kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৩ আষাঢ় ১৪২৮। ১৭ জুন ২০২১। ৫ জিলকদ ১৪৪২

আজ বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবস

আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি

ডা. মো. সালাহ্উদ্দীন শাহ্
অধ্যাপক, হেমাটোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন অব হিমোফিলিয়া

১৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি

হিমোফিলিয়া কী

হিমোফিলিয়া একটি বংশানুক্রমিক জিনগত রোগ। যাকে বলা হয় X linked recessive disorder। বিশ্বে প্রতি ১০ হাজারে একজন এই রক্তক্ষরণ রোগে ভুগছে। আর তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগী সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। সেই হিসাবে বাংলাদেশে হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৬ হাজার হওয়ার কথা। কিন্তু দেশীয় পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাত্র তিন হাজার রোগী নিয়মিত চিকিৎসাসেবার আওতায় আছে। এই রোগে রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। তাই শরীরের কোথাও কেটে গেলে সহজে রক্তপাত বন্ধ হয় না। X ক্রমোজমে F8 ও F9 নামের জিন থাকে, যা F-VIII ও F-IX ক্লোটিং প্রোটিন তৈরি করে। এই ক্লোটিং প্রোটিন রক্তের সাদা অংশে পরিমাণমতো থাকে। ফলে শরীরের কোথাও কেটে গেলে রক্তক্ষরণ আপনা-আপনিই বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রোটিন কম থাকলে কোথাও কেটে গেলে রক্তপাত সহজে বন্ধ হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় হিমোফিলিয়া। নারীদের দুটি এক্স (XX) ক্রমোজম থাকে আর পুরুষদের থাকে একটি এক্স (X) ও অপরটি ওয়াই (Y) ক্রমোজম। ছেলেদের এই X ক্রমোজমটি যদি অসুস্থ বা defect হয়, তাহলে F-VIII ও F-IX তৈরি হয় না। ফলে ছেলেরাই এই রোগে আক্রান্ত হয়। আর মেয়েদের যেহেতু দুটিই X ক্রমোজম; তাই যদি একটি অসুস্থ বা defect থাকেও, অন্যটি সুস্থ থাকার ফলে F-VIII ও F-IX তৈরি হয়। সাধারণত মেয়েরা এই রোগে আক্রান্ত হয় না। তারা এই রোগের বাহক। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে নারীরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। যেমন—lionization/inactivation of healthy X chromosome থাকলে, বাবা রোগী ও মা বাহক হলে অথবা Turner syndrome (45, XO) হলে মেয়েরাও এ রোগের রোগী হতে পারে। তাই হিমোফিলিয়া রোগীর সঙ্গে নিকটাত্মীয় যেমন—খালাতো, মামাতো বা ফুপাতো বোনের বিয়ে হলে দুজনেই রোগী হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

লক্ষণ

কেউ হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত কি না তা লক্ষণ দেখলেই কিছুটা বোঝা যায়। যেমন—কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে রক্তক্ষরণ, শরীরের কোথাও আঘাত লাগলে সেই জায়গাটি নীলচে হয়ে ফুলে যায় অর্থাৎ চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ; মাংসপেশিতে ও অস্থিসন্ধিতে রক্তক্ষরণ; হাঁটু, কনুই ও অন্যান্য অস্থিসন্ধি ফুলে যাওয়া; শরীরের কোথাও কেটে গেলে দীর্ঘক্ষণ রক্ত ঝরা; দাঁত তোলার পর বা সুন্নতে খতনা করার পর সহজে রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়া ইত্যাদি।

 

চিকিৎসা

সামান্য অসাবধানতায় মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে বিধায় এই রোগে আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চলতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের প্লাজমা পরিসঞ্চালন করতে হয়। F-VIII ও F-IX, যা এই রোগীদের শরীরে তৈরি হয় না, তা ইনজেকশনের মাধ্যমে নিতে হয়। এই ইনজেকশন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে হিমোফিলিয়া রোগের চিকিৎসা করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশের বেশির ভাগ রোগীরই সামর্থ্যের বাইরে। তাই সময়মতো যথাযথ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে না পারার কারণে অনেক মা-বাবা অকালে তাঁদের সন্তান হারান।

 

প্রতিরোধ

হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রোগী যত দিন বেঁচে থাকে, তত দিন চিকিৎসার মধ্যে থাকলেও স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন যাপন করতে পারে না। তাই এই রোগ প্রতিরোধের জন্য জনসচেতনতা জরুরি। হিমোফিলিয়া কী, এই রোগের কারণগুলো এবং প্রতিকার ও প্রতিরোধের বিষয় সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকলে অনাগত শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। বিয়ের আগে কাউন্সেলিং এবং জেনেটিক পরীক্ষা করতে পারলে ভালো হয়। অথবা বিয়ের পর এই রোগ ধরা পড়লে গর্ভধারণকালীন প্রি-নাটাল ডায়াগনসিস করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে অনাগত শিশুটি হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত কি না। অর্থাৎ সচেতনতা থাকলে এই রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

 

হিমোফিলিয়া রোগীদের অবশ্য পালনীয়

♦ নিয়মিত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া।

♦ আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা আছে—এমন কাজ বা খেলাধুলা না করা।

♦ মাংসে ইনজেকশন না দেওয়া।

♦ রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ছোট থেকে বড় কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার না করা।

♦ Anticoagulants (Heparin, Warfarin), NSAIDs (Aspirin, Naproxen etc.) গ্রহণ না করা।



সাতদিনের সেরা