kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

‘গ্রামে ডেঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা কম’

১১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘গ্রামে ডেঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা কম’

♦ শিশু, গর্ভবতী, বয়স্ক ব্যক্তি, কিডনি, হৃদরোগীদের ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া উচিত।

 

♦ ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার নেই বললেই চলে। সঠিকভাবে চিকিৎসা করালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শতভাগ রোগী সুস্থ হয়ে যায়।

 

♦ এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগ ছাড়াও ইয়েলো ফিভার, জিকা, চিকুনগুনিয়াও হতে পারে।

 

♦ জ্বর সেরে গেলেও কিছুদিন পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে হবে ও প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খেতে হবে। এ ছাড়া রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করে হিমোগ্লোবিন কত, প্লাটিলেট কত, ব্লাড সুগার কত, ব্লাড প্রেসার বা রক্তচাপ ঠিক আছে কি না, রোগী পানিশূন্যতায় ভুগছে কি না, রক্তের পিসিভি বা হেমাটোক্রিট কেমন ইত্যাদি দেখা উচিত।

 

প্রশ্ন : জ্বর ছাড়াও কি ডেঙ্গু হতে পারে? হাত ও পায়ের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা থাকা কি এর উপসর্গ?

উত্তর : সংক্রমিত এডিস মশা কামড়ানোর চার থেকে সাত দিন পর সাধারণত লক্ষণগুলো দেখা দেয়। হালকা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে কিছু মানুষের বিশেষ করে শিশু-কিশোররা কোনো লক্ষণ বা তীব্র জ্বর অনুভব না-ও করতে পারে।

হাত-পায়ের জয়েন্টে ব্যথা ছাড়া আরো অনেক কিছুই ডেঙ্গুর উপসর্গ; কিন্তু এখন তেমন কোনো উপসর্গ ছাড়াই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে

 

প্রশ্ন : জ্বর হলেই কি হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে?

উত্তর : জ্বর হলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ারও দরকার নেই। বাড়িতে রেখে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন, প্রচুর তরল গ্রহণ আর বিশ্রামই এর মূল চিকিৎসা। তবে শিশু, গর্ভবতী, বয়স্ক ব্যক্তি, কিডনি, হৃদরোগীদের ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া উচিত। আবার বিশেষ কিছু লক্ষণ দেখা দিলেও হাসপাতালে রাখা উচিত।

 

প্রশ্ন : কখন রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে?

উত্তর : নিজে নিজে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দরকার নেই। কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে কি না এটা জানতে জ্বর আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা এনএস১ এন্টিজেন পরীক্ষাটি করাতে বলি এবং সেটা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মতে।

 

প্রশ্ন : এনএস১ রিপোর্ট কত দিন পর্যন্ত পজিটিভ আসে?

উত্তর : এনএস১ প্রথম দিন নেগেটিভ আসে। দ্বিতীয় দিন নেগেটিভ আসার পরিমাণ কিছুটা কমে যায়, তৃতীয় দিন আরো কমে যায়। চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে কিন্তু এই পরীক্ষা করে তেমন কোনো লাভ হয় না। এই পরীক্ষাটি করাতে হবে জ্বর আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বা তিন দিনের মধ্যে। অনেকে চার-পাঁচ দিন পর এনএস১ পরীক্ষা করে বলেন, আমার ডেঙ্গু নেই—এটা কিন্তু ঠিক নয়।

 

প্রশ্ন : ডেঙ্গু ছাড়াও এই মুহূর্তে চিকুনগুনিয়া বা অন্যান্য রোগী পাচ্ছেন কেমন? জ্বর হলে কেউ কি আরটি পিসিআর পরীক্ষাটি করবে?

উত্তর : ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য জ্বর ও চিকুনগুনিয়ার রোগীও পাওয়া যাচ্ছে, তবে খুব কম। এ সময়টায় ডেঙ্গুর রোগীই বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রতিবছর বর্ষার এই সময়টায় ডেঙ্গু রোগী একটু বেশিই থাকে।

চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে কিছু উপসর্গ থাকে এবং চিকিৎসক যদি মনে করেন, তবে আরটি পিসিআর পরীক্ষা করাতে পরামর্শ দিতে পারেন।

 

প্রশ্ন : কারো ডেঙ্গু হতে যাচ্ছে কি না সেটা আগে থেকেই বোঝার কোনো উপায় আছে কি না অথবা সে অনুযায়ী আগেভাগে সতর্কতা গ্রহণ করার কোনো সুযোগ আছে কি না?

উত্তর : না। কারো ডেঙ্গু হতে যাচ্ছে কি না তা আগে থেকে সেভাবে বোঝার কোনো উপায় নেই। তবে জ্বর আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এনএস১ এন্টিজেন পরীক্ষাটি করালে প্রথম দিনই ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।

 

প্রশ্ন : অনেকে বলছেন, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় রক্তরোগ, হৃদরোগ, লিভার, কিডনি ইত্যাদি চিকিৎসকদের নিয়ে সমন্বিতভাবে হওয়া দরকার—আপনি কী মনে করেন?

উত্তর : জটিলতা তৈরি না হলে সমন্বিত চিকিৎসার তেমন দরকার হয় না। আর জটিলতা হয় খুব কমসংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে, যারা বিলম্বে চিকিৎসকদের কাছে আসে এবং রোগটিকে অবহেলা করে।

 

প্রশ্ন : ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার আসলে কত?

উত্তর : ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার নেই বললেই চলে। সঠিকভাবে চিকিৎসা করালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১০০ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে যায়। যদিও বলা হয়, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে মৃত্যুহার পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ; কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই হার ১ শতাংশেরও কম। মৃত্যুঝুঁকি তাদেরই বেশি, যারা শুরুতে অবহেলা করে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেয় না।

 

প্রশ্ন : ডেঙ্গু আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য কী পরামর্শ?

উত্তর : অন্যদের তুলনায় শারীরিক অবস্থা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নাজুক হওয়ায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় অন্তঃসত্ত্বা নারীরা বেশ ঝুঁকিতে থাকেন। তাঁরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। অভিজ্ঞ মেডিসিন ও গাইনি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে তাঁদের সমন্বিত চিকিৎসা করা জরুরি।

 

প্রশ্ন : জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টা নাকি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

উত্তর : কারো ডেঙ্গু হলে তা সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় দিন পর্যন্ত থাকে। তবে জ্বর চলে যাওয়ার পরের সময়টাকে ‘ক্রিটিক্যাল ফেইস’ বা ঝুঁকিপূর্ণ সময় ধরা হয়। ডেঙ্গুতে মারাত্মক সমস্যা হওয়ার সময় আসলে এটাই। এ সময় প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যেতে পারে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে, রক্তক্ষরণসহ আরো নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই এ সময়টায়ই সচেতন থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জ্বর সেরে গেলেও কিছুদিন পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে হবে ও প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খেতে হবে। এ ছাড়া রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করে হিমোগ্লোবিন কত, প্লাটিলেট কত, ব্লাড সুগার কত, ব্লাড প্রেসার বা রক্তচাপ ঠিক আছে কি না, রোগী পানিশূন্যতায় ভুগছে কি না, রক্তের পিসিভি বা হেমাটোক্রিট কেমন ইত্যাদি দেখা উচিত। 

 

প্রশ্ন : ঢাকা বা অন্যান্য শহর থেকে ঈদে যাঁরা গ্রামে যাবেন, তাঁদের ব্যাপারে পরামর্শ কী?

উত্তর : প্রথমত, যিনি এখন জ্বরে আক্রান্ত, তাঁর গ্রামে না যাওয়াই ভালো। কেননা সেখানে গিয়ে সমস্যা বাড়লে বিপদ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, যাঁর জ্বর হয়েছিল এখন ভালো হয়ে গেছে, তিনি গ্রামে যেতে পারবেন, তাতে তেমন সমস্যা নেই। তৃতীয়ত, যাঁরা গ্রামে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁরা সেখানে যথাযথ চিকিৎসা নেবেন, মশারির নিচে অবস্থান করবেন এবং পরিপূর্ণ বিশ্রাম নেবেন।

 

প্রশ্ন : গ্রামে গিয়ে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তার দ্বারা কি অন্য কেউ আক্রান্ত হতে পারে?

উত্তর : গ্রামে ডেঙ্গু বিস্তারের কোনো খবর এখনো জানা যায়নি। এডিস মশার বাস মূলত শহরকেন্দ্রিক, সেটা ঢাকা শহর হোক বা জেলা শহর হোক। সারা দেশে যতটুকু ছড়িয়ে গেছে বলা হচ্ছে, আসলে তা শহরে, গ্রামে নয়। সুতরাং গ্রামে গিয়ে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও তার দ্বারা অন্য কারোর আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম।

 

প্রশ্ন : কেউ ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে ঢাকার বাইরে গেল, সেখানে এডিস মশা না থাকলেও ডেঙ্গু ছড়াবে কি না?

উত্তর : জীবাণুবাহী এডিস মশা ছাড়া কিউলেক্স বা অন্য মশা কাউকে কামড়ালে ডেঙ্গু হয় না। কিছু ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে এ ধরনের আশঙ্কা করা হয়, যেকোনো মশা যখন কামড়ায়, তার মুখে ওই রক্তটা থাকে, তাই জীবাণু ছড়াতে পারে। এটা কিন্তু প্রমাণিত সত্য নয়।

 

প্রশ্ন : যারা দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, তাদের জন্য এটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

উত্তর : ডেঙ্গুর পাঁচটি সেরোটাইপ রয়েছে। একবার কারো ডেঙ্গু হলে তার আরো বাকি চারবার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বার বা পরবর্তীবার ডেঙ্গু হওয়া অবশ্যই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অ্যান্টিবডি পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়, তিনি প্রথমবার বা দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হয়েছেন কি না। দ্বিতীয়বার আক্রান্তদের উচিত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া।  

 

প্রশ্ন : ডেঙ্গু ধরা না পড়া সত্ত্বেও প্রাক-সতর্কতাস্বরূপ দৈনিক দুই লিটার করে স্যালাইনের পানি আর একটি করে ডাব খেতে থাকলে কি তা প্লাটিলেট কমে যাওয়া ঠেকানো যাবে?

উত্তর : এসবের কোনো ভিত্তি নেই।

 

প্রশ্ন : হৃদরোগীদের ডেঙ্গু হলে এসপিরিন, ইকোস্প্রিন, ক্লপিড ইত্যাদি ওষুধ কত দিন বন্ধ রাখতে হয়? এসব রোগীর মৃত্যুঝুঁকি কেমন?

উত্তর : হৃদরোগীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত পাতলা করার ওষুধ, এমনকি উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট ফেইল্যুরের ওষুধও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়। কিন্তু যখন রোগী সুস্থতার দিকে যায় এবং রক্তের অণুচক্রিকা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে, তখন আবার সেসব ওষুধ চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। হৃদরোগীদের ডেঙ্গু হলে হাসপাতালে ভর্তি রেখে সঠিকভাবে চিকিৎসা করালে তারা পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।

 

প্রশ্ন : এডিস মশা কামড়ালে গরুর-ছাগলেরও ডেঙ্গু হতে পারে কি না?

উত্তর : স্ত্রী প্রজাতির এডিস মশা যখন গর্ভবতী হয় বা ডিম পাড়ার সময় হয়, তখন তাদের রক্তের দরকার হয়। তখন তারা মূলত মানুষের রক্ত শুষে নিতে বেশি পছন্দ করে। গরু, ছাগলেরও রক্ত তারা খায়; কিন্তু ডেঙ্গু হয় কি না সে রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

প্রশ্ন : এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছাড়া আর কোন কোন রোগ হতে পারে?

উত্তর : এডিস ইজিপটি স্ত্রী প্রজাতির মশা হলো ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক। এই প্রজাতির মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগ ছাড়াও ইয়েলো ফিভার, জিকা, চিকুনগুনিয়াও হতে পারে।

মন্তব্য