kalerkantho

থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা

২৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা

দেহের এক অপরিহার্য উপাদান থাইরয়েড হরমোন। এটি কমবেশি হলে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। প্রত্যেক মানুষের দেহে নির্দিষ্ট মাত্রায় থাইরয়েড হরমোন থাকা জরুরি। এর হেরফের হলেই নানা জটিলতা দেখা দেয়। এ বিষয়ে লিখেছেন বারডেম হাসপাতালের এন্ডোক্রাইন ও ডায়াবেটিস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এস এম আশরাফুজ্জামান

 

মধ্যবয়সী আয়শা পারভিন। খাওয়াদাওয়া খুব বেশি করছেন না, তার পরও তিনি মোটা হয়ে যাচ্ছেন। সব সময় শীত শীত একটা ভাব অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের দিকে মনে হয়, শরীরের ভেতরে জ্বর বয়ে যায়; কিন্তু বাইরে থেকে শরীর ঠাণ্ডা। পাশাপাশি অতিরিক্ত দুর্বলতা আছে। মন চায় সব সময় শুয়ে থাকতে, কাজকর্মেও এক ধরনের স্থবিরতা চলে এসেছে। সর্বদা বিষণ্ন ভাব। চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে পারলেন, তিনি হাইপোথাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন।

রাসেল এবার পঁচিশে পা দিলেন। অফুরন্ত যৌবনশক্তি নিয়ে যে বয়সে জীবনকে উপভোগ করার কথা, সেই বয়সে রাসেলকে বেশির ভাগ সময় ঘরে বসে কাটাতে হয়। পেটে ক্ষুধা আছে, তার পরও ওজন কমে যাচ্ছে। সব সময় বুক ধড়ফড় করে। তাপ সহ্য হয় না। হাত-পা কাঁপে, মেজাজ সব সময় খিটখিটে থাকে। শরীরও সব সময় গরম থাকে। কেউ গায়ে হাত দিলে ভাববে জ্বর এসেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর চিকিৎসকরা জানালেন, তিনি হাইপোথাইরয়েডে আক্রান্ত।

 

থাইরয়েড কী?

থাইরয়েড হরমোন নিঃসৃত হয় থাইরয়েড নামের গ্রন্থি থেকে। এই গ্রন্থি গলার সামনের উঁচু হাড়ের পেছনের দিকে ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালিকে পেঁচিয়ে থাকে। এই গ্রন্থির কাজ হলো খাবারে যাওয়া আয়োডিনকে ব্যবহার করে থাইরয়েড হরমোন প্রস্তুত করা। ব্রেনের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে আসা সিগন্যালকে (টিএসএইচ) ব্যবহার করে থাইরক্সিন হরমোন (টি৪) প্রস্তুত করে এই থাইরয়েড গ্ল্যান্ড।

 

থাইরয়েড হরমোনের কাজ কী?

শর্করা, আমিষ, স্নেহজাতীয় খাবার খাওয়ার পর সেখান থেকে পাওয়া মূল অংশকে কাজে লাগিয়ে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও তাপ উৎপাদন করতে থাইরয়েড হরমোন ভূমিকা রাখে। দেহে এই থাইরয়েড হরমোন কম তৈরি হলে তাকে বলা হয় হাইপোথাইরয়ডিজম আর হরমোন বেশি তৈরি হলে তাকে বলা হয় হাইপারথাইরয়ডিজম। অর্থাৎ থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতাবিষয়ক সমস্যা দুই রকম হতে পারে।

 

হাইপোথাইরয়ডিজম

জেনেটিক কারণে, পিটুইটারি ফেইলিওর, কিছু বিশেষ ওষুধ, থাইরয়েডের প্রদাহ এবং বিশেষ করে আয়োডিনের অভাবে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তখন থাইরয়েড হরমোন (টি৩, টি৪) কম তৈরি হয়। থাইরয়েড হরমোনের অভাবে কোষগুলোতে স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তি, বিশেষ করে নারীদের হাইপোথাইরয়েডের প্রবণতা একটু বেশি দেখা যায়। গ্রামের চেয়ে শহরাঞ্চলে এই রোগের হার বেশি। তবে সেটা খাদ্যাভ্যাসের কারণে, নাকি পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে তা এখনো জানা যায়নি।

 

হাইপোথাইরয়েডের উপসর্গ

♦  ওজন বেড়ে যাওয়া।

♦   ঠাণ্ডা সহ্য না হওয়া।

♦   শারীরিক দুর্বলতা।

♦   পায়ে পানি আসা।

♦   সন্তান ধারণে সাময়িক অক্ষমতা।

♦   শরীরে সব সময় ব্যথা ব্যথা ভাব।

♦   মানসিক বিষণ্নতায় ভোগা ইত্যাদি।

♦   ক্ষুধামান্দ্য।

♦   ত্বক খসখসে হয়ে যাওয়া।

♦  স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া।

♦   শরীরে শীত শীত ভাব।

♦   অনিয়মিত পিরিয়ড, অতিরিক্ত রক্ত যাওয়া ইত্যাদি।

 

হাইপোথাইরয়েডিজমের উপসর্গ

এ ক্ষেত্রে থাইরয়েড হরমোন বেশি নিঃসৃত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির প্রধান অভিযোগ হলো—

♦   ক্ষুধা স্বাভাবিক কিন্তু ওজন কমে যাওয়া।

♦   হাত-পা কাঁপা।

♦   বুক ধড়ফড় করা।

♦  গরম সহ্য না হওয়া।

♦   চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া।

♦   ডায়রিয়া।

♦   মেজাজ সব সময় খিটখিটে থাকা।

♦   অতিরিক্ত ঘাম দেওয়া।

♦   শরীরে গরম অনুভব।

♦   ব্লাডপ্রেসার বেড়ে যাওয়া।

♦   অস্থিসন্ধিতে ব্যথা।

♦   মাসিকের সমস্যা।

♦   গর্ভপাত ইত্যাদি।

 

জটিলতা

থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যায় সঠিক চিকিৎসা না নিলে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন—

থাইরয়েড ক্যান্সার : অনেকের ক্ষেত্রে গলা কম সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত ফুলে যায় এবং সেখান থেকে ভবিষ্যতে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক নিশ্চিত হয়ে অপারেশনের পরামর্শও দিয়ে থাকেন। যাদের পরিবারে থাইরয়েড ক্যান্সারের ইতিহাস আছে, তাদের সতর্ক হওয়া উচিত। গলায় ছোট একটি নোডিউল যদি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

গর্ভাবস্থা ও শিশুদের ক্ষেত্রে : বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ এই হাইপার বা হাইপোথাইরয়ডিজম। আবার গর্ভাবস্থায় মায়ের হাইপোথাইরয়ডিজম যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে সে ক্ষেত্রে অনাগত শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। শিশুদের হাইপোথাইরয়ডিজম হয়। সম্ভব হলে জন্মের পর সব শিশুর TSH পরীক্ষা করে দেখা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে, কোনো শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যদি বয়স অনুযায়ী না হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

 

পরীক্ষা

থাইরয়েড গ্রন্থি ও হরমোনের বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়—

♦   রক্তে হরমোনের মাত্রা

♦   আল্ট্রাসনোগ্রাম

♦   রেডিও-অ্যাকটিভ আয়োডিন আপটেক ও স্ক্যানটেস্ট

♦   এফএনএসি ইত্যাদি।

 

চিকিৎসা

হাইপো বা হাইপার দুই থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতারই চিকিৎসা রয়েছে। তাই কারো এই ধরনের উপসর্গ থাকলে অহেতুক ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। হরমোন বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনে এই সমস্যাগুলো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হয় বা ক্ষেত্রবিশেষে রোগটিই সম্পূর্ণ নিরাময় হয়ে যায়।

 

থাইরয়েডজনিত সমস্যায় সব সময় যে লক্ষণ প্রকাশ পাবে, বিষয়টি এমন নয়। উপসর্গ না থেকেও থাইরয়েডজনিত সমস্যা থাকতে পারে, যাকে বলে ‘সাব-ক্লিনিক্যাল কন্ডিশন’। তখন শুধু পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে হয়। তবে উপরোক্ত লক্ষণগুলো থাকলে, বিশেষ করে দ্রুত ওজন বেড়ে যাচ্ছে—এমন মনে হলে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড সুস্থ আছে কি না তা জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শরীরের অতি প্রয়োজনীয় থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আয়োডিন। সেদিকটিও খেয়াল রাখতে হবে।

 

অনুলিখন : ডা. মোস্তাফিজুর রহমান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা