kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ফুসফুসের রোগ ব্রংকিয়াকটেসিস

ব্রংকিয়াকটেসিস হলে ক্রণিকপ্রদাহ ও জীবাণু সংক্রমণে শ্বাসনালি স্থায়ীভাবে প্রসারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে ফুসফুসের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় ও রেসপিরেটরি ফেইলিওর হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রংকিয়াকটেসিসের প্রকোপ বাড়ে। শীতের সময় এই রোগীদের একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষব্যাধি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম মোশাররফ হোসেন

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফুসফুসের রোগ ব্রংকিয়াকটেসিস

ব্রংকিয়াকটেসিস বেশ জটিল একটা রোগ। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ শতাংশ রোগী পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যায়। পুরুষের চেয়ে নারীদের এই রোগ বেশি হয়।

 

কারণ

ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ব্রংকিয়াকটেসিস রোগের উৎপত্তিতে মূলত দায়ী। এই দুটি কারণে ফুসফুসের প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী হয়, শ্বাসনালির মিউকোসায় আলসার হয়, আবার তা মেরামত হয়। এভাবে শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রসারিত হয়ে যায়। শ্বাসনালির এই পরিবর্তন একেবারে স্থায়ী পরিবর্তন। এ ধরনের শ্বাসনালিতে বারবার জীবাণুর সংক্রমণ হয়।

ব্রংকিয়াকটেসিস রোগের কারণগুলোর কিছু জন্মগত, তবে বেশির ভাগই অর্জিত। যেমন—

 

জন্মগত কারণ 

►        শ্বাসনালি প্রসারিত হওয়া (ব্রংকোম্যালাসিয়া)

►        শ্বাসনালির অস্বাভাবিক অবস্থান (একটোপিক ব্রংকাস)

►        সিসটিক ফাইব্রোসিস

►        শ্বাসনালির সিলিয়ার ত্রুটিপূর্ণ গতিবিধি (ইম্মোটাইল সিলিয়া)

►        জন্মগতভাবে দুর্বল রোগ প্রতিরোধতন্ত্র (ইমিইউনুডেফিসিয়েন্সি)

 

অর্জিত কারণ

►       শ্বাসনালির বাধা (টিউমার বা কোনো বস্তু)

►        শৈশবে ফুসফুসে সংক্রমণ (মিসল্স্)

►       যক্ষ্মা

►        সিওপিডি

►        ফুসফুসে মুখের বা খাদ্যনালির পদার্থ ঢুকে যাওয়া

►        রিওমাটয়েড আর্থ্রাইটিস

►       অ্যাজমা রোগীদের অ্যালার্জিক ব্রংকোপালমোনারি এসপারজিলোসিস। অ্যাজমা রোগীদের অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড সেবনেও ব্রংকিয়াকটেসিস হতে পারে।

 

উপসর্গ

►        দীর্ঘস্থায়ী কাশি আর প্রচুর শ্লেষ্মাই প্রধান লক্ষণ। এই শ্লেষ্মা সাদা, সবুজ বা হলুদ বর্ণের হয়। কখনো কখনো শ্লেষ্মায় রক্ত যায়। অনেক সময় বেশি পরিমাণে রক্তকাশি হয়, যা রোগী ও চিকিৎসকের জন্য ভীতিকর হয়ে ওঠে।

►        শ্বাসকষ্ট, নিঃশ্বাসে বুকে শাঁ শাঁ শব্দ হওয়া ও বুকে ব্যথা হওয়া।

►        কখনো রোগীদের শুধু মাঝেমধ্যে কাশির সঙ্গে রক্ত যায়, অন্য কোনো সমস্যা থাকে না।

►        জীবাণুর সংক্রমণ হলে নিঃশ্বাস থেকে দুর্গন্ধ আসে। তবে কারোর দীর্ঘস্থায়ী রাইনোইনাসাইটস থাকলে ঘ্রাণশক্তি কমে যায় বলে তাঁরা গন্ধ পান না।

 

পরীক্ষা

ব্রংকিয়াকটেসিস নির্ণয়ে বুকের এক্স-রে, সিটিস্ক্যান, পালমোনারি ফাংশন, শ্লেষ্মা ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হয়। এ ছাড়া স্টেথো দিয়ে ফুসফুসে অতিরিক্ত শব্দ (প্রচুর ক্রেকলস ও রংকাই) পাওয়া যায়। শ্লেষ্মায় ব্যাকটেরিয়া ও টিবির জীবাণু আছে কি না তা কালচার করে পরীক্ষা করা হয়। জীবাণু পাওয়া গেলে তাতে কোন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর তা-ও পরীক্ষা করা হয়।

 

চিকিৎসা ও করণীয়

►        প্রথমেই ধূমপান ত্যাগ করতে হবে

►        পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে

►        প্রচুর পানি পান করতে হবে

►        ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে শ্বাসনালির শ্লেষ্মা বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অ্যাক্টিভ সাইকেল ব্রিদিং টেকনিক করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

►        প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ও তিন বছর পর পর নিউমোনিয়ার টিকা নিতে হবে।

►        এমাক্সিসিলিন, এমোক্সিক্লভলিনিক এসিড, লেভোফ্লক্সাসিন ইত্যাদি অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে জীবাণু সংক্রমণের চিকিৎসা করা হয়।

►        ইনজেকশনের মাধ্যমে সিউডোমোনাস জীবাণুর চিকিৎসা করা হয়।

►        ব্রংকোডাইলেটর ও স্টেরয়েড ইনহেলার নিয়মিত ব্যবহারে শ্বাসকষ্ট কমে যায়।

►        রক্তকাশি খুব বেশি হলে যে ধমনি থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা ব্রংকিয়াল আর্টারি এমবোলাইজেশনের মাধ্যমে বন্ধ করা যায়। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কার্যকর, যাতে অনেক সময় সার্জারি এড়ানো যায়।

►       উপরোক্ত পদ্ধতিতে রক্তকাশি বন্ধ না হলে সার্জারি করে ব্রংকিয়াকটেসিস আক্রান্ত ফুসফুস কেটে বাদ দিতে হয়।

►        ব্রংকিয়াকটেসিসের কারণ হিসেবে কোনো রোগ থাকলে যেমন—রিওমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, সিওপিডি শ্বাসনালির জন্মগত ত্রুটি গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্ল্যাক্স ডিজিজ, অ্যাসপিরেশন ইত্যাদির চিকিৎসা করাতে হয়।

 

ব্যায়াম

ব্রংকিয়াকটেসিস বা ফুসফুসের রোগে অনেক সময় বেশি পরিমাণে নিঃসরণ হয়। ফুসফুসের নিঃসরণ বের করার জন্য এই কৌশলটি খুবই কার্যকর, যা তিনটি ধাপে করা হয়।

শ্বাস নিয়ন্ত্রণ : কাঁধ ও পেট শিথিল করে আরামের সঙ্গে তিন-চারবার শ্বাস নিতে হয় ও ছাড়তে হয়।

লম্বা শ্বাস : লম্বা শ্বাস নিয়ে কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখতে হয়। তারপর ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হয়। এভাবে তিন-চারবার করা ভালো।

হাফিং : বুকভরে শ্বাস নিয়ে পেটের মাংসপেশি সংকুচিত করে মুখ দিয়ে এক-দুবার শ্বাস ছাড়তে হয়। এরপর এক-দুবার কাশি দিয়ে কফ বের করা উচিত।

 

প্রতিরোধে করণীয়

►        দেহে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য পরিমিত আহার ও দৈহিক ব্যায়াম করতে হবে।

►        শিশুদের টিকাগুলো সঠিক সময় দিতে হবে। এতে শৈশবে হাম, হুপিংকাশি, যক্ষ্মা ইত্যাদি রোগ থেকে শিশুরা রক্ষা পাবে। পরবর্তী সময়ে ব্রংকিয়াকটেসিস হওয়ার আশঙ্কাও কমে যাবে।

►        ফুসফুসে নিউমোনিয়া হলে তা যথাযথভাবে অ্যান্টিবায়োটিক, ফিজিওথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা