kalerkantho

সোমবার । ২৯ আষাঢ় ১৪২৭। ১৩ জুলাই ২০২০। ২১ জিলকদ ১৪৪১

সাক্ষাৎকার

‘বিডিএস নয় তো ডেন্টিস্ট নয়’

অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল
অধ্যক্ষ, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি

২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘বিডিএস নয় তো ডেন্টিস্ট নয়’

মুখের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এক টুকরো সুন্দর হাসি। তবে সুন্দর হাসির অধিকারী হতে গেলে দাঁতের নিয়মিত যত্ন নিতে হবে। নইলে দেখা দিতে পারে দাঁতে ক্যাভিটি, মুখের আলসার, এমনকি মুখের ক্যান্সারও। তাই দাঁত, মাড়ি বা মুখের ভেতরের যেকোনো ছোট-বড় সমস্যাকে অবহেলা করা উচিত নয়। দাঁতের যত্ন ও চিকিৎসা বিষয়ে ঢাকা ডেন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুলের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আতাউর রহমান কাবুল

প্রশ্ন : রোগীরা মুখ ও দাঁতের কোন সমস্যাগুলো নিয়ে আসেন?

ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল : দাঁত বা মাড়ির ব্যথা ছাড়া সাধারণত কোনো রোগী আমাদের কাছে আসেন না। তবে ব্যথা হওয়ার আগে দাঁতের ক্ষয়রোগ হয়, ক্যাভিটি বা গর্ত হয়। এই গর্ত দাঁতের পাল্প পর্যন্ত পৌঁছলে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়, তখন রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যান, সেটা সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো হাসপাতাল বা চেম্বারে হোক। এ ছাড়া (অল্প বয়সী শিশুরা) আঁকাবাঁকা দাঁতের চিকিৎসার জন্য, স্পেসিং বা ফাঁকা দাঁত কাভার করতে, দাঁত পড়ে গেলে তা রিপ্লেসমেন্টের জন্য, উঁচু-নিচু বা অসামঞ্জস্য দাঁত কারেকশনের জন্য, দাঁতের গোড়ায় টিউমার হলে, হাড়ে ফ্র্যাকচার হলে, ওরাল ক্যান্সার হলে রোগীরা আসেন।

 

প্রশ্ন : প্রতিদিন কতবার দাঁত ব্রাশ করা উচিত? নিয়ম কী?

ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল : আমরা বলি, দিনে অন্তত দুইবার দাঁত ব্রাশ করা উচিত। একটি হচ্ছে রাতে শোবার আগে, আরেকটি হচ্ছে সকালে নাশতার পর। এতে সারা দিন খাবার খেয়ে দাঁতে যেসব পদার্থ জমে তা ক্লিন হয়ে যায়। দুইবার সম্ভব না হলে অন্তত রাতে শোবার আগে একবার ব্রাশ করতেই হবে ওরাল হাইজিন মেইনটেইন করার জন্য। অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ অজুর সময় দিনে পাঁচবার মিসওয়াক করেন। এটিও ভালো অভ্যাস; ক্ষতি নেই। তবে রাতে ব্রাশ করার পর সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ করার কোনো দরকার কিন্তু নেই। কেননা রাতে তো আর মুখে কোনো খাবার জমল না। সকালে নাশতা করার পর বরং একবার ব্রাশ করা যেতে পারে।

ব্রাশিং কখনো তিন-চার মিনিটের বেশি করা উচিত নয়; এতে দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যায়। বৈজ্ঞানিকভাবে ব্রাশ করার নিয়ম হলো, ওপরের মাড়ির ওপর থেকে নিচে এবং নিচের মাড়ির নিচ থেকে ওপরে ব্রাশ করা।

 

প্রশ্ন : কী ধরনের পেস্ট ব্যবহার করা উচিত?

ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল : টুথব্রাশ যখন আবিষ্কৃত হয় তখন ব্রাশিং টেকনিকটাকে আরামদায়ক করার জন্যই টুথপেস্টের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। পরবর্তী সময়ে টুথপেস্টের মধ্যে বিভিন্ন উপাদান যোগ করা হলো। যেমন—কোনটা থাকলে ক্ষয় রোধ হবে, কী উপাদান থাকলে শ্বাস-প্রশ্বাস সজীব হবে, কী থাকলে সুগন্ধ হবে, বেশিদিন টিকে থাকার জন্য, দাঁত যাতে শিরশির না করে সে জন্য নানা উপাদান সংযুক্ত করে অনেক আধুনিক টুথপেস্ট বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। তবে টুথব্রাশ হতে হবে সফট বা নরম প্রকৃতির ফাইবারের। শক্ত হলে তা দাঁতের এনামেল নষ্ট করে দেয়।

অনেক সময় দাতের ফাঁকে খাবার ঢুকে যায়। সে ক্ষেত্রে ডেন্টাল ফ্লস নামে একধরনের সুতা দিয়ে দুই দাঁতের মধ্যে ফ্লস করে নিলে কোথাও কোনো খাবার আটকে থাকে না। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাতে দাঁত ব্রাশ করার পর সর্বশেষ কুলিটা যদি মাউথ ওয়াশ দিয়ে করা যায়, তবে এই মাউথওয়াশ সারা রাত একটি সজীব নিঃশ্বাস দেবে। ক্যারিজ বা ক্ষয় রোধ করে এ ধরনের মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে ডেন্টাল ক্যারিজও হবে না। বাজারে এ ধরনের অনেক মাউথওয়াশ রয়েছে। 

প্রশ্ন্ : অনিয়মিত দাঁত ব্রাশের ফলে কী কী সমস্যা হতে পারে?

ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল : নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে ব্রাশ না করার ফলে দাঁতে লেগে থাকা খাবার বেশ শক্ত হয়ে যায়। এভাবে দিনের পর দিন দাঁতে লেগে থাকা ময়লা লেপ্টে পাথর জমে যায়, যা পরবর্তী সময়ে স্কেলিং করে পরিষ্কার করতে হয়। পাথর জমে জমে দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে অবস্থান নিয়ে দাঁত নড়বড়েও করে ফেলে এবং তখন দাঁতগুলো ফেলে দিতে হয়। আবার ক্ষয় থেকে গর্ত হয়, যা ফিলিং করতে হয়। এই গর্ত দাঁতের অস্থিমজ্জা পর্যন্ত স্পর্শ করে ইনফেকশন তৈরি করে যাকে বলে ‘পালপাইটিস’। এই পালপাইটিস থেকে তীব্র ব্যথা ও ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা না করালে দাঁতের গোড়ায় সিস্ট হয়, টিউমার হয় এবং আস্তে অস্টিওমাইলাইটিসে রূপ নেয়। মোটকথা নিয়মিত দাঁত ব্রাশ না করার ইফেক্ট অত্যন্ত ভয়াবহ।

 

প্রশ্ন : মুখের ক্যান্সারের কারণ কী কী?

ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল : আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মুখের ক্যান্সার হওয়ার বড় কারণ হলো, পান, সুপারি, চুন, জর্দা, খনি, গুল ইত্যাদির ব্যবহার। অনেকে এগুলো খেয়ে মুখ ঠিকমতো পরিষ্কার করে না, অনেকে গালে পান জমিয়ে রাখে। এসব থেকে আস্তে আস্তে ক্যান্সারে পরিণত হয়। এ ছাড়া অ্যালকোহল গ্রহণ, নেশাদ্রব্য ব্যবহার থেকেও ক্যান্সার হতে পারে এবং তা ছড়িয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া হাতুড়ে চিকিৎসকের কবলে পড়েও অনেকে ক্যান্সারের শিকার হতে পারে।   

প্রশ্ন : দাঁতের স্কেলিং করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল : দাঁতের গায়ের ময়লা বা দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে থাকা খাবার দীর্ঘদিন লেপ্টে থাকলে, নিয়মিত ব্রাশ না করলে একপর্যায়ে তা পাথরে পরিণত হয়। তখন বিশেষ যন্ত্রের দ্বারা পরিষ্কার করাতে হয়, যাকে বলে ‘স্কেলিং’। আজকাল খুব আধুনিক মেশিন বা আলট্রাসনিক স্কেলার দিয়ে স্কেলিং করা হয়। আমরা পরামর্শ দিই, প্রতি ছয় মাস অন্তর দাঁতের চেকআপ করানোর জন্য। তবে স্কেলিং বছরে একবার করলেই চলে, যতক্ষণ না পাথর জমা শুরু হয়। এটা ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর বা তারও বেশি হতে পারে। মোট কথা একটা মানুষ যদি তার মুখ পরিষ্কার রাখতে পারে, তবে বছর বছর স্কেলিংয়ের দরকার নেই। তবে অপরিষ্কার থাকলে এবং ডেন্টাল সার্জন প্রয়োজন মনে করলে স্কেলিং করানো উচিত।

 

প্রশ্ন : মুখের দুর্গন্ধ দূর করার উপায় কী?

ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল : খুব ভালো প্রশ্ন। মুখে ময়লা বা পাথর থাকলে দুর্গন্ধ হয়। তবে দাঁত নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে, স্কেলিং করালে দুর্গন্ধ তেমন হয় না। মূলত দুর্গন্ধ হয় দুই কারণে। একটা লোকাল কারণ, আরেকটি সিস্টেমিক কারণ। পেটে কোনো সমস্যা, কিডনি, লিভার রোগ থাকা হলো সিস্টেমিক কারণ।

 

প্রশ্ন : দাঁতের চিকিৎসক বাছাই করতে হবে কিভাবে?

ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল : এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট বা বিএমডিসি আইন, ২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশে শুধু এমবিবিএস এবং বিডিএস ডিগ্রিধারীরাই চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন, পদবি হিসেবে ডাক্তার লিখতে পারেন—অন্য কেউ নয়। বাংলাদেশে সাড়ে ১২ হাজার গ্র্যাজুয়েট ডেন্টিস্ট রয়েছে। এর বাইরে শহর ও গ্রামাঞ্চলে লক্ষাধিক ‘কোয়াক’ বা অল্পশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত ডাক্তার রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ডিপ্লোমাধারী বা নানা ধরনের সনদ নিয়ে প্র্যাকটিস করেন যাঁরা, তাঁরাই মূলত ‘কোয়াক’। এরা চিকিৎসার নামে মূলত অপচিকিৎসা দিচ্ছেন; মানুষও প্রতারিত হচ্ছে।

সারা পৃথিবীতেই ডেন্টাল সার্জারি বা শিক্ষায় গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রিধারীরাই চিকিৎসক হিসেবে বিবেচিত। এই ডিগ্রিগুলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন নামে দিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ডেন্টাল সার্জারিতে একই নামে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি দিয়ে থাকে, যাকে বলে ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি (বিডিএস)। বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহত প্রচারণা চালিয়েছে যে এমবিবিএস এবং বিডিএস বাদে কেউ চিকিৎসক নন। এর ফলে এই কোয়াকরা এখন আর ডাক্তার লেখেন না। তবে হালে তাঁরা নামের আগে ডেন্টিস্ট পরিচয় দিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। এ জন্য আমরাও বলা শুরু করেছি যে ‘বিডিএস নয় তো ডেন্টিস্ট নয়’। যাতে জনগণ কোনো প্রতারণার শিকার না হয়। তাই কোনো ডাক্তারের চেম্বারে গেলে জানা উচিত যে ওই ডাক্তারের সত্যিকার অর্থে বিডিএস ডিগ্রি রয়েছে কি না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা