kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

নারীর ঝুঁকি : অস্টিওপোরোসিস

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নারীর ঝুঁকি : অস্টিওপোরোসিস

অস্টিওপোরোসিস হলো এমন একটা অবস্থা, যাতে হাড়ের ক্যালসিয়ামের ঘনত্ব বা পরিমাণ কমে স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয় ও হাড় ভঙ্গুর হয়। একপর্যায়ে কোমরের হাড়, মেরুদণ্ড ও হাতের কবজির হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তবে আগেভাগে সতর্ক ব্যবস্থা নিলে অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ করা যায়। পরামর্শ দিয়েছেন ল্যাবএইড হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ ও আর্থোপ্লাস্টি সেন্টারের চিফ কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এম. আমজাদ হোসেন

 

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে নারীদের মেনোপজ-পরবর্তী সময়ে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। পুরুষের তুলনায় নারীদের এ রোগে আক্রান্তের হার বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে ৩০ বছরের পর থেকেই এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রতি তিনজন নারীর একজন এই হাড় ক্ষয় বা ভাঙার শিকার হয়। কায়িক শ্রম না করায় গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষের এই রোগ বেশি হয়।

 

কারণ

অস্টিওপোরোসিস হওয়ার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। শৈশবে হাড় গঠনের সময় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ ছাড়া হাড় গঠনে কিছুটা পারিবারিক প্রভাবও রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে ব্যায়ামের অভ্যাস ও দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম গ্রহণের ওপরও হাড়ের গঠন অনেকাংশে নির্ভর করে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগ ও কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিস হতে পারে।

 

উপসর্গ

অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয় একটি নীরব ঘাতক। তেমন কোনো উপসর্গ ছাড়াই মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। প্রাথমিক ধাপে এর কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় না; বরং হাড় ভাঙার মাধ্যমেই এর উপস্থিতি প্রথমবারের মতো টের পাওয়া যায়। এই রোগে রোগীর অস্থি বা হাড়ের ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি পায় এবং হারের পুরুত্ব কমে যায়, পেশিশক্তি হ্রাস পায়, পিঠের পেছন দিকের অস্থিতে ব্যথা অনুভব হয়, হিপ, কোমর ও মেরুদণ্ডে ক্ষয় দেখা দেয় ইত্যাদি। 

আবার হাড়ের ব্যথা বা অল্প আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়াও হতে পারে অস্টিওপোরোসিসের প্রথম লক্ষণ। মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙার ফলে কোমরে হাড়ের গঠনগত ত্রুটি, শরীরের উচ্চতা কমে যাওয়া, এমনকি মেরুদণ্ডের ভেতরে অবস্থিত স্নায়ুর ওপর চাপের প্রভাবে তীব্র ব্যথাও অনুভূত হতে পারে।

 

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

হাড়ের সাধারণ এক্স-রের মাধ্যমে অস্টিওপোরোসিস ধারণা করা গেলেও সঠিক অবস্থা শনাক্ত করা কঠিন। এ জন্য হাড় ভাঙার আগেই সঠিক সময়ে অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত করার জন্য বোন মিনারেল ডেনসিটি (বিএমডি) পরীক্ষাটি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সাধারণত কোমর বা মেরুদণ্ডের হাড়ের ডিস্ক স্ক্যানের মাধ্যমে হাড়ের এই ঘনত্ব নিরূপণ করা হয়। এ ছাড়া রক্তের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমেও (বোন টার্নওভার মার্কার) অস্টিওপোরোসিসজনিত হাড় ভাঙার ঝুঁকি মাপা হয়ে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত বিএমডির মাত্রাগুলো হলো—

স্বাভাবিক : T score -1 SD-এর সমান বা ওপরে (পজিটিভ)।

অস্টিওপেনিয়া :  T score-1 SD থেকে 2.5 SD।

অস্টিওপোরোসিস : T score-2.5 SD থেকে কম (নেগেটিভ)।

এই ছকটি মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের জন্য প্রযোজ্য। পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদের অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি ৫.১ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩.১ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ-পরবর্তী হরমোনের ইমব্যালান্সের (ইসট্রোজেন, প্রজেস্টেরন) কারণে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বেশি হয়ে থাকে।

 

চিকিৎসা

অস্টিওপোরোসিস চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমানো। হাড় ক্ষয় হ্রাস ও পূরণে প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্টারি, ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি কিছু শারীরিক ব্যায়ামও করতে হয়। এতে কিছু ক্ষেত্রে হাড় ক্ষয়ের হার তুলনামূলকভাবে ধীরে ঘটে এবং কিছু ক্ষেত্রে হাড় পুনর্গঠন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক মাত্রায় ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট (যেমন : খধনপধষ উ) গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিসফসফোনেট, ইবানড্রোনিক এসিড, জোলেনড্রোনিক এসিডজাতীয় ওষুধ বেশ কার্যকর।

কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে খুব সাবধানে চলাফেরা করুন ও চিকিৎসকের পরামর্শে চলুন। জাম্পিং বা দৌড়াদৌড়ি করা একেবারে ঠিক হবে না। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক ওজন বা ভার উত্তোলন, লো-ইমপ্যাক্ট ড্যান্সিং, এরোবিক্স বা অন্য কিছু ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করে এই রোগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। যারা এই রোগে আক্রান্ত, তাদের জন্য সাইক্লিং, ক্লাইম্বিং স্টিয়ারিং (সিঁড়ি মাড়ানো), নাচ, হাইকিং, জগিং, জাম্পিং রোপ (দড়ি লাফ), স্টেপ এরোবিক্স, টেনিস ইত্যাদি বেশ কার্যকর, তবে তা চিকিৎসকের তত্ত্ব্বাবধানে দেহের অবস্থা বুঝে করতে হবে। 

 

প্রতিরোধে করণীয়

আশার বিষয় যে অস্টিওপোরোসিস এখন একটি প্রতিরোধ ও নিরাময়যোগ্য রোগ। নিয়মিত জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে হাড় ক্ষয়ের পরিমাণ কিছুটা হলেও কম হতে পারে। মনে রাখতে হবে, হাড় ক্ষয়, পূরণ ও বৃদ্ধি একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে মন খারাপ না করে বরং সাহস সঞ্চয় করতে হবে। মনে করতে হবে, এটা কোনো রোগ নয় এবং জীবনই গতি, গতিই জীবন। অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধের কিছু ধাপ হলো—

 

সঠিক খাদ্যাভ্যাস : অস্টিওপোরোসিস রোগীদের দুধ, দধি, পনির, সয়াবিন, বাদাম, ফরটিফায়েড আটার তৈরি খাবার, ঋতুকালীন সবুজ শাকসবজি, লেটুস, ব্রকলি, মাশরুমজাতীয় খাবার, মাছ, পর্যাপ্ত প্রোটিনজাতীয় খাদ্য, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ‘ডি’ ও ‘কে’ গ্রহণ, কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ, ওমেগা-৩ জাতীয় খাদ্য, প্রচুর পরিমাণ ম্যাগনেশিয়াম ও জিংক গ্রহণ, খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়ামজাতীয় খাবার যুক্ত করা খুব জরুরি। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ভিটামিন ‘ডি’ ও ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করতে সাপ্লিমেন্টারি গ্রহণ করার কথাও বলা হয়।

পাশাপাশি লো-ক্যালরিসমৃদ্ধ খাদ্যদ্রব্য বর্জনসহ অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও বোতলজাত কোমল পানীয় কিংবা কার্বোনেটেড পানীয় বর্জন, পরিবর্তে নন-কোলা, আদা-পানি, লেবু পানি গ্রহণ করা যেতে পারে।

 

ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ : সূর্যের আলো হচ্ছে ভিটামিন ডির উত্কৃষ্ট উৎস। এ ছাড়া তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুমেও কিছু পরিমাণ ভিটামিন ‘ডি’ রয়েছে। এসব খাদ্যে বেশি কোলেস্টেরল থাকায় এটা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি গ্রহণ করা উচিত নয়। ভিটামিন ‘ডি’ পেতে হলে সূর্যরশ্মিই  হচ্ছে প্রধান উৎস।

 

ক্যালসিয়াম : দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদা বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রকম থাকে। গড়ে তিন বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন ৫০০ মিলিগ্রাম, চার থেকে আট বছর পর্যন্ত ৮০০ মিলিগ্রাম, ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সে এক হাজার ৩০০ মিলিগ্রাম, ১৯ থেকে ৫০ বছরে ১০০০ মিলিগ্রাম এবং ৫১ বছর বা তদূর্ধ্বে এক হাজার ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম খাবার থেকে গ্রহণ করা উচিত। দুধ ছাড়াও বাদাম, শাকসবজি, হাড়সহ ছোট মাছে প্রচুর ক্যালসিয়াম রয়েছে।

 

সঠিক ব্যায়াম : অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার আগেই নিজের প্রতি যত্নবান হোন। এখন থেকেই শারীরিক কার্যক্রম বাড়িয়ে দিন। সব সময় খেয়াল রাখুন, যাতে শরীরের ওজন না বাড়ে। নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের মাধ্যমেও সুস্থ হাড় পাওয়া সম্ভব। ব্যায়াম শুরু করার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। যত তাড়াতাড়ি ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা যাবে, ততই এর উপকারিতা বেশি। ওজনবাহী ব্যায়ামগুলোই অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধের জন্য বেশি উপযোগী। শারীরিক পরিশ্রম যেমন—সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, নিয়মিত হাঁটা, সম্ভব হলে জিমে যাওয়া উচিত। প্রতিটি স্কুল-কলেজে খোলাধুলার জন্য ব্যবস্থা রাখলে কোমলমতি শিশুরা ছোট থেকে খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের শরীর ফিট রাখতে পারে, যাতে হাড় ও মাংসপেশি শক্তিশালী হয়। 

বর্জন করুন : ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করুন। তামাক, জর্দা, ফাস্ট ফুড, পানীয়, চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।

অনুলিখন : ফারিয়া মৌ

মন্তব্য