kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

শিশুর বমি হলে অবহেলা নয়

নানা কারণে শিশুরা বমি করে থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামান্য কারণে বমি হয় এবং তা আপনাআপনি সেরে যায়। অনেক সময় শিশুদের বমি জটিল কোনো রোগের লক্ষণরূপেও দেখা দেয়। তাই বমি হলে সতর্ক হতে হবে। লিখেছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



শিশুর বমি হলে অবহেলা নয়

মাঝেমধ্যে শিশুদের বমি হতে পারে। এতে অভিভাবকরা সহজেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন কিন্তু সব বমির ক্ষেত্রে ওষুধ লাগে না। আবার বমি থামাতে গিয়ে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এতে বরং হিতে বিপরীত হতে পারে।

 

কারণ

স্বাভাবিক কারণ : প্রসবকালে জরায়ু থেকে বের হওয়ার পর নবজাতক সামান্য কিছু লাইকার, রক্ত ইত্যাদি গিলে ফেলে। যার কারণে নবজাতক শিশু জন্মের প্রথম কয়েক দিন বমি করতে পারে। পানি ভাঙার পর প্রসবকাল খুব দীর্ঘ হলে সাধারণত এমন ঘটে। এ রকম সন্দেহ হলে নবজাতক শিশুকে প্রথম খাবার দেওয়ার আগেই অর্থাৎ মায়ের বুকে দেওয়ার আগে পাঁচ থেকে ১০ মিলি নরমাল স্যালাইন দিয়ে স্টমাক ওয়াশ করে দেওয়া ভালো। তবে বিশেষজ্ঞ শিশুচিকিৎসক ভিন্ন অন্য কারো দ্বারা ওয়াশ না করানো উচিত।

বাতাস গেলা : নবজাতক ও কম বয়সী শিশুরা প্রতিবার খাবারের সময় কিছু না কিছু বাতাস খেয়ে ফেলে। খাওয়ার পর এ বাতাস পাকস্থলী থেকে বেরিয়ে যেতে চায় ও বেরোনোর সময় সঙ্গে দুধ তুলে নিয়ে আসে, যা কখনো কখনো শিশু আবার গিলে ফেলে। তবে পরিমাণ বেশি হলে শিশু সবটুকু গিলতে পারে না এবং অনেকে এই দুধ তুলে নিয়ে আসাকে বমি বলে মনে করেন। এটি অবশ্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা।

আবার বুকের দুধ খাওয়ানোর ভঙ্গি যথাযথ না হলে বা শিশুকে বোতলে বা ফিডারে খাওয়াতে গেলেও শিশুর পেটে বাতাস ঢোকে। কেননা বোতল বা ফিডারের নিপলের ছিদ্র খুব ছোট হয় কিংবা স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হয়, তাহলেও শিশুর প্রচুর বাতাস খাওয়ার সুযোগ ঘটে। মায়ের দুধের বোঁটা ভেতরের দিকে বসানো থাকলে (রিট্রেকট্রেড নিপল) কিংবা মায়ের বুকে দুধের প্রবাহ শুকিয়ে এলে, তখন শিশু চুষতে থাকলেও বেশি পরিমাণে বাতাস গেলার আশঙ্কা থাকে। নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুর বমি করার সর্বাধিক কারণ বেশি পরিমাণে বাতাস খেয়ে ফেলা।

জন্মগত ত্রুটি : যদি এমন দেখা যায় যে জন্মের পরপরই নবজাতক শিশুর মুখে অবিরাম ফেনা বেরোচ্ছে বা ক্রমাগত মুছে কিংবা সাকসান দিয়েও থামানো যাচ্ছে না, তখন ধারণা করতে হবে ওই নবজাতকের শ্বাস ও খাদ্যনালির জন্মগত ত্রুটি থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে শিশুকে কোনো খাবার না দিয়ে বা খাওয়ানোর চেষ্টা না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া।

কোনো নবজাতকের পায়খানার রাস্তা না-ও থাকতে পারে। ফলে জন্মের পর আস্তে আস্তে পেট ফুলে যায়। জন্মের ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও নবজাতক পায়খানা করে না এবং দু-এক দিন পর বমি করতে থাকে। শিশু বিশেষজ্ঞের দ্বারা রোগ নির্ণয়ের পর সফল অস্ত্রোপচারের সাহায্যে এসব ত্রুটি ইদানীং সারানো সম্ভব হচ্ছে।

আবার এমন দেখা যায় জন্মের প্রথম দুই সপ্তাহ নবজাতক শিশু সম্পূর্ণ ভালো ছিল, দু-তিন সপ্তাহ বয়সের দিকে বমি শুরু হয়েছে, বমির বেগ খুব বেশি এবং তা অনেক দূরে গিয়ে পড়ে। তা ছাড়া লক্ষ্য করলে পেটে নাভির বাঁ পাশে লেবুর মতো সাইজের একটি দলা বোঝা যায়। ‘কনজেনিটাল হাইপারট্রপিক পাইলোরিক স্টেনোসিস’ অর্থাৎ পাকস্থলীর নিম্নাংশের নালিপথ অত্যধিক সরু থাকার কারণে এসব লক্ষণ দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞের দ্বারা রোগ নির্ণয় করে অস্ত্রোপচারের সাহায্যে শিশুকে সম্পূর্ণ নিরাময় করে তোলা সম্ভব।

খাবারে হেরফের : খাবারদাবারে সামান্য হেরফের হলেও শিশুর বমি হতে পারে এবং সব বয়সের শিশুর বমি হওয়ার এটাই অন্যতম কারণ। শিশুর বমির কারণ খুঁজতে গেলে অবশ্যই মা-বাবার কাছে তাঁর শিশুকে খাওয়ানোর নিয়ম বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে। দেখা যায়, বেশির ভাগ সময়ে মা-বাবা শিশুকে এক-দুই ঘণ্টা পর পর কোনো না কোনো খাবার খেতে দেন। এত ঘন ঘন খাবার দেওয়ার কারণে শিশুর খিদে থাকে না। তবু মা তাকে জোর করে দুধ বা অন্যান্য খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। অন্যদিকে শিশুকে অনেক দেরি করে খেতে দিলেও শিশুর বমি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেশি খিদে পাওয়ার কারণে শিশু একসঙ্গে হঠাৎ বেশি খেয়ে ফেলার পর বমি করে দিতে পারে।

কিছু অসুখ : কোনো নবজাতক হয়তো জন্মের প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সম্পূর্ণ ভালো ছিল, বুকের দুধ নিজেই টেনে খেত। কিন্তু বর্তমানে বমি করছে এবং বুকের দুধ টেনে খাচ্ছে না বা একটু একটু টানছে বলে মনে হচ্ছে, তখন ধারণা করতে হবে হয়তো ওই নবজাতক কোনো ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের মেনিনজাইটিস অর্থাৎ মাথার আবরক ঝিল্লির প্রদাহ, এনকেফালাইটিস, ব্রেইন টিউমার, টনসিলাইটিস বা ফ্যারিনজাইটিস, কানপাকা রোগ, হুপিং কাশি, জন্ডিস, মূত্রনালির প্রদাহ, অ্যাপেন্ডিসাইটিস, পেটে নানা ধরনের কৃমি ইত্যাদি অসুখেও বমির মতো লক্ষণ দেখা যায়। কিছুটা বড় শিশুর ক্ষেত্রে পেপটিক আলসার, কিডনির অসুখ, ডায়াবেটিস কিটো এসিডোসিস, মাইগ্রেন, ভ্রমণের কারণে বমি হতে পারে।

বদহজম ও ভ্রমণজনিত : নবজাতকের প্রথম সপ্তাহ বা মাসগুলোতে সচরাচর বমি ঘটে। দ্রুত বাড়তে থাকার ওই সময়ে তারা দৈহিক খাবার গ্রহণের পরিমাণের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। ওই সময় সামান্য বদহজম থেকে বা ভ্রমণের কারণেও সে বমি করতে পারে। আবার দীর্ঘক্ষণ কান্না বা কাশি হলেও শিশুদের বমির উদ্রেগ ঘটায়। এ পরিস্থিতি শিশুকে অসুস্থ বানিয়ে দিতে পারে। যেকোনো কারণেই বমি হোক না কেন, ওই সময় নিতে হবে কিছু পদক্ষেপ।

 

চিকিৎসা ও করণীয়

►   মাঝেমধ্যে শিশু দু-একবার বমি করলে তা নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। কেননা প্রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বমি কোনো মারাত্মক অসুখের কারণ নয়। বমি করার পর শিশু যদি স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করে, উত্ফুল্ল থাকে, তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।

►   প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে বুকের দুধ পান চালিয়ে যাওয়া, তরল খাবার ও পানীয় পান করা, প্রতি ঘণ্টায় কয়েকবার খাবার স্যালাইন পান করানো উচিত। বমি বন্ধ হলে আগের মতো স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যাওয়া উচিত।

►   বমির কারণে দেহ থেকে পানি ও অন্যান্য জলীয় পদার্থ বেরিয়ে যায়। এসব পূরণের লক্ষ্যে বমি হলে শিশুকে খাবার স্যালাইন অল্প অল্প করে খেতে দিতে হবে। শিশু যদি নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

►   খেয়াল করুন, দুধ খাওয়া ভুলের কারণে শিশু বেশি বাতাস গিলছে কি না। এমনটি হলে তা শোধরানো উচিত। শিশুকে প্রতিবার খাওয়ার আগে ও খাওয়ানোর পরে কাঁধে রেখে ৫-১০ মিনিটের জন্য পিঠে মৃদু চাপড় দিলে এই বাতাস বেরিয়ে আসে, শিশু স্বস্তি ফিরে পায় এবং বমি করা বন্ধ হয়ে যায়।

►   শিশুকে জোর করে খাবার খাওয়াবেন না। আবার হঠাৎ করে শিশুর খাবার পরিবর্তন করেও দেবেন না। শিশুর খাদ্যসূচিতে পরিবর্তন আনতে হলে অথবা তাকে কোনো নতুন খাবার দিতে চাইলে তা খুব ধীরে ধীরে এবং অল্প অল্প করে শুরু করুন। কোনো খাবার খাওয়ানোর পর সঙ্গে সঙ্গে বমি করে দিলে দ্বিতীয়বার ওই খাবার দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।

►   খাবারে অ্যালার্জির কারণে বমি হতে পারে। শিশুকে প্রথম ডিম খাওয়ানোর সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করুন। অনেক শিশুর মুখে ডিম দিলেই বমি করে ফেলে ও চামড়ায় লাল রংয়ের দাগ দেখা যায়। প্রতিবার ডিম দেওয়ার পরপরই যদি এরূপ ঘটে, তাহলে বুঝতে হবে ডিমে তার অ্যালার্জি আছে এবং এসব ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করুন।

►   কৃমি প্রতিরোধে চিকিৎসকের পরামর্শে শিশুকে মাঝেমধ্যে কৃমির ওষুধ খাওয়ান। তবে কারণ না জেনে বমির ওষুধ দেওয়া ক্ষতিকর ও সম্পূর্ণ অনুচিত।

 

সতর্কতা

কখনো বমির আড়ালে মারাত্মক অসুখ লুকিয়ে থাকে। বিশেষত বমির সঙ্গে যদি জ্বর, চরম পানি স্বল্পতা, বুকের দুধ পান করে না বা পানি পানে অপারগতা, ত্বকে র‌্যাশ দেখা, ঘুম ভাব বা বেশি খিটখিটে, মাথার চাঁদি ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, পেট ফোলা, খিঁচুনি, বমিতে রক্ত বা পিত্তরস, খাওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে বেশ জোরের সঙ্গে বমি ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে সতর্ক হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, বমির একটা ধাক্কা ছয় থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাতে অবশ্য বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। শিশুটি যাতে পানিস্বল্পতায় না পড়ে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। আর বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে ‘ঘন ঘন বমি হওয়া এই শিশুটি ঠিকঠাক মতো বেড়ে উঠছে কি না। বিশেষত তার ওজনের দিকে বিশেষ খেয়াল করতে হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা