kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

চলছে ফুসফুসের ক্যান্সার সচেতনতা মাস

নয় ধূমপান ও তামাকদ্রব্যের ব্যবহার

অধ্যাপক ডা. কাজী মনজুর কাদের, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান, অনকোলজি বিভাগ, ডেলটা হাসপাতাল লিমিটেড

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নয় ধূমপান ও তামাকদ্রব্যের ব্যবহার

পুরুষের ক্ষেত্রে ফুসফুসের ক্যান্সার অতি পরিচিত এক রোগ। তবে ২০ বছরের কম বয়সী ছেলে-মেয়ের মধ্যে এ রোগ তেমন একটা দেখা যায় না। চলতি নভেম্বর পালিত হচ্ছে ফুসফুসের ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘Let’s Fight This Scourge’ বা ‘আসুন, এই মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করি’।

 

ফুসফুস ক্যান্সার

মানবদেহের একটি অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ ফুসফুস, যার মাধ্যমে মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করে। বক্ষপিঞ্জরের ডানে ও বাঁয়ে দুটি ফুসফুস অবস্থিত। ফুসফুসে অনেক ধরনের রোগ হতে পারে। তখন ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায়। তবে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে ফুসফুসের কিছু রোগ ভালো হয়। ফুসফুসে ক্যান্সার হলে একটি কষ্টকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।

ফুসফুসের ক্যান্সার একটি প্রাণঘাতী ব্যাধি। বর্তমান বিশ্বে পুরুষের মধ্যে সব ধরনের ক্যান্সারের চেয়ে ফুসফুসের ক্যান্সার শীর্ষে। নারীদেরও ফুসফুস ক্যান্সারের হার বেড়েছে। ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রতি পাঁচটির মধ্যে একটি হচ্ছে ফুসফুসের ক্যান্সার। ক্যান্সার আক্রান্ত মৃত্যুর মধ্যে ৫০ শতাংশ মৃত্যু ফুসফুসের ক্যান্সারজনিত কারণে হয়ে থাকে। মধ্যবয়স্ক ও বয়স্কদের মধ্যে এই রোগের হার সবচেয়ে বেশি।

 

কারণ

মানবদেহে অস্বাভাবিক জীবকোষের বিরতিহীন বিভাজনের ফলেই মূলত ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। দেহের বিভিন্ন অংশে এই অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন ঘটতে পারে। ফুসফুসের টিস্যুতে এ ধরনের অস্বাভাবিক কোষ বিরতিহীন বিভাজনের ফলে ফুসফুসে ক্যান্সার হয়।

যাঁরা তামাক বা সিগারেট গ্রহণ করেন তাঁদের মধ্যে এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সিগারেটে ৬০ প্রকারের বেশি কারসিনোজেন (ক্যান্সার উৎপাদক) থাকে। সিগারেটের প্রধান উপাদান নিকোটিন অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং নানা ধরনের ক্যান্সার হয়। উন্নত দেশগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশ মৃত্যু হয়ে থাকে ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণে। অন্য যেসব কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায় সেগুলো হলো, অ্যাজবেস্টস (বিশেষ খনিজ পদার্থ) এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিঃসরণ প্রভৃতি।

 

লক্ষণ

সহজে সারছে না এমন কাশি, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কফের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, ভাঙা কণ্ঠস্বর, শব্দ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া, খেতে অসুবিধা, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি হলো প্রধান উপসর্গ। তবে ফুসফুসের বাইরে অন্য স্থানে রোগটি ছড়িয়ে গেলে, যেমন—অস্থিতে ছড়িয়ে গেলে হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা, মাথায় চলে গেলে বমি হওয়া, মাথা ব্যথা, লিভার বা যকৃতে চলে গেলে যকৃৎ বড় হয়ে যাওয়া, এমনকি জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়।

 

পরীক্ষা

ধূমপানসহ রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে, কফ পরীক্ষা (ক্যান্সার কোষ), ব্রংকোসকোপি এফএনএসি, এফএনএবি, হিস্টোপ্যাথলজি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ফুসফুসের ক্যান্সার নির্ণয় করা যায়।

 

চিকিৎসা

চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যান্সারের আকার, ব্যাপ্তি ও হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্টের ওপর। মূল চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলো সার্জারি, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেডথেরাপি।

 

প্রতিরোধে করণীয়

নয় ধূমপান : সিগারেট বা বিড়ির ধোঁয়ার মধ্যে ক্যান্সার সৃষ্টির অনেক উপাদান বিদ্যমান। ক্যান্সার আক্রান্ত ৮৭ শতাংশ রোগীর দীর্ঘদিন ধরে এবং অধিক হারে ধূমপানের প্রমাণ পাওয়া গেছে গবেষণায়। যে ব্যক্তি প্রতিদিন ২০টি সিগারেট বা বিড়ি সেবন করে তার ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা অধূমপায়ীদের থেকে ২০ গুণ বেশি। এটাও জেনে রাখা দরকার, পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাবেও এই রোগ হতে পারে।

বর্জন করুন তামাক : তামাকের ধোঁয়া শ্বাসনালির অভ্যন্তরীণ দেয়ালে ক্ষত সৃষ্টি করে। ফলে কোষের আকৃতির অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন পরবর্তীকালে ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়।

তামাকের ক্ষতি ও ব্যবহার কমাতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন পাস হয়েছে দেশে। ২৬ মার্চ ২০০৫ থেকে এই আইন কার্যকর করা হয়। এই আইনের বিশেষ দিকগুলো হলো :

► পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ

► তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ

► তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান, কোনো টুর্নামেন্টের আয়োজন বা বিনা মূল্যে নমুনা প্রদান নিষিদ্ধ।

► উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটে বড় মাপের (৩০ শতাংশেরও বেশি) স্বাস্থ্য তথ্য মুদ্রণ করা।

 

কিছু কাজে ঝুঁকি বেশি : আর্সেনিক, পারমাণবিক রশ্মি বিকিরণ, অ্যাজবেস্টস, ক্রোমিয়াম যৌগ, আলকাতরাজাতীয় সামগ্রী, ভিনাইল ক্লোরাইড, ইউরেনিয়াম চুনের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই এসব কাজে নিয়োজিতদের সতর্ক থাকা উচিত।

 

এটা সত্য কথা যে ধূমপান, তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণে কোনো সুফল নেই। সুতরাং শুধু ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার ছেড়ে দিলেই ফুসফুসের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়।

মন্তব্য