kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

আমার সারা জীবনই তারকা হয়ে থাকতে হলো

রুনা লায়লা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উপমহাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী তিনি। স্বাধীনতার পর থেকেই ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ঢাকার যাপিত জীবনের স্মৃতি-বিস্মৃতির নানা দিক নিয়ে বলেছেন তিনি। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমার সারা জীবনই তারকা হয়ে থাকতে হলো

জন্ম সিলেটে। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ ইমদাদ আলী কাস্টমসে চাকরি করতেন। যখন মাত্র কয়েক মাস বয়স, রুনা লায়লার বাবা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের মুলতানে চলে যান। সেই থেকে অনেক বছর সেখানেই ছিলেন। সে সূত্রে তাঁর শৈশব কাটে পাকিস্তানের লাহোরে। তাঁর সংগীত জগতে পরিচিতি শুরু পাকিস্তান থেকেই। স্বাধীনতার পরে সপরিবারে দেশে চলে আসেন। ঢাকার সেই সময়ের দিনগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি ছিল। তার পরও আমরা কখনো দেশে থাকিনি। খুব একটা আসতামও না। বছরে হয়তো একবার এসে আত্মীয়-স্বজনের কাছে বেড়িয়ে চলে যেতাম। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের শহরগুলোর অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো ছিল। ওখানেই সবাই থাকার চেষ্টা করত; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে আমার দেশ পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের আগেই আব্বা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশে চলে আসবেন। তখন আমাদের পুরো পরিবারের মধ্যেই দেশে ফেরার আকুলতা তৈরি হলো। একাত্তরে যখন গণহত্যা শুরু হলো, কেন জানি ভেতরে দেশের জন্য অন্য রকম ভালোবাসা, আকুলতা কাজ করতে লাগল। কিছু ছবির কাজ বাকি ছিল, সেগুলো শেষ করে আসতে সময় লেগেছে। তবে হ্যাঁ, এটাও ঠিক, সেখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আমাকে রাখার জন্য খুব চেষ্টা করেছে, তার পরও নিজের দেশে চলে এসেছি। কারণ এ দেশই তো আমার প্রাণ।’

ঢাকায় এসে কী দেখেছেন? ‘পাকিস্তান আমলে ঢাকা তো খুবই অনুন্নত ছিল। তার মধ্যেও দু-একটি ভালো স্থাপনা ছিল। যা হোক, ঢাকায় যেসব বুদ্ধিজীবী ছিলেন, তাঁদের তো সবাইকে মোটামুটি শেষ করে দিল পাকিস্তানিরা—যে পাকিস্তানে আমার বেড়ে ওঠা। এসব দৃশ্য দেখে শুধু ঘৃণা আসতে থাকল ওদের ওপর। যখন ঢাকায় স্থায়ী হয়ে থাকা শুরু করলাম, তখন থেকে মূলত ঢাকা চিনতে শুরু করলাম। ১৯৭৪ সালের দিকে আমি বাংলাদেশে গান গাওয়া শুরু করি। আমার পরিচিতি তো ছিল তার আগে থেকেই। খুব ছোটবেলায় পরিচিতি পাওয়ায় আমার সারা জীবনের একটি আক্ষেপ রয়েছে। তা হলো আমার সারা জীবনই তারকা হয়ে থাকতে হলো, কখনো সাধারণের মতো যেখানে-সেখানে যেতে পারিনি। ঢাকায় তো তেমন ঘোরা হয় না। আমার মেয়ে লন্ডনে থাকে। ওর ওখানে মাঝেমধ্যে যাই। ওখানেও আমার প্রচুর পরিচিত মানুষ। এমন জায়গা খুঁজি যেখানে মানুষ আমাকে চেনে না।’

অনেক দিন ধরেই তিনি আছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। এখনকার ঢাকা কেমন লাগে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে ঢাকার উন্নতি বলতে ততটুকুই ছিল, যতটুকু পশ্চিম পাকিস্তানিদের আরাম-আয়েশের জন্য প্রয়োজন ছিল। যতটুকু না দিলেই নয়, এমন করে উন্নয়ন হতো। যুগ বদলাচ্ছে। বদলের পৃথিবীতে ঢাকারও অনেক বদল ঘটেছে, যা আছে তাতে আমি অখুশি নই। তবে রাজধানীর উন্নয়নে আমাদের সবারই ভূমিকা রাখতে হবে। এই শহরের মানুষগুলো খুব ব্যস্ত। সেই ব্যস্ততার ফাঁক গলেও কিছু কাজ করা যায়। দেশের জন্য কিছু করতে হলে সংগঠিত হতে হবে, বিশেষ করে তরুণদের। আড্ডা, গান সব কিছুই হবে, তার মধ্যে এই চেতনাটাও থাকা দরকার—দিন শেষে আমার দেশটাকে কতটুকু সময় দিলাম। এটা নিয়ে কি কিছু ভাবলাম? নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে। এক একটা গ্রুপ করে যদি আমরা শহরের পরিবেশটা ঠিক রাখার চেষ্টা করি, সেটাও কিন্তু অনেক। একটা ফ্লাইওভার নির্মাণ করা তো সরকার ছাড়া সম্ভব নয়। তবে আমরা কিন্তু পারি সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য মাঠে নামতে। আমি নিশ্চিত তাতে সরকার বা সমাজের উচ্চবিত্তরাও এগিয়ে আসবেন। আর এতে নিজের মধ্যেও তৃপ্তি লাগবে যে দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছি। মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে একটা দেশ দিয়েছে আমাদের। সেই দেশটাকে সুন্দর না রাখতে পারলে মুখে স্বাধীনতার কথা বলে কি লাভ?’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা