kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ বৈশাখ ১৪২৮। ৬ মে ২০২১। ২৩ রমজান ১৪৪২

সব করোনা রোগীকে ৮-১০টি করে ওষুধ দিতে হবে কেন?

অধ্যাপক আহমেদুল কবীর, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন
অধ্যক্ষ, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

১৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সব করোনা রোগীকে ৮-১০টি করে ওষুধ দিতে হবে কেন?

ডায়াবেটিস, অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগে ভোগা অনেকেই টিকা নিতে ভয় পাচ্ছেন

বয়স্কদের ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, উচ্চ রক্তচাপসহ শারীরিক জটিলতা বেশি। করোনায় মৃত্যুহার পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, ষাটোর্ধ্ব মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। সুতরাং ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা যাঁদের আছে, তাঁদের অবশ্যই টিকা নিতে হবে। অনেকে ভাবেন, আমার অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। আমি কিভাবে টিকা নেব? আসলে যাঁদের ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত তাঁরা সেটা নিয়ন্ত্রণ করে টিকা নেবেন। নরমাল হতে হবে এমন না, কন্ট্রোল হলেই চলবে। ধরুন, কারো ব্লাড সুগার খালি পেটে ৬ থেকে ৯-এর মধ্যে আর ভরাপেটে ৯ থেকে ১১-এর আশপাশে থাকে, মানে মোটামুটি কন্ট্রোল, তাঁরা টিকা নেবেন। সহজ কথায় অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এনে অবশ্যই টিকা নিতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের বেলায়ও একই কথা খাটে।

 

অনেকে ভাবেন সর্দি বা ফ্লু হয়েছে। ফলে মৃদু উপসর্গে টেস্টও করান না। আসলে কোন অবস্থায় টেস্ট করাতে হবে?

সময়টা অতিমারির। ফলে উপসর্গযুক্ত সবাইকে সম্ভাব্য কভিড রোগীই মনে করতে হবে। সর্দি বা ফ্লু ইত্যাদি মনে করার সুযোগ এখন নেই। এসব মনে করে বাসায় বসে থেকে কালক্ষেপণ করা বোকামি। এবারের ভাইরাসটা অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে কেউ যদি মনে করেন, না আমার কভিড হয়নি, নরমাল ফ্লু ততক্ষণে তাঁর ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলবে। অক্সিজেন দরকার হবে। এটাকে বলা হয় হ্যাপি হাইপোক্সিয়া। মানে অক্সিজেন নরমালের চেয়ে কমে গেল কিন্তু ক্লিনিক্যালি কোনো সমস্যা রোগীর হলো না। এ কারণে দেখা যায়, রোগী বাসায় থাকছে। পরে অক্সিজেন লেভেল এমন একটা বিপজ্জনক মাত্রায় চলে যায়, হাসপাতালে নিতে নিতেও অনেকে মারা যান। এমন অবস্থায় ডাক্তারদেরও হিমশিম খেতে হয়। অথচ একটু আগেভাগে চিকিৎসা শুরু করা গেলে হয়তো রোগীর অক্সিজেনই লাগত না। ফলে কভিডের মতো যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই পরীক্ষা করতে হবে।

 

যাঁরা বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন তাঁদের রোজা রাখায় কোনো ঝুঁকি আছে?

এটা আনপ্রেডিকটেবল ডিজিজ। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, ভাইরাসটা অনেক শক্তিশালী। এ কারণে একটু বয়স্ক ব্যক্তি, যাঁদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি, যাঁদের ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশনসহ নানা রোগ আছে, তাঁদের রোজা রাখা একটু কঠিন। আমার ব্যক্তিগত মত হলো—জ্বর, কাশির মতো উপসর্গ যাঁদের আছে এই মুহূর্তে তাঁদের রোজা রাখা ঠিক হবে না। তবে উপসর্গ এবং অন্যান্য সমস্যাবিহীন কভিড পজিটিভ রোগীর রোজা রাখার ক্ষেত্রে অসুবিধা আছে বলে মনে হয় না।

 

ছবি : মঞ্জুরুল করিম

এই সময়ে সুস্থ মানুষ রোজা রাখলে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে?

না। সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের রোজা রাখার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেই। বরং আরো ভালো। আপনি রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে, চায়ের দোকানে গিয়ে মাস্ক খুলে রেখে পানি খাচ্ছেন। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে মাস্ক খুলে রাখছেন। এভাবেই তো করোনা ছড়াচ্ছে। রোজাদার ব্যক্তির সেহরি থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাস্ক খোলার কথা না। ধরেন, কেউ মাস্ক পরে আছে সারা দিন। হঠাৎ করে মাস্কটা খুলে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া শুরু করল। কিংবা যার সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস সে সিগারেট খাচ্ছে। কেউ চা, কেউ পানি পান করল। এভাবে সুরক্ষা ব্যবস্থা কিছু সময়ের জন্য চলে গেল। এটার ঝুঁকি বেশি। এদিক থেকে রোজা এক ধরনের সুরক্ষা দেবে। যেহেতু খাওয়ার দরকার নেই, ফলে মাস্ক খোলারও দরকার হবে না।

 

ইফতার ও সাহরিতে কোন ধরনের খাবারে গুরুত্ব দিতে হবে?

সাধারণত যেসব খাবার দিয়ে আমরা বিশেষ করে ইফতার করি এটা অস্বাস্থ্যকর। রেস্টুরেন্ট থেকে ভাজাপোড়া খাবার আনার মাধ্যমেও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বাসার খাবার হলে ভালো। সুষম খাবার খেতে হবে। ডাবের পানি, লেবুর শরবতসহ ইফতারির সময় যদি ফলের জুস খাওয়া যায় তাহলে ভালো। প্রোটিন, ভিটামিন ‘ডি’-জাতীয় খাবার যেগুলো রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, সেগুলোর পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত মসলাদার ও ভাজাপোড়া খাবার খেলে পেট খারাপ হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।

 

টিকা নেওয়ার পর স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে অনেকে উদাসীন

টিকা নেওয়ার পরই অনেকে ভাবছেন, তাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়ে গেছে। বেপরোয়া চলাফেরার জন্য অনেকে টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে এক ধরনের ভুল বার্তা যাচ্ছে মানুষের কাছে যে টিকা নিয়ে না আবার কভিড হয়। আসলে বিষয়টা সে রকম নয়। আমাদের দেশে টিকা দেওয়ার সঙ্গে করোনা বাড়ার একটা যোগসূত্র আছে। যেই মাত্র টিকা দেওয়া শুরু হলো হু হু করে রোগীও বাড়ল। কারণ এত দিন সবাই মোটামুটি সতর্ক ছিল। টিকাদান শুরুর পর সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। যারা টিকা নিয়েছে তারা ফলস কনফিডেন্সে ভুগল। হাজার হাজার লোক কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে গেল। যেটা নিয়ন্ত্রণ করা খুব জরুরি ছিল। এরপরের অবস্থা তো সবাই দেখছে। ফলে টিকা নেওয়ার পরও যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

 

ফেসবুক, ইউটিউবে দেখে অনেকে নিজে নিজে ওষুধ খাচ্ছে। এটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

আমাদের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। ডাক্তারও বোধ হয় ১৮ কোটির কম হবে না! সবাই যেন ডাক্তার। এ কারণে কেউ আক্রান্ত হলে দেখবেন প্রত্যেকে প্রেসক্রাইব করা শুরু করবে—দুটি স্ক্যাবো খাও, একটা করে এজিথ্রোমাইসিন, ডক্সিসাইক্লিন, ভিটামিন ‘ডি’, জিংক ট্যাবলেট খাও ইত্যাদি। এটা ভয়ংকর।

আর পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশেই ওষুধের দোকান থেকে শুরু করে যেকোনো জায়গায় প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ পাওয়া যায়। সে জন্য ফেসবুক, ইউটিউবে যা বলে দোকানে গিয়ে সেটা কেনা শুরু করে। সংক্রামক ব্যাধিতে সবার অন্তত একটা গাইডলাইন ফলো করা উচিত। করোনা চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ সরকারের যে গাইডলাইন আছে সেটা ফলো করার কথা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের। অথচ আমরা দেখছি, ফেসবুক, ইউটিউবে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষ একাকার হয়ে গেছে। কেউ তার দায়িত্বশীলতার জায়গায় নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা বাংলাদেশ সরকারের যে জাতীয় গাইডলাইন আমি তো বলব, অনেক চিকিৎসকই এটা মানছেন না।

 

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককেও তো দেখা যায় ফেসবুক-ইউটিউবে পরামর্শ দিচ্ছেন

আমাদের দেশে তথাকথিত কিছু বিশেষজ্ঞ আছেন। তাঁরা ইউটিউব ও ফেসবুকে গিয়ে এমন সব ওষুধের গুণগান গাইছেন, দেখে খুব অবাক লাগে। একজন ডাক্তার কিভাবে ফেসবুক লাইভে গিয়ে ফার্মাসিউটিক্যালস কম্পানিকে প্রমোট করেন? আপনার শার্ট তো আপনার দাদুকে পরিয়ে দিলে হবে না। তারা কাটপেস্ট করে একই চিকিৎসা প্রত্যেক মানুষকে দিচ্ছে! রোগীর ব্লাড, কিডনিসহ অন্য কোনো জটিলতা আছে কি না, কোনো ওষুধে সংবেদনশীলতা আছে কি না এসবের পরোয়া করছে না। অবৈজ্ঞানিক একটা চিকিৎসা সারা দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে তারা। কিছু ফার্মাসিউটিক্যালস কম্পানিও হয়তো এর সঙ্গে জড়িত। এদের কারণে বিজ্ঞানবহির্ভূতভাবে কোটি কোটি টাকার ওষুধ কিনে খাচ্ছে মানুষ। এতে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষতিও হচ্ছে। কিছু ওষুধ আছে জীবন রক্ষাকারী। যেমন স্টেরয়েড। এই ওষুধটা জীবন যেমন রক্ষা করে তেমনি এর অপব্যবহারে প্রাণক্ষয়ও হতে পারে। এটির ব্যবহার সম্পর্কে ন্যাশনাল গাইডলাইনে পরিষ্কার বলা আছে। প্রথম সাত দিনে এই ওষুধ দেওয়া মানে সুইসাইডাল। আমি অনেক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন দেখেছি যাঁরা প্রথম দিনই স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিভাইরাল কিংবা রক্ত পাতলাকরণের ওষুধ দিয়ে দিচ্ছেন এবং সেটা রোগীকে বাসায় রেখে। এগুলো অবৈজ্ঞানিক। যখন ভাইরাস কিছুটা নিষ্ক্রিয় হবে অথবা রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন হবে তখনই শুধু স্টেরয়েড দেওয়া যেতে পারে। তার আগে এই ওষুধ ব্যবহার করা মানে মৃত্যু ডেকে আনা। করোনাকে ফ্লু ভাইরাসেরই এক ধরনের রূপান্তর বলতে পারেন। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রমাণিত কোনো চিকিৎসা নেই। তাহলে উপসর্গ থাক বা না থাক, কেন একেকজন রোগীকে ৮-১০টি করে ওষুধ দেওয়া হবে? এখানে বিএমডিসিরও দায়িত্ব আছে। আসলে এ দেশের মানুষের ওপর গিনিপিগের মতো সব কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় দেখার জন্য। আমরা গাইডলাইন তৈরি করেছি। বারবার বলেছি, বেশির ভাগ রোগীর ওষুধেরই দরকার নেই। শুধু জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল খাবে। চিকিৎসার দরকার হলে গাইডলাইন ফলো করবে।

 

হাসপাতালগুলোকে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় কী?

আগে ভাইরাসের যে ধরনটি ছিল সেটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। সেই সময়ই দুটি জিনিস ঘটল। প্রথমত, আমরা ভ্যাকসিন পেয়ে গেলাম। দ্বিতীয়ত, সেই ভ্যাকসিন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সব প্রটেকটিভ গিয়ার ছেড়ে দিলাম। এই সুযোগটা নিল সাউথ আফ্রিকান ও ইউকে ভ্যারিয়েন্ট। এর মধ্যে সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট নরমাল ভাইরাসের চেয়ে ৭০ গুণ দ্রুত ছড়ায়। ফলে এটা সুনামির মতো আরেকটা ঢেউ তৈরি করল। বলতে পারেন, এই ঢেউ ম্যানমেইড। আগেরটা মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নষ্ট করতে ছয়-সাত দিন সময় নিত। এখনকার ভাইরাস যেহেতু সরাসরি ফুসফুসে আক্রান্ত করছে, ফলে দু-এক দিনের মধ্যে অবস্থা খারাপ করে ফেলে। তাই খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকার হাসপাতালগুলো রোগীতে ভরে গেল। হাসপাতালে জায়গা না থাকলে রোগী চিকিৎসা পাবে কিভাবে? ফলে প্রতিদিনই মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে। এখন সরকার যদি কার্যকরভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে সংক্রমণ কমে আসবে। স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য আর অনুরোধ না করে অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। সহজ কথায়, মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে হবে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : পিন্টু রঞ্জন অর্ক



সাতদিনের সেরা