kalerkantho

সোমবার । ২৩ চৈত্র ১৪২৬। ৬ এপ্রিল ২০২০। ১১ শাবান ১৪৪১

করোনাভাইরাস : উদ্বিগ্নতা ও করণীয়

বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চ, বরিশাল আয়োজিত ‘করোনাভাইরাস : উদ্বিগ্নতা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় গত ৪ ফেব্রুয়ারি। এতে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরেন গোপালগঞ্জ শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রাফি উদ্দিন আহম্মেদ

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনাভাইরাস : উদ্বিগ্নতা ও করণীয়

মানবদেহের সেল গঠিত হয় সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াস দিয়ে। অন্যদিকে ভাইরাস হলো এক ধরনের অতি ক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব, যারা জীবিত কোষের ভেতরেই মাত্র বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এরা অতি-আণুবীক্ষণিক এবং অকোষীয়। ভাইরাসকে জীব বলা যাবে কি না, এ নিয়ে অবশ্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত আছে। নিউক্লিক এসিড দুই ধরনের : ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) এবং রাইবোনিউক্লিক এসিড (আরএনএ)। এই ডিএনএ বা আরএনএ দিয়েই ভাইরাসের গঠন। এর পাশে একটা প্রোটিনের কোট আছে। তবে ভাইরাসের দেহে কোনো নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম নেই।

 

করোনাভাইরাস কী?

লাতিন শব্দ ‘করোনা’ অর্থ মুকুট, যা দেখতে অনেকটা সূর্যচ্ছটার মতো। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের ভেতরে কতগুলো স্পাইক বা গজালের মতো আছে। আগে এই ভাইরাসটি দেখা যায়নি বলে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘নভেল করোনাভাইরাস’।

দুই হাজার রকমের করোনাভাইরাস রয়েছে। বর্তমানে যে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে তা সর্বশেষ। ভাইরাস যখন কাউকে আক্রান্ত করে তখন নিজে নিজেই শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। এ জন্য দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্তরা সাত দিনের মধ্যে ভালো হয়ে থাকে। যেকোনো ভাইরাসের ক্ষেত্রে চিকিৎসাও খুব সীমিত; সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিতে হয়। একবার কারো হলে দ্বিতীয়বার সাধারণত হয় না। একজনের দেহ থেকে অন্যজনকে আক্রান্ত করলে অ্যান্টিবডি চেঞ্জ হয়ে যায়। তখন নতুন করে তাকে আক্রান্ত করতে পারে। 

 

ঘটেছে ‘জিনোম’ পরিবর্তন

পৃথিবীর প্রতিটি প্রজাতির আলাদা আলাদা ভাইরাস রয়েছে। এক প্রজাতির ভাইরাস অন্য প্রজাতিকে আক্রমণ করে না। তাই মানুষের জন্য যে করোনাভাইরাস তা বাদুড় বা শূকরের জন্য নয়, কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ এখন অন্যের আবাসস্থলে হানা দিয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছে। হয়তো সেই ভাইরাসের সঙ্গে সহাবস্থান করতে গেছে বা ওই ভাইরাস নষ্ট না করেই খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। এসব কারণে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। এ ভাইরাস ওই ভাইরাস মিলে একটা জট তৈরি হয়ে গেছে; মানুষের ভেতরেও তা ঢুকে গেছে। নিউক্লিক এসিডের জিনোম পরিবর্তনের কারণে আসলে এসব ঝামেলা হয়েছে। ফলে শূকর বা বাদুড়ের ভাইরাস এখন মানুষকে আক্রমণ করছে। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদিও কিন্তু অন্য প্রজাতির ভাইরাস ছিল। পরে সেগুলোও মানুষকে আক্রান্ত করেছে।

 

কিছু বৈশিষ্ট্য

করোনাভাইরাসের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, প্রথম তিন দিন মানবদেহে করোনাভাইরাসের জীবাণু থাকলেও তা বোঝা যায় না। ওই সময় থার্মাল স্ক্যানার, থার্মোমিটার বা অন্য কিছু দিয়েও শনাক্ত করার কোনো উপায় আসলে নেই।

দ্বিতীয়ত, তিন থেকে পাঁচ দিন পর যখন জ্বর বা অন্যান্য উপসর্গ শুরু হবে, তখন থেকে এর ব্যাপ্তি হবে সাত দিনের মতো। তার মানে, সব মিলিয়ে ১২-১৩ দিন। এ জন্য করোনা সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টাইনে দুই সপ্তাহ বা ১৪ দিনের মতো রাখা হয়, যা নিরাপদ। অর্থাৎ এই ১৪ দিনের মাথায় পুরো চক্রটি শেষ হয়।

তৃতীয়ত, অন্যান্য ইনফ্লুয়েঞ্জায় এক সপ্তাহের মধ্যে রোগটি সেরে উঠলেও করোনার ক্ষেত্রে এক সপ্তাহে উপসর্গ শেষ হয়ে যায় না।

 

মানবদেহে প্রবেশের পর

করোনাভাইরাস প্রথমে নাক দিয়ে ফুসফুসে ঢুকে দেহের আবরণী কলার (Epithelial tissue) মধ্যে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। একপর্যায়ে আবরণী কলাগুলো ফুলে যায়। দেহের রেসপিরেটরি সিস্টেমের কাজ হলো অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড এক্সচেঞ্জ করা। কিন্তু সব সেল ফুলে গিয়ে প্রতিটি সেল অক্সিজেনের অভাবে আক্রান্ত হয়। তখন সেই পরিবর্তন করার কাজটি করতে পারে না। একে বলে হাইপক্সিয়া বা দেহকোষে অক্সিজেনের অপ্রতুলতা। দেহ তখন তৈরি হওয়া বর্জ্য পদার্থও বের করতে পারে না। বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজমও নষ্ট হয়। হাইপক্সিয়ার কারণে পর্যায়ক্রমে কিডনি, লিভার, হার্ট ফেইলিওর বা মাল্টি-অর্গান ফেইলিওর করে। তখন দিব্যি সুস্থ মনে হওয়া মানুষও দ্রুত মৃত্যুর মুখে পতিত হতে পারে।

 

অন্যদের মধ্যে যেভাবে ছড়াতে পারে

আক্রান্তদের হালকা জ্বর দিয়ে সংক্রমণ শুরু হয়। সঙ্গে হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি উপসর্গ থাকতে পারে। দেহে করোনাভাইরাস বা জীবাণু প্রবেশের পর তিন থেকে পাঁচ দিনের মাথায় এসব উপসর্গ দেখা দেয়। এ সময় কোনো সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাস বা কথাবার্তার মাধ্যমে তা অন্যের কাছেও সংক্রমিত হতে পারে। রোগীর কাছাকাছি থাকলে বাতাসের মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। অথবা ওই রোগীর স্পর্শ লাগা কোনো বস্তুতে অন্য মানুষের স্পর্শ লাগলেও ছড়াতে পারে। যাঁদের দেহে ভাইরাস প্রবেশ করেছে, অথচ রোগের লক্ষণ প্রকট নয়, তাঁরাও কিন্তু রোগটি ছড়াতে পারে।

 

ঝুঁকি কতটা?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর যখন ‘হাইপক্সিয়া’ শুরু হয় বা কম অক্সিজেন পায়, তখন সেই সেলগুলোর বেশির ভাগই মারা যায়। তখন ভাইরাসগুলো আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে, হাঁচি-কাশির সঙ্গে, লালার সঙ্গে বা দেহের যেকোনো বর্জ্য পদার্থের সঙ্গে সেল বা দেহকোষ থেকে বেরিয়ে আসে। তখন ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা, এমনকি তাকে স্পর্শ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কেউ ধরলে, আক্রান্ত ব্যক্তি দুই ফুটের কম ব্যবধানে হাঁচি দিলে, তার নিঃশ্বাসের সংস্পর্শে এলে, তাকে ধরে অন্য কাউকে ধরলে এটা ছড়াতে পারে। এ জন্য আক্রান্তের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স বা অন্য কারোর জন্যও করোনাভাইরাস মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ভাইরাসটি যতক্ষণ ফ্লুইডের মধ্যে থাকে বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভাইরাসটি বেঁচে থাকে। বাতাসে বা রোদের আলোতে শুকিয়ে গেলে ভাইরাসটি মারা যায়।

 

নিজেকে বাঁচানোর উপায়

♦ প্রথমে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখতে হবে। যাতে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যের মধ্যে ভাইরাসটি না ছড়ায়।

♦ হাঁচি ও কাশি দেওয়ার সময় পারসোনাল হাইজিন মেইনটেন করা। এ ক্ষেত্রে রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করা, নিজের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি অন্য কাউকে ব্যবহার করতে না দেওয়া।

♦ কাউকে স্পর্শ না করা, এমনকি করমর্দনও নয়।

♦ নিজেকে রক্ষা করতে যথাসম্ভব মাস্ক বা মুখোশ ব্যবহার করা।

♦ ব্যবহৃত জামাকাপড় কড়া রোদে শুকানো। সাবান দিয়ে কাপড় ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া।

♦ সব বর্জ্য মাটির নিচে পুঁতে ফেলা ইত্যাদি।

(ফেসবুক থেকে সংক্ষেপিত) অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা