kalerkantho

শনিবার। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৫ ডিসেম্বর ২০২০। ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২

কিশোর গ্যাংগুলো ফের বেপরোয়া

সাত দিনে দুই কিশোরকে ছুরি মেরে হত্যা ♦ ধরা পড়েনি আরিফ খুনের ১০ আসামি

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘আমার কী অপরাধ? কেন মারছ আমাকে?’ এরপর আর কথা বলতে পারেনি আরিফ মিয়া (১৪)। গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল এই কিশোরের বুকে ছুরি মেরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দশজনকে আসামি করে শাহবাগ থানায় একটি মামলা হয়েছে। তবে গত দুই দিনেও কোনো গ্রেপ্তার নেই। এই ঘটনার সাত দিন আগে পুরান ঢাকার চকবাজারে একইভাবে ছুরি মেরে হত্যা করা হয় সিজান ওরফে বক্সার (১৬) নামে অন্য এক কিশোরকে।

কেবল রাজধানীর এ দুটি ঘটনাই নয়, গত কয়েক মাসে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সের বেপরোয়া কিশোর-তরুণদের হাতে আরো বেশ কিছু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনার জন্য সামাজিক অস্থিরতাকে দায়ী করছে পুলিশ। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর নজরদারি ও পারিবারিক অনুশাসনের অভাবে এমন অপরাধের মাত্রা যেন ক্রমেই বাড়ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানায়, এর আগে রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, তেজগাঁওসহ আরো কয়েকটি এলাকায় কিশোর ও তরুণ গ্যাংগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে অন্তত ১৪ কিশোর খুন হয়। তাদের বেশির ভাগ বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র। ওই সব ঘটনা তদন্তে অনেক আসামি গ্রেপ্তারও হয়েছে। এর পরও এ ধরনের অপরাধ কমছে না।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এর আগে এক সেমিনারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, কিশোর তরুণরা পরিবারের উদাসীনতা আর সামাজিক অস্থিরতার কারণে নানা অপরাধ এমনকি খুনের ঘটনায়ও জড়িয়ে পড়ছে। পরিবারের উচিত সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা। সব কিছু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিলেই চলবে না।

আরিফ হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী সানি নামের অন্য এক কিশোরের ভাষ্য, “আরিফের কোনো দোষ ছিল না। আমরা একসঙ্গে ক্রিকেট খেলে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দোয়েল চত্বরের সামনে চারজন আরিফকে পেছনে ল্যাং মেরে ফেলে দেয়। ‘আমার কী অপরাধ, আমাকে মারছ কেন?’ আরিফ এ কথা বলার পর আরো ছয়জন এসে আরিফকে মারতে থাকে। আরিফ চিৎকার করতে থাকলে ওরা ওর বুকে ছুরি মেরে পালিয়ে যায়।”

নিহত আরিফের বাবার নাম হেলাল মিয়া। দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল ছোট। গতকাল শনিবার বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। এরপর গ্রামের বাড়ি নিয়ে লাশ দাফন করা হয়। বড় ভাই আওলাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আরিফ ঘটনার দুই দিন আগে ভৈরবের কালিপ্রসাদ গ্রাম থেকে ঢাকায় আসে। দশম শ্রেণিতে গ্রামের স্কুলে ভর্তি হলেও অনটনের কারণে আর লেখাপড়া করা হয়নি। বাবা দশ বছর ধরে শারীরিক প্রতিবন্ধী (প্যারালাইজড)। মা অন্যের বাসায় কাজ করেন। গত ১২ মার্চ ঢাকায় এসেই নাজিমউদ্দিন রোডে জুতার দোকানে কাজে যোগ দেয়। পরদিন শুক্রবার বিকেলে কারখানার অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে হাইকোর্ট মাঠে ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে কোনো কারণ ছাড়াই সন্ত্রাসীরা আমার ভাইকে ছুরি মেরে হত্যা করেছে। আমি ওই খুনিদের বিচার চাই।’

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ‘আরিফকে হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, ওকে কোনো কারণ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে। পুরো ঘটনার তদন্ত চলছে।’

এই ঘটনার সাত দিন আগে পুরান ঢাকার চকবাজারে খুন হয় সিজান ওরফে বক্সার। ওই ঘটনায় মোহাম্মদ ইমন ও মুন্না মিয়া নামের সমবয়সী দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বক্সারও সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় খুন হয়।

পিবিআইয়ের এসপি আবুল কালাম আজাদ গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, গত ৭ মার্চ হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের দায়ের করা মামলায় (ছায়া) তদন্ত করতে গিয়ে গত সোমবার গভীর রাতে কক্সবাজারে লাইট হাউস এলাকা থেকে সন্দেহভাজন আসামি ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুন্না মিয়া নামের আরেকজনকে ওই রাতেই রাজধানীর বংশাল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই সঙ্গে তাদের তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয় সিজান হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাকু।

প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসপি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পুরান ঢাকার বংশাল ও চকবাজার থানার সুরিটোলা, চানখাঁরপুল ও মালিটোলা এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাঁচটি সিনিয়র-জুনিয়র গ্রুপ সক্রিয়। এগুলোর

একটি ইমন সমর্থিত, আরেকটি সিজান সমর্থিত। ওই বিরোধের জের ধরেই বক্সারকে হত্যা করা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা