kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

সাতরং ছড়ানো পপি

রংধনু একাডেমির স্বত্বাধিকারী সুলতানা পপি। এসএসসি পাসের পর চাকরি শুরু করলেও নিজের গড়া একাডেমিই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় কাজের জায়গা। করেছেন অনেকের কর্মসংস্থান। পেয়েছেন জাতীয় যুব পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শুনেছেন ফরহাদ হোসেন

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাতরং ছড়ানো পপি

‘দাদাবাড়ি ঢাকার লালবাগে। ছিল যৌথ পরিবার। কিন্তু মা-বাবা থাকতেন বাগেরহাটে। আমাদের দুই বোন, এক ভাইয়ের সংসার। মা-বাবা বাগেরহাটে থাকলেও ঢাকায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে বাগেরহাট থেকে আমি ঢাকায় চলে আসি। বছরখানেক পর মা-বাবাসহ সবাই চলে এলেন লালবাগের বাসায়। ছোটবেলায় হাতের কাজ শিখেছিলাম। শখ করে যা বানাতাম তা অনেকে পছন্দ করে কিনে নিতেন। এটা দেখে এক কাজিন আমাকে একটা এনজিওতে ফিল্ড সুপারভাইজার পদে কাজ পাইয়ে দিল। তত দিনে এসএসসির ফল বেরিয়েছে। ভর্তি হলাম ধানমণ্ডির উইমেন ফেডারেশন কলেজে। তখন থেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার বাসনা। এনজিওর চাকরি ছেড়ে ১৯৯১ সালে যোগ দিই ব্র্যাকের আড়ংয়ে সেলস এক্সিকিউটিভ পদে। পড়ার পাশাপাশি চলছিল আড়ংয়ের চাকরি। সেখানে কাজের সুবাদে ক্রিয়েটিভ অনেক কিছু শিখি। আমার কাজের দক্ষতার কারণে তখন আড়ং থেকে পাই বেস্ট পারফরমার অ্যাওয়ার্ড। আড়ং থেকে চাকরি ছেড়ে ১৯৯৬ সালে যোগ দিই গণসাহায্য সংস্থা নামের একটি বেসরকারি সংস্থায় সেক্রেটারি হিসেবে। সেই চাকরিতে থাকাকালে দুপুরের খাবারের সময়টুকুতে বিভিন্ন বিষয়ে হাতের কাজ শিখতাম যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে। বিকেলে অফিস শেষ করে বাসায় গিয়ে আবার অন্য নারীদের তা শেখাতাম। এভাবে নিজের শেখা কাজটাকে আরো অনেকের মাঝে বিলিয়ে দিতে থাকলাম। একটা সময় অনুভব করলাম প্রশিক্ষণ একাডেমি দিলে মন্দ হয় না। সেই প্রেরণা থেকেই ঘয়োরাভাবে খুলি রংধনু একাডেমি।’ এভাবেই উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার কথাগুলো বলছিলেন সুলতানা পপি।

তিনি আরো বলেন, ‘১৯৯৭ সালে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় আমার। ঘরসংসার সামলানোর পাশাপাশি চাকরি ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজগুলো শত কষ্টের মধ্যেও সমানতালে চলছিল। ১৯৯৯ সালে ঘর আলোকিত করে জন্ম নিল মেয়ে। একই বছর চাকরিও বদলালাম। যোগ দিলাম রাশেদা কে চৌধুরীর গণস্বাক্ষরতা অভিযানের সেক্রেটারি পদে। বছরখানেক পরে সুযোগ হলো ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করার। অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দিলাম ভিক্টরি ট্রাভেলস লিমিটেডে। ২০০৩ সালে কোলজুড়ে এলো এক পুত্রসন্তান। এরপর চাকরির সব পর্ব চুকিয়ে মন দিলাম নিজের গড়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে।

২০০৬ সালে রংধনু একাডেমির নামে নেওয়া হলো ট্রেড লাইসেন্স। মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় দেড় লাখ টাকা দিয়ে নিলাম একাডেমির জন্য ঘরভাড়া। সেই টাকার অনেকটা এক আত্মীয় থেকে ধার নিয়েছিলাম। কয়েক বছর পরে আমার একাডেমি শিফট করি উত্তর কাফরুলে। এখন সেখানেই চলছে আমার সব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। আমি যখন প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু করি, তখন পরের অধীনে চাকরি করতাম। নিজের স্বাধীনতা ছিল না। তার পরও শত কষ্টের মধ্যেও প্রশিক্ষণ দেওয়াটা চালিয়ে যেতাম। নিজেও শিখতাম প্রতিনিয়ত। যখনই কোনো কিছুর প্রয়োজন মনে হতো তা শিখে নিতাম। আমি ফুরসত পাওয়া ছোট ছোট সময়কে কাজে লাগিয়ে বড় কিছু করার চেষ্টা করতাম। মনের ভেতরে একটা কথাই পুষে রাখতাম যে আমাকে ভালো কিছু করতে হবে। এখনকার তুলনায় তখন আসলে মেয়েদের বাইরে কাজের পরিবেশটা খুব একটা ভালো ছিল না। তা ছাড়া তখন কম মেয়েরাই বাইরে কাজ করত। তবে এখনো আমরা অনেক দিক থেকে পজিটিভ হতে পারিনি। সামাজিক একটা বাধা এখনো রয়েই গেছে। তবে মা-বাবা আর স্বামীর কাছ থেকে অনেক পজিটিভ মনোভাব পেয়েছি। তা না হলে হয়তো এত দূর পথ হাঁটা হতো না।

নিজ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে সুলতানা পপি

একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালাতে নানা ধরনের জ্ঞান রাখতে হয়। আমি মনে করি অন্য কাউকে কাজ শেখানোর আগে নিজে ভালো করে শিখতে হবে। আমি বিভিন্ন সময়ে এসএমই ফাউন্ডেশন, বিসিক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ সরকারি-বেসরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে পঞ্চাশের অধিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ১৯৯৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নানা বিষয়ে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। প্রশিক্ষণ শেষে এসব নারী ঘরে বসে ছোট পরিসরে প্রতিষ্ঠান খোলে বা অন্য কারো প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পায়। আমার প্রশিক্ষণ একাডেমি থেকে ফুড মেকিং অ্যান্ড প্রসেসিং (পিঠা এবং ঘরে তৈরি খাবার), ভেজিটেবল কাভিং, অপারেশন অব হোম এপ্লায়েন্সের নানা বিষয়, পোশাক তৈরি, সেলাই ও এমব্রয়ডারি, হ্যান্ডিক্রাফটের নানা বিষয়, ক্যান্ডেল শোপিস, পাটের পণ্য তৈরি, বনসাই তৈরিসহ শতাধিক বিষয়ে লক্ষাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমার এখান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া অনেক নারীই এখন দেশ-বিদেশে কাজ করে।’

নিজের গড়া রংধনু একাডেমি ছাড়াও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত আছেন পপি। এ ছাড়া বেশ কিছু বেসরকারি টিভি চ্যানেলে হ্যান্ডিক্রাফট, বুটিক, রান্নাসহ নানা বিষয়ে অনুষ্ঠান করেছেন। বুটিক ও হ্যান্ডিক্রাফট পণ্য নিয়ে এসএমই মেলা, যুব মেলা, বিসিক মেলাসহ অন্যান্য মেলায় নিয়মিত অংশ নেন। এ ছাড়া প্রতিবছর জাতীয় পিঠা উৎসবে থাকে তাঁর সরব উপস্থিতি। 

কাজের সুবাদে পেয়েছেন জাতীয় যুব পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা। সেরা আত্মকর্মী হিসেবে ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পেয়েছেন জাতীয় যুব পুরস্কার। উদ্যোক্তা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ২০১৭ সালে। পেয়েছেন সিঙ্গার বেস্ট সুইং টিচার অ্যাওয়ার্ড, সিঙ্গার বেস্ট সেলার অ্যাওয়ার্ড। ঝুলিতে আছে পিডিলাইট অ্যাওয়ার্ড, পিডিলাইট সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড ২০১৭-১৮। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে পেয়েছেন ফুড ফেস্টিভাল অ্যাওয়ার্ড, জাতীয় পিঠা উৎসবে বিজয়ী হয়েছেন পাঁচবার। যুক্ত আছেন উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বি’ইয়ার মেন্টর হিসেবেও। জানা গেল তাঁর রংধনু একাডেমিতে বিভিন্ন ট্রেডের প্রশিক্ষকসহ কাজ করে দশজন। নিজ একাডেমি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে পপি বলেন, ‘একাডেমির কাজটা নিয়মিত করে যেতে চাই। সঙ্গে সমাজ ও দেশের যুব সমাজ, বিশেষ করে নারীর উন্নয়নে কাজ করতে চাই। ভবিষেত ইচ্ছা আছে বৃদ্ধাশ্রম করার, যা হবে কর্মমুখী। বৃদ্ধাশ্রমে থাকা একজন ব্যক্তি যেন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সময় কাটাতে পারে। যদি কেউ শ্রম দিতে না পারে, সে যেন বুদ্ধি দিয়েও অবদান রাখতে পারে। আমাদের দেশে স্টিটফুড নিয়ে হাইজিন ও মানসম্মত খাবারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দিতে চাই। যেন তারা রাস্তার পাশেও পরিচ্ছন্ন, মানসম্মত খাবার তৈরি ও বিক্রি করতে পারে।’ নতুনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নতুনরা অনেকেই কোনো কাজ শুরুর আগেই ভাবে মূলধন দরকার। আমি বলব, আগে কাজের দক্ষতা অর্জন করুন। জেনে-বুঝে কাজে নামাটাই উত্তম। সরকার এখন নারীদের অনেক কাজ শেখার সুযোগ করে দিয়েছে। ইচ্ছা করলে এটাকে কাজে লাগাতে পারেন। নিজেকে দক্ষ করতে পারলে অর্থের জোগানটাও হয়ে যায়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা