kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

লকডাউনে নিজেকে সময় দিন

অধ্যাপক ডা. আহসানুল হাবিব, সাবেক পরিচালক, পাবনা মানসিক হাসপাতাল এবং বিভাগীয় প্রধান, মানসিক রোগ বিভাগ আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল

১৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লকডাউনে নিজেকে সময় দিন

এ দেশে সামান্য জ্বরের কারণে ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটির ইতিহাস বহু পুরনো; কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারটা আমাদের কাছে বরাবরই উপেক্ষিত। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের মাঝে আবার দূরত্ব বাড়িয়েছে। আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি ক্রমেই। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, সামাজিকভাবে একে অপরের সঙ্গে কথাবার্তা ও ইতিবাচক স্পর্শের ফলে আমাদের শরীরের ডোপামাইন, অক্সিটোসিন ও সেরোটোনিন হরমোন নিঃসরণ বাড়ে এবং কর্টিসল নিঃসরণ কমে। ডোপামাইন, অক্সিটোসিন ও সেরোটোনিন নামের ক্ষতিকর হরমোন নিঃসরণ বাড়ার ফলে আমাদের মনের মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতির জন্ম হয়। নিরাপত্তা, অনুপ্রেরণা, মানসিক চাপ মুক্তি, ভরসা ইত্যাদির ভারসাম্য বজায় থাকে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ কম হওয়ার কারণে। করোনায় মেলামেশার সুযোগ কমার কারণে দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে ছেলে-বুড়ো সবাই। এর ফলে দেখা দিচ্ছে ঘুমের সমস্যা (স্লিপিং ডিস-অর্ডার), অবসাদ (ডিপ্রেশন), পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা (অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিস-অর্ডার) ইত্যাদি। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য রইল কিছু পরামর্শ :

১. পর্যাপ্ত ঘুম ও সময় বণ্টন : এখন শিশু বা বড়রা কেউই সময়মতো ঘুমাতে চায় না। শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে বড়রা ভাবেন তাঁদের দায়িত্ব শেষ। এটা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বেশ লোপ পাচ্ছে। ফলে যেকোনো চাপেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে সবাই। করোনা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তা করছি অথচ সচেতন হতে হলে কী কী প্রয়োজন তার ধার ধারছি না। এ থেকেই বোঝা যায়, আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এখন কোন পর্যায়ে! এ জন্য রাতে পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে এবং সারা দিন কিভাবে পার করা উচিত তার একটা রুটিন থাকা প্রয়োজন।

২. ঘরের কাজে হাত লাগান : রমজানে বাসায় টুকিটাকি অনেক কাজ থাকে। দেখা যায়, বড়রাই সেসব কাজ করছেন আর ছোটরা টেলিভিশন বা ল্যাপটপে বেশি সময় পার করছে। পারিবারিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বড় বাধা এটি। সবাই মিলে উৎসবমুখরভাবে প্রতিটা কাজে হাত লাগানো উচিত। এতে একঘেয়েমি দূর হবে, সঙ্গে কিছুটা কায়িক শ্রমও হবে। বাসার সবাই মিলে কাজগুলো ভাগ করে নিলে সম্পর্ক বেশ উন্নত হয়।

৩. আবেগ নিয়ন্ত্রণে পরিবারের সবার পরামর্শ : করোনায় অনেকের মধ্যে আবেগের প্রকাশ একটু বেশিই দেখা যাচ্ছে; অনেকের আবার অনুভূতিই ভোঁতা হয়ে গেছে। দুটিই ক্ষতিকর। কেউ কেউ কোনো ছোট ব্যাপারেও বেশি রিঅ্যাক্ট করে। এই বিষয়গুলো দীর্ঘদিন একা থাকার কারণে এবং নিজের আবেগকে কারোর কাছে ভালোভাবে প্রকাশ না করার দরুন ঘটতে থাকে। এ জন্য যেকোনো আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চুপ থাকা উচিত নয়। পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষজনের সঙ্গে সব কিছু নিয়ে কথা বলা যেতেই পারে। কাছের বন্ধু বা সহকর্মীরাও হতে পারে ভালো অভিভাবক। তাদের কাছেও খোলামেলা কথা বললে মনে প্রশান্তি আসে।

৪. কর্মস্থলের চেনা মানুষদের ভুললে চলবে না : দীর্ঘদিন অনেকে হোম অফিস করছেন। সে ক্ষেত্রে কর্মস্থলের পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারেই বন্ধ করা উচিত নয়। এখন প্রযুক্তির যুগে বাসায় থেকেও খুব সহজেই সবার খোঁজখবর রাখা সম্ভব। কর্মস্থল কতটা মিস করছেন সেসব ব্যাপারেও একে অপরের সঙ্গে দিল খুলে কথা বলতে পারেন।

৫. ক্ষতিকর আসক্তি দূর : লকডাউনের অবসরে অনেকেই বিভিন্ন ক্ষতিকর আসক্তির ফাঁদে পা দেন। সেটা হতে পারে অতিরিক্ত ডিভাইস আসক্তি অথবা ধূমপান বা অন্য যেকোনো কিছু। এই ফাঁদে না পড়া অথবা ফাঁদ থেকে বের হওয়ার জন্য সৃজনশীল কাজে মন দেওয়া উচিত। অনেকেই কাগজ দিয়ে সুন্দর খেলনা বানাতে পারেন, সেসব সে বাড়ির বাচ্চাদের শেখাতে পারেন। অনেকেই ভালো ছবি আঁকতে পারেন; কিন্তু সময়ের অভাবে হয়নি অনেক দিন। তাঁরাও ছবি আঁকায় হাত লাগাতে পারেন।

৬. অতিরিক্ত চিন্তা নয় : আমাদের ভেতর ওভার থিংকিং প্রবণতা বেশি। আমরা খুব সামান্য জিনিস নিয়ে চিন্তা করতে বসে যাই। আশপাশের কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে—এ খবরেও অনেকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এটা এখন বেড়েছে টেলিভিশনে বিভিন্ন নেতিবাচক খবর বেশি প্রচারের কারণে। চেষ্টা করতে হবে এসব খবর বর্জন করে ভালো ও উৎসাহব্যঞ্জক অনুষ্ঠান দেখার। এতে মনের ওপর চাপ কমে এবং স্ট্রেস ফ্রি হতে সাহায্য করে।

মানসিক ডাক্তাররা প্রায়ই একটা কথা বলেন, Try to find the possibilities not only the problems itself। করোনার এই দীর্ঘ ছুটিতে আমরা শুধু কী কী সমস্যা নিয়ে বেড়ে উঠছি সেটার চেয়ে এই দীর্ঘ সময়ে কিভাবে নিজেকে এগিয়ে রাখতে পারি সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সমস্যার দিকে যত বেশি দৃষ্টিপাত হবে, সমস্যা তত বাড়তেই থাকবে। সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি দিলে সমস্যা কমতে শুরু করে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের; আমরা সমস্যা বাড়তে দেব, নাকি সম্ভাবনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাব।

অনুলিখন : আল সানি



সাতদিনের সেরা