kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

ই-বর্জ্য : নগরবাসীর ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে

নিখিল ভদ্র   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ই-বর্জ্য : নগরবাসীর ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে

দেশে ই-বর্জ্যের রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় প্রায় ৫০ হাজার শিশু জড়িত। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের ৬নং রোডে মৃতপ্রায় খালের ধারে পাঁচ থেকে আট বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের জটলা। আশপাশে মাঠ নেই, তাই সেখানেই তাদের খেলার জায়গা। খেলার কোনো সরঞ্জাম নেই। তারা খেলছে পুরনো কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ নিয়ে। মাঝে মধ্যে অকেজো মোবাইল সেট দিয়ে সেলফিও তুলছে! অথচ তাদের কেউ জানে না, এটা তাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যার কারণে অনেকে প্রতিবন্ধিতার শিকার হতে পারে। বিষয়টি তারা কেন, তাদের মা-বাবাও জানেন না। যে কারণে এ ধরনের অসংখ্য পুরনো ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম (ই-বর্জ্য) খালের পাশ দিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি, টেলিভিশন, কম্পিউটারের মনিটর ও যন্ত্রাংশ, ল্যাপটপ, ল্যাপটপের ব্যাটারি ও চার্জার কেবল, প্রিন্টার ও প্রিন্টারের টোনারসহ বিচিত্র ধরনের ইলেকট্রনিক খেলনা এখন আধুনিক মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য যন্ত্রপাতি। এসব পণ্য ব্যবহারকালে একসময় নষ্ট হয়ে যায়। পরিত্যক্ত জিনিসের ভ্রাম্যমাণ ক্রেতা তথা ভাঙাড়ির কাছে এগুলো বিক্রি করা হয়। আবার বাড়ির আশপাশেও ফেলে দেওয়া হয়। এসব বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোনো ডাস্টবিন কিংবা ভাগাড় নেই। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে এ দেশের ব্যবহারকারীদের ধারণা ও সচেতনতা খুবই সীমিত।

তবে ইতিমধ্যে সচেতনতার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘রাজধানীতে ২০১৬ সালে এক লাখ ৪২ হাজার মেট্রিক টন ই-বর্জ্য বের হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ মোবাইলের ই-বর্জ্যও রয়েছে। যা আগামী ২০২১ সালে প্রায় এক হাজার ১৭০ টনে পৌঁছবে।’ বেসরকারি সংস্থা এনভাইরনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে ই-ওয়েস্ট তৈরি হচ্ছে প্রায় তিন মিলিয়ন মেট্রিক টন। ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাড়ছে এসব পণ্যের বর্জ্যও। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে এ বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হারে বেড়েছে।

ইএসডিওর তথ্যানুযায়ী, ই-ওয়েস্টের ট্র্যাডিশনাল এ ব্যবস্থাপনায় শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে যেসব শিশু রিসাইকেল প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ই-ওয়েস্ট রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় প্রায় ৫০ হাজার শিশু জড়িত রয়েছে। তাদের প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু ব্রেইন, কিডনি, ফুসফুস ড্যামেজ, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক বিষণ্নতা, নার্ভ সিস্টেমের দুর্বলতা, শ্রবণশক্তি হ্রাস, পঙ্গুত্বসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যাদের মধ্যে থেকে বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু মারা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ই-বর্জ্য একটা বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠছে, যা সমাধানের লক্ষ্যে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ই-বর্জ্যরে কারণে ঘটছে জলবায়ুর পরিবর্তন। এটা বিশ্বব্যাপীই ঘটছে। এই বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি। এসব যন্ত্রপাতিতে মানবস্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের বহু ক্ষতিকর উপাদান থাকে। উন্নত দেশগুলো ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে পারলেও বাংলাদেশ এখনো তা কোনো ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে পারেনি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ই-বর্জ্যকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সচেষ্ট। এ জন্য একটি খসড়া নীতিমালাও তারা প্রণয়ন করেছে। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য ওই নীতিমালায় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, ‘দিনে দিনে ই-বর্জ্য কমানো যাবে না, আমাদের ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল পণ্যের ব্যবহার আরো বাড়বে। পুরনো প্রযুক্তি বাদ দিয়ে নতুন প্রযুক্তিতে যেতে হবে। ই-বর্জ্য সম্পদে রূপান্তর করে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো নজির স্থাপন করেছে। আমরাও সে পথে চলতে পারি।’

টিআরএনবির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ই-বর্জ্যের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে বলেন, ‘ই-বর্জ্যের মধ্যে অনেক বিষাক্ত পদার্থ ও রাসায়নিক যৌগ আছে, যা রোদে এবং তাপে নানাভাবে বিক্রিয়া করে। অনেক সময় রোদে ফেলে দেওয়া ‘ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট’ (আইসি) থেকে নির্গত হয় ক্ষতিকর বিকিরণ। এই ই-বর্জ্য পানিতে ফেলে দিলে ও মাটিতে পুঁতে রেখে দেওয়ার পরও বিষাক্ত থাবা বন্ধ থাকে না। ই-বর্জ্য অটিজম ও মানসিক বিকাশ না হওয়ার অন্যতম কারণ।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বলেন, ‘ই-বর্জ্যের ভয়াবহতা মারাত্মক। যে পরিমাণ টাকা দিয়ে ডিভাইস কিনি, তার দ্বিগুণ পরিমাণ টাকা দিয়েও ব্যবস্থাপনা করা যাবে না। বিটিআরসির সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল দুর্গম এলাকায় টেলিকম সেবা দেওয়ার জন্য বলা আছে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে এই তহবিলের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য আইনের সংশোধন প্রয়োজন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা