিন কাজকর্ম করার জন্য। অর্থাৎ পুরোপুরি লকডাউন মেনে চলতে পারছি না। বিদেশের লকডাউনে দেখা যাচ্ছে একটি গাড়িও চলছে না। আমাদের দেশে যা হচ্ছে তা নামকাওয়াস্তে লকডাউন। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা কেন? সারা রাত খুলে রাখলে বরং মানুষের ভিড় কমবে। আস্তে আস্তে মানুষ জরুরি কেনাকাটা করতে পারবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। এ জন্য বর্তমান লকডাউনকে আমি নন-মেডিক্যাল লকডাউন বলি। আমরা শুধু গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবি। কিন্তু যেসব মানুষ ঘরে আছে নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক, সেই সব মানুষের উপসর্গভিত্তিক পরীক্ষার পর শনাক্ত করে তাদের আইসোলেশনে রাখতে পারলে বাকিরা নিরাপদ হয়ে যেত।

 

শতভাগ কার্যকর কোনো ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষায় আছেন এখনো অনেকে।

আমাদের দেশে যে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে তা নেওয়া উচিত। কোনো ভ্যাকসিনেই শতভাগ কাজ হবে না এটা স্বীকার করেই সবাইকে ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত। ভ্যাকসিন কিন্তু অল্প সময়ের জন্য প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করে। যদি আরো কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন পাওয়া যায় তখন সেটাও নিতে হবে।

 

সামনে ঈদ। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে কী ধরনের সতর্কতা নেওয়া উচিত?

ঈদের সময় গ্রামে যাওয়া এবং গ্রাম থেকে ফেরাই মূল সমস্যা। কিন্তু চাইলেও হয়তো এটা একেবারে বন্ধ করা যাবে না। তবে মাস্ক ব্যবহার করে, শারীরিক দূরত্ব মেইনটেইন করে কমসংখ্যক যাত্রী নিয়ে যানবাহন চলাচল করলে হয়তো বা ব্যাপক হারে সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া ঈদের জামাতেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত।

সাক্ষাৎকার : আতাউর রহমান কাবুল