kalerkantho

শনিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৮ সফর ১৪৪২

কিডনি রোগীর করোনাঝুঁকি ও করণীয়

ডা. মো. শোয়েব নোমানী, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল

৮ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কিডনি রোগীর করোনাঝুঁকি ও করণীয়

করোনায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যারা সহরোগে ভুগছে বা যারা কো-মরবিডি রোগী, যেমন—কিডনি জটিলতা, হৃদেরাগ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তারাই বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ক্রনিক কিডনি রোগ, কিডনি বিকল বা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশনের রোগীরা করোনায় আক্রান্ত হলে ঝুঁকিতে থাকে বেশি। তাই কিডনি রোগীদের করোনাঝুঁকি ও সতর্কতার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিতে হবে।

 

যারা অতিমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ

►        কিডনি সংযোজিত রোগী।

►        নিয়মিত ডায়ালিসিস নেয়, এমন রোগী।

►        যাঁদের বয়স ৬০-৭০ বছর বা এর বেশি।

►        প্রদাহজনিত কিডনি রোগে ভুগছে যারা।

►        রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসকারী, যেমন—স্টেরয়েড, সাইক্লোফসফামাইড, সাইক্লোস্পোরিন, টেকরোলিমাস, এজাথিওপ্রিন, এমটিএক্স ও রিটুক্সিম্যাব সেবনকারী। শিশু কিডনি রোগী উল্লিখিত ওষুধ কম ডোজে খেলেও অতিঝুঁকির তালিকাভুক্ত হবে।

 

করোনায় আক্রান্ত হলে

যেকোনো ধরনের কিডনি রোগী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে কিছু সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন :

►        দেহে তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি থাকা, কফ-কাশি থাকা, নাকে গন্ধ না পাওয়া, মুখে স্বাদ না পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে রোগীকে ১৪ দিনের আইসোলেশনে থাকতে হবে।

►        উপসর্গ থাকার কারণে কভিড-১৯ টেস্ট করাতে হবে। যদি পজিটিভ রিপোর্ট আসে তাহলে সাম্প্রতিক সময়ে যারা তার সংস্পর্শে ছিল তাদেরও নজরে রাখতে হবে।

►        সশরীরে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ফোনে যোগাযোগ করে বা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।

►        সামাজিকভাবে মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা কমিয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে কিডনি রোগের মাত্রা বেশি থাকলে বা সিকেডি স্টেজ ৪ বা ৫ হলে হাট-বাজার, কর্মক্ষেত্র বা উপাসনালয়ে যাওয়া একেবারে বন্ধ করে যতটা সম্ভব বাড়িতে থাকতে হবে।

►        পাবলিক বাহনে চলাফেরা করা যাবে না, ব্যক্তিগত গাড়ি বা বিকল্প গাড়িতে চলাফেরা করতে হবে।

►        কারো সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে কথা বলা যাবে না, পাশাপাশি হয়ে কথা বলতে হবে।

►        বাইরে বের হলে অবশ্যই ফেস মাস্ক বা ফেস কাভারিং ব্যবহার করতে হবে। বাসায় ফিরেই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।

 

বাইরে যেতে হলে

করোনাকালে কিডনি রোগীদের বাড়িতেই অবস্থান করা উচিত। তবে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে একান্তই বাইরে গেলে কিছু সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন :

►        প্রতিদিন একবার এবং খুব বেশি প্রয়োজনে দুবারের বেশি বাড়ির বাইরে বের হওয়া নয়। বাইরে বের হওয়ার সময়টা খুব সকাল বা যখন নির্জন অবস্থা বা মানুষের চলাফেরা কম থাকে এমন সময় হলে ভালো হয়।

►        মানুষ থেকে মানুষে দু-এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।

 

ডায়ালিসিস রোগীদের জন্য

►        নিয়মিত হেমোডায়ালিসিসের রোগীদের আগেই যোগাযোগ করে ডায়ালিসিস ইউনিটকে জানাতে হবে এবং তাদের দেওয়া শিডিউল মোতাবেক ডায়ালিসিস করাতে হবে।

►        যদি সম্ভব হয় সপ্তাহে তিনটির পরিবর্তে দুটি হেমোডায়ালিসিস নেবেন। তবে বাসায় ডায়ালিসিস করালে আগের নিয়মেই করাবেন।

►        শ্বাসকষ্ট, খাবারে পটাসিয়াম ও পানির পরিমাণের ব্যাপারে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে https://kitchen.kidneyfund.org সাইটের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

►        ঘর থেকে বের হওয়ার পর ফিরে আসা পর্যন্ত মুখে তরল প্রতিরোধী সার্জিক্যাল মাস্ক পরিধান করুন। এই মাস্ক পরার উদ্দেশ্য হলো নিজের, ডায়ালিসিস ইউনিটের অন্য রোগীদের এবং হাসপাতালের অন্যান্য স্টাফসহ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

►        ডায়ালিসিস চলাকালীন মুখের মাস্ক সরিয়ে কিছু খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এই সময় হাসপাতাল স্টাফ এবং অন্য রোগীরা অবশ্যই দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখবে। খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়া মাত্রই রোগী মাস্ক বা কাভারিং দিয়ে মুখ ঢাকবে।

►        যাতায়াতের জন্য সম্ভব হলে ব্যক্তিগত বা বিকল্প গাড়ি ব্যবহার করবেন।

►        উপসর্গযুক্ত রোগীরা কয়েকজন একত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে একই গাড়িতে যেতে পারে।

 

হোম ডায়ালিসিস রোগীর করণীয়

►        রোগী বাসায় আলাদা রুমে অবস্থান করবে।

►        বাসায় যদি এমন ব্যক্তি থাকে, যাকে প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে হয়, তার সঙ্গেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবে।

►        ডায়ালিসিসের উপকরণগুলো খুব সতর্কতার সঙ্গে বাসায় পৌঁছাতে হবে।

►        রুটিন চেক আপ করাতে দূরের হাসপাতাল পরিহার করে বাসার কাছাকাছি কোনো ল্যাব থেকে বা সম্ভব হলে হোম সার্ভিসের মাধ্যমে করিয়ে নেওয়া কম ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ল্যাব টেকনিশিয়ান অবশ্যই পিপিই পরে নমুনা সংগ্রহ করবেন।

 

শিশু কিডনি রোগী

সাধারণত শিশু কিডনি রোগীরা বড়দের তুলনায় কভিড-১৯-এ কম ভুগে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ উপসর্গবিহীন থাকে। কভিড-১৯-এ শিশু মৃত্যুহার একেবারেই নগণ্য। যদি শিশুদের জ্বর, সর্দি, কাশি দেখা যায়, তবে অন্যান্য ভাইরাল ফিভারের মতোই তাদের যত্ন নিতে হবে।

কিন্তু শিশু কিডনি রোগী যদি স্টেরয়েড বা স্লাইক্লোফসফামাইড পায়, ডায়ালিসিস পায় বা কিডনি সংযোজিত হয়, তবে তারা বড় রকমের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাস সম্পূর্ণ ছড়িয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।

 

নারী কিডনি রোগী

এই করোনাকালে নারী কিডনি রোগীদের গর্ভধারণের ব্যাপারে নিরুৎসাহ করা হচ্ছে। কারণ গর্ভবতী অবস্থায় কভিডে আক্রান্ত হলে মা ও শিশু উভয়েই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে যেতে পারে।

তবে কেউ এরই মধ্যে গর্ভবতী হয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ১২ সপ্তাহের আইসোলেশনে থাকবেন। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত কিডনির কার্যক্ষমতা মনিটর করতে হবে। তিনি অ্যান্টিন্যাটাল ক্লিনিক সেবা টেলিফোনের মাধ্যমে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

 

যাদের একটি কিডনি

যেসব রোগীর একটি কিডনি আছে তাদের কভিডের ঝুঁকি বাড়ায় না। যদি একটি কিডনি সম্পূর্ণ কর্মক্ষম থাকে, তবে তা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কোনো পরিবর্তন আনবে না। সে ক্ষেত্রে ঝুঁকি অন্য সাধারণ মানুষের মতোই।

কিন্তু যদি সেই একটি কিডনি অসুস্থ হয়ে থাকে, তবে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। কোনো বিশেষ রোগের কারণে একটি কিডনি ফেলে দিতে হয়েছিল, এমন ক্ষেত্রে (যেমন—ডায়াবেটিস থেকে এমফাইসেমাটাস পাইলোনেফ্রাইটিস) কভিড-১৯-এর ঝুঁকি বাড়তে পারে।

 

পলিসিস্টিক কিডনি রোগী

দুটি কিডনি সম্পূর্ণ কর্মক্ষম থাকলে জন্মগত বা পলিসিস্টিক কিডনি রোগী অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে ঝুঁকি বাড়তে থাকে। যেমন—সিকেডি স্টেজ ৩ থেকে স্টেজ ৪ এবং স্টেজ ৪ থেকে স্টেজ ৫ বেশি ঝুঁকি বহন করে।

 

কিডনি সংযোজিত রোগী

কিডনি সংযোজিত রোগীদের এই সময় হাসপাতালে এসে ফলোআপ করা থেকে নিরুৎসাহ করা হচ্ছে। কভিডের সময় এই ধরনের রোগীরাই সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তারা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত বিরতিতে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে।

করোনাকালে এখন সব কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারও বন্ধ আছে। কারণ ট্রান্সপ্লান্টের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসকারী ওষুধ দেওয়া হয়। তাই তারা করোনায় আক্রান্ত হলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা